যেভাবে বদলে গেলো বাংলাদেশের ব্যাটিং

স্পোর্টস ডেস্ক
১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল বোলিং। বড় মঞ্চে এবার সময় ছিল ব্যাটারদের জ্বলে ওঠার। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে ঠিক সেটিই করে দেখিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে স্বাগতিকদের পুরোপুরি কোণঠাসা করে ৯ উইকেটের জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। এই জয় তাই বাংলাদেশের বোলারদের পাশাপাশি ব্যাটারদের অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

প্রথম টেস্টে ১৩৮ ওভার ব্যাট করে বাংলাদেশের ৪২৬ রান দেশের বাইরে, উপমহাদেশের বাইরে তাদের তৃতীয় দীর্ঘতম ইনিংস। প্রথম দিনেই বাংলাদেশের বোলিং অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করার পর ব্যাটাররা ২২৮ রানের লিড এনে দেন। তাতে আরও চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ইনিংসেও ৩০০ পার করতে পারেনি স্বাগতিকরা। ফলে ৫৭ রানের লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য হয়ে ওঠে নিছক আনুষ্ঠানিকতা।

অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণকে বিশ্বের সেরা বলা হয়। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড ও মিচেল স্টার্ক-অভিজ্ঞ এই ত্রয়ীর বয়স বাড়লেও ধার কমেনি। তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটাররা ধারাবাহিকভাবে ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ওপেনার তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজও করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ফিফটি।

অথচ ডারউইনে বাংলাদেশের ব্যাটারদের দেখে বোঝার উপায় ছিল না, এর আগের দুটি লাল বলের ম্যাচে তাদের পারফরম্যান্স কতটা হতাশাজনক ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে হারারেতে জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর ডারউইন টেস্টের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয় তারা।

বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার মনে করেন, টেস্টের এক সপ্তাহ আগে ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার ধাক্কাই শেষ পর্যন্ত দলকে উজ্জীবিত করেছিল। ক্রিকইনফোকে তিনি বলেছেন, ‘শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু ৫৪ রানে অলআউট হওয়াটা আসলে আমাদের সাহায্য করেছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও আমরা ভালো ব্যাটিং করিনি। ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর সবার শারীরিক ভাষায় পরিবর্তন দেখতে পেয়েছিলাম। কোচ যখন অনুশীলনে বাড়তি পরিশ্রম করতে বললেন, সবাই সেটি গ্রহণ করেছিল। পরের কয়েক দিন তারা খুব, খুব কঠোর পরিশ্রম করেছে।’

তার মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছিল ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার মানসিক বাধা কাটিয়ে ওঠায়, ‘আমার মনে হয়েছে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল আমরা ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার মানসিক বাধাটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম। দক্ষতার দিক থেকে আমাদের খুব বেশি পরিবর্তন করতে হয়নি, সেটা সবসময়ই ছিল। কিন্তু ব্যাটিং নিয়ে যে সচেতনতা তৈরি হয়েছিল, পরিবর্তনটা সেখানেই। প্রথম ইনিংসে তানজিদ যেভাবে ব্যাট করেছে, তাতেই তার প্রতিফলন দেখা গেছে।’

বাশার মনে করেন, প্রস্তুতি ম্যাচের পর প্রত্যেকেই নিজেদের কাছে কিছু প্রমাণ করার তাড়না অনুভব করেছিল, ‘আমার মনে হয়েছে, ওই প্রস্তুতি ম্যাচের পর সবাই নিজেদের কাছে কিছু প্রমাণ করতে চেয়েছিল। পুরো দলের মানসিকতা ও শারীরিক ভাষা বদলে গিয়েছিল। আমরা বলছিলাম, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে এমন কিছু করতে হবে, যা ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে। গভীরে গিয়ে সবাই হয়তো বিশেষ কিছু করতে চেয়েছিল। আমার মনে হয়, পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছে তাদের মানসিক শক্তি।’

বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমানে বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগে কাজ করা শাহরিয়ার নাফীস মনে করেন, অফ স্টাম্পের বাইরের বল নিয়ে বাংলাদেশের পুরোনো দুর্বলতা কাটানোর ব্যাপারে দল সচেতনভাবেই পরিবর্তন এনেছিল, ‘আমি মনে করি, ডারউইনে একই ধরনের বলের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটাররা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় অনুশীলনের সুযোগগুলো তারা সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়েছে। প্রায় কোনো অনুশীলন সেশনই বাদ দেয়নি। এতে এখানকার কন্ডিশন যতটা সম্ভব বোঝা সহজ হয়েছে।’

সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত তানজিদ হাসানের পরিবর্তন। সাদা বলের ক্রিকেটে শুরুতে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আক্রমণাত্মক ব্যাটার হিসেবে। কিন্তু মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই যেভাবে নতুন বল সামলে দীর্ঘ সময় ব্যাট করলেন, সেটি ছিল তার পরিণত হওয়ার বড় প্রমাণ।

