বয়স কেবল সংখ্যা, বিরাটের ব্যাটে এখনো রেকর্ড ভাঙার ক্ষুধা

স্পোর্টস ডেস্ক
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:১২ আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:১২

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৮৬টি সেঞ্চুরি, ওয়ানডেতে ১৫ হাজারের বেশি রান, বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। একটির পর একটি কীর্তিতে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বিরাট কোহলি। তবে তার পরিচয় কি কেবল পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ? ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো, চাপের মুখে দলের দায়িত্ব নেওয়া আর প্রতিটি ইনিংসে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাগিদই তাকে পরিণত করেছে কোটি মানুষের আবেগের নাম।

ব্যাট হাতে বিরাট কোহলি যখন মাঠে নামেন, দর্শকের প্রত্যাশা থাকে অন্য রকম। তার ব্যাটিংয়ে থাকে আত্মবিশ্বাস, আগ্রাসন আর ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য। কখনো প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে শাসন করেন, কখনো কঠিন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন। আবার কখনো নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে লড়াই করে ফিরে আসেন আরও দৃঢ়ভাবে।

আজ ৫ নভেম্বর ২০২৬, বিরাট কোহলির ৩৮তম জন্মদিন। ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর প্রায় দুই দশকের পথচলায় তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে। এই দীর্ঘ যাত্রায় গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড, জিতেছেন বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক শুধু অর্জনের তালিকা নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সেরাটা বের করে আনার মানসিকতা।

জন্মদিনের ঠিক আগের দিন, ৪ নভেম্বর অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ৫১ বলে ৭৪ রানের ইনিংস খেলেছেন কোহলি। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ভারত জিতেছে পাঁচ উইকেটে। ওয়ানডেতে এটি তার ৮০তম অর্ধশতক। একই ইনিংসে রান তাড়ায় শচীন টেন্ডুলকারকে ছাড়িয়ে ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হয়েছেন তিনি। ৩৮তম জন্মদিনের ঠিক আগমুহূর্তেও তার ব্যাটে দেখা গেছে সেই চেনা আত্মবিশ্বাস।

দিল্লির সেই ছেলেটি থেকে বিশ্বক্রিকেটের তারকা

১৯৮৮ সালের ৫ নভেম্বর ভারতের দিল্লিতে জন্ম বিরাট কোহলির। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহকে পেশাদার স্বপ্নে রূপ দিতে শৈশব থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছেন তিনি।

২০০৮ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ভারতকে নেতৃত্ব দেন কোহলি। তার নেতৃত্বেই শিরোপা জেতে ভারত। একই বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। জাতীয় দলে শুরুটা অবশ্য সহজ ছিল না। কখনো ওপেনিংয়ে, কখনো মিডল অর্ডারে ব্যাট করতে হয়েছে। তবে ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা ও পরিস্থিতি বুঝে খেলার দক্ষতায় ধীরে ধীরে নিজের জায়গা পাকা করেন তিনি।

কোহলির ব্যাটিংয়ের বিশেষত্ব শুধু বড় শটে নয়। উইকেটের মধ্যে দ্রুত দৌড়ানো, ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে নেওয়া এবং বোলারের ওপর চাপ তৈরির ক্ষমতাও তাকে আলাদা করেছে। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তার লক্ষ্য ছিল শুধু দলে জায়গা ধরে রাখা নয়, বরং ম্যাচ জেতানো ক্রিকেটার হয়ে ওঠা।

রান তাড়ার রাজা: চাপের মধ্যে কোহলির ব্যাটিং

ওয়ানডে ক্রিকেটে রান তাড়ায় বিরাট কোহলির দক্ষতা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বড় লক্ষ্য সামনে থাকলেও সাধারণত তাড়াহুড়া করেন না তিনি। বরং ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে ধীরে ধীরে ইনিংস গড়ে তোলেন। কখন রান বাড়াতে হবে, কখন উইকেট ধরে রাখতে হবে, আর কখন বোলারের ওপর পাল্টা আক্রমণ করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা অসাধারণ।

এই কারণেই তাকে বলা হয় ‘চেজ মাস্টার’। দলের জয়ের সম্ভাবনা যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তার ব্যাটিংয়ের অন্যতম বড় শক্তি।

