‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’ তারা অবশ্য ‘শিশু’ নন, তবে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তো বটেই। আগামী ১৩ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ডে শুরু হবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ আয়োজন। আজ থাকছে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান তৌহিদ হৃদয়ের কথা।
শৈশবেই হৃদয়ের ‘হৃদয়’ কেড়ে নিয়েছিল ক্রিকেট। তার বয়স তখন মাত্র সাত বছর। বাড়ির পাশের মাঠে সকাল থেকে সন্ধ্যা মেতে থাকতেন ক্রিকেট নিয়ে। বগুড়ার ছেলেটি জীবনের শুরুতে প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন ক্রিকেটের কারণেই। বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় এসে বনশ্রীতে একটি ‘ভুয়া’ ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিন পর উধাও হয়ে যায় সেই তথাকথিত একাডেমি। ব্যস, বহু টাকার গচ্চা! ২০১৬ সালে রাজশাহীর বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হয়ে ক্রিকেট জীবনের পথ খুঁজে পান তিনি। সেখানে ভর্তি হওয়ার আগে অবশ্য বগুড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে অনুশীলন করতেন হৃদয়। কখনও শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম, কখনও জেলা স্টেডিয়ামে মগ্ন থাকতেন নিবিড় অনুশীলনে।
হৃদয়ের ক্রিকেটার হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মা তাহমিনা আক্তার। জমি বন্ধক রেখে বনশ্রীর সেই ‘একাডেমি’র জন্য টাকা জোগাড় করেছিলেন তিনি। এখনও জমি ফেরত পায়নি হৃদয়ের পরিবারের। যুব দলের নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানের লক্ষ্য, ক্রিকেট খেলে টাকা উপার্জন করে জমি ফেরত নিয়ে আসা, মায়ের মুখে হাসি ফোটানো।
একান্ত সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হৃদয়
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটে জড়িয়ে পড়া কীভাবে?
হৃদয়: ছোটবেলায় ক্রিকেটেই ডুবে থাকতাম। টিভিতে খেলা দেখালে কিছু না বুঝলেও তাকিয়ে থাকতাম। বাসার পাশেই ছিল মাঠ, সেখানে বড় ভাইরা খেলতো। ছোটবেলায় সারাদিন সেখানেই পড়ে থাকতাম। খেলার সুযোগ না পেলেও বল কুড়িয়ে এনে দিতাম, যে কারণে মাঝে মাঝে আমাকে ফিল্ডার হিসেবে দলে নিতো। আর আমি তাতেই খুশি থাকতাম।
বাংলা ট্রিবিউন: জীবনের শুরুতে ক্রিকেটের জন্য প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। গল্পটা শুনতে চাই।
হৃদয়: একটা সময় ক্রিকেট খেলার জন্য আমি বগুড়ায় থাকতে চাইছিলাম না। আমার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল, আমাকে ক্রিকেটার হতেই হবে। ভালো কোনও একাডেমিতে ভর্তি করানোর জন্য বাসায় জেদ ধরি। তখন আমি বেশ ছোট, বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেও পারিনি। এরপর এলাকার এক ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসি। রামপুরার দক্ষিণ বনশ্রীতে একটা একাডেমিতে জমি বন্ধক রেখে ভর্তি হই। বাবাকে না জানিয়ে গ্রামের জমি বন্ধক রেখে মা টাকা দিয়েছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেলেও ওই জমি ছাড়িয়ে আনতে পারিনি। সেজন্য এখনও মাকে কথা শোনান বাবা। মোটা অঙ্কের টাকা নষ্ট হয়েছে আমার জন্য, যা কখনও ভুলতে পারবো না।
বাংলা ট্রিবিউন: মায়ের জন্য হলেও নিশ্চয়ই বড় ক্রিকেটার হতে চান?
