তফশিল ঘোষণা না হলেও রাজধানী ঢাকার দুইটি সিটি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বড় দলগুলো। এরই মধ্যে মেয়র প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অন্যতম মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা জোটগতভাবে নির্বাচন করবে না বলে ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে।
যদিও একাধিক মনেনায়ন-প্রত্যাশী থাকায় এখনও প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলটির সূত্র জানিয়েছে, ভেতরে ভেতরে তাদের প্রার্থী বাছাই চলছে। বিষয়টি সরাসরি তদারকি করছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নির্বাচন ঘিরে নানা সমীকরণকে সামনে রাখছে দলগুলো। গণমুখী ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থী খুঁজছে বিএনপি। অপরদিকে নিজেরা জোটভুক্ত হলেও এককভাবেই নির্বাচন করতে চায় জামায়াত ও এনসিপি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার এক সদস্য জানান, বিগত নির্বাচনে ঢাকার দুই সিটি এলাকায় ৬টি আসনে জয় এবং বেশিরভাগ আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তাই সিটি নির্বাচনে তারা আটঘাঁট বেঁধে মাঠে নামতে চায়।
দলীয় হাইকমান্ড আগেই জানিয়ে দিয়েছেন— তারা এক্ষেত্রে শরিকদের ছাড় দেবে না। আর এনসিপিও মনে করে, তাদের দুই সিটির প্রার্থীরাই জনপ্রিয়। তাই জয়-পরাজয় যাই হোক, তারা প্রথমবারের মতো এককভাবে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চায়। নির্বাচনি কৌশলের অংশ হিসেবে দুই সিটিতে তারা প্রার্থীও পরিবর্তন করেছে।
অপরদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, সরকারের ৬ মাসের ইতিবাচক কাজের কারণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে তারা শতভাগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে কৌশলগত কারণে তারা তফশিলের আগে প্রার্থী ঘোষণা করতে চান না।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের আদ্যোপান্ত
দলীয়ভাবে এখনও কাউকে মনোনয়ন না দিলেও ঢাকার দুই সিটিতে নিজেদেরকে প্রার্থী হিসেবে জানান দিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির একাধিক নেতা। ইতোমধ্যে অনেকে নিজের ছবি সম্বলিত পোস্টার-ব্যানার সাঁটিয়ে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন হাইকমান্ডের দরবারে। যদিও দল থেকে জানানো হয়েছে, এবার কোনও বিতর্কিত নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না। জয়ী হয়ে আসার মতো জনপ্রিয় নেতারাই আছেন হাইকমান্ডের গুডবুকে।
দলের বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণে মেয়র প্রার্থিতার দৌড়ে আছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, এই তিন নেতাই দলে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে হাবিব উন নবী খান সোহেল বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে নিবেদিত প্রাণের ভূমিকা রাখেন। ছাত্র জীবন থেকেই বারবার কারা নির্যাতিত। বিগত নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আবার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কোনও জায়গাই তাকে রাখা হয়নি। হয়তো দল তাকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগাতে চায়। এক্ষেত্রে মেয়র পদে তাকে দেখা যেতে পারে বলে মনে করে সূত্রটি।
আর বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বর্তমান ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালামও আলোচনায় আছেন বলে জানায় আরেকটি সূত্র। বিশেষ করে বিগত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনি সমন্বয়ক হিসেবে তার সাফল্যের বিষয়টিও বিবেচনাধীন বলে জানা গেছে।
একই সিটিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এগিয়ে আছেন তরুণ প্রার্থী হিসেবে। বিশেষ করে জামায়াতের সাদিক কায়েম ও এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো তরুণ প্রার্থীকে মোকবিলায় তার মতো তরুণ প্রার্থীকেও সামনে আনা হতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ। তাছাড়া তার বাবা প্রয়াত ছাদেক হোসেন খোকার গ্রহণযোগ্যতাকেও তার জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে বলে মনে করেন নেতারা।
অপরদিকে ঢাকা উত্তরেও তৎপরতা চালাচ্ছেন দলটির একাধিক নেতা। এর মধ্যে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
এর মধ্যে তাবিথ আউয়াল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনায় আসেন। তখন তরুণ প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের মাঝে সাড়া ফেলতে সক্ষম হন। তিনি বর্তমান বন ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে। আর এম এ কাইয়ূম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার গ্রেফতার হন ও মামলা-হামলার শিকার হন। গত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। তবে তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতা হিসেবে দলের শীর্ষ পর্যায়ে তার একটি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে জানান নেতাকর্মীরা।
আরেক প্রার্থী শফিকুল আলম খান মিল্টন বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান। এবার তিনি মেয়র প্রার্থী হওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটি বড় দল হিসেবে সিটি নির্বাচনে বিএনপিতে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকতেই পারে। এটিই স্বাভাবিক। তবে ঢাকায় এখনও পর্যন্ত দলের পক্ষ থেকে কাউকে চূড়ান্ত করা হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছেন দলীয় হাইকমান্ড। আশা করি, যোগ্য প্রার্থীরাই মনোনয়ন পাবেন। তিনি জানান, তফশিল ঘোষণার পরই দলীয় মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।’’
সেলিম-সাদিকেই ভরসা জামায়াতের?
