৬ ফুটের বেশি উচ্চতার রিপন মণ্ডল একজন পেসার। তার প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও দক্ষিণ আফ্রিকান সাবেক পেসার ডেইল স্টেইন। দুই ক্রিকেটারের ক্রিকেট দর্শনে মুগ্ধ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের এই পেসার। ক্রিকেট প্রেমের কারণে চতুর্থ শ্রেণিতেই শেষ পড়ালেখার অধ্যায়। এজন্য অবশ্য মা-বাবাকে বোঝাতে হয়েছে, তিনি বিশ্বসেরা পেসার হবেন। স্টেইনের মতো পেসার হয়ে ব্যাটারদের মনে ভয় ছড়াবেন। ব্যস, ‘হ্যাঁ’ সার্টিফিকেট মিলে যাওয়ার পর আর কোনও বাধা আসেনি পরিবার থেকে। বরং সমর্থন পেয়েছেন সবসময়। সেই রিপনই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অপেক্ষায়।
মা-বাবার একমাত্র সন্তান বলেই কিনা বেশি আদুরে রিপন। ফলে ছেলের ক্রিকেটার হওয়ার আবদার ফেলতে পারেননি বাবু মণ্ডল-আসমা মণ্ডল দম্পতি। ছেলের প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে তার স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করে যাচ্ছেন তারা। পাড়া-মহল্লায় টেপ টেনিস দিয়ে ক্রিকেটে হাতেখড়ি রিপনের। টেপ টেনিসে তার গতিময় বোলিং দেখে অনেকেই বলতেন, ‘তুমি ক্রিকেট বলে অনুশীলন শুরু করো, তোমাকে দিয়ে হবে।’ এরপর ২০১৭ সালে মা-বাবার আবেগ কাজে লাগিয়ে মহাখালীর গ্লোবাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়ে যান রিপন। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অন্য সব ক্রিকেটারের মতো বয়সভিত্তিক ক্রিকেট ডিঙিয়ে আসেননি তিনি। প্রথম বিভাগ, তৃতীয় বিভাগের হয়ে সাফল্য তাকে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাইয়ে দেয়।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৭ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ (রবিবার) থাকছে পেসার রিপন মণ্ডলের একান্ত সাক্ষাৎকার−
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটে আপনার শুরুটা কীভাবে?
রিপন: ছোটবেলা থেকে গাজীপুরে বিভিন্ন জায়গাতে টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলতাম। টেপ টেনিসে যখন জোরে বল করতাম, সবাই বলতো, ‘তুই জোরে বল করিস। ক্রিকেট বলে লেগে থাকলে ভালো কিছু করতে পারবি।’ শরীফ নামে আমার একজন বড় ভাই ছিলেন। আগে ক্রিকেট খেলেছেন। উনি আমাকে বলছিলেন, ‘তুই একটা অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়ে যা, ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু হবে।’ তখন আমি ২০১৭ সালের দিকে মহাখালীতে গ্লোবাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হই। ওখানে কোচ হিসেবে ছিলেন বরিশাল বিভাগের হয়ে খেলা উইকেটকিপার ব্যাটার শাহীন হোসেন স্যার ও মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু স্যার। ওখান থেকে কন্টিনিউ অনুশীলন শুরু করি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলেননি, তাহলে কীভাবে সুযোগ এলো অনূর্ধ্ব-১৯ দলে?
রিপন: অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর ওই বছর আমি তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট খেলার জন্য রেজিস্ট্রেশন করি। কিন্তু শেষের দিকে রেজিস্ট্রেশন হওয়ার কারণে খেলার সুযোগ পাইনি। তবে পরের বছর তৃতীয় বিভাগ খেলি। সাত ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়েছিলাম। একই বছর শাহীন স্যার ও মঞ্জু স্যারের সূর্যতরুণে খেলার সুযোগ পাই। ১২ ম্যাচে ২৭ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকার করি। পরবর্তীতে করোনার কারণে অনুশীলন ব্যাঘাতগ্রস্ত হলেও নাদিফ ভাই (ক্রিকেটার নাদিফ চৌধুরী) আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। উনার পাশাপাশি শাহীন স্যার, মঞ্জু স্যারও দারুণ সহযোগিতা করেছেন। উনাদের কারণেই এতটুকু আসা।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটের কারণে লেখাপড়া বাদ দিয়েছেন। পরিবার থেকে কখনও বাধা আসেনি?
রিপন: আমার প্রতি ফ্যামিলি ছোটবেলা থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিল। আমি ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। এরপরই ক্রিকেটের পেছনে চলে আসছি। আমি বাবা-মাকে বুঝিয়েছি, আমি বিশ্বসেরা পেসার হবো। যদিও স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু পড়াশোনা করিনি। ক্রিকেট নিয়েই ছিলাম। বাসা থেকে পরে আর কিছু বলেনি। বড় ভাই শরীফুল ইসলাম ভাইও বলেছেন, ওখান থেকে তারা আশা পেয়েছেন। আল্লাহর রহমতে ভালো করেছি। আসলে উনাদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস ছিল, আমাকে দিয়ে হয়তো হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: ডেল স্টেইন আপনার আইডল। নিজে পেসার হওয়ার কারণে তাকে আদর্শ মানা স্বাভাবিক। কিন্তু সাকিবকেও পছন্দ করেন। বিশেষ কোনও কারণ?
