মৃত নারীর ‘ধর্ষক’ মুন্নাদের চিকিৎসা নেই!

Send
শাহরিয়ার হাসান
প্রকাশিত : ১০:০০, নভেম্বর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৮, নভেম্বর ২১, ২০২০

গ্রেফতার মুন্না ভগত

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসা ছয় তরুণীর মৃতদেহ ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে মুন্না ভগত নামে এক যুবককে। গত দেড় বছরে ছয় নারীর মৃতদেহকে ধর্ষণের  বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (ডিএনএ ম্যাচ) পেয়েছে সিআইডি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত মুন্না নিজেও আদালতে দাঁড়িয়ে  স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সিআইডি বলছে, দেশে এমন জঘন্য অপরাধ ডোমের সহকারী এই মুন্নাই প্রথম করেছে। প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে তার। তবে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা বলছেন, এই শাস্তির বাইরে আরও শাস্তির ব্যবস্থা না করলে, এ ধরনের মানসিক রোগী কখনও সুস্থ হবে না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডা. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে সাধারণ মানসিক রোগীর সংখ্যার চেয়ে যৌনবিকৃত মানুষের সংখ্যা বেশি। মানসিক রোগীরা চিকিৎসকদের কাছে আসেন বলে আমরা জানতে পারি। কিন্তু যৌনবিকৃত রোগীরা জেনেশুনে অপরাধ করেন। তাই চিকিৎসকের কাছে আসেন না। মুন্না ভগত যে জঘন্য অপরাধ করে আসছিল, সেটা রোগ হলেও সম্পূর্ণ সচেতনভাবেই একজন অপরাধী এসব করে থাকে।’

এই প্রফেসর অব সাইকিয়াট্রিস্ট বলেন, ‘কোনও একদিনের অভ্যাসে মুন্না ভগত এমন কাজ করেননি। ধীরে ধীরে সে সাহসী হয়ে উঠেছে। প্রথম দিকে হয়তো স্বাভাবিকভাবে মৃতদেহের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিতো। পরবর্তীতে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছে। হঠাৎ একদিন এ ধরনের কাজে লিপ্ত হয়। তারপর এটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। ভয়টা কেটে যায়। তারপর থেকে শুধু এই ধরনের যৌনবিকৃত আচরণেই সে সুখ বোধ করে। স্বাভাবিক সম্পর্ক তার কাছে তখন ততটা আনন্দদায়ক হয় না। এই রোগকে আমরা নেক্রোফিলিয়া বলে থাকি। এর বিভিন্ন ধাপ আছে। এটা চূড়ান্ত বিকৃত ধাপ।’ 

ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘নেক্রোফিলিয়া রোগীদের আসলে কোনও ওষুধ নেই। কাউন্সেলিং করেও এদের সুস্থ করা সম্ভব না। এরা পরিপূর্ণ যৌন তৃপ্তি পায় এই বিকৃতভাবেই। তবে তাদের দীর্ঘদিন যৌন সম্পর্কিত অঙ্গে বিশেষ পদ্ধতিতে শারীরিক কষ্ট দেওয়ার পাশাপাশি কাউন্সেলিং করলে, এই জায়গা থেকে বের করে আনা সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা, বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশের মতো আমাদের দেশেও নেক্রোফিলিয়ার রোগী আছে। তবে তুলনামূলক কম। এরা জেনে-বুঝে অপরাধগুলো করে। তাই সবার মাঝে লুকিয়ে থাকতে পারে। আমরা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারি না।’

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যখন মানুষের মধ্যে মানবিকতার পুরোটাই লোপ পেয়ে যায়, তখন সর্বোচ্চ পৈশাচিকতা দেখা যায়। তখনই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। একজন মৃত মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, আমরা এই সমাজে দিতে পারছি না।’

এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, ‘এটা কেবল নির্দিষ্ট ওই হাসপাতালের গাফিলতির জন্যে না। বিষয়টি হলো, রাষ্ট্র যখন বিকলাঙ্গ হয়ে যায়, তখনই এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটে। শুধুমাত্র আমরা একটি প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করলে, সেটা সত্যিকারের দৃশ্য হবে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্য, একজন মৃত মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা আমরা দিতে পারছি না।’

