পুলিশ দিয়ে আমি সরকার চালাতে চাই না: বঙ্গবন্ধু

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৮:০০, মে ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০, মে ২০, ২০২০

১৯৭২ সালের ২০ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমিক সমাবেশে যে ভাষণ দেন তার ওপরে দৈনিক বাংলায় ২১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

(বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ওই বছরের ২০ মে’র ঘটনা।)

২০ মে ১৯৭২। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমিক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে বলেন, ‘জনগণকে কষ্ট দিয়ে আমি সরকার চালাতে চাই না। পুলিশ দিয়ে আমি সরকার চালাতে চাই না। তবে চোর গুণ্ডা বদমাশ দমন করার জন্য পুলিশ থাকবে।’ তিনি চোরাকারবারি, মজুতদার, জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান। 

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একইসঙ্গে দেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে উৎপাদন বাড়ানো এবং শিল্পে শান্তি রক্ষার জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান। ওই বছরের ২০ মে ঢাকা কটনমিল প্রাঙ্গণে জাতীয় শ্রমিক লীগের দুই দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। দৈনিক বাংলাসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এ খবর প্রকাশিত হয়। 

বঙ্গবন্ধু বলেন, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির জন্য চরম কষ্ট স্বীকার করতে হয়। বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ ৫ বছর একটানা কঠোর পরিশ্রম করেছে। তারা স্বেচ্ছায় উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের পুনর্গঠনে ও সেখানকার শ্রমিকরা দ্বিগুণ পরিশ্রম করে দেশকে গড়ে তুলেছে। 

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪০ মিনিট বক্তৃতা করেন। সম্মেলনের প্রতিনিধিগণ বারবার গগনবিদারী স্লোগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের সমর্থন জানান বলে দৈনিক বাংলার খবরে প্রকাশ করা হয়। বিদেশি শক্তির দালালদের সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, বিদেশি অর্থপুষ্ট দালালরা দেশে সমাজতন্ত্র কায়েমের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তারা আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র করছে, কোটি কোটি টাকা খরচ করছে কিন্তু আমাদের জনগণ ঐক্যবদ্ধ আছে। শত্রুদের ষড়যন্ত্র সফল হবে না। আইয়ুব-ইয়াহিয়া চৌধুরী মোহাম্মদ আলীদের বড় বড় ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেছে। তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, অতীতে যখন তিনি আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা সাড়া দিয়েছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে তিনি তাদেরকে ডাক দেবেন এবং তখন শ্রমিকরা তার পাশে এসে দাঁড়াবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, আমি বাংলার মাটিকে চিনি। বাংলার মানুষকে জানি। তাদেরকে আমি ভালোবাসি। তাদের জন্যই আমি প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ গ্রহণ করেছি। কিন্তু আমি যখন বুঝবো আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা আর নেই, প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ ছেড়ে আমি আবার জনতার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে দ্বিধা করবো না। 

স্বাধীনতার সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ৩০ লক্ষ মানুষের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি না হলে সে স্বাধীনতা হবে অর্থহীন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা একদিনে আসে নাই স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল অনেক আগে। ধাপে ধাপে এই সংগ্রাম এগিয়ে এসেছে। স্বাধীনতার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করে নিতে হয়। সময়োপযোগী স্লোগান তুলে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হয়। তা নাহলে জনগণ বিভ্রান্ত হয় এবং পেছনে পড়ে থাকেন।

পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, সাবেক পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাদেশকে তাদের বাজারে পরিণত করেছিল, এ দেশে তারা এক শ্রেণির দালাল সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু, অস্বীকার করে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, দেশের সমস্যা আজ অনন্ত গ্রামে গ্রামে। খাদ্য সমস্যা, আমাদের মা বোনদের পরনে বস্ত্র নেই, লক্ষ লক্ষ লোকের জন্য আশ্রয় দরকার, ব্রিটিশ শাসন করেছে পাকিস্তানের উপনিবেশবাদীরা সম্পদ বেড়েছে। ২৪ বছর ধরে তাদের অত্যাচারে এক কোটি লোক দেশত্যাগ করে।

শ্রমিক সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু (১৯৭২ এর ২১ মে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে নেওয়া।

মজুরি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে

মজুরি বৃদ্ধি প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের বেতন গড়ে ২৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে বছরে ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। এছাড়া পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হয়েছে করা হয়েছে, সার্টিফিকেট প্রথা তুলে দেওয়া হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। সবাই নিজ নিজ ধর্ম কর্ম করবেন। কেউ তাতে বাধা দিতে পারবে না। কিন্তু ধর্মের নামে শোষণ লুট নির্যাতন করা চলবে না। ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। এছাড়া সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দেশকে ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না।

বঙ্গবন্ধু বলেন, সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হলে শ্রমিকদের দায়িত্ব বেশি। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে না গিয়ে আমরা যদি ধর্মতন্ত্রের পদ্ধতি তবে অনেক অর্থ দেশে আসতো। তাতে ভবিষ্যৎ বংশধররাও গোলাম হবে। আমি কিছুতেই তা হতে দেবো না।

তিনি বলেন, যারা সমাজতন্ত্রের বিশ্বাস করে না তারাই গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তারা অতিবিপ্লবী ও হটকারী।

 

/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