‘তুই ধর্ষক, তুই অপরাধী, লজ্জা তোর’

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৪:৩১, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৭

প্রভাষ আমিনসংগ্রামী বোন রুপা খাতুনের নির্মম ধর্ষণ ও হত্যার বেদনা নিয়ে ঈদের ছুটিতে গেছে দেশ। কিন্তু সেই বেদনার রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আরও ধর্ষণের খবর বেদনা আরও বাড়িয়েছে শুধু। গাইবান্ধার সিনথিয়া একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। নতুন পোশাক কিনে ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছিল শিশুটি। কিন্তু ঈদের আগের দিন ধর্ষণের পর হত্যা করে একটি পুকুরে কচুরিপানার নিচে তার মরদেহ লুকিয়ে রাখে ধর্ষকরা। এমনকি ধর্ষণের মহামারী বন্ধ ছিল না ঈদের দিনেও। পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাকে দেখে ঈদের দিন ভোরে ভাড়ার মোটর সাইকেলে বাড়ি ফিরছিল এক তরুণী। ৫ পশু তাকে বহনকারী মোটর সাইকেল আটকে পরিত্যক্ত ভিটায় নিয়ে ধর্ষণ করে। রূপালী বা সিনথিয়া বা পটুয়াখালির তরুণী নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই কেউ না কেউ ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। পত্র-পত্রিকা খুললেই ধর্ষণের খবর। পশুদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিশু, নারী, তরুণী, শিক্ষক, এমনকি পুলিশ সদস্যও। ধর্ষণের যত খবর পত্রিকায় আসে, তারচেয়ে অনেক বেশি থেকে যায় আড়ালে।
রুপা বা সিনথিয়া তবু মরে বেঁচে গেছে। যারা ধর্ষিত হওয়ার পর বেঁচে গেছেন, তারাই আসলে মরে গেছে। বেঁচে যাওয়ার পর এখন তাকে প্রতিদিন মানসিকভাবে ধর্ষিত হতে হবে। এই ভয়ে অনেকেই ধর্ষণের খবরটি চেপে যান। নিজে নিজেই দগ্ধ হন গ্লানিতে। সইতে না পেরে কেউ কেউ আত্মহত্যাও করে। যারা সাহস করে বিচার চাইতে যায়, তাদের আসল গ্লানিটা শুরু হয় তখন। প্রথমে হাসপাতালে ধর্ষণের প্রমাণ দিতে হয়, তারপর পুলিশের কাছে ধর্ষণের খুটিনাটি বিবরণ দিতে হয়। অভিযোগ যদি আদালত পর্যন্ত যায়, তাহলে প্রকাশ্য আদালতে আইনজীবীর অশ্লীল জিজ্ঞাসাবাদে বারবার ধর্ষিত হতে হয়। এই দীর্ঘ দুর্ভোগ সইবার মতো মানসিক শক্তি সবার থাকে না। আমাদের আইনটাই এমন ধর্ষকের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। চেষ্টা করা হয় ধর্ষিতাকে নষ্টা, চরিত্রহীনা প্রমাণের। আর এটা প্রমাণ করতে পারলেই যেন জায়েজ হয়ে যায় ধর্ষণ। কিন্তু মেয়েটি যৌনকর্মী হলেও, এমনকি আপনার বিয়ে করা স্ত্রী হলেও ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা যাবে না। ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে কোনও সম্পর্ক অপরাধ। কিন্তু আমাদের দেশে যেই পশুটা ধর্ষণ করে, তার পক্ষে হাজার যুক্তি- বয়সের দোষ, পোলাপান একটু-আধটু এমন করেই, মেয়েটা কেন অত রাতে অমন পোষাকে বাইরে এলো, মেয়েটা কেন হেসে কথা বললো, মেয়েটা কেন ফিরে তাকালো। খলের কখনও ছলের অভাব হয় না। নেকড়ে ভেড়াটাকে খাবে। ব্যস, এর জন্য যুক্তির অভাব হবে না। এই সমাজে ধর্ষকরা গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর ধর্ষিতার জন্য এই পৃথিবীটা হয়ে যায় নরকসময়। অবিবাহিত হলে তার আর বিয়ে হবে না। বিবাহিত হলে সংসার ভেঙে যাবে। এই মেয়েগুলোকে একটু সুরক্ষা দেওয়ার আশায় আমরা তাদের নাম প্রকাশ করি না, ছবি দেখাই না। কিন্তু তাতে কাজ হয় সামান্যই। এলাকার সবাই চিনে ফেলে তাকে। মেয়েটি হেঁটে গেলে হাজার পুরুষের চোখ তাকে বারবার ধর্ষণ করে। নিজেরা নিজেরা মেয়েটিকে দেখিয়ে দেখিয়ে রসালো আলাপ করে। দেশে এমন হাজার ধর্ষিতার এই দুর্বিষহ জীবনের কতটুকু খবর আমরা রাখি? কিন্তু ধর্ষিতাকে দেখে দেখে আনন্দ নেয় যে পুরুষ, সে কি ভাবে না, তার বোন বা কন্যাও একদিন এই পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

