কিশোর গ্যাং তৈরির কারণ কী?

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৭:৪২, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৯, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৭

Salek Uddinকিশোর অপরাধ নিয়ে আজকাল আলোচনা চলছে। উত্তরায় কিশোর আদনান হত্যার পর থেকেই এ বিষয়ে সবার টনক নড়েছে। ৬ জানুয়ারি নবম শ্রেণির ছাত্র কিশোর আদনান কবীর খুন হয়েছে উত্তরায়। ঘটনাস্থল তার বাড়ির পাশে, স্কুলের সামনে। মাঠের ভেতরে থাকা কমিউনিটি পুলিশ, আশপাশের মুদি দোকানদার, লন্ড্রি, চা-বিক্রেতা, আদনানের স্কুল থেকে দল বেঁধে বের হওয়া ছেলেমেয়েরা সবাই দেখলো এমন ঘটনা। এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে বের হয়ে এলো উত্তরায় কিশোর গ্যাং-এর কথা। সেখানকার ডিসকো গ্রুপ, নাইনস্টার গ্রুপের কথা। ডিসকো গ্রুপের হাতে নাইনস্টার গ্রুপের কিশোর আদনান নিহত হলো।
বের হয়ে আসলো উত্তরার এই দুটি কিশোর গ্যাং-এর মতো রাজধানীতে আরও কিশোর গ্যাং-এর হদিস। জানা গেলো কেবল উত্তরায় নয়, ধানমন্ডি ও গুলশানেও এ ধরনের বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এ ধরনের গ্যাং বা গ্রুপ। গ্রুপের নাম বিভিন্ন ‘হরর ফিল্ম’ ও ভিডিও গেমস থেকে নেয় তারা। স্কুল কলেজের কিছু ছাত্র আড্ডা দিতে দিতে গড়ে ওঠে ছোট ছোট গ্রুপ। একসঙ্গে ঘোরাঘুরি খাওয়া-দাওয়া খেলা আর আড্ডার মধ্যদিয়ে একসময় তারা সহিংস হয়ে ওঠে। ছোটখাটো সন্ত্রাস ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ পেছনে ফেলে এই কিশোররা ড্রাগ খুন ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে একসময়।
আদনান হত্যার সূত্র ধরে পত্রপত্রিকায় সম্প্রতি আর যে সব কিশোর অপরাধের পুরনো ঘটনা নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই-একটি হলো, বরিশালে দশম শ্রেণির ছাত্র ১৫ বছর বয়সী হৃদয় হত্যা। হৃদয়ের এক কিশোরী সহপাঠীকে প্রেম নিবেদন করে ১৭ বছরের আর এক কিশোর। কিন্তু ওই কিশোরীকে পছন্দ করে হৃদয়ের এক বন্ধু। তাই প্রেম নিবেদনকারী অন্য কিশোরকে বাধা দেয়  হৃদয়। এতে সৃষ্টি হয় বিরোধ। প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি। পরে ওই গ্রুপের কিশোরদের হাতে খুন হয় হৃদয় নামের ১৫ বছরের এক সম্ভাবনাময় কিশোর।
গত ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর তেজকুনি পাড়ায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হয় আব্দুল আজিজ নামের এক কিশোর। সে ছিল ওয়ার্কশপকর্মী। এলাকার কিশোরদের গ্রুপিং ও সিনিয়র জুনিয়র সমস্যার জের ধরে খুন হয় সে। এই গ্রুপিংয়ে যারা জড়িত, তারা তেজগাঁও ও কাওরান বাজারের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে কাজ করতো। হত্যাকারী আরেক কিশোর সায়মনের চাকুর আঘাতে মৃত্যু হয় আজিজের। তবে তারা দু’জনেই একই গ্রুপের ছিল। সমস্যা ছিল তারা একে অন্যকে মান্য করতো না। কে কার বড় ভাই—এ নিয়ে ছিল দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বের জের ধরেই ঘটলো এই হত্যাকাণ্ড।    
১৫ জানুয়ারি রূপনগরে এক স্কুল ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করে একদল কিশোর।
গেলো বছর ১৪ মে ভাসানটেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয় ১৪ বছরের এক কিশোরের কাছে।
১৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরে নতুন মডেলের মোটরসাইকেল না পেয়ে ১৭ বছরের কিশোর ছেলে তার বাবা ও মায়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। মা বেঁচে গেলেও বাবা মারা যান কিশোর ছেলের সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে। কিশোর অপরাধের বর্ণিত এই ঘটনাগুলো হলো তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়া কয়েকটি মাত্র।

