‘অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের ৫৮ শতাংশই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২০:৩১, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫১, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

করোনার প্রভাবে আয়ের সুযোগ হারিয়েছেন বেশিরভাগ নারী উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারীরা। ফলে এদের বেশিরভাগই পারিবারিক সহিংসতা, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, উদ্বেগসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। তবু আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা।

বৃহস্পতিবার (১৭ই সেপ্টেম্বর) ব্র্যাক সংলাপ ‘কাজে ও ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ তথ্য উঠে আসে। ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের উদ্যোগে অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ প্রোগ্রাম এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করে। 

‘কোভিড ১৯ মহামারিতে কুটির, অতি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির-শিল্প উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারীদের অবস্থা’ শীর্ষক এক দ্রুত সমীক্ষায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ এর কারণে উদ্যোক্তাদের ৬৫ শতাংশেরই কোনও উপার্জন নেই। এ মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত ছুটি ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আরোপের ফলে গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের ৫৮ শতাংশই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন।

সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ। সমীক্ষায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ এর কারণে উদ্যোক্তাদের ৬৫ শতাংশেরই কোনও উপার্জন নেই। এ মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত ছুটি ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আরোপের ফলে গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের ৫৮ শতাংশই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের ৬৭ ভাগ আয় কমে গেছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবীদের আয় কমেছে ৬৬ ভাগ। এর ফলে ৯০ ভাগ নারী উদ্যোক্তা এবং ৮৪ ভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।

ব্র্যাক জানায়, গত ৮ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই দেশের ২৮ জেলার ১৭৪টি উপজেলায় জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে ১ হাজার ৫৮৯ জন নারী অংশ নেন, যার মধ্যে ৫৮৯ জন উদ্যোক্তা এবং ১ হাজার কর্মী। অংশগ্রহণকারীদের ৩২ ভাগ হলেন গ্রামীণ নারী, বাকি ৬৮ ভাগ শহরাঞ্চলের।  

সমীক্ষায় দেখা যায়, এই দুর্যোগকালে উদ্যোক্তাদের ৩৩ শতাংশই তাদের ব্যবসায় উদ্যোগ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন, ৪১ ভাগ উদ্যোক্তা কর্মীদের কর্মবিরতিতে (লে অফ) পাঠিয়েছেন। ৮৬ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, ব্যবসায়িক সংকটগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে তারা কোনও ব্যবস্থাই নিতে পারেননি। কর্মজীবী নারীদের ৩৯ শতাংশ বলেছেন,টিকে থাকার জন্য আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে তাদের ঋণ নিতে হয়েছে। মহামারির এই সময়টাতে পরিবার থেকেই নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছেন ৪৬ ভাগ উদ্যোক্তা, আর ৭২ ভাগ কর্মজীবী নারী, যাদের বেশিরভাগই তীব্র মানসিক চাপে ভুগেছেন বলে জানান। এতে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়ে মাথাপিছু গড়ে  লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০৫ টাকা।

ব্র্যাক জানায়,  এই সমীক্ষার উল্লেখযোগ্য ফল হচ্ছে, এতসব সমস্যার পরেও এই নারী উদ্যোক্তা ও  কর্মজীবীরা আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এজন্যে ৮৩ শতাংশ কর্মজীবী নারী আর্থিক সহায়তা চান আর ৭৯ শতাংশ উদ্যোক্তা সহজ শর্তে ও অল্প সুদে ঋণ পেতে চান। এর পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও চান বেশিরভাগ উত্তরদাতা। আশার কথা হচ্ছে, মাত্র ১ শতাংশ তাদের আগের কাজ ও ব্যবসা উদ্যোগ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুস সালাম বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা গ্রহণেও কৌশলগত  পরিবর্তন আসছে।  কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশাল প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান ব্যাংকসহ আরও কিছু  ব্যাংক ঋণদান করছে। আশা করি, ডিসেম্বরের মধ্যেই এই অভাবের চিত্রটা পালটে যাবে। আমরা আবারও উঠে দাঁড়াবো।’

অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘কুটিরশিল্প ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসা উদ্যোক্তা এবং কর্মীদের এই গবেষণায় আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ,এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে খানা জরিপ করা হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের তালিকাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতো। এখন প্রয়োজনে এনজিওর মাধ্যমে এদের প্রণোদনা বিতরণ করার উদ্যোগ নিলে এ সমস্যা মোকাবিলা সহজ হবে।’

ব্র্যাকের  নির্বাহী পরিচালক  আসিফ সালেহ বলেন, ‘আমরা যদি গত চার-পাঁচ মাসে দেখা দেওয়া সংকটগুলো কাটিয়ে ওঠার সংকল্প নিই, যেমন- যথাসময়ে যথাস্থানে সহায়তা পৌঁছানো, নারীর প্রতি সহিংসতা ও স্কুলশিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা গেলে আমরা অবশ্যই অবস্থার উন্নতি করবো। নারীর মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেন এই সংকটে আরও প্রান্তিক না হয়ে পড়েন, সেই লক্ষ্যে আমাদের সরকার, সামাজিক সংগঠন ও এনজিওদের একত্রে কাজ করতে হবে।’

ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক শামেরান আবেদ বলেন, ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা নারীরা ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণত ঋণ পান না। আর কুটির ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তো ব্যাংকে যেতেই পারেন না। এনজিওগুলোকে এ দিকে নজর দিতে হবে, কিন্তু তাদেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সরকারি-বেসরকারি উভয়দিকেই সমন্বিত উদ্যোগে এর সমাধান খুঁজতে হবে।’

ইউসেপ বাংলাদেশ-এর চেয়ারপারসন পারভীন মাহমুদ বলেন, ‘নিউ নরমালে টিকে যাওয়ার জন্যে নারীদের ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় বদল আনার জন্যে সক্ষমতা এবং দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। আমাদের সরকারের পলিসিতে থাকলেও মাইক্রো ইন্স্যুরেন্সের সুযোগ নাই আমাদের দেশে। আমি মনে করি, কটেজ এবং মাইক্রো শিল্প উদ্যোগের নিরাপত্তার জন্যে মাইক্রো ইন্স্যুরেন্সের সুযোগ থাকা খুবই জরুরি। ’

ব্র্যাকের পরিচালক নবনীতা চৌধুরীর সঞ্চালনায় এতে প্যানেল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন— ইউসেপ বাংলাদেশ-এর চেয়ারপারসন পারভীন মাহমুদ, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের  প্রধান নির্বাহী  কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম, কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক, তরঙ্গ-এর প্রধান নির্বাহী  কর্মকর্তা কোহিনূর ইয়াসমিন প্রমুখ।

 

 

/এসও/এপিএইচ/

লাইভ

টপ