কদিন আগে বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিতে এক সাহসী নারীর দেখা পেয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। পূর্ণিমা নামে এই বোনটি ধর্ষিত হয়েছিল। সে ধর্ষণের পর তার দুঃসহ জীবনের বর্ণনা দিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, যারা ধর্ষণ করেছে লজ্জাটা তো তাদের, আমাদের লজ্জা হবে কেন? তার প্রশ্ন শুনে লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে যায়। এই প্রশ্নের উত্তর পেলেই ধর্ষণের আমল কারণটা জানা যাবে। পুরুষ যে সবসময় জৈবিক কামনা চরিতার্থ করতে ধর্ষণ করে তা কিন্তু নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণ করা হয়, প্রতিশোধ নিতে। ধর্ষণ করার পর ধর্ষকদের মনোভাব থাকে এমন, তোর অনেক দেমাগ হয়েছিল। এবার যা তোর দেমাগ ভেঙে দিলাম। তোকে নষ্ট করে দিলাম। ধর্ষণ আসলে পুরুষের মানসিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অক্ষম চেষ্টা। ধর্ষকরা যেন জোর গলায় বলতে চায়, দেখো আমি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমি তোমাকে নষ্ট করে দিলাম। সমাজের এই ভাবনাটা যদি আমরা পাল্টে দিতে পারি, তাহলে শুধু বদলাতে পারে পরিস্থিতি। অপরাধ করেছে ধর্ষক। তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে, সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। আর সহানুভূতি নিয়ে ধর্ষিতার পাশে দাঁড়াতে হবে।

আরেকটা খুব নোংরা ব্যাপার ঘটে আমাদের দেশে। ধর্ষণের সবচেয়ে ন্যায়বিচার হলো, ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে। আমি অনেকবার এই কুৎসিৎতম অবিচারের বিরুদ্ধে লিখেছি। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তখন ধর্ষক বেছে নেয় অব্যর্থ অস্ত্র। যার থাকার কথা কারাগারে সে যায় বাসর ঘরে। আর ধর্ষিতাকে জেনেশুনে সারাজীবন একটা ধর্ষকের সঙ্গে সংসার করতে বাধ্য করা হয়। এই অবিচার চলতে থাকলে ধর্ষকরা একজন সুন্দরী মেয়েকে টার্গেট করবে। তারপর সুযোগ বুঝে তাকে ধর্ষণ করবে এবং বুক ফুলিয়ে বিয়ে করবে।

হঠাৎ করে দেশে ধর্ষণ বেড়ে গেলো কেন? ভাদ্র মাসে কিছু মানুষও কুকুর হয়ে যায় বলে? আসলে ধর্ষকের কোনও মাস নেই, সময় নেই। আমাদের চারপাশেই ঘুরে বেড়ায় অসংখ্য ধর্ষক, খালি সুযোগের অপেক্ষায়।

আমাদের এই সব ভালো ভালো কথায় কি ধর্ষণ বন্ধ হবে বা কমবে? মনে হয় না। কারণ অনেক ধর্ষক টিভি দেখে না, পত্রিকা পড়ে না। তাই এই সু্বচনে কাজ হবে না। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। আর দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ। কিন্তু বাংলাদেশে আইন ধর্ষিতার পক্ষে নয়, ধর্ষকের পক্ষে। ধর্ষণের পর একটি মেয়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো অনেকক্ষণ ধরে গোসল করা। এভাবে মেয়েটি নিজের গা থেকে ধর্ষণের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চায়। তারপর থানায় গেলেও প্রমাণ থাকে না। অনেকে থানায় যাবেন কী যাবেন না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পার করে ফেলেন মূল্যবান সময়। বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ঘটনা নিয়ে সারাদেশে তোলপাড়। সেই মামলাও কিন্তু হয়েছে চারমাস পর। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, অধিকাংশ ধর্ষণের কোনও সাক্ষী থাকে না। তাই ধর্ষিতার পক্ষে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়। চলন্ত বাসে রুপার ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে যখন সারাদেশে তোলপাড়, তখনই পত্রিকায় খবর আসে, টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে পোশাকশ্রমিককে ধর্ষণের ১৬ মাস পরও অভিযোগ গঠন হয়নি। কিন্তু জামিন পেয়ে গেছে এক আসামী। রুপার ঘটনার ১৬ মাস পরও হয়তো আমরা একই ধরনের নিউজ করবো। তনু হত্যার বিচার হয়নি, হবেও না। এভাবে দিনের পর দিন বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে যাবে, আর আমাদের বোনেরা, কন্যারা ধর্ষিত হবে। পরকালের ভয় দেখিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। ধর্ষণের বিচারের জন্য সাক্ষ্য আইন বদলাতে হবে, দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ‘বয়সের দোষ’ বলে অপরাধ হালকা না করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সংক্ষিপ্ততম সময়ে ধর্ষকের ফাঁসি দিতে পারলেই কেবল বন্ধ হবে ধর্ষণ।

ধর্ষণকে আড়াল না করে, সামাজিকভাবে সমঝোতা না করে, ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ের ব্যবস্থা না করে; ধর্ষককে আইনের আওতায় আনতে হবে। ধর্ষকের পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। ধর্ষিতাদের আইনের কাছে যেতে হবে। পূর্ণিমার মতো সবাইকে জোর গলায় বলতে হবে, লজ্জা আমার নয়। আমি মাথা উচু করে রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটবো। তুই ধর্ষক, তুই অপরাধী, লজ্জা তোর।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

probhash2000@gmail.com

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