শোনা যায় উত্তরার ডিসকো গ্রুপের হাতে নাইট স্টার গ্রুপের আদনান নিহতের পর ডিসকো গ্রুপের দাম বেড়েছে অনেক। এলাকার অনেক কিশোরই এখন ডিসকো গ্রুপে যোগ দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য আদনানের মৃত্যুতে নাইনস্টার গ্রুপের পরাজয় হয়েছে। তারা বিজয়ীর পক্ষে। তারা সদর্পে চলতে চায়। দিনভর আড্ডাবাজি করতে চায়। রাতে মোটরসাইকেল রেসে বের হতে চায়। তারা এলাকার দখলদারিত্ব চায়। আর এসবের মধ্যদিয়েই তারা ঢুকে পড়ে ছিনতাই ড্রাগ খুন ধর্ষণের মতো অপরাধে। আর হারায় চমৎকার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

এই অবস্থাটা এখন শুধু উত্তরা ধানমন্ডি গুলশানেই সীমাবদ্ধ নেই পুরো রাজধানী জুড়েই বিরাজমান। শুধু রাজধানী বললে ভুল হবে সারাদেশ জুড়েই চলছে এই অবস্থা।

দেশে কিশোর অপরাধ আগেও ছিল। তবে বর্তমানের মতো এমন হিংস্রতা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। গত অর্ধ যুগ ধরে কিশোর অপরাধ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এর ধরন পালটে গেছে। তাদের অপরাধগুলো ক্রমেই হিংস্র নৃশংস বিভীষিকাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খুন, ধর্ষণ ও ধর্ষণ করার পর হত্যা করার মতো হিংস্র ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে এবং বেড়েই চলছে। সংঘবদ্ধভাবে প্রকাশ্য দিনের আলোয় নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লক্ষ্যে এখনই এর লাগাম টেনে ধরা দরকার।

দেশে বিরজমান এখনকার কিশোর গ্রুপ কিশোর গ্যাং ও দ্রুতলয়ে বেড়ে যাওয়া কিশোর অপরাধ সম্পর্কে গুণীজনদের মূল্যবান অনেক কথাই পত্রপত্রিকায় আসছে। কেউ কেউ বলছেন, এতে ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রসারের প্রভাব রয়েছে। কেউ বলছেন, পারিবারিক বন্ধন শিথিল, মা-বাবার সঙ্গে কিশোর সন্তানদের দূরত্ব তৈরি এবং খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে শিশুদের মধ্যে নেতিবাচক প্রবণতা বাড়ছে, যা কিশোরদের ভ্রান্তপথে যাওয়ার একটি কারণ। অনেকের মতে, আমাদের সমাজে সন্ত্রাস ও খুন হরহামেশায় হচ্ছে এবং অর্থের বলে ও ক্ষমতার দাপটে সন্ত্রাসী ও খুনিরা বিচার ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমাজে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে। তাদের সামাজিক মর্যাদা আরও বাড়ছে। কিশোররা এসব দেখে ধরে নিচ্ছে সন্ত্রাস করে পার পেয়ে যাওয়া তাদের পক্ষেও সম্ভব। তারা হয়ে উঠছে বেপরোয়া। 

উত্তরার ডিসকো গ্রুপের হাতে নাইনস্টার গ্রুপের কিশোর আদনান নিহত হওয়ার পর  কিশোর গ্যাং,  কিশোর অপরাধ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় শোরগোল পড়ে যায়। এসময় বাংলা ট্রিবিউনসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা এ বিষয়ে সমাজ সংস্কারক, শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষকসহ বিভিন্ন গুণীজনের অভিমত তুলে ধরে। কিশোর অপরাধ নিয়ে তাদের মূল্যবান বক্তব্য নিম্নরূপ: 