সিআইডি’র অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমরা খুব সচেতনভাবে এই কেসটি নিয়ে কাজ করেছি। এটি এমন স্পর্শকাতর বিষয় যে, আমরা বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি। প্রমাণ পেয়েছি। পরে সে নিজেও স্বীকার করেছে। এই অপরাধের জন্য প্রচলিত আইনে যাবজ্জীবন শাস্তির কথা বলা আছে। মুন্নার ক্ষেত্রে আমরা সেটাই আশা করবো।’

মৃত নারীদের ধর্ষণ করার অভিযোগে গ্রেফতার মুন্না ভগত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশিদ জবানবন্দি গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

সিআইডি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেফতার হওয়া মুন্না ভগত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে ডোম জতন কুমার লালের সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। প্রায় দেড় বছর ধরে সে মর্গে থাকা মৃত নারীদের ধর্ষণ করে আসছিল।

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, মৃত নারীদের ধর্ষণ করা পৃথিবীর জঘন্যতম একটি কাজ। সুস্থ ও স্বাভাবিক কেউ এমন জঘন্যতম কাজ করতে পারে না। গ্রেফতার হওয়া মুন্না বিকৃত মানসিকতার। তা না-হলে এমন কাজ করার কথা নয়।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে দায়িত্বরত ডোম ও মুন্নার মামা জতন কুমার লাল জানান, মুন্না গত দুই-তিন বছর ধরে তার সহযোগী হিসেবে মর্গে কাজ করতো। তার বাবার নাম দুলাল ভগত। গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাজারে। সে আরও দুই-তিন জনের সঙ্গে মর্গের পাশে একটি কক্ষেই রাতে থাকতো।

মুন্নাকে যেভাবে শনাক্ত করলো সিআইডি

২০১২ সালে বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম ডিএনএ ল্যাবরেটরি স্থাপিত হয়। ল্যাবরেটরি স্থাপনের পর হতে ধর্ষণ ও হত্যাসহ আদালতের নির্দেশে পাঠানো সব আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা ও প্রোফাইল তৈরি করে সিআইডি। গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ কয়েকটি নমুনা পাঠিয়েছিল সিআইডিকে। সেখানে মৃত নারীর এইচভিএসে পুরুষ বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করার চেষ্টা করে তারা।

মুন্না ভগতের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোডিস (CODIS)  সফটওয়্যারে আমরা সার্চ দিয়ে দেখি— মোহাম্মদপুর ও কাফরুল থানার কয়েকটি ঘটনায় মরদেহে প্রাপ্ত নমুনা ডিএনএ’র প্রোফাইলের সঙ্গে একই ব্যক্তির ডিএনএ বারবার ম্যাচ করছে। যেটা অনেকটাই অস্বাভাবিক ছিল।

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের তখনই সন্দেহ হয় যে, কোনও না কোনোভাবে ভিকটিমদের মৃতদেহের ওপরে কোনও ব্যক্তির বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ হয়েছে। প্রতিটি মৃতদেহ মর্গে আনার পর তার মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। সব লাশই ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রেখে দেওয়া হয়। সেখানে বেশ কয়েকজন ডোম নিয়মিত পাহারা দিতো। কিন্তু এই লাশগুলোর ক্ষেত্রে একজন ডোমের সহকারী নিয়মিত ডিউটিতে থাকতো। প্রাথমিকভাবে তাকে সন্দেহ হয় আমাদের। পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বাইরে নিয়ে গিয়ে কথা বলার নামে, চা খাওয়ার ছলে তার ডিএনএ সংগ্রহ করি আমরা। সেটা সিআইডি ল্যাবে নিয়ে এসে বিশ্লেষণ করলে ওই ৬ মরদেহের ডিএনএ’র সঙ্গে ম্যাচ করে। তখন শতভাগ নিশ্চিত হয়ে তাকে গ্রেফতারে করি।

আরও পড়ুন...
মৃত নারীদের ধর্ষণ করতো ছেলেটি!

 

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