হৃদয়: অবশ্যই, মা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। মায়ের জন্য হলেও আমাকে সাকিব ভাই, মাশরাফি ভাই, তামিম ভাইদের মতো ক্রিকেটার হতে হবে। ক্রিকেটার হওয়ার জন্য আমি অনেক কষ্ট করেছি। সামনে আরও অনেক কষ্ট করতেও রাজি।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন, বাবা-মার অনুভূতি কী?
হৃদয়: আমার মা-বাবা ক্রিকেট তেমন বোঝেন না। ক্রিকেট খেলার জন্য একসময় বাবা রাগ করতেন, তবে এখন আমার পাশেই আছেন তিনি। যখন কেউ বলে, ‘আপনার ছেলে তো ভালোই ক্রিকেট খেলে।’ তখন বাবার মুখে হাসি আর ধরে না!
বাংলা ট্রিবিউন: বয়সভিত্তিক দলগুলোতে আপনার পারফরম্যান্স কেমন ছিল?
হৃদয়: বগুড়া অনূর্ধ্ব-১৪ দলের হয়ে অনেক রান করলেও বিভাগীয় দলে সুযোগ পাইনি। তবে অনূর্ধ্ব-১৬ বিভাগীয় পর্যায়ে সুযোগ পাই। এরপর অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ক্যাম্পে থাকলেও একাদশে সুযোগ পাইনি। অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের দল থেকে বাদ পড়ে যাই। প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে সর্বোচ্চ ৬৮৮ রান করেছিলাম। ওয়াইসিএল অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টের বড় দৈর্ঘ্য আর টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টেও সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হই। এরই পুরস্কার হিসেবে আবার সুযোগ হয় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে।
বাংলা ট্রিবিউন: কোন ম্যাচে ভালো খেলে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ফিরেছিলেন?
হৃদয়: প্রথম বিভাগ লিগে শাইনপুকুরের হয়ে পেগাসাস ক্লাবের বিপক্ষে অসুস্থতা নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম। সেদিন সুজন স্যার (খালেদ মাহমুদ সুজন) আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘আজ অনেক মানুষ তোর খেলা দেখবে, তোর জন্য এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ।’ স্যারের কথা শুনে আমার মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি হয়েছিল। ওই ম্যাচে একজনের সঙ্গে ১৭২ রানের জুটি গড়েছিলাম, যেখানে আমার অবদান ছিল ৫৯ রান। ম্যাচটাও আমরা জিতেছিলাম। এরপর আবার অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পাই।
বাংলা ট্রিবিউন: নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি কেমন চলছে?
হৃদয়: দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ হারলেও সমস্যা নেই, কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, বিশ্বকাপ শুরুর আগে দলের সবাই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। নিউজিল্যান্ডে আমাদের ক্যাম্পের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য ক্রিকেট বোর্ডকে ধন্যবাদ।
বাংলা ট্রিবিউন: যুব বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ ৫০৫ রান ভারতের শিখর ধাওয়ানের। রেকর্ডটা ভাঙতে পারবেন?
হৃদয়: বিশ্বকাপে সব ম্যাচ খেলতে পারলে অবশ্যই রেকর্ডটা ভাঙার চেষ্টা করবো। ধাওয়ানের রেকর্ডটা তেমন কঠিন বলেও মনে হচ্ছে না।
প্রোফাইল
নাম: তৌহিদ হৃদয়
ডাক নাম: হৃদয়
বাবা: এনামুল হক
মা: তাহমিনা আক্তার
জন্ম: ৪ ডিসেম্বর ২০০০
জন্মস্থান: বগুড়া
উচ্চতা: ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি
প্রথম ক্লাব: শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব
বর্তমান ক্লাব: শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
প্রিয় শট: কাভার ড্রাইভ
প্রিয় মানুষ: মা
প্রিয় ফুটবল দল: ব্রাজিল
ক্যারিয়ারের স্মরণীয় মুহূর্ত: প্রথম বিভাগ লিগে পেগাসাস ক্লাবের বিপক্ষে ৫৯ রানের ইনিংস
ছবি-নাসিরুল ইসলাম








