ক্ষমতার আগে বলে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, পরে বলে ‘গিভ মি ইওর প্ল্যান’: হাসনাত আব্দুল্লাহ 

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক 
২৪ আগস্ট ২০২৬, ২১:১৩আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ২১:৫৮

বিগত ছয় মাসে বিএনপি সরকার প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের ঘুণে ধরা প্রশাসন এবং সেকেলে রাজনৈতিক দলের দেশ নিয়ে কোনও ইনোভেটিভ প্ল্যান নাই, ক্ষমতার আগে তারা বলে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী দলকে আল্টিমেটাম দেয় ‘গিভ মি ইওর প্ল্যান’। এভাবেই চলছে।”  

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।  

ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, “নির্বাচনের আগে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ সরকারের প্রথম ছয় মাসেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি তো দূরের কথা, উল্টো ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৬১,৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছে। 

“একদিকে এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে ছয় মাসে প্রায় ৬২ হাজার মানুষের চাকরি হারানো— এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকারের কর্মসংস্থান নীতির সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করতে হবে।  

“সরকার শ্রমবাজারের মাত্র ৪ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ নিয়োগ দেয়, এর বেশি পারে না। পারবে না। বাকিটা নিয়োগ দেয় বেসরকারি খাত, প্রবাসী শ্রমবাজার।  

“এখন কোন দল দেড়-দুই বছরেই কোটি পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলে ধরে নেওয়া যায় এসব মিথ্যা আশ্বাস। (আয়রনি হচ্ছে, প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলে হাঁটে-মাঠে রাস্তায়-ঘাঁটে, টেম্পুস্ট্যান্ড থেকে ট্রাকে সর্বত্র চাঁদাবাজিতে লাখে লাখে বিএনপি কর্মীকে নিয়োজিত করেছে)।”  

‘তাহলে দেশের কর্মসংস্থান কীভাবে সম্ভব?’— এমন প্রশ্ন উত্থাপন করে এই সংসদ সদস্য পোস্টে উল্লেখ করেন, “সরকার হবে এমপ্লয়মেন্টের ফেসিলিটেটর, এনাবলার। সে পলিসি ইন্টারভেনশন করবে, ফাইনান্স ফ্রেমওয়ার্ক সাজাবে, ইনফ্রা সাপোর্ট দেবে। কর্মসংস্থান এগিয়ে নিবে বেসরকারি খাত।  

“অর্থনীতি ও শ্রমবাজার দুইভাগে বিভক্ত। ফর্মাল আর ইনফর্মাল। ফর্মাল খাত শ্রমবাজারের ১৫ শতান্সঘ নিয়োগ দেয় আনুমানিক। আনফর্মাল খাত ৮৫ শতাংশ। কিছু কমবেশি হতে পারে!  

“ফর্মাল খাতে মিড ও হাই লেভেল স্কিল লাগে। সরকারের কাজ ইন্ডাস্ট্রি সার্ভে করে আজকের এবং আগামীর স্কিল ডিমান্ড কী কী সেগুলো লিস্টেড করা। এর পরে সে সে স্কিলগুলো তৈরির জন্য ছোট, মাঝারি ও লম্বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট (দক্ষতা তৈরি ও প্রশিক্ষণ) কোর্স তৈরি করা, এর জন্য ট্রেনিং ফেসিলিটি, হাতে কলমে শিক্ষার ফিন্যান্স ও অবকাঠামো তৈরি করা। মানে দক্ষতার পাইপলাইন বানানো। নতুন দক্ষতা ডিমান্ড তৈরি হবে, সেমতে ট্রেনিং কাঠামো ঠিক করা।  

“অর্থাৎ সরকারকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ যাবতীয় ট্রেনিং একাডেমি ও ইন্সটিটিউটকে নিজেদের অকার্যকর কোর্সের খোলস থেকে বাস্তবের শ্রমবাজারে নামিয়ে আনতে হবে। শ্রম বাজারের সব ডিমান্ডের সঙ্গে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েকে ম্যাপিং করে দক্ষতার বা স্কিল ডেভেলপমেন্টের পাইপলাইন তৈরি করাই সরকারের কাজ। বাংলাদেশের বিএনপি-আওয়ামীলীগ টাইপের পুরানা দলগুলো এটা করতে ব্যর্থ। কারণ তাদের শিক্ষা ও শ্রম খাতের পেশাজীবীরা, নেতারা মাঠের রাজনীতি বোঝে কিন্তু দক্ষতা তৈরির পাইপলাইন বোঝে না। তাই কিছু ডেলিভারি দিতে পারে না।  

“বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে শিক্ষিত তরুণদের কর্মহীনতার বাজার, মেধার বধ্যভূমি, আমাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বেকারত্ব তৈরির কারখানা। এটা গতানুগতিক দলগুলোর মান্ধাতার আমলের অকেজো চিন্তার আউটকাম।  

