সব মিলিয়ে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের সঙ্গে হুলিয়ান আলভারেজের সম্পর্ক এখন অস্বস্তিকর। কিন্তু দল যদি তাকে ছাড়তেই না চায়, তাহলে এরপর কী?
গত সপ্তাহে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের মাঠ ছাড়ছিলেন হুলিয়ান আলভারেজ। তবে সতীর্থদের সঙ্গে নয়, একাই। রবিবার ভিয়ারিয়ালের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্রয়ের পর অ্যাতলেতিকোর খেলোয়াড়রা সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে এগিয়ে যান। কিন্তু আলভারেজ সেখানে যাননি। সমর্থকদের কাছ থেকে তাকে দূরে থাকতে পরামর্শ দিয়েছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
এর আগেই অবশ্য নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন অ্যাতলেতিকোর সমর্থকরা। বার্সেলোনায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা আলভারেজকে দুয়ো দিয়ে বিদ্রূপ করেন তারা।
দৃশ্যটি ছিল ভীষণ অস্বস্তিকর। একই সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে ডিয়েগো সিমিওনের দলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আলভারেজ যদি শেষ পর্যন্ত অ্যাতলেতিকোতেই থেকে যান, তাহলে কী হবে?
পুরো গ্রীষ্মজুড়েই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে অ্যাতলেতিকো। বার্সেলোনার কাছে আলভারেজকে বিক্রি করবে না তারা। মঙ্গলবার ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই মনে হচ্ছে নিজেদের অবস্থানে সফল হতে যাচ্ছে মাদ্রিদের ক্লাবটি।
কিন্তু আলভারেজকে দলে রেখে দেওয়াই তো শেষ কথা নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হবে তাকে পুরো মৌসুমে দলের প্রতি মনোযোগী ও নিবেদিত রাখা।
২০২৪ সালে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে আলভারেজকে দলে ভেড়াতে সর্বোচ্চ ৯৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ হয়েছিল অ্যাতলেতিকোর। এরপর থেকেই সিমিওনের আক্রমণভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টাইন এই ফরোয়ার্ড। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করেছেন ২৯ গোল।
তাই তাকে বাদ দিয়ে অ্যাতলেতিকোর জন্য কোনো সহজ ফুটবলীয় সমাধানও নেই। আলভারেজ কখনও মূল স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে পারেন, আবার মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে কিছুটা নিচে নেমেও খেলতে পারেন। অন্য কোনো ফরোয়ার্ডের পাশেও কার্যকর তিনি। তার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো মুভমেন্ট। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জায়গা থেকে সরিয়ে দিয়ে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করতে পারেন তিনি।
এ কারণেই তার পরিস্থিতি এমন কোনো খেলোয়াড়ের মতো নয়, যাকে বাদ দিলেও দলের কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন হবে না।
আলভারেজ যদি থেকে যান, সিমিওনেকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই তাকে খেলাতে হবে। প্রশ্ন হলো—তিনি কি সেই একই আলভারেজকে ফিরে পাবেন?
সমর্থকদের সঙ্গে একজন স্ট্রাইকারের সম্পর্ক খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। আর গোলই সেই সম্পর্ক মেরামতের সবচেয়ে সহজ পথ।
আলভারেজ যদি নিয়মিত গোল করতে শুরু করেন, কঠোর পরিশ্রম করেন এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করেন, তাহলে আজকের দুয়ো একসময় করতালিতে পরিণত হতে পারে। তবে উল্টোটাও সত্যি। প্রতিটি গোলের সুযোগ নষ্ট, বাজে পারফরম্যান্স কিংবা মাঠে দৃশ্যমান হতাশা আবারও ফিরিয়ে আনতে পারে ট্রান্সফার প্রসঙ্গ। তখন অ্যাতলেতিকোর ৯ নম্বর হিসেবে নয়, বরং যে খেলোয়াড়টি দল ছাড়তে চেয়েছিল—এই পরিচয়েই তাকে বিচার করার ঝুঁকি থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে চাপ থাকবে সিমিওনের ওপরও। দলের ভেতরে চলা এই বিরোধ সামলাতে হবে তাকে, আবার একই সঙ্গে আলভারেজের গুরুত্বও অস্বীকার করা যাবে না। আলভারেজকে স্থায়ীভাবে দলের জন্য বিভ্রান্তির কারণ হতে দেওয়া যাবে না। আবার ট্রান্সফার নিয়ে মতবিরোধের কারণে দলের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কেও হারানো যাবে না।
অ্যাতলেতিকোতে এমন পরিস্থিতির একটি নজিরও আছে। আন্তোয়ান গ্রিজমান একসময় বার্সেলোনায় যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখিয়ে অ্যাতলেতিকোর সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে তিনি যোগ দেন কাতালান ক্লাবটিতে। ২০২১ সালে আবার মাদ্রিদে ফেরেন এবং ধীরে ধীরে সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন। একপর্যায়ে অ্যাতলেতিকোর ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন ফরাসি ফরোয়ার্ড।
তবে আলভারেজের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গ্রিজমান শেষ পর্যন্ত নিজেই অ্যাতলেতিকোয় ফিরেছিলেন। কিন্তু আলভারেজ থেকে গেলে সেটি হতে পারে ক্লাবটির তাকে ছাড়ার অস্বীকৃতির ফল।
আলভারেজের সামনে অবশ্য বিকল্পও রয়েছে। রবার্ট লেভানডোভস্কি ও ফেরান তোরেস চলে যাওয়ার পর বার্সেলোনা এখনও ৯ নম্বর পজিশনের জন্য আলভারেজকেই তাদের পছন্দের খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করছে। মিকেল আরতেতার আক্রমণভাগ শক্তিশালী করার পরিকল্পনায় আর্সেনালের সঙ্গেও আর্জেন্টাইন তারকার নাম জড়িয়েছে।
আর্সেনালের আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আরতেতা অবশ্য বিষয়টি এড়িয়ে যান। বার্সেলোনার জন্য এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা সময়। অ্যাতলেতিকো আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ট্রান্সফার উইন্ডো বন্ধ হওয়ার আগে তাদের হাতে খুব বেশি সুযোগ নেই।
আর্সেনালের ক্ষেত্রে বিষয়টি নির্ভর করতে পারে ইংল্যান্ডে যাওয়ার ব্যাপারে আলভারেজের আগ্রহ কতটা, তার ওপর।
তবে ট্রান্সফার বাজারের লড়াইয়ে জিতে যাওয়া মানেই ফুটবলীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া নয়। আলভারেজকে সতীর্থ, কোচ এবং শেষ পর্যন্ত সমর্থকদেরও বোঝাতে হবে যে তিনি অ্যাতলেতিকোর জন্য নিজের সবটুকু দিতে প্রস্তুত।
সিমিওনেকেও তাকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিতে হবে, যাতে তাকে দলে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হয়। একই সঙ্গে পুরো দলকে ট্রান্সফার-সংশ্লিষ্ট এই আলোচনা থেকে দূরে রাখার দায়িত্বও থাকবে তার। আর সবশেষে, আলভারেজকে পারফর্ম করতেই হবে।