২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ওয়ানডেতে ৩১৮ ম্যাচে ১৫ হাজার ১৮৩ রান করেছেন কোহলি। ব্যাটিং গড় ৫৮.৮৫। রয়েছে ৫৫টি সেঞ্চুরি ও ৮০টি অর্ধশতক। এই পরিসংখ্যান তাকে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সফল ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করা দ্বিতীয় ব্যাটার কোহলি। প্রথম ছিলেন তারই আদর্শ শচীন টেন্ডুলকার। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অপরাজিত ১৩৯ রানের ইনিংস খেলার পথে মাইলফলকটি স্পর্শ করেন তিনি। কোহলির লেগেছিল ৩০৩ ইনিংস, আর শচীনের প্রয়োজন হয়েছিল ৩৭৭ ইনিংস। 

২০২৩ বিশ্বকাপ: ইতিহাসের পাতায় লেখা এক অধ্যায়

২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ছিল কোহলির ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময়। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই আসরে স্বাগতিক দল ফাইনাল পর্যন্ত অপরাজিত ছিল। দলের এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা ক্রিকেটারদের একজন ছিলেন কোহলি।

১১ ম্যাচে ৭৬৫ রান করেন তিনি। ব্যাটিং গড় ছিল ৯৫.৬২। তিনটি সেঞ্চুরি ও ছয়টি অর্ধশতকের পাশাপাশি ভেঙে দেন শচীন টেন্ডুলকারের এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে সেঞ্চুরি করে ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজের ৫০তম শতক পূর্ণ করেন কোহলি। এর মধ্য দিয়ে ওয়ানডেতে ৫০টি সেঞ্চুরি করা প্রথম ব্যাটার হন তিনি। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।

তবে ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ভারতের পরাজয়ে সেই অসাধারণ আসরের শেষটা প্রত্যাশামতো হয়নি। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দলীয় শিরোপার স্বপ্নও ছিল কোহলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিততে না পারলেও এক বিশ্বকাপে ৭৬৫ রানের কীর্তি তার সামর্থ্য ও ধারাবাহিকতার বড় প্রমাণ হয়ে আছে।

দীর্ঘ রানখরা থেকে ফিরে আসার গল্প

প্রতিটি বড় ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারেই খারাপ সময় আসে। কোহলির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০১৯ সালের পর দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেঞ্চুরির দেখা পাননি তিনি। ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, অফ স্টাম্পের বাইরের বলে বারবার আউট হওয়া এবং ক্রমাগত সমালোচনা তার ওপর চাপ তৈরি করেছিল।

২০২২ সালে সেই চাপ আরও বেড়ে যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, কোহলি কি আর আগের মতো ব্যাট করতে পারবেন? কিন্তু এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে অপরাজিত ১২২ রানের ইনিংস খেলে তিনি বুঝিয়ে দেন, তার সামর্থ্য হারিয়ে যায়নি। এটিই তার টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরি।

এরপর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫৩ বলে অপরাজিত ৮২ রানের ইনিংসটি হয়ে ওঠে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। মেলবোর্নের সেই ম্যাচে ১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে ভারত। কিন্তু কোহলি শেষ পর্যন্ত বদলে দেন ম্যাচের চিত্র।

হারিস রউফের বলে তার সেই ছক্কা আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ইনিংসটি শুধু একটি ম্যাচ জেতানোর গল্প নয়, বরং কঠিন সময় পেরিয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখার এক অনন্য উদাহরণ।

নেতৃত্বে কোহলি: জয়ের মানসিকতা তৈরি

কোহলির অধিনায়কত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার আগ্রাসী মনোভাবের কথা আসবেই। তিনি সব সময় জয়ের জন্য খেলেছেন। মাঠে তার আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা এবং সতীর্থদের উজ্জীবিত করার ক্ষমতা ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন এক আবহ তৈরি করেছিল।

২০১৪ সালে টেস্ট অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর ভারতীয় দলকে বিদেশের মাটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলার দিকে এগিয়ে নেন তিনি। তার নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন কন্ডিশনেও নিজেদের শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ভারত।

বিশেষ করে ২০১৮-১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয় ছিল ঐতিহাসিক সাফল্য। অধিনায়ক হিসেবে ৬৮টি টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়ে ৪০টি ম্যাচ জিতেছেন কোহলি। এই রেকর্ড তাকে ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সফল অধিনায়কের মর্যাদা দিয়েছে।

তার নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেটে ফিটনেস, পেশাদারত্ব এবং বিদেশের মাটিতে জয়ের মানসিকতা নতুন গুরুত্ব পায়। তবে তার নেতৃত্বের সব সিদ্ধান্ত যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল, তা নয়। মাঠের আচরণ ও অতিরিক্ত আগ্রাসন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারপরও ভারতীয় ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা তৈরিতে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

