X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

কর্মপরিকল্পনার অভাবে তৈরি হচ্ছে না তরুণ উদ্যোক্তা 

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২২:২৫

দেশের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশই তরুণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি এর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই তারুণ্যের পথের বাধা কাটছেই না। গবেষণা বলছে, সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাব, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা, অবহেলা, বৈষম্যমূলক নীতি, অপর্যাপ্ত গবেষণা, অপ্রতুল বরাদ্দ ও বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়হীনতাসহ নানা অব্যবস্থাপনাই প্রাণশক্তিতে ভরা দেশের তারুণদের প্রধান বাধা। এ অবস্থায় জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি শক্তিশালী জনশক্তি তৈরিতে সঠিক কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। 

সরকারের নেওয়া নানাবিধ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও এখনও অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি, দরিদ্রতা, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া, উগ্রধর্মীয়বাদ, রোহিঙ্গা সমস্যা, বেকারত্বসহ নানা প্রতিবন্ধকতা। যতই দিন যাচ্ছে ততই সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল দেশে যুব নীতিমালা প্রণয়ন করে গেজেট প্রকাশ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এতে যুবদের নানামুখী দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্র সৃষ্টিতে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি যুব উন্নয়নে সরকার কীভাবে কাজ করবে সে বিষয়েও বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নীতিমালা বাস্তবায়নে কোনও গতি নেই। 

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, যুবসমাজের উন্নয়ন এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষেই জাতীয় যুবনীতি তৈরি করা হয়। রাষ্ট্রকে অবশ্যই নাগরিকের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং তরুণদের উন্নয়নে বাজেটে আরও বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী দক্ষ জনবল নেই। দেশে যে জনশক্তি রয়েছে তাতে আশা দেখা যাচ্ছে না। কারণ শিল্প একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অন্যান্য শিল্পও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না। ফলে শিল্প নির্ভরতা বাড়তে থাকলেও সেখানে কর্মসংস্থানে অনেকটা স্থবিরতা বিরাজ করছে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা চাকরির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছেন। বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষা পাচ্ছেন, তাতে তারা চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম্পিউটার ও ইংরেজি ভাষায় আত্মবিশ্বাসী মাত্র ১৬ শতাংশ। এর জন্য দক্ষতার ঘাটতি যেমন রয়েছে ঠিক কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগও দায়ী।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু তারা আর্থিকসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন। ৩৬ শতাংশ শহরের তরুণ এবং ৪২ শতাংশ গ্রামের তরুণ কর্মসংস্থান কিংবা কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। যুবা নারীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ এবং যুবা পুরুষদের ৩৩ শতাংশ কোনও ধরনের আয়-উপার্জন করতে পারছেন না।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক জরিপে ৪৭ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অসমতা তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তরুণদের অর্ধেকের বেশি মনে করেন, তাদের স্বপ্ন আর প্রত্যাশা নিয়ে ভাবেন না দেশের নীতিনির্ধারকরা। নীতিনির্ধারকদের বৈষম্যমূলক এই নীতি নিয়েও তারা উৎকণ্ঠিত।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ বা দুই-তৃতীয়াংশই বেকার। ওই প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি পান। আর মাত্র ৩ শতাংশ নিজের উদ্যোগে কিছু করছেন। দুই বছর আগেও বিশ্বব্যাংক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর জরিপ করেছিল। তাতেও দেখা গেছে, স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থীদের ৪৬ শতাংশ বেকার, যারা তিন বছর ধরে চাকরি খুঁজছেন।

দেশে এখন তরুণ সমাজের খুবই দুঃসময় চলছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত উদ্যোগ ও কর্ম পরিকল্পনার অভাবে আমাদের তরুণরা শক্তিশালী জনশক্তিতে রূপান্তর হতে পারছে না। শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়লেও তাদের কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এতে অনেক শিক্ষিত তরুণ হতাশ হয়ে পড়ছে। অনেকেই দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। অনেক সময় আমরাও তাদেরকে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারছি না। সব মিলিয়ে তরুণ সমাজের খুবই দুঃসময় চলছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বাংলাদেশে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ওপরে আছে কেবল পাকিস্তান।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপেও দেখা যায়, দেশে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বেকারের হার বেশি। যেখানে ৪৭ শতাংশ শিক্ষিতই বেকার। অন্যদিকে প্রতিবছর দেশে শ্রমশক্তিতে যোগ হচ্ছেন ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু সে অনুপাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ফলে বড় একটি অংশ বেকার থেকে যাচ্ছেন।

