পল্লবী থানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশই সম্পৃক্ত?

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০০:৪৫, আগস্ট ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৫, আগস্ট ১১, ২০২০

পল্লবী থানা

রাজধানীর পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণ নিয়ে রহস্য কাটেনি এখনও। ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ধোঁয়াশা কাটছে না। বিস্ফোরণের আগে পুলিশের দাবি অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া ৩ সন্ত্রাসী কেন এবং কার কাছ থেকে এসব বিস্ফোরক সংগ্রহ করেছিল তা নিয়ে স্পষ্ট করে কোনও কথা বলছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, গ্রেফতার হওয়া তিন সন্ত্রাসীর বাইরেও আরও কয়েকজনকে তারা শনাক্ত করেছেন, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাদের গ্রেফতার করতে পারলেই পুরো ঘটনা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এদিকে আলোচিত এই ঘটনার তদন্তের মাঝখানেই পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদসহ পল্লবী থানা সংশ্লিষ্ট পুলিশের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে একযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আলোচিত এই ঘটনাটি একটি ‘সাজানো নাটক’। রাজনৈতিক একটি পক্ষকে ফাঁসাতে গিয়েই এই ‘নাটক’ সাজানো হয়। ওই এলাকার পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন। এজন্য আড়াই কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে সূত্রগুলো বলছে।

আলোচিত এই ঘটনাটি বর্তমানে পুলিশের জঙ্গি প্রতিরোধে গঠিত বিশেষ ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট তদন্ত করছে। সিটিটিসির উপ-কমিশনার (স্পেশ্যাল অ্যাকশন গ্রুপ) আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। এই ঘটনায় আরও যারা জড়িত রয়েছে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাদের গ্রেফতার করতে পারলে ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পল্লবী এলাকায় দুটি রাজনৈতিক পক্ষ রয়েছে। এরমধ্যে একটি পক্ষের নেতৃত্ব দেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম বাপ্পী এবং আরেকটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা জুয়েল রানা। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাপ্পী তার প্রতিপক্ষ জুয়েল রানাকে ফাঁসানোর জন্য এই পরিকল্পনা করেছিলেন। এজন্য পুলিশের একজন কর্মকর্তাকে তিনি আড়াই কোটি টাকা দিয়েছিলেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে যে ৩  জনকে আটক করা হয়েছে, তারা সবাই জুয়েল রানার অনুসারী বলে জানা গেছে। অস্ত্র ও বিস্ফোরক দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই থানা পুলিশের ‘ভুল’-এর কারণে হাতে তৈরি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডিগুলো বিস্ফোরিত হয়ে যায়। বিস্ফোরণের কারণেই পুরো পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, বিস্ফোরণের পর স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারাও ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান। এজন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও তারা বিষয়টি লুকানোর চেষ্টা করেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসায় স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা একেকবার একেকরকম তথ্য দিতে থাকেন। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় ডিএমপি কমিশনার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেন। তদন্ত শেষে ওই কমিটি পুলিশ কমিশনারের কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। এর আগেই মিরপুর ও পল্লবীর সকল পুলিশ সদস্যকে একযোগে বদলি করা হয়। তবে তদন্ত কমিটির সদস্যদের কেউ প্রতিবেদন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।

সূত্র জানায়, পল্লবী থানায় বিস্ফোরিত বোমাগুলো শক্তিশালী আইইডি বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছে। এগুলো ভারতে পালিয়ে থাকা জামিল নামে এক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে এসেছে। তাদের কাছ থেকে আইইডি সংগ্রহের পর সেগুলো দিয়ে গ্রেফতার হওয়া তিন সন্ত্রাসীকে আদালতে চালান দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম দফায় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আইইডি না দিয়ে শুধু অস্ত্র ও বোমাসদৃশ বস্তু দিয়ে জব্দ তালিকা তৈরি করা হয়। বোমাসদৃশ বস্তু পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা সেটি পরীক্ষা করে ভেতরে বালু দেখে ফিরে যান। পরে পরিকল্পনা পরিবর্তন করে আসল আইইডি দেওয়া হয়। কিন্তু অসতর্কতার সঙ্গে সেগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে থানার ভেতরে বিস্ফোরিত হয়।

পুলিশের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, থানায় বোমা বিস্ফোরণের পর বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট আবারও ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। ঘটনাস্থলে ছুটে যান ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানারকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। একজন কর্মকর্তা জানান, বিস্ফোরণের পর পল্লবী থানা পুলিশের সদস্যদের জেরা করে মূল ঘটনা জানতে হয়েছে। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চাপ দিলে আসল কাহিনি বের হয়ে আসে। ওই কর্মকর্তা জানান, এই ঘটনার সঙ্গে পুলিশের জড়িত থাকার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হতে পারে। এমনিতেই কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা জোরালো হয়েছে। এরমধ্যে পল্লবীর ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে পুলিশের প্রতি আরও বেশি নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেবে। এ কারণে পল্লবী থানায় বিস্ফোরণের ঘটনাটি ‘ধীরে চলো’ নীতিতে তদন্ত চলছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুলাই ভোরে পল্লবী থানায় একটি আইইডি বিস্ফোরণের ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচ জন আহত হন। পরে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট গিয়ে আরও তিনটি তাজা বোমা নিষ্ক্রিয় করার দাবি করেছে। এ ঘটনায় রহস্য সৃষ্টি হলে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে বিভিন্ন কর্মকর্তা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেন। এটি জঙ্গিদের হামলা কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এমনকি একদিনের মাথায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট এ ঘটনার দায়ও স্বীকার করে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই এই ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দাবি করা হয়। ঘটনার সময় গ্রেফতার হওয়া শহিদুল, রফিকুল ও মোশারফকে দুই মামলায় সাত দিন করে মোট ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

/এমআর/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ
X