X
রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪
১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই নিয়ে হেফাজতের যত আপত্তি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪:০৪আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২১:৪৫

নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রমে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের কিছু বিষয়বস্তু ও ছবি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। একই সঙ্গে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব বিষয় বাতিলসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ফেনী সমিতি মিলনায়তনে সংগঠনের আমির শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, নাগরিকদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যানধারণা ও নীতি-নৈতিকতা গঠনে সে রাষ্ট্রের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সু-গভীর প্রভাবের বিষয়টি অনস্বীকার্য। এ কারণেই রাষ্ট্রের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সে দেশের সচেতন নাগরিকদের সজাগ দৃষ্টি ও অনেক প্রত্যাশা থাকে। বিশেষ করে আলেম সমাজ ও তৌহিদি জনতার প্রাণের দাবি থাকে, জাতীয় শিক্ষাক্রম কোনোভাবেই যেন রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম এবং ইসলামি চিন্তা-চেতনার বিপরীত না হয়। জাতীয় শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে ইসলামি আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও চিন্তা যেন আমাদের সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে সক্ষম না হয়। 

তারা বলেন, কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছি, ইসলাম ফোবিয়ায় আক্রান্ত এক শ্রেণির ধর্মবিরোধী গোষ্ঠী এ দেশের মুসলিম প্রজন্মের মন ও মানস থেকে ইসলামি ধ্যান-ধারণাকে চিরতরে মুছে দেওয়ার নীলনকশা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠে-পরে লেগেছে। আর তারা এই হীন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রমের অধীনে সংকলিত পাঠ্যপুস্তককে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলামঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুকে বাদ তো দিয়েছেই, তারওপর ইসলামবিরোধী বিষয়বস্তুকে সুপরিকল্পিতভাবে অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। 

সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়ে হেফাজত নেতারা বলেন, অবিলম্বে এ সমস্যাগুলো সংশোধন করে দেশের আলেম সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন করে সংকলিত পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হোক। আর তা নাহলে এই দেশের অনাগত প্রজন্মের মন মানসিকতা থেকে ইসলামকে চিরতরে মুছে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব। আপত্তির বিষয়গুলো উপস্থাপন করে হেফাজত জানিয়েছে, ২০২২ শিক্ষাবর্ষে ইবতেদায়ী প্রথম শ্রেণির ‘ইংলিশ ফর টুডে’ বইটিতে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি কথোপকথন শেখাতে গিয়ে সালাম বিনিময় রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে সেখানে সালাম বাদ দিয়ে ‘গুড মর্নি’, ‘হাই’, ‘হ্যালো' ইত্যাদি নিয়ে আসা হয়। ২০২৪ সালের বইটিতেও তা বহাল রাখা হয়েছে। 

হেফাজত বলছে, বিগত বছরে ইবতেদায়ি শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকগুলোর ছবিতে শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের হিজাব, টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় দেখানো হচ্ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে তাদের হিজাব, টুপি এবং পাঞ্জাবিবিহীন অবস্থায় উপস্থাপন করা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের বিভিন্ন স্থানে ‘আমার আত্মপরিচয়' শিরোনামে নাম, লিঙ্গ, বয়স, পছন্দের খাবার, পোশাক, খেলা ও শখ উল্লেখ থাকলেও ধর্মের পরিচয় সেখানে নেই।

এছাড়া নবম শ্রেণির ‘ইসলাম শিক্ষা’ বই থেকে ইসলামের ‘অকাট্য ফরজ বিধান জিহাদ’ পুরোই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান হেফাজত নেতারা। তারা বলেন, বিশ্ব মানচিত্রের ছবি থেকে ফিলিস্তিনকে বাদ দিয়ে সে জায়গায় অবৈধ দখলদার সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইজরায়েলের নাম সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানের পাঠ্যপুস্তকগুলোতে যৌনশিক্ষার নামে ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালীন স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে অবলীলায় এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে লজ্জা-শরম কারও মাঝে থাকে না। পহেলা বৈশাখ, গায়ে হলুদ, জন্মদিন পালন, মুখেভাত ইত্যাদি অনুষ্ঠানকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেন এগুলোকেই আমাদের একমাত্র ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মনে হয়। অথচ এগুলোর ইতিহাস খুবই অল্পদিনের।

হেফাজত নেতাদের অভিযোগ, পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বিভিন্ন স্থানে বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিকে সচেতনতা সৃষ্টি করার নামে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিবাহবহির্ভূত অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের মতো জঘন্য কাজকে নিতান্তই স্বাভাবিক মনে করবে। পাঠ্যবইয়ের অন্য এক স্থানে ছেলে-মেয়ে বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কে জড়ালে শাসন করা উচিত নয় বলা হয়েছে।

তারা আরও বলেন, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইগুলোতে উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মনে হয়, স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের কোনও অবদান নেই। কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরই অবদান রয়েছে। তাছাড়া মাদরাসার বইসহ প্রায় সব বইয়ের প্রচ্ছদে বাদ্য-বাজনার ছবি, ভেতরে হিজাববিহীন ছবি, কখনও নারীদের অশালীন ছবিতো আছেই। সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে ‘শরীফ থেকে শরীফা’ হওয়ার গল্প আছে। এই ধরনের ট্রান্সজেন্ডারের গল্প পাঠ্যবইয়ে ঢুকিয়ে শিক্ষার্থীদের মগজধোলাই করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ‘ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষা আইন ২০২৩ (খসড়া)’ বাস্তবায়ন না করার দাবিও জানিয়েছে হেফাজত। তারা বলছেন, এ আইনটিকে যদিও হিজড়া সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষা আইন মনে করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আসলে হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার এক নয়।

এই আইন না করাসহ ৫ দফা দাবি তুলে ধরেছে হেফাজত। দাবিগুলো হচ্ছে, ১) জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম থেকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক সব বিষয় বাদ দিতে হবে। ২) ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষা আইন ২০২৩ (খসড়া) না করা। ৩) পঞ্চগড়ে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের জলসা বন্ধ এবং তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা। ৪) অবিলম্বে মাওলানা মামুনুল হকসহ সব কারাবন্দি আলেমদের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া ও ২০১৩ সাল থেকে অদ্যাবধি হেফাজতের নেতাকর্মীদের নামে দায়েরকৃত সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা এবং ৫) হেফাজতের ১৩ দফা বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।

/সিএ/ইউএস/
সম্পর্কিত
২৯ ডিসেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশ স্থগিত করেছে হেফাজত
ঢাকায় মহাসমাবেশের হুঁশিয়ারি হেফাজতের
কারাবন্দি আলেমদের মুক্তির দাবিতে হেফাজতের বিক্ষোভ শুক্রবার
সর্বশেষ খবর
আন্ডারপাসে পিকনিকের বাস আটকে শিশু নিহত, আহত ২২
আন্ডারপাসে পিকনিকের বাস আটকে শিশু নিহত, আহত ২২
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আমিরাত ও যুক্তরাজ্য গেলেন রাষ্ট্রপতি
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আমিরাত ও যুক্তরাজ্য গেলেন রাষ্ট্রপতি
আবারও হাবের নেতৃত্বে শাহাদাত হোসাইন
আবারও হাবের নেতৃত্বে শাহাদাত হোসাইন
গাজীপুরে তুলার গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে
গাজীপুরে তুলার গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে
সর্বাধিক পঠিত
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিএসসি পাস মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ
মোবাইল অপারেটররা দিতে পারবে ওয়াই-ফাই সেবা, আপত্তি আইএসপি অপারেটরগুলোর
মোবাইল অপারেটররা দিতে পারবে ওয়াই-ফাই সেবা, আপত্তি আইএসপি অপারেটরগুলোর
স্কুলে গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে পারেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা: শিক্ষামন্ত্রী
স্কুলে গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক হতে পারেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা: শিক্ষামন্ত্রী
বিদেশের সম্পদ দেশের টাকায় করিনি: সাবেক ভূমিমন্ত্রী
বিদেশের সম্পদ দেশের টাকায় করিনি: সাবেক ভূমিমন্ত্রী
ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ‘এএমপিএম’, পলাতক কর্মকর্তারা
বেইলি রোড ট্র্যাজেডিব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ‘এএমপিএম’, পলাতক কর্মকর্তারা