সিডার কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার বিষয়ক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বেশি, তার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত কম। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় কর্মমুখী হতে পারছেন না তারা। এ ধরনের নানাবিধ সমস্যায় হতাশা থেকে দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তরুণরা। ফলে বৈধ বা অবৈধ যেকোনও উপায়ে তারা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

অথচ দেশের এই যুব সমাজকে নিয়ে বড় সম্ভাবনা দেখছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, বাংলাদেশ সেইসব ভাগ্যবান দেশের তালিকায় আছে যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম তরুণ রয়েছে। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে পারছে না। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য সরকারের যে পরিকল্পনা, তাতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি বছরের ১৩ জুন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ যৌথভাবে ‘তরুণদের প্রেক্ষাপটে বাজেট’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সরকারের ২২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যুব উন্নয়নে কাজ করে। চলতি (২০২১-২২) অর্থবছরের জন্য এই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তারমধ্যে সরাসরি তরুণদের কেন্দ্র করে মাত্র ১৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর ২৬ শতাংশ বরাদ্দ আংশিকভাবে তরুণদের জন্য দেওয়া হয়। বাকি ৬০ শতাংশ বরাদ্দ তরুণদের কাজে লাগে না। এক্ষেত্রে ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বরাদ্দে তরুণদের জন্য কোনও বরাদ্দ নেই।

যুবসমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ‘শুধু চাকরি নয়, কেউ যদি উদ্যোক্তা হতে চান তাতেও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তারা ব্যবসা করার পুঁজি কোথায় থেকে পাবেন সে বিষয়েও তথ্য জানেন না। তাছাড়া ব্যবসার প্রথম বাধাই হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স। এই সনদটির যে ফি ধরা হয়েছে তাতে ক্ষুব্ধ তরুণ উদ্যোক্তারা।

তরুণ উদ্যোক্তা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘পড়াশোনা শেষে চাকরি না পেয়ে অনেকেই ব্যবসা শুরু করতে চান। তখন পুঁজি থাকে সামান্য। কিন্তু শুরুতেই ট্রেড লাইসেন্স করতে হয়। এই ফি ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা করা হয়েছে। এর সঙ্গে আরও অন্যান্য ফিও রয়েছে। এতেই হোঁচটটা শুরু হয়। এরপর পদে পদে তো বাধা রয়েছে।’

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম মনে করেন, দেশে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে এই সমস্যাটির সমাধান করা সম্ভব। এজন্য প্রত্যেক যুবসমাজকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। যুবকদের আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, যুব সমাজের উন্নয়নে শুধু কর্মভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ না করে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যুবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং যুবদের অধিকার সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত। শুধু পরোক্ষভাবে পরামর্শ গ্রহণ প্রক্রিয়া নয়, যুবদের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এসডিজি জবাবদিহি প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত করতে হবে। সুনির্দিষ্ট এসডিজি সম্পর্কিত এবং যুবভিত্তিক কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

তরুণদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, সরকার গত তিন মেয়াদে ২ কোটি যুবকের চাকরি এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় তিন কোটি বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে কাজ করছে সরকার। এজন্য সারাদেশে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি চালু করা হবে। বেকার যুবকদের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ, ঋণ প্রদান ও আত্মনির্ভরশীল হিসেবে তৈরি করতে প্রতিটি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

আরও পড়ুন: সামাজিক কর্মকাণ্ড ও নেতৃত্বে আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণরা

/এনএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হুইল সাবানকে ডলার বলে বিক্রি
হুইল সাবানকে ডলার বলে বিক্রি
কোল পাওয়ার জেনারেশনে চাকরির সুযোগ
কোল পাওয়ার জেনারেশনে চাকরির সুযোগ
ঢাকাবাসীকে জ্যাম থেকে উদ্ধার করতে চান অনন্ত 
ঢাকাবাসীকে জ্যাম থেকে উদ্ধার করতে চান অনন্ত 
রিজেন্টের সাহেদের জামিন আবেদন হাইকোর্টে খারিজ
রিজেন্টের সাহেদের জামিন আবেদন হাইকোর্টে খারিজ
এ বিভাগের সর্বশেষ
বন্যার্তদের জন্য কনসার্ট
বন্যার্তদের জন্য কনসার্ট
ব্যাংককে অ্যাওয়ার্ড পেলেন সীমা হামিদ
ব্যাংককে অ্যাওয়ার্ড পেলেন সীমা হামিদ
বন্যার্তদের সহায়তায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
বন্যার্তদের সহায়তায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
এসডিজি ইয়ুথ সামিটের নিবন্ধন শুরু
এসডিজি ইয়ুথ সামিটের নিবন্ধন শুরু
যেখানে বিনামূল্যে ইফতার করেন হাজার মানুষ
যেখানে বিনামূল্যে ইফতার করেন হাজার মানুষ