রিপন: যখন থেকে খেলা দেখি, তখন থেকেই ডেল স্টেইনের খেলা খুব ভালো লাগতো। উনার বোলিং, আগ্রাসন সবকিছুই আমার ভালো লাগতো। তাকে দেখেই আমি ছোটবেলা থেকেই পেস বোলিং করি। তার মতোই বিশ্বসেরা পেসার হতে চাই। সাকিব ভাইকেও আমার ভালো লাগে। উনার আচরণ, চিন্তা-ভাবনা আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপের জন্য আপনারা এশিয়া কাপ খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রস্তুতি নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট?
রিপন: আমাদের প্রস্তুতি ভালো হয়েছে। বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপ আমাদের পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া টুর্নামেন্টের বেশ আগে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাবো। ওখানকার কন্ডিশন সম্পর্কে ধারণা পাবো। আশা করি, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আমরা আমাদের পুরোপুরি প্রস্তুত করে ফেলতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: ওয়েস্ট ইন্ডিজের উইকেট পেসারদের জন্য স্বর্গরাজ্য, কতটা রোমাঞ্চিত?
রিপন: আমাদের ভাবনাটা আসলে সিম্পল রাখতে হবে। যেহেতু উইকেট ভালো, সিমে হিট করতে পারলেই ভালো করা সম্ভব। বাকিটা বলই করবে। রোমাঞ্চিত হয়ে যদি বেশি কিছু করতে যাই তাহলে লেন্থে সমস্যা হতে পারে। বেশি কিছু করতে চাইলে বল উল্টোপাল্টা হতে পারে। এক্সসাইটমেন্ট ওইরকম না যে অমন উইকেটে খেলতে পারলে ভালো লাগবে।
বাংলা ট্রিবিউন: কিছু দিন ধরেই আশিকুজ্জামান ও আপনি পেস আক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন। ভারত সফরে তানজিম হাসান সাকিব যুক্ত হওয়ার পর পেস আক্রমণের শক্তি নিশ্চয় বেড়েছে?
রিপন: আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের পেস বোলিং আক্রমণ অনেক শক্তিশালী। আমরা আমাদের বোলিং নিয়ে আশাবাদী, আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই। অভিজ্ঞ ক্রিকেটার থাকা মানেই বাড়তি পাওনা। সাকিব ভাইয়ের অভিজ্ঞতা আমরা খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবো। উনারা যেহেতু আগে খেলে আসছেন, ভালো বুঝতে পারবেন কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে বোলিং করতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: জাতীয় দলের ব্যাটারদের নেটে বোলিং করেছেন। সেই অভিজ্ঞতাও নিশ্চয় কাজে দেবে?
রিপন: অবশ্যই। আমি সাকিব ভাই, তামিম ভাইদের অনুশীলনে অনেকবারই বোলিং করার সুযোগ পেয়েছি। উনাদের বিপক্ষে বোলিং করতে গিয়ে অনেক কিছুই শিখেছি। আমার জন্য এটা বিশাল প্রাপ্তির। আমিও ওখান থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি, যা ম্যাচে কাজে লাগাতে পারছি।
বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশ যুব বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। এজন্য বাড়তি কোনও চাপ অনুভব হচ্ছে কি?
রিপন: চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে মাঠে নামবো- এটা আমাদের চাপ নয়, ভালো ক্রিকেট খেলতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপে আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?
রিপন: বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হতে চাই। আমার চেষ্টাটা সেভাবেই থাকবে। ভালো করতে আমি আমার ফিটনেস লেভেলের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছি। একটা রুটিন সেট করে ওভাবেই কাজ করছি। নির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে কিছুই করছি না। নিজেকে এভাবেই প্রস্তুত করছি যেন বড় স্টেজে গিয়ে খেলতে পারি। বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হতে পারি, তেমন কিছুই আসলে ভাবনাতে।
প্রোফাইল
নাম: মোহাম্মদ রিপন মণ্ডল
ডাক নাম: রিপন
জন্ম: ২১ মার্চ ২০০৩
জন্মস্থান: গাজীপুর
বাবা: বাবু মণ্ডল
মা: আসমা মণ্ডল
উচ্চতা: ৬ ফুট ১ ইঞ্চি
লেখাপড়া: চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন
প্রথম ক্লাব: গ্লোবাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমি, মহাখালী
বর্তমান ক্লাব: গ্লোবাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমি, মহাখালী
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
বোলিং স্টাইল: ডানহাতি পেসার
বোলিংয়ে শক্তির জায়গা: লেন্থে হিট করা, ডেথ ওভারে ইয়র্কার
প্রিয় ক্রিকেটার: ডেল স্টেইন ও সাকিব আল হাসান
ক্যারিয়ারে সেরা মুহূর্ত: আফগানিস্তানের সঙ্গে ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে। ওই ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়ে দলকে জিতিয়েছিলেন রিপন।