দলীয় একাধিক মনোনয়ন-প্রত্যাশী না থাকায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে সবার আগেই অনানুষ্ঠানিকভাবে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে মনোনয়ন পেয়েছেন মহানগর আমির সেলিম উদ্দিন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসন থেকে দলটির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই তিনি নির্বাচনি এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। নিজের ছবি সংবলিত পোস্টারের মাধ্যমে ভোটারদের দোয়া কামনা করছেন। যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে।
অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে অনানুষ্ঠানিকভাবে জামায়তের মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম। দলটির নেতারা মনে করেন, ডাকসু নির্বাচনে জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় এখানেও তিনি সাড়া ফেলতে সক্ষম হবেন। এরই মধ্যে তাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন তার সমর্থকরা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যোগ দিচ্ছেন তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দুই সিটিতে আমাদের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা না হলেও মূলত তারাই প্রার্থী। মহানগর থেকে তাদেরকে বাছাই করা হয়েছে। তারপরও কেন্দ্রের পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে তাদের নাম ঘোষণা হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘দুই প্রার্থীই ব্যাপক জনপ্রিয়। দুই জনই ছাত্র নেতৃত্বের ফসল। তাই তরুণদের মধ্যে তাদের আলাদা একটি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।’’
তিনি মনে করেন, সরকারের ব্যর্থতার কারণে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদেরকে বেছে নেবেন ভোটাররা।
হঠাৎ কেন প্রার্থী রদবদল এনসিপির?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই ঢাকার দুই সিটিতে নিজেদের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। এর মধ্যে প্রথমবার দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী ছিলেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও উত্তরে ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। দুই প্রার্থীই এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে গত ৭ সেপ্টেম্বর অনেকটা হঠাৎ করেই নিজের ভোটার তালিকা দক্ষিণ থেকে উত্তরে স্থানান্তর করেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া। আর উত্তর থেকে দক্ষিণে নিজের ভোটার তালিকা নিয়ে আসেন দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
এনসিপির সূত্র জানায়, এর মাধ্যমে তারা দুই জনই এখন দুই সিটির প্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। এর মধ্যে আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ছিলেন। আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এই সময়ে এসে দলটির দুই নেতার প্রার্থিতা রদবদলের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হচ্ছে।
অনেকে মনে করেন, ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ মূলত জামায়াতের সমর্থন চেয়েছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে জামায়াত তাদেরকে কিছুতেই ছাড় দিতে নারাজ। এতে সাদিক কায়েমের মতো প্রার্থীর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হবে কিনা, সে সমীকরণ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাদের। আর জোটের স্বার্থে উত্তরে হয়তো সেলিম উদ্দিনকে শেষ পর্যন্ত বসিয়ে দিতে পারে জামায়াত। আবার দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এনসিপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে হয়তো সাদিক কায়েমকেই সমর্থন দিতে পারেন।
তবে এ ধরনের সমীকরণকে প্রত্যাখ্যান করে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মাহবুব আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দল যা সঠিক মনে করেছে, তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত আমাদের অভ্যন্তরীণ জরিপে মনে হয়েছে, এতে সুফল মিলবে। তাই এই সিদ্ধান্ত। সেখানে অন্য কোনও দল বা প্রার্থীর অবস্থানকে আমরা বিবেচনায় নিইনি।








