কীভাবে খরচ হবে সেই ‘খাবারের বিলের ২০ কোটি টাকা’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:২৫, জুলাই ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫১, জুলাই ০২, ২০২০

ঢামেক চিকিৎসকদের পরিবহন খরচ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কোভিড-১৯ চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়া বাবদ এক মাসে ২০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে’—এমন একটি তথ্য শনিবার বিকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। বিষয়টি নিয়ে সোমবার সংসদে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে চাওয়া ব্যাখ্যার জবাব দেয় ঢামেক কর্তৃপক্ষ। আসলেই কি খাবারে খরচ হলো ২০ কোটি টাকা? কর্তৃপক্ষের দাবি, শুধু খাওয়া বাবদ এই টাকা চাওয়া হয়নি। কোভিড-১৯ চিকিৎসা সেবা দিতে মোট দুই হাজার ৭৬ জন জনশক্তি দরকার হয়। তাদের থাকা, খাওয়া, যাতায়াতসহ সব খরচের বাজেট এটি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করা টাকা ঢামেক কর্তৃপক্ষের হাতে আসলেও এখন পর্যন্ত কোনও টাকা খরচ করা হয়নি। হোটেল বা যানবাহন সংশ্লিষ্ট কাউকে বিল পরিশোধ করা হয়নি। 

ঢামেকের উপপরিচালক ও  কোভিড চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিতদের ‘হোটেল ও যানবাহন নির্বাচন কমিটির’ সদস্য সচিব আলাউদ্দিন আল আজাদ, ‘গত ২৩ জুন আমরা মন্ত্রণালয় থেকে টাকা হাতে পেয়েছি। তবে একটি টাকাও কোথাও বিল দেইনি। আমাদের কাছে হোটেল, যানবাহন সংশ্লিষ্টরা বিল পাঠিয়েছে। আমরা সেগুলো যাচাইবাছাই করছি।’

এদিকে, চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়ার বিষয়ে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে তা সঠিক নয় বলে দাবি করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে সেই হিসাবসহ ব্যাখ্যার কাগজের কিছু অংশ। এতে দেখা যায় ঢামেকের করোনা চিকিৎসকদের দুই মাসের যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়েছে ১০টি ১২ সিটের মাইক্রোবাস, ১টি ১৫ সিটের মাইক্রোবাস, একটি ২৬ সিটের এসি টুরিস্ট বাস, দুইটি ৪৫ সিটের নন এসি বাস, চার রুটের চারটি বিআরটিসির ডাবল ডেকার ৭৫ সিটের নন এসি বাস। এই বাসের ভাড়া বাবদ এক মাসে ব্যয় হয় ৪৬ লাখ ৯৮ হাজার ৮৭০ টাকা। দুই মাসে ব্যয় হয় ৯৩ লাখ ৯৭ হাজার ৭৪০ টাকা।

অন্যদিকে হোটেল ভাড়া ও খাওয়া বাবদ দুই মাসের ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি ৬৪ লাখ ২৫ হাজার ৯৩৭ টাকা। মোট ৩০টি আবাসিক হোটেলের দৈনিক আবাসন খরচ ৬০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। এখানে অনেক হোটেলেই থাকার বিলের সঙ্গে খাওয়ার বিল যুক্ত নয়। ঢামেক চিকিৎসকদের আবাসন ও খাওয়া বাবদ খরচ-১

মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের খাওয়া খরচ বাবদ যে ২০ কোটি টাকার কথা বলা হচ্ছে, সেটা কেবল খাওয়া খরচ নয়। তাদের থাকা-খাওয়া-যাতায়াত সবকিছু মিলিয়ে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য সাধারণ সময়ের চেয়ে চারগুণ বেশি লোকবল লাগছে। এ হাসপাতালে এখন প্রায় সাড়ে ৬০০ এর বেশি করোনা রোগী রয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন ইতোমধ্যে আমাদের যাতায়াত, আবাসন ও খাওয়া বাবদ ১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যখন বাজেট চাওয়া হয় তখন জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ২০ কোটি টাকার মতো বাজেট দেওয়া হয় এবং সেটা তারা বিবেচনা করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর অনুমোদন পায়।

ব্রিগেডিয়ার এ কে এম নাসির উদ্দিন আরও বলেন, আমরা অনুমোদন পেয়েছি গত পরশু রাতে। এখন হোটেল, যানবাহনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিল পাঠিয়েছে, আমরা সেগুলো ‘স্ক্রুটিনাইজ’ করছি, চূড়ান্ত  হলে সেগুলো পাঠানো হবে। ২০ কোটি টাকা দেওয়া হয়নি, এটা খুবই ‘ক্লিয়ার অ্যান্ড ক্লিন’ বিষয়।ঢামেক চিকিৎসকদের আবাসন ও খাওয়া বাবদ খরচ-২

