৩ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলা

Send
তোফায়েল হোছাইন
প্রকাশিত : ১৯:২২, মার্চ ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১২, মার্চ ২৮, ২০২০

বনানীতে ধর্ষণ মামলার পাঁচ আসামি

২০১৭ সালের ২৮ মার্চ আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ধর্ষণের শিকার হন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ছাত্রী। বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের এ ঘটনা ঘটে। আলোচিত এ ঘটনার দায়ের করা মামলায় তিন বছর পার হলেও এখনও মামলাটির বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তির মুখ দেখছে না।  কবে নাগাদ মামলাটির নিষ্পত্তি হতে পারে তাও বলতে পারছ্নে না সংশ্লিষ্টরা। অনেকের অভিযোগ, বারবার উচ্চ আদালত থেকে ধর্ষণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা থাকলেও মানা হচ্ছে না। তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মামলাটি যাতে দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হয়, সে চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহারের আদালতে মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলছে। সর্বশেষ চলতি মাসের ২৩ মার্চ মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওইদিন আদালতে কোনও সাক্ষী হাজির না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ পেছানোর জন্য সময়ের আবেদন করা হয়। বিচারক আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ৭ মে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন।

সংশ্লিষ্ট আদালতের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর আফরোজা ফারহানা আহমেদ বলেন, আলোচিত  মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে আছে। সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলাটির বিচারকাজ শেষ হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, দুই ভিকটিমের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার। তাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালত থেকে সমন পাঠানো হয়। তারপরও তিনি আদালতে হাজির হচ্ছেন না। তিনি আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তার জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাক্ষ্য দিতে এলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষ্যগ্রহণ করাতে দিচ্ছেন না। তারা বলছেন, আগে শাহরিয়ারের সাক্ষ্য নেওয়া হোক। একারণে মামলাটির সাক্ষ্য হচ্ছে না। ফলে মামলাটি টেকনিক্যাল সমস্যায় পড়ে যায়। তা না হলে এতদিন রায়ের কাছাকাছি চলে যেত। তারপরও আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করবো। আসামিদের যেন সর্বোচ্চ সাজা হয় এবং ভুক্তভোগী পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সাক্ষী না আসায় বিচার শেষ হচ্ছে না। এ পর্যন্ত আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন আমরা আশা করছি তাদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হবে।

জামিনে থাকা চার আসামির আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন মোল্যা বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য নয়। মামলাটির ট্রায়াল চলছে। আমরা ট্রায়াল ফেস করছি।  আশা করছি, আসামিরা খালাস পাবেন। কারাগারে থাকা নাঈম আশরাফের আইনজীবী শিশির আলম খান বলেন, মামলার চার আসামি জামিন পেলেও নাঈম আশরাফ জামিন পাচ্ছেন না। জামিনের জন্য আমরা উচ্চ আদালতে যাবো। এ মামলা থেকে আমার আসামি ন্যায় বিচার পাবেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত অভিযুক্তরা মামলার বাদী, তার বান্ধবী ও বন্ধুকে আটকে রাখে। অস্ত্র দেখিয়ে ভয় প্রদর্শন ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। বাদী ও তার বান্ধবীকে জোর করে একটি কক্ষে নিয়ে যায় তারা। বাদীকে সাফাত আহমেদ ও তার বান্ধবীকে নাঈম আশরাফ একাধিকবার ধর্ষণ করে।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, সাদমান সাকিফকে দুই বছর ধরে চেনেন মামলার বাদী। তার মাধ্যমেই ঘটনার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে সাফাতের সঙ্গে দুই ছাত্রীর পরিচয় হয়। ওই দুই ছাত্রী সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যান। সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী তাদের বনানীর ২৭ নম্বর রোডে রেইনট্রি হোটেলে নিয়ে যায়। হোটেলে যাওয়ার আগে বাদী ও তার বান্ধবী জানতেন না যে, সেখানে পার্টি হবে। তাদের বলা হয়েছিল, এটা একটা বড় অনুষ্ঠান, অনেক লোকজন থাকবে। অনুষ্ঠান হবে হোটেলের ছাদে। সেখানে যাওয়ার পর তারা কাউকে দেখেননি। সেখানে আরও দুই তরুণী ছিল। বাদী ও তার বান্ধবী সাফাত ও নাঈমকে ওই দুই তরুণীকে ছাদ থেকে নিচে নিয়ে যেতে দেখেন। এ সময় বাদীর বন্ধু ও আরেক বান্ধবী ছাদে আসেন। পরিবেশ ভালো না লাগায় তারা চলে যেতে চান। এই সময় অভিযুক্তরা তাদের গাড়ির চাবি শাহরিয়ারের কাছ থেকে নিয়ে নেয় এবং তাকে মারধর করে। ধর্ষণের সময় সাফাত গাড়িচালককে ভিডিওচিত্র ধারণ করতে বলেন। বাদীকে নাঈম আশরাফ মারধর করে

ওই ঘটনায় ২০১৭ সালের  ৬ মে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয়। ওই বছর ৭ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের (ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার) পরিদর্শক ইসমত আরা এমি আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আসামিরা হলো, সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, দেহরক্ষী রহমত আলী ও গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন।

২০১৭ সালের ১৩ জুলাই আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলাটিতে এখন পর্যন্ত ৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার দুই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সত্যব্রত শিকদার ও খুরশীদ আলম সাক্ষ্য দেন। গত ছয় মাসে কোনও সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

এদিকে মামলাটিতে নাঈম আশরাফ বাদে অপর চার আসামি জামিনে আছেন। মামলাটিতে ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর সাফাত আহমেদের জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি আদালত তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠান। গত বছর ৭ নভেম্বর আদালত ফের সাফাতের জামিন মঞ্জুর করেন।

/এমআর/এমএমজে/

লাইভ

টপ