নাফীসের মতে, তানজিদকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কৃতিত্ব হাবিবুল বাশারকেও দিতে হবে। ১০১ রানের ইনিংসে তানজিদ মেরেছেন আটটি চার ও একটি ছক্কা। কিন্তু তার স্ট্রাইক রেট ছিল মাত্র ৫১.২৬ এবং পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ক্রিজে ছিলেন। বিশেষ করে নতুন বলের বিপক্ষে অসাধারণ ধৈর্য দেখিয়েছেন। নাফীস বলেন, ‘তানজিদকে সাদা বলের বিশেষজ্ঞ বলা হয়, এটার সঙ্গে আমি একমত নই। সে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেছে এবং ওই ফরম্যাটে ভালো করেছে। তার স্ট্রাইক রেট ভালো, কিন্তু সেটি তাকে শুধু সাদা বলের বিশেষজ্ঞ বানায় না। আমার বিশ্বাস, নির্বাচকদের কাছে তানজিদ তিন ফরম্যাটের ব্যাটার হিসেবেই বিবেচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। অতীতে টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে আমাদের অনেক আলোচনা হয়েছে। আমি তাকে বলেছি, টেস্টেও নিজের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলা সবচেয়ে ভালো। আমার মনে হয়, সে পাঁচ ঘণ্টা টিকে থাকতে পেরেছে কারণ নিজের শক্তির ওপর আস্থা রেখেছে এবং ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

বাংলাদেশের আরেকটি বড় পরিবর্তন ছিল উইকেট পড়ার পর দ্রুত ধসে না গিয়ে বড় জুটি গড়ে তোলা। হাবিবুল বাশার বলেন, ‘বড় জুটি গড়ার পর দ্রুত উইকেট হারানো আমাদের প্রায়ই একটা সমস্যা। আমরা সুবিধাটা ধরে রাখতে পারি না।’

ডারউইনে সেই দুর্বলতা দেখা যায়নি। দ্বিতীয় উইকেটে তানজিদ ও মুমিনুল যোগ করেন ১০২ রান। এরপর তানজিদ ও শান্ত তৃতীয় উইকেটে করেন ৯৩ রান। চতুর্থ উইকেটে শান্ত ও মুশফিকুর রহিম যোগ করেন ৬৬ রান। নাফীস বলেন, ‘মুমিনুল ও শান্ত আত্মবিশ্বাসী খেলোয়াড়, তারা নিজেদের ওপর আস্থা রাখে। মুমিনুল ৪৯ রান করেছে, কিন্তু তার ক্রিজে উপস্থিতিই তরুণ ব্যাটারদের সাহায্য করে। মুমিনুল, শান্ত ও মুশফিক; তারা দায়িত্বশীল চরিত্রের খেলোয়াড়। এই দলটিতে এটি দারুণ একটি সমন্বয় তৈরি করেছে।’

ডারউইন টেস্টটি ব্যাটার মেহেদী হাসান মিরাজের জন্যও বড় পরিবর্তনের ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়া যখন দ্বিতীয় নতুন বল হাতে নিয়েছে এবং শেষ তিনটি উইকেট তুলে নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল, তখনও ৫০ ওভারের বেশি সময় নিচের সারির ব্যাটারদের নিয়ে লড়ে গেছেন মেহেদী।

অন্য প্রান্তে হাসান মাহমুদ ৯২ বলে ১৪, তাইজুল ইসলাম ২৩ বলে ১৭, তাসকিন আহমেদ অপরাজিত ৩২ বলে ১৪ এবং এবাদত হোসেন ১৮ বলে ৭ রান করে মেহেদীকে সঙ্গ দিয়েছেন। তাদের ব্যাটিং গড় খুব বেশি না হলেও অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের বিপক্ষে তারা অসাধারণ লড়াইয়ের মানসিকতা দেখিয়েছেন।

বাশার বলেছেন, ‘আমাদের পেসাররা ব্যাট করার যে ক্ষুধা দেখিয়েছে, সেটা আমি সত্যিই উপভোগ করেছি। পুরো বিষয়টাই আলাদা ছিল। হাসান মাহমুদ ৯০টির বেশি বল খেলেছে। তাসকিন, তাইজুল ও এবাদতও কঠোর লড়াই করেছে। এখানেও বোঝা গেছে, তারা টেস্টে বিশেষ কিছু অর্জন করতে চেয়েছিল। আমরা সবসময়ই ভালো করতে চাই, কিন্তু এবার মানসিকতা ও ক্ষুধাটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

 

/এফআইআর/
সম্পর্কিত
প্রথম টেস্টে নেই বাবর, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নেতৃত্বে কে?
ব্যাটারের জোরালো শটে বল লাগলো আম্পায়ারের মুখে, তার পর হাসপাতালে 
তানজিদ-ব্রুকদের হারিয়ে জুলাই মাসের সেরা গ্রিভস
সর্বশেষ খবর
খুলনায় যুবককে গুলি, পাঠানো হলো ঢাকায়
খুলনায় যুবককে গুলি, পাঠানো হলো ঢাকায়
আঙুল ফোটানোর অভ্যাস স্বস্তি নাকি নীরব ক্ষতি
আঙুল ফোটানোর অভ্যাস স্বস্তি নাকি নীরব ক্ষতি
৩ ডিসি এবং ১ বিভাগীয় কমিশনার প্রত্যাহার
৩ ডিসি এবং ১ বিভাগীয় কমিশনার প্রত্যাহার
অটোরিকশার অবৈধ বিদ্যুতের ব্যবহার বন্ধে অভিযান, লাইন কাটতে গিয়ে উত্তেজনা  
অটোরিকশার অবৈধ বিদ্যুতের ব্যবহার বন্ধে অভিযান, লাইন কাটতে গিয়ে উত্তেজনা  
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
ব্যাংকের বাইরে টাকা জমানোর নতুন সুযোগ, ১০ শতাংশ বরাদ্দ শুধু ব্যক্তিদের 
ব্যাংকের বাইরে টাকা জমানোর নতুন সুযোগ, ১০ শতাংশ বরাদ্দ শুধু ব্যক্তিদের 
চার দেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্ক করলো দূতাবাস 
চার দেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্ক করলো দূতাবাস 
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা