কোভিড ইউনিটে সেবা দেওয়া চিকিৎসকরা কোথায় যাবেন?

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০১:৫১, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৯, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

করোনা পরীক্ষা

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসকরা ডিউটি শেষে কোয়ারেন্টিনের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। ১৯ সেপ্টেম্বর তারা এই দাবিতে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক উত্তম কুমার বড়ুয়া, উপপরিচালক ডা. মামুন মোর্শেদ ও মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও কোভিড ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. শাহাদাৎ হোসেন রিপনের রুম ঘেরাও করেন।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরার্মশক কমিটির ২০তম সভায় হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা নিয়ে আবারও আলোচনা হয়। বলা হয়, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিবার পরিজনরাও কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই ডিউটি শেষে তাদের কোয়ারেন্টিনের জন্য নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজন ।

তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, এই বিষয়ে তার কিছু করার নেই। সরকারিভাবে চিকিৎসকদের কোয়ারেন্টিন বাতিল করেছে মন্ত্রণালয়। এদিকে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি বলছে, হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি তাদের পরিবার পরিজনও কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পর কোয়ারেন্টিনের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা আবশ্যক বলেও মনে করছে কমিটি।

প্রসঙ্গত, করোনা প্রাদুর্ভাবের পর গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর ছয় হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের স্বাস্থ্য সেবাদানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার জন্য ১৯টি হোটেল নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। কিন্তু গত ২৯ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল মান্নান স্বাক্ষরিত পরিপত্র অনুযায়ী করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসিক হোটেলের বিল পরিশোধ না করার সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে চিকিৎসকদের জন্য বরাদ্দ হোটেলের সুবিধাও বাতিল করে তারা।

পরিপত্র অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার মধ্যে দায়িত্ব পালনকারী একজন চিকিৎসক দৈনিক দুই হাজার টাকা এবং ঢাকার বাইরে এক হাজার ৮০০ টাকা, একজন নার্স ঢাকার মধ্যে এক হাজার ২০০ ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে এক হাজার টাকা এবং একজন স্বাস্থ্যকর্মী ঢাকার মধ্যে ৮০০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৬৫০ টাকা ভাতা পাবেন।

চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসকরা সুপার স্প্রেডার। ১৫ দিন টানা হাসপাতালে ডিউটি করার পর নিজ দায়িত্বে কোয়ারেন্টিন সব দিক থেকেই অবৈজ্ঞানিক। তারা বলছেন, চিকিৎসকরা কোনও পাঁচ তারকা হোটেল চাননি, তারা কেবল ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড’ অনুযায়ী থাকার জায়গা চেয়েছিলেন, যেটা তাদের এবং পরিবারের সবার সুরক্ষার জন্য।

কোয়ারেন্টিন বাতিলের সিদ্ধান্ত খুবই অমানবিক, অপমানজনক এবং অবমাননাকর বলে মন্তব্য করেছেন কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে কাজ করা চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তগুলো আমলাতান্ত্রিক না হয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক হওয়া উচিত। কোভিড রোগীদের চিকিৎসা কি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা করছেন নাকি চিকিৎসকরা করছেন সে প্রশ্নও তুলছেন চিকিৎসকরা। একইসঙ্গে চিকিৎসকরা এও বলছেন, সঙ্গ-নিরোধ (কোয়ারেন্টিন) আমাদের ছুটি নয়, এটা হাসপাতালে কাজের একটি অংশ। কোনোভাবেই কর্তৃপক্ষ এসময়ে আমাদের বাড়িতে পাঠাতে পারে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'চিকিৎসকরা যখন কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে ডিউটি করেন, তখন তারা হাইলি এক্সপোজড থাকেন। আর যেদিন শেষ ডিউটি করবেন কোনও চিকিৎসক, তার পরবর্তী ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতেই হবে। কারণ চিকিৎসকরা সাধারণত মানুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি রিস্কে থাকেন। আর তাই ডিউটি করার পর চিকিৎসকদের জন্য কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যেন পরিবারের কেউ তার থেকে সংক্রমিত না হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'গতকাল (১৯ সেপ্টেম্বর) যেসব হোটেলে তারা অবস্থান করছিলেন, সেখান থেকে ফোন করে তাদের জানানো হয়েছে- দুপুর ১২টার ভেতরে হোটেল কক্ষ ছেড়ে দেওয়ার জন্য, এর বেশি থাকলে সেটা তাদের নিজেদের খরচে থাকতে হবে।'

হোটেল থেকে ফোন কল পাওয়ার পর তারা হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের ঘেরাও করেন এবং তাদের দাবির কথা জানান। একাধিক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমাদের আজ ডিউটি শেষ করে বাসায় যেতে হবে। একাধিক চিকিৎসকের পরিবারের একাধিক সদস্য আমাদের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন, মারাও গেছেন তিন চিকিৎসকের বাবা ও শ্বশুর। কিন্তু এই বিষয়ে এখনও কোনও সমাধান আমরা পাইনি।'

হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'চিকিৎসকদের দাবি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো বলে তাদের জানিয়েছি। ইতোমধ্যে আমি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি এবং মন্ত্রণালয়কেও এটা জানাবো।'

দেশের বিভিন্ন স্থানে কোভিড ইউনিটে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসকসহ অন্যদের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেছে কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর কমিটির সভাতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় এবং সেখানে তারা জানায়, হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি তাদের পরিবার পরিজনও কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পর কোয়ারেন্টিনের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির একটি বিশ্বস্ত সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, গত সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান, অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) এবং অতিরিক্ত সচিব ( জনস্বাস্থ্য) এর সঙ্গে এই বিষয়ে বৈঠক হয়, যারা বিষয়টি দেখাশোনা করছেন। আমরা তাদের বলেছি, চিকিৎসকরা কোনও প্রণোদনা চাচ্ছে না, তারা চাচ্ছেন পরিবারের সুরক্ষার জন্য মানসম্মত কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা, তারা ফাইভ স্টার বা ফোর স্টার হোটেল চাচ্ছে না। অনেক চিকিৎসকেরই আইসোশেন করার মতো বাসা রয়েছে, আবার অনেকেরই নেই জানিয়ে তাদের আমরা অপশন দেওয়ার জন্যও বলেছি। সেখানে যারা কোয়ারেন্টিনের জন্য আলাদা থাকতে চান, তাদের জন্য ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে। তখন সিদ্ধান্ত হয়, সব চিকিৎসকদের একটা মানসম্মত জায়গাতে, নার্স-টেকনোলজিস্টদের একটা এবং অন্যান্য কর্মচারীদের একটা জায়াগাতে রাখা হবে। তাদের খাওয়া-দাওয়া এবং যাতায়াতের ব্যবস্থাও করবে মন্ত্রণালয়। এবং এই পুরো বিষয়টি তদারকি করবে মন্ত্রণালয়, যাতে তৃতীয় পক্ষ হস্তক্ষেপ করতে না পারে এবং কোনও বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। এখানে কোনও সেকেণ্ড এবং থার্ড পার্টি থাকবে না, এতে করে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হবে এবং চিকিৎসকসহ অন্যদের পারিবারিক সুরক্ষা হবে।

সেই আলোচনা খুব সৌহার্দপূণ্য ছিল মন্তব্য করে সূত্র জানায়, যতক্ষণ না পর্যন্ত এই ব্যবস্থা হচ্ছে ততক্ষণ অবধি যে ব্যবস্থা রয়েছে সেভাবেই চলতে থাকবে।

এই আলোচনার পর চিকিৎসকদের কাছে মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা যায়- কারা সরকারি ব্যবস্থপনায় আইসোলেশেন এবং কোয়ারেন্টিন চায় সেটা জানানো জন্য, এই প্রক্রিয়া চলমান অবস্থাতেই মন্ত্রণালয় থেকে আগামী সপ্তাহ থেকে চিকিৎসকদের হোটেল ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে বলেও জানায় সূত্র।

বিশ্বস্ত একটি সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরকারের সর্বোচ্চ মহলে বলা হয়েছে- চিকিৎসকদের ২১ দিনের প্রণোদনা দিলে তারা খুশি হবে। করোনার শুরুতেও চিকিৎসকরা মাস্ক-পিপিই এর কথা বলছিলেন, তখনও চিকিৎসকদের সর্ম্পকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। গণমাধ্যমেও সরকারি কর্মকর্তারা বলেছিলেন, চিকিৎসকরা এসব অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন কাজ না করার জন্য, যেটা মিথ্যা। একইভাবে এখনও চিকিৎসকদের আইসোলেশনের বিষয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেওয়া হচ্ছে উচ্চ পর্যায়ে। যার ফলে চিকিৎসকরা বিভ্রান্ত, ক্ষুব্ধ। কারণ, অনেকের পরিবারের সদস্য তাদের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন।

চিকিৎসকদের কোয়ারেন্টিনের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নানের সঙ্গে জাতীয় পরামর্শক কমিটির একটি আলোচনার পর কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেসব সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।'

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে একাধিকবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নানকে মোবাইলে কল করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।

এদিকে চিকিৎসকদের কোয়ারেন্টিন সুবিধা বাতিলের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে ৩৩তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে। রবিবার পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শেষে সরকারিভাবে চিকিৎসকদের জন্য কোয়ারেন্টিনের আবাসন সুবিধা বাতিল করা কান সমাধান হতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে আমরা স্বাস্থ্যখাতে যে নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় এমন একটি সিদ্ধান্ত আমাদের বাকরুদ্ধ করে দেয়।

আরও বলা হয়, অন্যান্য সরকারি চাকরিতে ঝুঁকি ভাতা চালু থাকলেও সংক্রমণ রোগীর চিকিৎসার্থে স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ভাতার বিষয়টি আজও উপেক্ষিত।

 

 

 

/জেএ/এএইচ/

লাইভ

টপ