বাংলাদেশে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এখন কোটি মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের ভরসা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ (এপ্রিল ২০২৬) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২৫ কোটি ৪৭ লাখে পৌঁছেছে। তবে ডিজিটাল লেনদেনের এই দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারণাও। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যক্তিগত এমএফএস গ্রাহক, ১৭ শতাংশ এজেন্ট এবং ১ দশমিক ৬ শতাংশ মার্চেন্ট প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রতারণা হয়েছে ভুয়া তথ্য বা বিভ্রান্তিকর বার্তার মাধ্যমে, ৪২ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে ফোনকল বা এসএমএস ব্যবহার করে, আর ১২ দশমিক ৩ শতাংশ ঘটনায় হ্যাকিংয়ের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তাই কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা মেনে চললেই মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পিন, ওটিপি বা নিরাপত্তা কোড কখনোই কাউকে জানাবেন না
মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল হলো ব্যবহারকারীর পিন, ওটিপি (ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড) বা নিরাপত্তা কোড হাতিয়ে নেওয়া। প্রতারকরা প্রায়ই বিকাশ বা নগদের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে বলেন, ‘আপনার অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে’, ‘কেওয়াইসি (নো ইউর কাস্টমার) আপডেট করতে হবে’ কিংবা ‘ওটিপি না দিলে অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে’। মনে রাখবেন, বিকাশ, নগদ বা কোনও ব্যাংকই ফোন, এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা ই-মেইলে এসব গোপন তথ্য জানতে চায় না। এমন অনুরোধ পেলেই কল কেটে দিয়ে বা ভুয়া-বার্তা উপেক্ষা করে অফিসিয়াল অ্যাপ বা হেল্পলাইনের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করুন।
ভুলবশত পাঠানো টাকা ফেরতের সাজানো ফাঁদে পা দেবেন না
অনেক প্রতারক ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর থেকে ‘ট্রান্স্যাকশন সাকসেসফুল’ বা ‘ক্যাশ ইন সাকসেসফুল’ লেখা ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে পরে ফোন করে দাবি করেন, ভুলবশত আপনার নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে। এরপর সেই অর্থ ফেরত দিতে বা ওটিপি দিতে চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাই শুধু এসএমএসের ভাষা নয়, সেটি অফিসিয়াল শর্ট কোড থেকে এসেছে কি না নিশ্চিত করুন। সন্দেহ হলে সরাসরি অ্যাপে প্রবেশ করে লেনদেনের ইতিহাস ও ব্যালেন্স যাচাই করুন অথবা অফিসিয়াল হেল্পলাইনে কল করে যাচাই করুন।
লোভনীয় অফার বা জরুরি বার্তায় প্রলুব্ধ হবেন না
‘ঈদ উপলক্ষে ৫০ হাজার টাকা জিতেছেন’, ‘সরকারি ভাতা পেতে তথ্য দিন’ কিংবা ‘৩০ মিনিটের মধ্যে কেওয়াইসি হালনাগাদ না করলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’ এ ধরনের বার্তা ব্যবহারকারীদের ভয় বা লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্যই তৈরি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এআই-ভিত্তিক ভয়েস ক্লোনিং ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর নকল করেও অর্থ দাবি করার ঘটনা বাড়ছে। মনে রাখবেন, বিকাশ বা নগদের সব অফার, ক্যাম্পেইন ও ঘোষণা শুধু তাদের অফিসিয়াল অ্যাপ, ওয়েবসাইট এবং ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
সেন্ড মানি বা কিউআর কোড ব্যবহারের আগে স্ক্রিন ভালোভাবে পড়ুন
অনলাইন কেনাবেচার সময় প্রতারকরা অনেক ক্ষেত্রে দাবি করেন, ‘টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি, শুধু কিউআর কোড স্ক্যান করে পিন দিন’ অথবা ‘ভুল করে বেশি টাকা চলে গেছে, সেন্ড মানি করে ফেরত দিন।’ বাস্তবে পিন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার অ্যাকাউন্ট থেকেই অর্থ কেটে যেতে পারে। তাই পিন দেওয়ার আগে স্ক্রিনে সেন্ড মানি, ক্যাশ আউট নাকি পেমেন্ট– কোনও লেনদেন অনুমোদন করছেন, তা অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন। ভুল করে টাকা পাঠানোর দাবি এলেও নিজে থেকে অর্থ ফেরত না পাঠিয়ে আগে অফিসিয়াল হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন।
ভুয়া কাস্টমার কেয়ার, অচেনা লিংক ও রিমোট অ্যাপ থেকে দূরে থাকুন
গুগল সার্চ, ফেসবুক বা মেসেঞ্জারে পাওয়া তথাকথিত ‘বিকাশ কাস্টমার কেয়ার’ বা ‘নগদ হেল্পলাইন’ নম্বরে যোগাযোগ করে অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়ে থাকে। একইভাবে ‘সমস্যা সমাধানের জন্য এনি ডেস্ক, টিম ভিউয়ার বা অন্য কোনও অ্যাপ ইনস্টল করুন’– এমন নির্দেশনা কখনোই অনুসরণ করবেন না। এসব রিমোট অ্যাক্সেস অ্যাপের মাধ্যমে প্রতারক আপনার ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। প্রয়োজন হলে শুধু অফিসিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বর ব্যবহার করুন এবং অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন।
অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিন
হঠাৎ সিমে নেটওয়ার্ক না থাকা, অচেনা লেনদেনের নোটিফিকেশন পাওয়া, অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে না পারা বা সিম অকার্যকর হয়ে যাওয়া ‘সিম সওয়াপ’ প্রতারণার লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেরি না করে মোবাইল অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট এমএফএস প্রতিষ্ঠানের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন। পাশাপাশি সহজ পিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন, স্ক্রিন লক ও বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবহার করুন এবং প্রতিটি লেনদেনের নোটিফিকেশন চালু রাখুন।









