রোড ডিভাইডারে ঝুঁকিপূর্ণ কাঁটাতারের বেড়া

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৮:৫৯, অক্টোবর ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৬, অক্টোবর ০১, ২০২০

রোড ডিভাইডারে কাঁটাতারের বেড়া

যত্রতত্র পারাপার বন্ধে রাজধানীর অধিকাংশ রোড ডিভাইডারে তথা সড়ক বিভাজকে বাঁশের খুঁটির মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি)। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু দুর্ঘটনা রোগে স্থাপিত এসব কাঁটাতার উল্টো দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁটাতার কোনওভাবেই সড়ককে নিরাপদ করে তুলতে পারে না বরং এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্ঘটনার কারণ।

জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণের পাঁচটি অঞ্চলে রোড ডিভাইডার রয়েছে ৪৬ দশমিক ১৪ কিলোমিটার। তার মধ্যে ২৭ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার রোড ডিভাইডারে কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনও সমপরিমাণ সড়ক বিভাজকে কাঁটাতারের বেড় নির্মাণ করেছে। কাঁটাতার ও লোহার তৈরি বেড়ার উচ্চতা হচ্ছে আড়াই ফুট থেকে চার ফুটের মধ্যে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ঢাকার সড়কে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক বিভাজক টপকে রাস্তা পারাপার বন্ধ করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমবারের মতো তখন বিমানবন্দর সড়কে ডিভাইডারের ওপর দুই থেকে আড়াই ফুট উঁচু বেড়া দেওয়া হয়। এই বেড়ার ওপরের অংশ ধারালো রাখা হয়েছে। ফলে ডিভাইডার টপকে রাস্তা পারাপার সম্ভব হবে না।

সেসময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সড়ক পরিদর্শনে আসেন। তখন তারা ডিভাইডার উঁচু করার পরামর্শ দেন। ওই পরামর্শ অনুযায়ী ডিভাইডারে বেড়া দেওয়ার পরিকল্পনা নেয় সিটি করপোরেশন।

রোড ডিভাইডারে কাঁটাতারের বেড়াদুই সিটি করপোরেশন বলছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সম্পূর্ণ অস্থায়ীভাবে কাঁটাতারের বেড়াগুলো দেওয়া হয়েছে। আপাতত নিরাপত্তার জন্যেই এগুলো লাগানো হয়। এতে স্থায়ী কাঠামো দিতে গেলে অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়। প্রকল্প গ্রহণ করে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এই প্রক্রিয়া যেমন ব্যয়বহুল তেমনি সময় সাপেক্ষ। আর কাঁটাতার দিয়ে বেড়া দিলে তাতে এই সমস্যায় পড়তে হয় না। তাই কাঁটাতারেই তাদের আগ্রহ।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের কিছু স্থানে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। তবে অধিকাংশ স্থানে লোহার গ্রিলের ব্যবস্থা আছে। আমরা সড়ক বিভাজকের ব্লকগুলোর ভেতরে কাঁটাতার দিয়েছি। এটা কোথাও ছয় ইঞ্চি আবার কোথাও তার চেয়ে ভেতরে থাকে। এটা অনিরাপদ ঠিক, এ জন্য সচেতনতা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা প্রয়োজন। এটা না করলে শৃঙ্খলা থাকবে না। নিরাপদ সড়ক তৈরির জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ রয়েছে ডিএসসিসির। পর্যায়ক্রমে এগুলোর বাস্তবায়ন ঘটলে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব হবে।  ভবিষ্যতে মোটা গ্রিল দিয়ে বিভাজকে বেড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তার দাবি, কাঁটাতারা বাদে লোহার গ্রিল দিয়ে করতে গেলে প্রকল্প গ্রহণ করতে হয়। এতে বড় তহবিলের প্রয়োজন হয়। টেন্ডার করতে হয়। যা সময়সাপেক্ষ। আর কাঁটাতার দিয়ে করার অর্থ হচ্ছে এটা ওয়ান টাইম। যে কোনও মুহূর্তে রিপ্লেস করা যায়।

জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর কৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সড়কের বিভাজকে কাঁটাতারের কোনও সমর্থন নেই। রোড সেইফটির ম্যানুয়াল থেকে আরম্ভ করে কোথাও এটা সাপোর্ট করা হয় না। এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আনসিভিলাইজড ট্রিটমেন্ট।

তিনি আরও বলেন, এক সময় ডিভাইডারকে বাঁচানোর জন্য রেলের স্পাইড দেওয়া হতো। সিটি করপোরেশনের এমন একটা যদি ইউনিট থাকতো, যারা রাস্তার ওপর কোনটা লাগানো উচিৎ, কোনটা উচিৎ নয় সেটা নিয়ে ভাববে, গবেষণা করবে। কিন্তু তাদের তো সেটা নেই। এটা নিয়ে ভাবেও না। বাসে যারা ঝুলেঝুলে চলাচল করেন তাদের গায়েও লাগে। মোটরসাইকেলের যাত্রীদের ওড়না ও কাপড় পেঁচিয়ে দুর্ঘটনা ঘটনায়। কাঁটাতার মানে হচ্ছে জেল খানার বিষয়। এটা এখানে আসার কথা নয়। এগুলো সড়ক নিরাপদের চেয়ে ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই আমি বলবো এগুলো আধুনিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত।

রোড ডিভাইডারে কাঁটাতারের বেড়াতিনি আরও বলেন, নগরীর অধিকাংশ স্থানে সড়ক বিভাজকে নিরাপদ রেলিং দেওয়া হয়েছে। এগুলো দেওয়ার বৈজ্ঞানিক সমর্থন আছে। কাঁটাতার বা বাঁশ দেওয়া সমর্থন নেই। বড় গাছ লাগানোরও সমর্থন নেই। কিন্তু শুধু ঢাকা সিটি এর ব্যতিক্রম। জনগণের নিরাপত্তার ইস্যুগুলোকে সিটি করপোরেশনের দেখা উচিত।

নগরীর বেশ কিছু এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে যেসব সড়কে কাঁটাতার দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে সেসব স্থানের অধিকাংশ এলাকায় তা ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও কাঁটাতার ছিঁড়ে সড়কের ওপরেও পড়ে রয়েছে। এতে কাঁটাতারের সঙ্গে পেঁচিয়ে দুর্ঘটনা শিকার হচ্ছেন পথচারী ও যাত্রীরা।

নগরীর খিলগাঁও ফ্লাইওভারের স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন যাত্রী ছাউনির সামনের সড়ক বিভাজকের কাঁটাতার ছিঁড়ে সড়কের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয় কয়েকজন রিকশা চালক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সপ্তাহখানেক আগে এই এলাকায় একজন মোটরসাইকেল চালক তার স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে ছেঁড়া কাঁটাতারের সঙ্গে পেঁচিয়ে আহত হন। অল্পের জন্য তারা বাসের চাকার নিচে পড়েননি। সিটি করপোরেশন থেকেও কোনও তদারকি করা হচ্ছে না।

বাসাবো থেকে মুগদা হয়ে টিটিপাড়া পর্যন্ত সড়কেও রয়েছে বাঁশের খুঁটির ওপর কাঁটাতারের বেড়া। ২০১৮ সালের শেষের দিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় আপাতত দৃষ্টিতে সড়কটিতে বাঁশের খুঁটির উপর কাঁটাতার দিয়ে এসব বেড়া নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে বাঁশের খুঁটিগুলো ভেঙে অধিকাংশ স্থানে কাঁটাতারগুলো সড়কের ওপরে উপড়ে পড়েছে। কোনও কোনও স্থানে বাঁশ থেকে কাঁটাতার আলাদা হয়ে পড়েছে। এতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

একই চিত্র দেখা গেছে কাকরাইল মোড থেকে প্রধান বিচারপতির বাসভবন পর্যন্ত সড়কের বিভাজকে। এই সড়কটিতে স্টিলের গ্রিলের সঙ্গে কাঁটাতার লাগানো হয়েছে। এর উপর দিয়েও রাস্তা পারাপার হতে দেখা গেছে।

আরিফুল রহমান নামে একজন পাঠাও চালক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কয়েকদিন আগে আমার সামনেই আরেকজন পাঠাও চালক যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় বাতাসে যাত্রীর ওড়না কাঁটাতারের সঙ্গে পেঁচিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাইক থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। তার শরীরের একাংশে কাঁটাতার ঢুকে কেটে যায়। পরে তাকে হাসপাতালের নেওয়া হয়।

উত্তর সিটির বনানী, খিলক্ষেত, মহাখালী ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কেও কাঁটা তারের বেড়া দেখা গেছে। এসব সড়কেও ঘটছে দুর্ঘটনা। ডিএনসিসি বলছে তারা নিরাপদ সড়ক তৈরিতে কাজ করছে।

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, অবশ্যই কাঁটাতার নিরাপদ সড়কের জন্য সহায়ক হতে পারে না। বিভাবে সড়ক বিভাজকগুলোকে নিরাপদ করা যায় আমরা তা নিয়ে কাজ করছি।

 

/এমআর/

লাইভ

টপ