চোর ধরলেন যিনি, শাস্তিও পেলেন তিনি!

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৯:১৬, আগস্ট ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৮, আগস্ট ০৩, ২০২০

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকোরবানির ঈদে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা ৬০ টন ব্লিচিং পাউডার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগে সংস্থাটির ভাণ্ডার বিভাগের একজন কর্মকর্তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে এই অনিয়মের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে যিনি জানিয়েছেন, উল্টো তাকেই শাস্তি পেতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সংস্থার প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম। তিনি নিজে অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে দায় চাপিয়ে দিয়েছেন ভাণ্ডার রক্ষক শফিকুল ইসলামের ওপরে। একই সঙ্গে শফিকুলকে ওএসডি করানোর নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন সাজেদুল। এ নিয়ে নগর ভবনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীর মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে শেষমেশ রেহাই পাননি প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা। তাকেও শাস্তি পেতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তাকে বদলির আদেশ দিয়ে নগর ভবন থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।

জানা গেছে, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে পরিচ্ছন্নতা কাজে ব্যবহারের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৬০ টন ব্লিচিং পাউডার সরবরাহের জন্য কার্যাদেশ দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ৪৫ লাখ টাকার এ কাজটি পায় আই ভেঞ্চার লিমিটেড। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কার্যাদেশের শর্ত না মেনে ব্লিচিংয়ের সঙ্গে চক পাউডার মেশানোর পাশাপাশি প্লাস্টিকের উন্নতমানের ড্রামে সরবরাহ না করে সাধারণ বস্তায় সরবরাহ করে। এজন্য সংস্থার প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম আই ভেঞ্চারের সরবরাহ করা পণ্য গ্রহণের  সব আয়োজন প্রায় চূড়ান্ত করেন। কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হলে ডিএসসিসি’র মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সেই পণ্য (ব্লিচিং পাউডার) ফেরত পাঠান। পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

ডিএসসিসি সূত্র জানিয়েছে, ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের ৬০ টন ব্লিচিং পাউডার সরবরাহের জন্য আই ভেঞ্চার লিমিটেডের মালিক শেখ গোলাম দস্তগীরের নামে এই কার্যাদেশ দিয়েছিলেন ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম।

কার্যাদেশের শর্ত ছিল, সরবরাহকৃত ব্লিচিং পাউডার উন্নতমানের ও দেশি বা বিদেশি হতে হবে। ব্লিচিং পাউডার গ্যালভানাইজড লোহার তৈরি অথবা মজবুত প্লাস্টিকের তৈরি ড্রামে পলিথিনে মোড়ানো এয়ার টাইট অবস্থায় সিলগালা যুক্ত হতে হবে। প্রতি ড্রামে ২৫-৩০ কেজি ব্লিচিং পাউডার থাকতে হবে। প্রতিকেজি ব্লিচিং পাউডারের দাম ধরা হয়েছে ৬০ টাকা। ঠিকাদারের লভ্যাংশ, ভ্যাট ও আইটিসহ প্রতিকেজির দর দাঁড়ায় ৭৫ টাকা। সব মিলিয়ে ৬০ টন পাউডারের মূল্য ৪৫ লাখ টাকা।

কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশের এসব শর্ত মানেনি। বরং তারা বেশি লাভের আশায় বস্তাভর্তি ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ করে। এমনকি সরবরাহকৃত ব্লিচিং পাউডারের সঙ্গে চকের গুঁড়া মেশানোর অভিযোগ ওঠে।  ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ করপোরেশনের ভাণ্ডার বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুরো আয়োজনটি ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তার যোগসাজশে হয়েছে। অথচ এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযেগে ভাণ্ডার রক্ষক শফিকুল ইসলামকে গত ২৬ জুলাই ডিএসসিসির সচিবের দফতরে ওএসডি করা হয়।

ভাণ্ডার রক্ষক শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বস্তায় করে নগর ভবনে ব্লিচিং পাউডার নিয়ে আসার পর কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী মালামাল সরবরাহ না করায় তিনি ও সহকারী ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মনোজ কুমার রায় বিষয়টি প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলামকে জানান। এসময় সাজেদুল ইসলাম জানান, বিষয়টি সম্পর্কে মেয়রের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। সরবরাহকৃত ব্লিচিং পাউডারগুলো গ্রহণের জন্য  তাদের দুজনকে নির্দেশ দেন তিনি।’ শফিকুল ইসলাম  বলেন, ‘এরপরও আমি সেই মাল গ্রহণ করিনি। পরে স্বাস্থ্য বিভাগ বিষয়টি মেয়রের নজরে আনে। মেয়র এই মালামাল ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।’

তিনি আরও জানান, এই সুযোগে প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম নিজের দায় আড়াল করতে কর্তৃপক্ষকে ভুল বুঝিয়ে আমাকে সংস্থার সচিবের দফতরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করান। আমি মেয়র মহোদয়ের কাছে লিখিত আবেদন করবো। এর সঠিক তদন্ত চাইবো। এই ঘটনায় দফতরের আরও অনেকেই সাক্ষী আছেন।

নাম প্রকাশ না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আই ভেঞ্চারের একাধিক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যে দরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বর্তমানে বাজারে সেই দর নেই। করোনার কারণে ব্লিচিং পাউডারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তিনিই বস্তায় করে মাল সরবরাহের পরামর্শ দেন। সে কারণে আমরা মাল সরবরাহ করি। তবে যে কর্মচারীকে ওএসডি করা হয়েছে, তিনি এ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন। যদিও ব্লিচিং পাউডারের সঙ্গে চকের পাউডার মেশানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন আই ভেঞ্চারের এই কর্মকর্তারা।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি ডিএসসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম। এদিকে প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তার এমন কাণ্ডে নগর ভবনের ওই বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসি সচিব আকরামুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে ব্লিচিং পাউডার কেনার জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিকাদার কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী মালামাল সরবরাহ করেননি। তাছাড়া ঠিকাদার পাউডারের সঙ্গে চক পাউডার মিশিয়ে দিয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে ভাণ্ডার রক্ষক শফিকুল ইসলাম জড়িত—জানতে পারায় তাকে আমার দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখবো।’

সচিবের দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, পুরো বিষয়টিতে প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলামের কারসাজি ও অনিয়ম কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হওয়ায় তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তাকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পাট অধিদফতরে বদলি করা হয়।

/এপিএইচ/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