বিশ্বজুড়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে পরিবহন ব্যবস্থা। একসময় পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়িই ছিল সড়কের প্রধান ভরসা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানির বাড়তি খরচ এবং উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তির কারণে এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ গ্লোবাল ইভি আউটলুক ২০২৬ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ২ কোটিরও বেশি হয়েছে। এর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বড় বাজার চীন, যেখানে এক বছরেই ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি ইভি বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্বে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০টি বৈদ্যুতিক গাড়ির মধ্যে প্রায় ছয়টিই চীনের বাজারে বিক্রি হয়েছে।
কেন বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি ব্যয় কম হওয়া।
প্রচলিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়ি চালাতে তুলনামূলক কম খরচ হয়। পাশাপাশি এতে ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তনের মতো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও কম।
এছাড়া পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে। সেই লক্ষ্য পূরণেও বৈদ্যুতিক গাড়িকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের সাফল্যের রহস্য
বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে চীন। শুধু উৎপাদন নয়, ব্যবহারেও দেশটি বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি ভর্তুকি, চার্জিং অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণ, ব্যাটারি উৎপাদনে বিনিয়োগ এবং দেশীয় গাড়ি নির্মাতাদের উৎসাহ দেওয়ার কারণে চীন খুব অল্প সময়ে ইভি শিল্পে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
বিশ্বখ্যাত নির্মাতা বিওয়াইডি, জিলি, এক্সপেনগ, এনআইও এবং শাওমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নতি বড় ভূমিকা রাখছে
একসময় বৈদ্যুতিক গাড়ির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল ব্যাটারির দাম এবং একবার চার্জে কম দূরত্ব চলতে পারা।
কিন্তু গত কয়েক বছরে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। নতুন প্রজন্মের ব্যাটারির মাধ্যমে অনেক বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন একবার চার্জেই ৪০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার কিংবা তারও বেশি পথ অতিক্রম করতে পারে।
একইসঙ্গে ব্যাটারির উৎপাদন ব্যয়ও ধীরে ধীরে কমছে, যার ফলে ইভির দামও তুলনামূলকভাবে কমে আসছে।
চার্জিং অবকাঠামো বাড়ছে
আগে চার্জিং স্টেশন কম থাকায় অনেকেই বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনতে আগ্রহী ছিলেন না।
বর্তমানে চীন, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুতগতিতে চার্জিং স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। অনেক এলাকায় ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটেই ব্যাটারির বড় অংশ চার্জ করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চার্জিং অবকাঠামোর উন্নয়ন ইভির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
শুধু ব্যক্তিগত গাড়ি নয়
বর্তমানে শুধু ব্যক্তিগত গাড়িই নয়; বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল এবং থ্রি-হুইলারও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বিশ্বের বিভিন্ন শহরে গণপরিবহনেও ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে, যাতে বায়ুদূষণ এবং জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।
বাংলাদেশের জন্য কতটা সম্ভাবনাময়
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ইতোমধ্যে দেশের সড়কে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারের ব্যবহার বেড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণের জন্য চার্জিং স্টেশন বৃদ্ধি, নীতিগত সহায়তা এবং কর কাঠামো আরও বাস্তবসম্মত করা প্রয়োজন।
এছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গএনইএফ’র মতে, আগামী বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি আরও দ্রুত বাড়বে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যাটারির দাম কমে আসা এবং পরিবেশবান্ধব নীতির কারণে অনেক দেশ ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর গাড়ির ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা করছে।
ফলে আগামী দশকে বৈদ্যুতিক গাড়ি শুধু বিকল্প নয়, বরং প্রধান পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা শুধু একটি নতুন প্রযুক্তির উত্থান নয়, এটি বিশ্বের পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ সুরক্ষা এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে ইভি এখন ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
বিশ্ব যখন দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র:
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ), গ্লোবাল ইভি আউটলুক ২০২৬
ব্লুমবার্গএনইএফ, ইলেকট্রিক ভেহিকল আউটলুক ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ), ট্রেন্ডস ইন ইলেকট্রিক কারস ২০২৬
/জেএ/আরকে/

ইভি বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ, নতুন আশায় বাঘ ইকো মোটরস