“অর্থাৎ সঠিক দক্ষতা ও ফাইনান্স প্ল্যানিং করাই সরকারের কাজ। ব্যাংকিং ঋণ সরকার নেবে না, নেবে বেসরকারি খাতে। আর বেসরকারি খাতের বড় ও ভালো প্রতিষ্ঠান স্টক মার্কেট থেকে অধিকাংশ পুঁজি সংগ্রহ করবে। বাকিটা বেসরকারি খাতই এগিয়ে নেবে। সরকার বেসরকারি খাতকে চাহিদামত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবারহ করবে, চাঁদাবাজির বিপরীতে বেসরকারি বিনিয়োগের যথাযথ নিরাপত্তা দিবে।  

“ইনফর্মাল খাতে সরকারের মূল কাজ ‘এক্সেস টু ফাইন্যান্স’ নিশ্চিত করা। মানে আপনি উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের চাহিবামাত্র সহজ শর্তে ঋণ দেবে। ঋণদাতা যাতে সেটার কিস্তি নিয়মিত ফেরত পায় সে গ্যারান্টি ও নিশ্চয়তা তৈরি করবেন।  

“আজকে ব্যাংক ঋণের গন্তব্য সরকার নিজেই। ব্যাংকগুলা সরকারকে ঋণ দিয়ে সুদ খায়, বেসরকারি খাতে ঋণ সেভাবে দিচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৫ শতাংশে (ইনফ্যাক্ট ৪.৬ শতাংশ)। মানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের যে টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে, ইনফরমাল অর্থনীতিতে যাবার কথা, সরকার সেটা নিয়ে নিচ্ছে, ইনফরমাল খাতের ফান্ডিং ডিমান্ড নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে গ্রামের চাষি জেলে খামারিরা আর্থিক পরিষেবায় আওতার বাইরে। ফর্মাল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রামে নাই, আছে ক্ষুদ্র ঋণ, সেখানে সুদের হার বেশি। আছে চাঁদাবাজি। দুয়ে মিলে গ্রামীণ উদ্যোক্তারা অর্থের অভাবে কর্ম তৈরি করতে পারছে না।  

“যে যার মতো হাঁসমুরগি গরু মাছের ফল সবজির খামার করবেন, নার্সারি করবে কিংবা শহরের বিভিন্ন সেবা গ্রামে নেবেন, কিন্তু সরকারের কাজ তার জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা। চীনের আদলে গ্রাম থেকে পণ্য শহরে আনার সাপ্লাই চেইন ও ই-কমার্স ডেভেলপ করা। আমাদের কৃষি ঋণ নেয় দলীয় কর্মীরা, দালালরা, তারা কিস্তি ফেরত দেয় না। দল ক্ষমতায় আসলে মাফ করিয়ে নেয়। ফলে অন্যের কাছ থেকে বাড়তি আদায় করতে গিয়ে ৯ শতাংশের সুদ হয় ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের যে পলিসি ইন্টারভেনশন, মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট থাকার কথা তা নাই, সরকার এমপ্লয়মেন্ট তৈরির ফেসিলিটেটর হিসেবে আবির্ভূত হতে পারছে না।  

“এদিকে গ্রামীণ সমাজে স্কিল ডেভেলপমেন্টের ইনফ্রা ও ফ্যাসিলিটি নাই বলে প্রবাসগামীরা উচ্চ ঋণ করে, জমি বেঁচে বিদেশ যান, কিন্তু অদক্ষ হবার কারণে রিটার্ন সেভাবে দিতে পারেন না। অনেকেই ফেরত এসে বেকার হন।   

“আপনার দরকার চাষিকে সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দেওয়া। আপনি তা না দিয়ে চাষিকে কাজের সময়ে শ্রমঘন্টার নষ্ট করে এনে সারের লাইনে দাঁড়া করান, ডিলারের পিছনে ঘোরান। তাও ১৩৫০ টাকার সার বেচেন ১৮০০ টাকায়।  

“আপনার এখনও চাষির, জমির ও জমিতে আবাদকৃত ফলনের ডেটাবেজ নাই। ফলে কে কী চাষ করলো, কতটুকু করলো, তার কত সার দরকার, কিংবা উৎপাদনের মূল্য ফিরেছে কিনা, কস্ট অফ প্রডাকশন ঠিক রাখতে ভর্তুকি কত লাগবে, বাজারমূল্য কী হবে— এসব ডেটাভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট এবং সেমতে পলিসি ইন্টারভেনশন প্ল্যান আপনার নাই। আপনার পলিটিক্যাল চেইনের টপ টু বটম সবাই প্রায় সবাই আধুনিক মাইক্রো ইকনোমিক ব্যবস্থাপনা জ্ঞানহীন, পলিসিহীন, ফলে আপনার ইশতেহার যেমন কাগুজে, আপনার বাস্তবায়নও গোলমেলে।  

“এসব কাজ বাংলাদেশের হিসেবে ইনোভেটিভ মনে হলেও বিশ্বের দেশে দেশে এসব বেসিক সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। আমাদের ঘুণে ধরা প্রশাসন এবং সেকেলে রাজনৈতিক দলের দেশ নিয়ে কোনও ইনোভেটিভ প্ল্যান নাই, ক্ষমতার আগে তারা বলে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী দলকে আল্টিমেটাম দেয় ‘গিভ মি ইওর প্ল্যান’। এভাবেই চলছে। ফলে আজকে আমাদের দরকার ফ্রেশ আইডিয়ার তরুণদের রাজনীতি।  

“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরকারকে অতিসত্ত্বর ভাতা ও কার্ডনির্ভর পপুলিজম থেকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ফিরে আসতে হবে।  

“পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় এক ডজন অলস ভাতা (কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, রূপশ্রী, দুয়ারে সরকার, বাংলার বাড়ি, স্বাস্থ্যসাথী, কৃশক সম্মান, শস্য সাথী ইত্যাদি) দেওয়ার পরেও ক্ষমতা হারিয়েছেন। কেননা অলস ভাতা কর্ম তৈরি করেনি বরং ছদ্ম বেকারত্ব তৈরি করেছে। দুর্নীতি, অপব্যবস্থাপনা, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি ঘটিয়েছে। আপনি সেখান থেকে শিক্ষা না নিয়ে, বাংলাদেশের অলস ভাতার নামে নানাবিধ কার্ডের দোকান খুলেছেন। বিভিন্ন জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির দোকান আসলে ভর্তুকির ভার তৈরি করছে যে ভর্তুকির জন্য আপনি জ্বালানি কিনতে পারছেন না। দিনশেষে এগুলা একেকটা হয়ে উঠবে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও দলীয় কর্মী তোষণের হাতিয়ার, এবং ভর্তুকির বোঝা। 

“আমাদের দরকার পরিবারের সদস্যদের কর্ম দক্ষতা, আপনি দিচ্ছেন ফ্যামিলি কার্ড। ইতোমধ্যেই আসছে নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতির খবর। কৃষকের দরকার সার, বীজ, চাষবাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি। সার বরাদ্দে চাঁদাবাজ বসিয়ে আপনি এবার বলছেন নেও তোমার ফারমার কার্ড। বাস্তবে ভাতা নাগরিকের কাছে পৌঁছাতে কোনও কার্ড লাগে না, লাগে নিখুঁত সিটিজেন ডেটাবেজ যা সময়ের সঙ্গে হালনাগাদ হবে। আপনি ফ্যামিলি কার্ডের একটা স্থির ডেটাবেজ বানাতে বরাদ্দ করেছেন ২০০০ কোটি টাকা।”  

সবশেষে তিনি সরকারের উদ্দেশে লেখেন, “সবশেষে সরকারকে বলবো— পপুলিস্ট কাজকারবার বন্ধ করুন। এসব না করে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য ফরমাল ও ইনফরমাল ইকোনমির ফেসিলিটেটিং পলিসি, শহর ও গ্রামে দক্ষতা তৈরির পাইপলাইন তৈরি, এক্সেস টু ফাইনান্স, টুলস টু ওয়ার্ক ইত্যাদি বাস্তব কাজে ফিরে যান।  

“এভাবে চলতে থাকলে জনগণ বলতে বাধ্য হবে— ‘You came empty-handed & you have no plan at all.’”  

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
পুরনো স্বৈরাচারী কায়দায়ই ফিরে যাচ্ছে সরকার: নাহিদ ইসলাম
জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে এনসিপি
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ২৫ এজেন্সি, স্বচ্ছতা চায় এনসিপি
সর্বশেষ খবর
ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত, আলোচিত সেই মাদ্রাসা শিক্ষকই শিশুটির বাবা
ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত, আলোচিত সেই মাদ্রাসা শিক্ষকই শিশুটির বাবা
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব হলেন ইউনুস আলী
রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব হলেন ইউনুস আলী
স্ত্রীর দায়ের করা পর্নোগ্রাফি মামলায় স্বামী গ্রেফতার
স্ত্রীর দায়ের করা পর্নোগ্রাফি মামলায় স্বামী গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
জেলেদের সঙ্গে ট্রলারেই দুপুরের খাবার খেলেন প্রতিমন্ত্রী
জেলেদের সঙ্গে ট্রলারেই দুপুরের খাবার খেলেন প্রতিমন্ত্রী
‘ঢাকায় যদি ফুটপাতে একটা দোকান থাকে, মিজানেরটাও থাকতে হইবো’
‘ঢাকায় যদি ফুটপাতে একটা দোকান থাকে, মিজানেরটাও থাকতে হইবো’
মাজারের সেই কুমির এখন কক্সবাজারে
মাজারের সেই কুমির এখন কক্সবাজারে
‘হানিট্র্যাপ’ কেলেঙ্কারি: ওসি জাহেদুল ইসলামকে বদলি
‘হানিট্র্যাপ’ কেলেঙ্কারি: ওসি জাহেদুল ইসলামকে বদলি
টাকার অভাব নেই, কমেছে সুদহার: তবু ঋণ নিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা 
টাকার অভাব নেই, কমেছে সুদহার: তবু ঋণ নিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা