‘রাজনৈতিক দলের নতুন নিবন্ধন আইনের কয়েকটি ধারা আত্মঘাতী’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:২৯, জুলাই ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩০, জুলাই ০২, ২০২০

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলের নতুন নিবন্ধন আইনের বিরোধিতা করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংগঠনটি মনে করে, স্বতন্ত্র এই আইনের কয়েকটি ধারা নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আত্মঘাতী। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সুজনের উদ্যোগে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এমন মন্তব্য করা হয়। আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ: নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ও সুজন-এর বক্তব্য’।
সুজনের পক্ষ থেকে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। তিনি জানান, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একটি স্বতন্ত্র আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর শিরোনাম ‘কমিশনে রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন, ২০২০’। এজন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত দি রিপ্রেজেন্টেশন অব দি পিপলস অর্ডার ১৯৭২-এর ৬-ক অধ্যায়ে উল্লেখ করা ‘কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন’ শিরোনামের অধীনে ন্যস্ত ধারাগুলো রহিত করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ওয়েবসাইটে আইনটির খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে।
দিলীপ কুমার সরকার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘খসড়াটি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সকল স্তরের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারীকে সদস্য রাখার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, নির্বাচন কমিশন তার সময়সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। মানুষের প্রত্যাশা যখন একটি স্বাধীন, সাহসী ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের দুর্বল করছে নির্বাচন কমিশন। এটি একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলের কাছে নির্বাচন কমিশনের নতজানু মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ; তেমনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ তথা নারীর ক্ষমতায়নের পরিপন্থী।’

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও প্রস্তাবিত আইনের খসড়ার বর্ণনায় পার্থক্য তুলে ধরেন সুজনের এই কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী। তা হলো, ‘লক্ষ্যমাত্রাটি পর্যায়ক্রমে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে অর্জন করিতে হইবে’র স্থলে ‘কমিশনে প্রদেয় বার্ষিক প্রতিবেদনে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিবরণী অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে।’ তার কথায়, ‘এমন পার্থক্যের অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, লক্ষ্যমাত্রা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অর্জন করার বাধ্যবাধকতা ছিল, তা না করলেও চলবে। তার পরিবর্তে বার্ষিক প্রতিবেদনে এই লক্ষ্যমাত্রা কতটুকু অর্জিত হয়েছে তার বিবরণ দিতে হবে।’

কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন আইন, ২০২০-এর খসড়ার আরেকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সুজন। তা হচ্ছে নিবন্ধন প্রাপ্তির শর্তাবলী। আইনের খসড়ায় এমনভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী যেকোনও দুটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে কোনও নতুন দলের জন্য নিবন্ধন পাওয়া সম্ভব হবে না।
সুজন মনে করে, নতুন দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নতুন আইনের খসড়ায় উল্লিখিত প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। নিবন্ধনের পূর্বশর্তগুলো খুব বেশি কড়াকড়ি না করে বরং কিছুটা শিথিল রাখা উচিত, যাতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উন্মেষের পথ খোলা থাকে।

নির্বাচন কমিশনকে আপোসকামিতার মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে সুজন। দিলীপ কুমার সরকারের বক্তব্য, ‘কমিশনকে মনে রাখতে হবে, রাষ্টের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করাই তাদের মূল কাজ। কোনও রাজনৈতিক দল বা সরকারের স্বার্থরক্ষা কমিশনের কাজ নয়। আর অন্যান্যদের মতো আমরাও মনে করি, নির্বাচন কমিশনের নতুন প্রস্তাব গৃহীত হলে তা নারীর ক্ষমতায়ন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করবে। পক্ষান্তরে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে তা কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মন্তব্য, একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, কোনও দলের কাছে নয়। তার প্রশ্ন, ‘এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য জনস্বার্থ, নাকি রাজনৈতিক দলের স্বার্থ? রাজনৈতিক দল যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে লক্ষ্য হওয়া উচিত দলগুলোকে গণতান্ত্রিক করা।’
সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনার সময় বদিউল আলম মজুমদার অভিযোগ করেন, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন ধরেই জনস্বার্থবিরোধী কাজ করে আসছে, বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছে। আমি মনে করি, নতুন আইনটি অপকর্মেরই ধারাবাহিকতার অংশ।’

কমিশনের কড়া সমালোচনা করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় জীবনে এমন উদ্ভট ও বিবেচনাহীন সব বিষয় সামনে আসে যে, এসব নিয়ে সুস্থভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো কঠিন। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যদি মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবো? নির্বাচন কমিশন এখন আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমিশন জাতির অগ্রগতির পথে অনেক বড় অন্তরায় হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।’

সংগঠনটির আরেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এমন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ চরম আপত্তিকর, অগণতান্ত্রিক, অগ্রহণযোগ্য ও সংবিধানবিরোধী। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে জনগণের অধিকার চর্চা সংকুচিত করার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে আমার কাছে তা পরিষ্কার নয়। আমি বলবো, এটি একটি অগ্রহণযোগ্য সংস্থার চরম অগ্রহণযোগ্য একটি কাজ। এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের ন্যূনতম গণতন্ত্র চর্চার সুযোগও থাকবে না।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুজন কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। এতে আরও বক্তব্য রাখেন সুজন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান, সুজন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি সফিউদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী সদস্য ও ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী মুজবাহ আলীম এবং সুজন ঢাকা অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মুর্শিকুল ইসলাম শিমুল।

/এসও/জেএইচ/

লাইভ

টপ