টেস্ট ক্রিকেটে এক অন্য কোহলি

সাদা পোশাকে কোহলির ব্যাটিং ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিশ্রমী ও পরিণত অধ্যায়গুলোর একটি। টেস্ট ক্রিকেটে ১২৩ ম্যাচে ৯ হাজার ২৩০ রান করেছেন তিনি। ব্যাটিং গড় ৪৬.৮৫। রয়েছে ৩০টি সেঞ্চুরি ও ৩১টি অর্ধশতক। টেস্টে তার সর্বোচ্চ ইনিংস অপরাজিত ২৫৪ রানের।

টেস্ট ক্রিকেটে কোহলির গুরুত্ব শুধু রানসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক সময়ে ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যখন সীমিত ওভারের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছিল। তবু টেস্ট ক্রিকেটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়ের লক্ষ্য, পেস বোলিংয়ের শক্তি বাড়ানো এবং খেলোয়াড়দের ফিটনেসে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার নেতৃত্বের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

২০২৫ সালের মে মাসে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছরের অধ্যায়ের ইতি টানেন তিনি। এর আগে ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক থেকেও অবসর নেন। ফলে এখন ভারতের হয়ে শুধু ওয়ানডে ক্রিকেটেই খেলছেন কোহলি।

আইপিএলে এক ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে বিরাট কোহলি ও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর সম্পর্কও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০৮ সালে আইপিএল শুরু হওয়ার পর থেকেই বেঙ্গালুরুর হয়ে খেলছেন তিনি। এত দীর্ঘ সময় ধরে একই ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলার নজির খুব বেশি নেই।

২০২৪ সালের আইপিএলে ৭৪১ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন কোহলি। এরপর ২০২৫ সালে ৬৫৭ রান করে বেঙ্গালুরুর প্রথম আইপিএল শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর শিরোপা জয়ের সেই মুহূর্ত ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একের পর এক সাফল্য পেলেও আইপিএলে শিরোপা জেতার স্বপ্ন পূরণে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৮ বছর। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দলীয় শিরোপার আনন্দও যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই অভিজ্ঞতা তার জন্য ছিল বিশেষ।

২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি: বড় মঞ্চে আবারও কোহলি

২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে কোহলি আবারও প্রমাণ করেন, বড় ম্যাচে তার গুরুত্ব কতটা। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে ভারতকে জয় এনে দেন তিনি। পাঁচ ম্যাচে ২১৮ রান করে ভারতের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার যে পরিচিতি তিনি তৈরি করেছেন, চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পারফরম্যান্স ছিল তারই আরেকটি উদাহরণ। চাপের মুহূর্তে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য এখনো তার ব্যাটিংয়ের অন্যতম বড় শক্তি।

২০২৬: বয়স নয়, ব্যাটিংয়ের ক্ষুধাই বড়

২০২৬ সালেও কোহলির ব্যাটিংয়ে দেখা গেছে নতুন উদ্যম। জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৯৩ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ইন্দোরে ১২৪ রান করে ওয়ানডেতে নিজের ৫৪তম সেঞ্চুরি তুলে নেন।

সেপ্টেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে তিরুবনন্তপুরমে ৮৮ বলে অপরাজিত ১৩৯ রানের ইনিংস খেলেন কোহলি। এই ইনিংসেই ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন এবং ৫৫তম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন।

এরপর ৪ নভেম্বর অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ৭৪ রানের ইনিংস খেলে আবারও প্রমাণ করেন, বড় লক্ষ্য তাড়ায় তার অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এই পর্যায়ে এসে কোহলির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সময়ের সঙ্গে নিজের ব্যাটিংকে মানিয়ে নিতে জানেন তিনি। প্রয়োজন হলে ধৈর্য ধরেন, আবার সুযোগ পেলে দ্রুত রান তোলেন। বয়স বাড়লেও প্রতিটি ইনিংসে নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ তার ব্যাটিংয়ে এখনো স্পষ্ট।

ক্রিকেটের বাইরেও কোহলির প্রভাব

কোহলির জনপ্রিয়তা শুধু রান বা সেঞ্চুরির কারণে নয়। তরুণদের মধ্যে ফিটনেস, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন তিনি। নিজের জীবনযাপন, অনুশীলন ও শারীরিক প্রস্তুতির মাধ্যমে ভারতীয় ক্রিকেটে ফিটনেসের নতুন মানদণ্ড তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন।

তার প্রভাব শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছেও তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশের অনেক সমর্থকের কাছে কোহলির ব্যাটিংয়ের আকর্ষণ হলো, কঠিন পরিস্থিতিতেও ম্যাচের ফল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা। তিনি যখন ব্যাট করেন, তখন শেষ বল পর্যন্ত লড়াই দেখার প্রত্যাশা তৈরি হয়।

