এক বাড়িতেই ছিল ২২টি বাংকার!

হিমাদ্রী শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ
০৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৬:০৩আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৪:১৫

আজাফর আলী মোড়লের বাড়িসুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে সুরমা ও ধলাই নদী  এবং আঁকাবাঁকা মেঠোপথ  পেরিয়ে মেঘালয় পাহাড়ের পা ঘেঁষে  নারায়নতলা গ্রাম। জেলা সদর থেকে দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভৌগোলিক অবস্থান ও নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামেই আজাফর আলী মোড়লের বাড়িতে সি কোম্পানির সদর দফতর স্থাপন করেছিলেন। বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। তিন একর আয়তনের ওই বাড়ির চারপাশে মুক্তিযোদ্ধারা ২২টি বাংকার স্থাপন করেছিলেন। রাতদিন এসব বাংকারে থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর নজর রাখতেন এবং তাদের ওপর সাঁড়াশি অভিযান চালাতেন। অস্ত্র, গোলাবারুদ মজুদ রাখা, খাবার সরবরাহ করা, আশ্রয় দেওয়াসহ সব ধরনের সাহায্য করতেন আজাফর আলী। তবে তার সে অবদানের কথা এ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার কেউ নেই।

নারায়নতলা গ্রামের পশ্চিম সীমান্ত বেয়ে ধলাই নদী। পূবে ও উত্তরে মাত্র আধ কিলোমিটারের মধ্যে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। দক্ষিণ দিকে নুরুজপুর হাওর। সীমান্তের খুব কাছাকাছি হওয়ায় ভারত থেকে যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ সহজে সংগ্রহ করে আজাফর আলী মোড়লের বাড়িতে মজুদ করে রাখা হতো।মুক্তিযোদ্ধারা বিপদে পড়লে সহজে সীমান্ত পার হয়ে ভারতীয় বাহিনী তাদেরকে সহযোগিতা করতে পারতো। এনিয়ে পাকবাহিনীর মধ্যে একটি ভীতিও কাজ করতো।

জানা গেছে, কোম্পানি সদর দফতর হওয়ায় প্রতিদিনই এ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আসা যাওয়া করতেন। দীর্ঘ সাত মাস মুক্তিযোদ্ধারা আজাফর মোড়লের বাড়িতে অবস্থান করেন। তার পরিবারের লোকজন ও গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারদাবার দেওয়াসহ অন্যান্যভাবে সহযোগিতা করতেন।

প্রয়াত আজাফর আলী মোড়লের স্ত্রী মঞ্জুরা বেগম বলেন, ৭১ সালে তার স্বামীর বয়স ছিল ৪৫ বৎসর।বাড়িতে গোয়ালঘর, গোলাঘর, খড়েরঘরসহ মোট ৭টি ঘর ছিল। এসব ঘরের তিনটিতে মুক্তিযোদ্ধারা থাকতেন।বাড়ির সামনে খোলা মাঠে তারা ট্রেনিং নিতেন এবং বাংকারে অবস্থান করে যুদ্ধ করতেন। তিনি ও পরিবারের সদস্যরা তাদের রান্না করে দিতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য দেশীয় দোসর আলবদর রাজাকারসহ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের বাড়ি আক্রমণ করে।এতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। ভয়ে আজাফর আলীর পরিবারের লোকেরা বাড়ির পাশে ভারতে চলে যান। যুদ্ধের দুইদিন পর বাড়ি ফিরে তারা দেখেন পাঞ্জা ও তাদের দোসররা বাড়িতে ব্যাপক লুটপাট করে। এমনকি কাপড় চোপড় থেকে শুরু করে হাঁড়িপাতিল সব নিয়ে যায়।

সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার মো. মোকসেদ আলী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও নিরাপদে রসদ সংগ্রহ সরবরাহের জন্য আজাফর আলীর বাড়িতে সি কোম্পানির সদর দফতর স্থাপন করা হয়েছিল। বাড়িটি ছিল সীমান্তের খুব কাছে। ছিল বিএসএফের ক্যাম্প। যুদ্ধের সময় আজাফর আলী মোড়ল ও তার পরিবারের লোকজন মুক্তিযোদ্ধাদের ঐকান্তিক সাহায্য সহযোগিতা করেছে। তারা গোলার ধান, গোয়ালের গরু, পুকুরের মাছ সবই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন।এ বাড়িটি কোম্পানি হেডকোয়ার্টারের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এ বাড়িতে  অবস্থান করে অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এ বাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম অংশ। তারপরও এখানে কোনও ধরনের স্মৃতিস্মারক স্থাপন করা হয়নি।এমনকি আজাফর মোড়লের নামে এলাকায় কোনও প্রতিষ্ঠানও নেই।’৭১ এর যুদ্ধে তাঁর ত্যাগ খাটো করে দেখার কোনও অবকাশ নেই।’

আজাফর মোড়লের দ্বিতীয় ছেলে ও সাবেক ইউপি সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, ‘সি কোম্পানির কমান্ডার এনামুল হক চৌধুরী এ বাড়িতে অবস্থান করে আশপাশের এলাকায় হানাদার বাহিনীর ওপর সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের পরিবার যুদ্ধের সময় বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। বাবা সংসারের সব কিছু দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের এতো বছর পরও আমাদের পরিবারের কোনও মূল্যায়ন করেনি সরকার। আজ আমাদের পরিবারের সদস্যরা অসহায়ভাবে দিন যাপন করছে। বাড়িতে অনেক শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়ে রয়েছে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করার দাবি জানাই সরকারের কাছে।’

তৃতীয় ছেলে মতিউর রহমান কাজল বলেন, যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৩/১৪ বছর। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির বাক্স, ম্যাগাজিন, বোমা, মর্টার, এসএমজি বোঝা বয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন।এছাড়া তাদের খাবার পরিবেশন করতেন।

আজাফর আলী মোড়লের নাতনি ও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের  বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মোছা. শ্যামা আক্তার বলেন,  তিনি বলেন ছোট বেলায় তারা তাদের দাদির মুখে মুক্তিযোদ্ধা আজাফর মোড়লের অবদানের  অনেক গল্প শুনেছেন। তার দাদা দেশ স্বাধীনের জন্য নিজের সহায় সম্বল অনায়াসে বিলিয়ে দিয়েছেন।কিন্তু দেশ স্বাধীনের এতো বছর পেরিয়ে গেলেও তার কোনও মূল্যায়ন করেনি সরকার।তাদের বাড়িতে যুদ্ধস্মৃতি রক্ষায় কোনও স্মৃতিসৌধ বা স্থাপনা তৈরিরও উদ্যোগ নেয়নি সরকার।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত আজাফর আলী মোড়লের বাড়িতে সরকার একটি স্মৃতিস্থম্ভ নির্মাণ করে নুতন প্রজন্মের কাছে ৭১ এর সঠিক ইতিহাস তুলে ধরুক, এই দাবি জানান এলাকাবাসী।

/এফএস/টিএন/

সম্পর্কিত
বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে ফের উড়লো বাংলাদেশের পতাকা
অযত্ন-অবহেলায় সর্ববৃহৎ গণহত্যার স্থান, ৫৪ বছরেও হয়নি স্মৃতিসৌধ
নানা আয়োজনে রাজধানীবাসীর বিজয় উদযাপন
সর্বশেষ খবর
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি