আত্মরক্ষায় কোনও ডিভাইস ব্যবহারের অনুমতি নেই!

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১১:০১, অক্টোবর ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৭, অক্টোবর ২৩, ২০২০

টেজার গান (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)কেউ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হলে বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাড়তি উপায় হিসেবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারবেন। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্র নয়, এমন কোনও ডিভাইস বা সরঞ্জাম সব সময় নিজের সঙ্গে রাখা যাবে না। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আত্মরক্ষার্থে কোনও ডিভাইস বা আত্মরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের অনুমোদন নেই। অন্যান্য দেশে, বিশেষ করে বাইরের দেশের নারীদের মধ্যে ‘ইলেকট্রিক টেজার‘ বা  ‘টেজার গান’সহ এ ধরনের বিভিন্ন আত্মরক্ষামূলক ডিভাইসের (যেগুলো মারণাস্ত্র নয়) জনপ্রিয়তা যখন বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশে যে কারও এসব বহনের ক্ষেত্রে আইনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এসব ডিভাইস ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য বছরের শুরুতে উচ্চ আদালত আইসিটি মন্ত্রণালয়কে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। মন্ত্রণালয় সম্প্রতি আদালতকে তাদের মতামত জানিয়েছে। তারা মনে করছে, শরীরে বা সঙ্গে বহন করা সম্ভব এমন কয়েকটি ডিভাইস ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এগুলো কীভাবে ৯৯৯ সেবার সঙ্গে যুক্ত করা যায় সে ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যা ২০১৮ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ছিল উদ্বেগজনক। এসব বিবেচনা করে নারীর আত্মরক্ষার জন্য ডিভাইস ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে উচ্চ আদালতে এ বছরের জানুয়ারিতে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিট করে। রিটের শুনানিতে আদালত নারীদের স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষামূলক যন্ত্র বা ‘অ্যান্টি-রেপ সিকিউরিটি অ্যালার্ম’ নামের ডিভাইসের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৯৯৯-কে সংযুক্ত করতে আইসিটি সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেন।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং চিলড্রেন চ্যারিটি বাংলাদেশ (সিসিবি) ফাউন্ডেশনের পক্ষে রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রিট শুনানিতে আদালত আইসিটি সচিবকে বুয়েটের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই কমিটি ওই ডিভাইস ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাই বাছাই করে দেখবে। তবে আইসিটি মন্ত্রণালয় আদালতে কী বলেছেন তা বিস্তারিত এখনও জানা সম্ভব হয়নি।’

আত্মরক্ষায় কী কী করা যাবে

আত্মরক্ষায় আক্রমণকারীকে হত্যার বিষয়টিও বিশেষ ক্ষেত্রে আইনসিদ্ধ। তবে এই বিষয়টি অনেকগুলো ‘যদি’ দিয়ে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আত্মরক্ষায় কেউ কোনও ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবেন কিনা বা সঙ্গে কিছু রাখতে পারবেন কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই আইনে।

আইনজীবী ইশরাত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও ডিভাইস সঙ্গে রাখতে পারবেন না—আইনে তা বলা নেই। আবার রাখতে পারবেন তাও বলা নেই। এ বিষয়টিতে অস্পষ্টতা রয়েছে। আইনে যেসব বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে, সেগুলো করা যায় না। সেজন্য আমরা উচ্চ আদালতে রিট করেছিলাম।’

দেশের ১৮৬০ সালের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৯৬ ধারা থেকে ১০৬ ধারা পর্যন্ত আত্মরক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে দণ্ডবিধির ৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার জন্য কোনও অধিকার প্রয়োগ করে থাকলে কোনও কাজই আইনে অপরাধ বলে গণ্য হবে না। তবে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে নিজের সঙ্গে কোনও সরঞ্জাম রাখার কথা এই ধারাগুলোর কোনোটিতেই উল্লেখ নেই।

১০৬ ধারায় প্রয়োজনে জনতার ওপরে গুলি চালানোর কথা বলা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত করে, অনুমোদিত আগ্নেয়াস্ত্রের কথা। তবে অন্য কোনও আত্মরক্ষা সামগ্রীর কথা বলা হয়নি। এ বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। তাই কোনও ডিভাইস বা অন্য কিছুই বহন করা আইনত বৈধ না।

১০০ ধারায় আছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে আপনি আত্মরক্ষা করতে গিয়ে অন্য কারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারেন। আর এগুলো হলো নিজের নিশ্চিত মৃত্যু ঠেকাতে, মারাত্মক আঘাত, ধর্ষণ বা অস্বাভাবিক কাম লালসা থেকে বাঁচতে বা অপহরণের হাত থেকে রক্ষা পেতে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এক্ষেত্রে পরবর্তীতে আত্মরক্ষার্থে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে আদালতে প্রমাণ করতে হবে।

এছাড়াও ১০১, ১০২ ও ১০৩ ধারাতেও বলা হয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার জন্য একজন মানুষ বলপ্রয়োগ করতে পারবেন।

ইশরাত হাসান বলেন, ‘যেকোনও ডিভাইসকে আমাদের দেশের অস্ত্র আইনে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অস্ত্রের সংজ্ঞায় ফেলা যায়। তাই টেজারগানসহ এসব ডিভাইস ব্যবহার করা আইনতভাবে বৈধ না।’

তিনি বলেন, ‘নারী বা পুরুষ যেই হোন, কোথাও কোনও আক্রমণের শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি আত্মরক্ষার্থে হামলাকারীকে আঘাত করতে পারবেন। এখানে,  আক্রমণ বলতে শুধু জীবনের ওপর আক্রমণ নয়, সম্মানের ওপর আক্রমণও বোঝায়। হাতের কাছে যা পাবেন তাই দিয়েই তাৎক্ষণিকভাবে আক্রমণকারীকে আঘাত করে নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন। তবে পূর্ব থেকেই আঘাত করার জন্য কোনও বস্তু নিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে থাকার বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা নেই আইনে।’ আইনে এ বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় এসব ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে না বলেই তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘আইনে যা বলা আছে তার বাইরে একজন নাগরিক অন্য কোনও অস্ত্র বা কিছু রাখতে পারবেন না। অন্য কারও জন্য প্রাণহানিকর হতে পারে এমন সামগ্রী ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আছে।’ 

ডিভাইস বহনে অনুমতির পক্ষে মন্ত্রণালয়

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এন এম জিয়াউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি কমিটি করে কয়েক দফা বৈঠক করি। কয়েকটি ডিভাইসের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উচ্চ আদালতে আমরা জবাবও দিয়েছি। এখন আদালত যেভাবে নির্দেশ দেবেন আমরা সেভাবে কাজ করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হলে আমরা  ৯৯৯-এর সঙ্গে এসব ডিভাইস কীভাবে সংযুক্ত করবো, সেটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। ছোট্ট একটি ডিভাইসের আলোচনা করছি, যেটি শরীরের যেকোনও জায়গায় বা পোশাকের সঙ্গে রাখা যায়। সেটির কথাও ভাবছি।’

এতে আইনের কোনও পরিবর্তন করতে হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করলে আত্মরক্ষার জন্য আইনের কোনও পরিবর্তন করতে হবে না। বিদ্যমান আইনেই এটা সম্ভব।’

/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