ঢামেকে কোভিড ইউনিটে কাজ করছেন কতজন

ব্রিগেডিয়ার এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবন ও পুরাতন বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটকে করোনার চিকিৎসায় ডেডিকেটেড করা হয়েছে। নতুন ভবনে এক সপ্তাহে ১১৭ জন চিকিৎসক কাজ করেন, তিন সপ্তাহে মোট ৩৫১ জন। বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে এক সপ্তাহে কাজ করেন ৫৩ জন চিকিৎসক, তিন সপ্তাহে সেটা হয় ১৫৯ জন। তিন সপ্তাহে এ দুই ভবন মিলিয়ে দরকার হয় ৫১০ জন চিকিৎসক। বাকি আরেক সপ্তাহে কাজ করেন ১৭০ জন চিকিৎসক। এক মাসে কাজ করেন মোট ৬৮০ জন চিকিৎসক। ৫৪ জন নার্স বার্নে কাজ করেন এক সপ্তাহে, তিন সপ্তাহে ১৬২ জন। নতুন ভবনে কাজ করেন ১৫৮ জন, তিন সপ্তাহে কাজ করেন ৪৭৪। তিন সপ্তাহে মোট কাজ করেন ৬৩৬ জন নার্স। এক মাসে মোট ৮৪৮ জন নার্স দুই ভবনে কাজ করেন। বাকি টেকনেশিয়ান, আল্ট্রাসাউন্ড, ল্যাবরেটরিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দরকার হয় এক সপ্তাহে ১৯ জন করে। তিন সপ্তাহে দরকার হয় ৫৭ জন। এক মাসে দরকার হয় ৭৬ জন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ করতে হয় ১৪ দিন করে। ১৫ দিনে কাজ করেন ১২০ জন, এক মাসে দরকার হয় ২৪০ জন। আবার বার্ন ইনস্টিটিউটে ১৫ দিনে ৫৮ জন করে কাজ করে। এক মাসে কাজ করেন ১১৬ জন। এক মাসে দুই ভবন মিলিয়ে কাজ করেন ৪৫৬ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। নতুন ভবনে ১৫ দিনে ৮৮ জন নিরাপত্তারক্ষী কাজ করেন, সে হিসেবে এক মাসে কাজ করেন ১৭৬ জন। বার্ন ইনস্টিটিউটে ১৫ দিনে কাজ করেন ২০ জন করে, সে হিসেবে একমাসে কাজ করেন ৪০ জন। দুই ভবন মিলিয়ে এক মাসে কাজ করেন ২১৬  জন। সে হিসেবে তিন সপ্তাহে কোয়ারেন্টিনে হোটেলে থেকেছেন ৫১০ জন চিকিৎসক, ৬৩৬ জন নার্স, ৪৫৬ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, টেকনোলজিস্ট ৭৬, আর নিরাপত্তারক্ষী ২১৬ জন। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা এক হাজার ৮৯৪ জন। আর ৩৯২ জনের মতো ‘রেস্টে’ থাকেন, যারা চতুর্থ সপ্তাহে কাজ করেন। মোট দুই হাজার ৭৬ জন জনশক্তি দরকার হয় এক মাসের জন্য।’ ঢামেক চিকিৎসকদের আবাসন ও খাওয়া বাবদ খরচ-৩

খাবারের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫০০ টাকা

এ বাজেটে দুই মাসের জন্য এবং প্রতিদিনকার খাবারের জন্য নির্ধারিত ৫০০ টাকা মাত্র বলে নিশ্চিত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক। অন্যদিকে ঢামেক পরিচালক জানিয়েছেন প্রতি মাসে চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, টেকনোলজিস্ট আর নিরাপত্তারক্ষীসহ মোট দুই হাজার ৭৬ জন জনশক্তি দরকার হয়। এই দুই হাজার ৭৬ জনের প্রতিদিন খাবার বাবদ (২০৭৬*৫০০) প্রয়োজন হয় ১০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। দুই মাস অর্থাৎ ৬০ দিনে এই ২০৭৬ জনের খাবার বাবদ ব্যয় ৬ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

ঢামেক চিকিৎসকদের আবাসন ও খাওয়া বাবদ খরচ-৪মন্ত্রণালয়ের মন্তব্যের অপেক্ষায় দুদক

তবে আদৌ এই ব্যয় হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান অনেক প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গসংগঠন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, এটা অস্বাভাবিক বিষয়, খাবারের খরচ বা হোটেল খরচ। গত পরশু বিষয়টি জেনে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে এটা সত্য কী সত্য নয়। আমরা এখনও তাদের কাছ থেকে রিপোর্ট পাইনি, তাদের প্রতিবেদন পাবার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেবো তদন্তে যাবো কিনা। নিউজটার বিষয়ে আমাদের সন্দেহ আছে, তাই মন্ত্রণালয়কে বলেছি এটার সত্যতা আগে যাচাই করতে। আমরা এখন মন্ত্রণালয়ের মন্তব্যের অপেক্ষা করছি।

/এমআর/এফএএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