একজন ভক্তের চোখে বিরাট কোহলি

বিরাট কোহলিকে ভালোবাসার কারণ শুধু তার রেকর্ড নয়। ব্যাটিংয়ের সময়কার আত্মবিশ্বাস, প্রতিটি রানের জন্য লড়াই করার মানসিকতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে হাল না ছাড়ার অভ্যাস তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভা দিয়ে শুরু করা যায়, কিন্তু ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও নিজের ওপর বিশ্বাস। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট সেঞ্চুরি বা রেকর্ডে নেই; বরং উত্থান-পতনের মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকার গল্পে।

একজন ভক্তের চোখে কোহলির সবচেয়ে বড় অর্জন তাই কেবল সংখ্যায় মাপা সম্ভব নয়। ব্যর্থতার পর ফিরে আসা, সমালোচনার মুখেও নিজের খেলায় মনোযোগ রাখা এবং প্রতিটি ম্যাচে জয়ের জন্য লড়াই করার মানসিকতাই তাকে আলাদা করেছে।

বিরাট কোহলির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখন নতুন এক অধ্যায়ে। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক থেকে অবসরের পর ওয়ানডেই এখন তার একমাত্র আন্তর্জাতিক ফরম্যাট। সামনে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ। কোহলি নিজেই জানিয়েছেন, ভারতের হয়ে এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। তাই ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি দেশের হয়ে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করাই তার লক্ষ্য।

ক্রিকেটের ইতিহাসে নিজের অবস্থান ইতোমধ্যেই বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন কোহলি। ব্যাটার হিসেবে অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন, অধিনায়ক হিসেবে ভারতীয় দলকে দিয়েছেন নতুন মানসিকতা, আর একজন মানুষ হিসেবে কোটি ভক্তকে শিখিয়েছেন নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখতে।

স্বপ্ন, পরিশ্রম, ব্যর্থতা এবং ফিরে আসার গল্প- বিরাট কোহলির ক্যারিয়ার যেন এসবেরই এক অনন্য সমন্বয়। এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, তিনি এখনো ব্যাট হাতে মাঠে নামেন। প্রতিটি নতুন ইনিংসের সঙ্গে আবারও মনে করিয়ে দেন, কিংবদন্তিরা শুধু অতীতের রেকর্ডে বেঁচে থাকেন না; তারা প্রতিনিয়ত নতুন ইতিহাসও তৈরি করেন।

 

/জেএ/এফআইআর/
সম্পর্কিত
টসে হেরে দ্বিতীয় টেস্টে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে দুই পরিবর্তন
হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লড়াই, সিলেটে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৌশল!
ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হারের পর র‍্যাঙ্কিংয়ে অবনতি তাইজুল-মিরাজের 
সর্বশেষ খবর
ব্রাজিলে এক ম্যাচে ৫৩ লাল কার্ড, ফুটবল মাঠে নজিরবিহীন কাণ্ড!
ব্রাজিলে এক ম্যাচে ৫৩ লাল কার্ড, ফুটবল মাঠে নজিরবিহীন কাণ্ড!
শ্রমিক আন্দোলনে নিহত তৌফিকের পরিবারের পাশে থাকবো: জামায়াত আমির
শ্রমিক আন্দোলনে নিহত তৌফিকের পরিবারের পাশে থাকবো: জামায়াত আমির
ইলেকট্রোলাইট পানীয় খাচ্ছেন? উপকারের বদলে ক্ষতি হচ্ছে না তো?
ইলেকট্রোলাইট পানীয় খাচ্ছেন? উপকারের বদলে ক্ষতি হচ্ছে না তো?
পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসনে জামায়াতের ১৫ দাবি
পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসনে জামায়াতের ১৫ দাবি
সর্বাধিক পঠিত
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
‘বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলাম’, রাকসু ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন আম্মার
‘বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলাম’, রাকসু ছেড়ে কোথায় যাচ্ছেন আম্মার
বাংলাদেশের এমপির বড় ভাই জিতলেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে, এলাকায় আনন্দ
বাংলাদেশের এমপির বড় ভাই জিতলেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে, এলাকায় আনন্দ
প্রধানমন্ত্রী সফরে আসছেন, তাই বদলে গেলো খানাখন্দে ভরা মহাসড়ক
প্রধানমন্ত্রী সফরে আসছেন, তাই বদলে গেলো খানাখন্দে ভরা মহাসড়ক
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার
‘ভিআইপি’ সেবায় সন্ত্রাসীর আস্তানায় গিয়ে ৭৪ জমির দলিল রেজিস্ট্রি করলেন সাব-রেজিস্ট্রার