জুলাই ঘোষণাপত্র একতরফা, পক্ষপাতমূলক: গণফোরাম

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৭ আগস্ট ২০২৫, ১৯:০০ আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫, ১৯:০০

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যে ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন, সেটিকে একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যায়িত করেছে গণফোরাম। এছাড়া এতে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা লক্ষ করা গেছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।

বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানায় দলটি।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান। তিনি জুলাই ঘোষণাপত্রে ১৯৭২ এর সংবিধান প্রণয়নপদ্ধতি এবং সাংগঠনিক কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের দাবিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু জুলাই ঘোষণাপত্রে ভবিষ্যত রাষ্ট্র ব্যবস্থার কোনও রূপরেখা স্থান পায়নি। জুলাই ঘোষণাপত্র একতরফা, পক্ষপাতদুষ্ট এবং ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা লক্ষণীয়। অন্যদিকে ৩৬ জুলাই উদযাপন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যা কাম্য নয়।

এতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ১০ এপ্রিলের প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্টের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়। দীর্ঘ ৫৩ বছরে কোনও রাজনৈতিক দল বা সরকার বাহাত্তরের সংবিধানের প্রণয়ন পদ্ধতি নিয়ে কখনও প্রশ্ন উত্থাপন করেনি।

লিখিত বক্তব্যে জন-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান সংযোজন-পরিমার্জন করা যেতে পারে, তবে সংবিধান প্রণয়ন পদ্ধতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে মুক্তিযুদ্ধকেই বিতর্কিত করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী শক্তিই বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধ এবং বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকার বাহাত্তরের সংবিধানের প্রণয়ন পদ্ধতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে জুলাই ঘোষণাপত্রে বিতর্ক সৃষ্টির কারণে মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে।

এতে আরও বলা হয়, শুধু বাহাত্তরের সংবিধানকে দায়ী করে (মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী) সরকারগুলোর রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতাকে আড়াল করার হীন মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতাকে কোনোভাবেই সংবিধানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, বিগত সময়ে যারা শাসনক্ষমতায় এসেছে, তারা সংবিধানকে অনুসরণ না করে অসাংবিধানিকভাবে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রে জবাবদিহি ছিল না, আইনের শাসন ছিল না, বিচারের নামে অনেক জায়গায় অবিচার করা হয়। এতে জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা ছিল, তাদের এই দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। সংবিধানের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের এড়িয়ে চলা যাবে না।

সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, সরকার বিভিন্ন সময় তার আলোচনা ও কাজে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৈষম্য তৈরি করেছে। নানাভাবে বিভক্তি তৈরি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে জন-আকাঙ্ক্ষা ছিল সংস্কার করে গণতান্ত্রিক চরিত্রে রাষ্ট্র ফিরে আসবে, কিন্তু সর্বশেষ জন-আকাঙ্ক্ষার জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে সরকার এক ধরণের লুকোচুরি করেছে।

তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়া কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে সরবরাহ করা হয়েছে। ঘোষণাপত্র পড়ার দিন দুপুর ১২টায় শুধু সাধারণ সম্পাদকের নামে একটি কার্ড দলীয় অফিসে পাঠানো হয়। এটাও একটি বৈষম্যমূলক আচরণ। তারপরও সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য সেখানে গিয়েছি। সেখানেও অনেক বৈষম্য করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি ও দল বা আমরা যে চেতনা ধারণ করি, তার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়ে এই ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়েছে।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেন, জন-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন, পরিমার্জন করা যেতে পারে। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানের প্রণয়ন পদ্ধতি নিয়ে যদি প্রশ্ন তোলা হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। স্বৈরাচার এরশাদের পতন কিংবা শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে যদি মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, সংবিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জুলাই ঘোষণার মধ্যে বিতর্কিত বিষয় টেনে আনা হয়, তাহলে এটি পক্ষপাতদুষ্ট। এর পেছনে অনেক ধরনের অশুভ শক্তি কাজ করে।

যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ নির্মাণে বাধাগ্রস্ত করেছিল তারাই এখন তৎপর হয়েছে উল্লেখ করে গণফোরামের সভাপতি পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট একেএম জগলুল হায়দার আফ্রিক বলেন, তারাই সংবিধানকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকার সেই ফাঁদে পা দিয়েছে। সরকার সেটি করতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য জুলাই অভ্যুত্থান হয়নি। এত মানুষ রক্ত দেয়নি। রাষ্ট্র নির্মাণের মীমাংসিত বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দায়িত্ব জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকারকে কেউ দেয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন– গণফোরামের কোষাধ্যক্ষ শাহ নুরুজ্জামান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লতিফুল বারী হামিম, আন্তর্জাতিক সম্পাদক এড.গোলাম মোস্তফা, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ মধু, তথ্য ও গণমাধ্যম সম্পাদক টি এইচ এম জাহাঙ্গীর গবেষণা ও পরিকল্পনা সম্পাদক অ্যাড.সাইফুল ইসলাম, সমাজসেবা সম্পাদক ফারুক হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা হাসান, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মজিবুর রহমান শিবলু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান প্রমুখ।

/এসটিএস/আরকে/
সম্পর্কিত
সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি এনসিপির
জুলাই জাতীয় সনদ: এক বছরে অগ্রগতি কতটুকু
জাতির সঙ্গে গাদ্দারি এবং বিশ্বাসঘাতকতা করছে সরকার: নাহিদ ইসলাম
সর্বশেষ খবর
ইতিহাস গড়া নারী কাবাডি দল পেলো অর্থপুরস্কার
ইতিহাস গড়া নারী কাবাডি দল পেলো অর্থপুরস্কার
কাজের অপেক্ষায় লাখ লাখ তরুণ, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগে বিশ্বব্যাংক
বাংলা ট্রিবিউন এক্সক্লুসিভ কাজের অপেক্ষায় লাখ লাখ তরুণ, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগে বিশ্বব্যাংক
প্রধানমন্ত্রীর এক ক্লিকেই ৩৯ হাজার কৃষক পেলেন ১২ কোটি টাকা
প্রধানমন্ত্রীর এক ক্লিকেই ৩৯ হাজার কৃষক পেলেন ১২ কোটি টাকা
ফিক্সিংয়ের অভিযোগে বাংলাদেশ ও ভারতের ৭ জন নিষিদ্ধ
ফিক্সিংয়ের অভিযোগে বাংলাদেশ ও ভারতের ৭ জন নিষিদ্ধ
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