অপরাধ বিশ্লেষক ড. জিয়া বলেছেন, কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েরা প্রভাবিত হয় সহজে। তাদের নতুন করে সবকিছু বুঝতে শেখার এই সময়টাতেই যদি ‘ক্ষমতা’ বিষয়টি তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তবে তারা সহিংসতাকেই হাতিয়ার মনে করে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ের কিশোররা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে এবং সেই সংস্কৃতি নিজেদের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই জায়গায় তারা ব্যর্থ হচ্ছে। যে সংস্কৃতি তারা গ্রহণ করতে চাচ্ছে সেটা পুরোপুরি নিতে পারছে না। অন্যদিকে যারা নিচ্ছে তারাও এটার সদ্ব্যবহার করতে পারছে না। যার ফলে সমাজে এর কু প্রভাব পড়ছে এবং কিশোর অপরাধ বাড়ছে।

সমাজসেবা অধিদফতরের জনৈক পরিচালক বললেন, অনেক মা-বাবা আছেন, তারা তাদের সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, ইন্টারনেটে কী দেখছে, সে সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। মনে করেন টাকা দিলেই সব শেষ। তাদের সন্তানদেরই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সমাজ কল্যাণ বিভাগের শিক্ষক শেখ তউহিদুল ইসলাম বলেন, অভিবাবকদের নিয়ন্ত্রণহীনতা, অর্থের সহজলভ্যতা, ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের অবাধ সুবিধা ইত্যাদি কিশোর অপরাধ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নুর খান মনে করেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, সমাজের প্রতিটা স্তরে নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় হচ্ছে। ফলে সমাজ থেকে শিশুরা যা দেখছে তাই শিখছে। সমাজে সর্বস্তরে অপরাধ বাড়ছে তাই কিশোর অপরাধও বাড়ছে।   

কিশোর গ্যাং কিশোর গ্রুপ সর্বোপরি কিশোর অপরাধ সম্পর্কে গুণীজনরা যা বললেন তার সারাংশ হলো, পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, পারিবারিক অনুশাসনহীনতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অংশগ্রহণহীনতা, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্টতা ও তা অনুকরণ এবং অপব্যবহার, সর্বোপরি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এর হাত থেকে বাঁচার উপায় কী? বাংলাদেশে দু’টি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। একটি গাজিপুরের টঙ্গিতে অন্যটি যশোরে। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী ৯ থেকে অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের কোন শিশু অপরাধে জড়ালে তাদের সাধারণ কারাগারে না পাঠিয়ে বড়দের মতো শাস্তি না দিয়ে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয় এবং তাদের মানসিকভাবে শোধন করার ব্যবস্থা করা হয়।

এই শোধন প্রক্রিয়াই কি দেশের কিশোর গ্যাং অপরাধ নিধন করতে পারবে? সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ। তবে কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে? না, এর লাগাম টেনে ধরার জন্যে যা যা প্রয়োজন এখনই তাই তাই করতে হবে। প্রথমত এখনই সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। দ্বিতীয়ত কেন কিশোর গ্রুপ কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হচ্ছে এবং কেন আমাদের কিশোরদের মধ্যে ড্রাগ আসক্তি-খুন-ধর্ষণের মতো হিংস্র ও বিকৃত অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে, তার কারণ উদ্ঘাতন করতে হবে। এর জন্য দরকার অনেক বড় পরিসরে গবেষণা। আর সেই গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। সরকারিভাবে অগ্রধিকারভিত্তিতে এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।

সবশেষে যে কথাটি বলতে চাই, তা হলো, জন প্রতিনিধিরা যদি এগিয়ে আসেন, তাদের নিজ নিজ এলাকায় কিশোর গ্যাং অপরাধ বন্ধ করবেন এবং কিশোরদের কল্যাণকর কাজে উদ্বুদ্ধ করবেন, তাহলে এই সমস্যার সমাধান খুব সহজ হয়ে যায়। এর জন্য সমাজ সংস্কারক ও সরকারকে এগিয়ে আসা  প্রয়োজন।          

লেখক: কথাসাহিত্যিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