দেশের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আবারও রাজনীতিতে ফিরতে পারবে কিনা, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে যেকোনও মূল্যে দেশে ফেরার আলটিমেটামের পর গত কয়েক মাসে বিষয়টি আলোচনাতেই ছিল। এর মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছেন। এসব মিছিল থেকে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে, আবার মিছিল করতে গিয়ে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের হাতে কেউ কেউ মারধরের শিকারও হয়েছেন।
বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ভাষণের পর পরিস্থিতি আবারও আলোচনায় আসে। এর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে এই বিচার। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতারা রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দাবি করায় ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’র প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এরই মধ্যে গত ২৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের অন্যতম শরিক জাসদ কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানে ২৯০ জন সমর্থককে আটকের ঘটনাকে বাংলাদেশে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর আক্রমণের সর্বশেষ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সোমবার (৫ অক্টোবর) সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।
সবশেষ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় যাওয়ার আগে প্রথম ও মৌলিক শর্ত হলো নিজেদের অপরাধের সুনির্দিষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া এবং সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া। এই প্রাথমিক শর্ত পূরণ ছাড়া সমঝোতার প্রশ্নই ওঠে না। সেজন্য আগে আওয়ামী লীগকে তাদের অপরাধ স্বীকার করে নিতে হবে।
তিনি বলেন, কেউ যদি রিকনসিলিয়েশন চেয়ে থাকেন এবং এটিকে ভালো মনে করেন, তাহলে তাদের উচিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ করা। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে রিকনসিলিয়েশন শুরুর মৌলিক জায়গাটি নিশ্চিত করতে হবে। সেটুকু হলে আলোচনা হতে পারে। তবে একমুখী ও উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে সমঝোতার আলোচনা এগিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।
তবে তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিকে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ভেতরে ভেতরে ভিন্ন কিছু ঘটতে পারে।
অন্যপক্ষ অবশ্য বিষয়টিকে এতটা সরলভাবে দেখছে না। তাদের মতে, জুলাইয়ের ভূমিকার জন্য আওয়ামী লীগ এখনই অনুতপ্ত হবে কিনা, তা বলা কঠিন। আবার অনুতপ্ত হলেই বিএনপি সরকার দলটির সঙ্গে সমঝোতা করবে, বিষয়টিও এতটা সহজ নয়। বিশেষ করে এ ইস্যুতে জামায়াত ও এনসিপিসহ জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর অবস্থান কী হয়, সেটিও দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য আওয়ামী লীগ এখনও অনুতাপ স্বীকার করেনি। এ ধরনের অপরাধ করে দুঃখ প্রকাশ করলেই ক্ষমা করে দেওয়া যায় না। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান। সেখানেই বিষয়টির ফয়সালা হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিএনপি নিজেদের সুবিধার জন্য চাইলেই তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে না।
নিষেধাজ্ঞা শুরু কখন থেকে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর থেকেই প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ময়দানে নেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরদিন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বাতিল করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন। তবে দলটিকে এখনও নিষিদ্ধ করা হয়নি। অবশ্য ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠন যুবলীগ পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পরও সেই নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত আছে। বরং গত ৮ এপ্রিল ওই অধ্যাদেশ ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। বিলটিতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিধানে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি।
সরকারের আসল অবস্থান কী?
আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি সত্যিই সমঝোতা করবে কিনা, এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে। কারণ সরকারের দায়িত্বশীল নেতারা দলটিকে নিয়ে একেকরকম কথা বলছেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে ক্ষমতাচ্যুত ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনও জাতীয় সমঝোতা হতে পারে না। হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর ‘বিচার, জবাবদিহিতা ও জাতীয় সমঝোতা’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, অপরাধ স্বীকার করলে সমঝোতা হতে পারে। আবার গত ৫ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে ২৪ সালে। আর দাফন হবে দিল্লিতে।
এক বিষয়ে দলটির একাধিক নেতার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে এক ধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার আওয়ামী লীগকে কীভাবে সমঝোতায় আনতে চায়, আগে সেটা পরিষ্কার করে বলতে হবে। কারণ তাদের একেক নেতা একেকরকম কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। নির্বাচনি ইশতেহারে তারা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করার কথা বলেছিল। কিন্তু সেটার কোনও খবর নেই। অথচ তারা রসালো কথা বলছে। এ বিষয়ে বিএনপি এককভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এটি জনগণই দেখবে।
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকার সমঝোতা করবে কিনা সেটি পরের কথা। তাদের বিচারকাজ আদালতে চলমান। বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের ফেরার প্রশ্ন সামনে আসবে।
আসলেই কি আওয়ামী লীগ অনুতপ্ত হবে?
দেশের রাজনীতিতে ফিরতে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন বিশ্লেষণও হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, একপর্যায়ে দলটি হয়তো ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আরেকটি পক্ষ মনে করে, আওয়ামী লীগ নতি স্বীকার করবে বলে মনে হয় না।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইবে কিনা, সেটা এখনই বলা যাবে না। তবে একটা পর্যায়ে এসে তারা অপরাধের কথা স্বীকার করতেও পারে। তাদের শাস্তিও হতে পারে। তবে সবশেষে হয়তো তারা রাজনীতিতে ফিরতে পারে।
অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিএনপি জুলাইয়ের শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাদের সাম্প্রতিক আচরণে তা স্পষ্ট। তারা বিভিন্নভাবে ফ্যাসিবাদকে ফিরিয়ে আনতে চায়। এ কারণে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করছে।
তিনি বলেন, বিএনপি যদি পর্দার অন্তরালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনও ধরনের সমঝোতা করেই থাকে, সেটি অবিশ্বাস করার কিছু নেই। তবে তাদের মনে রাখতে হবে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। বিএনপিকে জবাবদিহি করতে হবে।