ধর্ষণমুক্ত সমাজের অপেক্ষায়

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:১৮, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৭

সালেক উদ্দিনআজকাল পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে খুন নির্যাতন আর ধর্ষণের খবর। মনে হয় এমন ঘটনা ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। শুধু এই আগস্ট মাসের গত কুড়ি দিনে একটি দিনও আসেনি যে দিন কমপক্ষে দুটি ধর্ষণের খবর ছাপা হয়নি। বনানীর হোটেলে আপন জুয়েলার্সের মালিকের পুত্র কর্তৃক বহুল আলোচিত ছাত্রী ধর্ষণ ও পিতাপুত্রের নির্লজ্জ দম্ভ এবং বগুড়ার শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার কর্তৃক বাড়ি থেকে ক্যাডার দিয়ে তুলে নিয়ে ছাত্রী ধর্ষণ ও পরে দলীয় ক্যাডার ও এক নারী কাউন্সিলরকে দিয়ে ধর্ষণের শিকার কিশোরী ও তার মাকে চার ঘণ্টা ধরে নির্যাতনের পর দুজনেরই মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনা দেশের সর্বস্তরের মানুষকে বিস্মিত করে ফেলে।
এ দুটি ঘটনাই অর্থ ও ক্ষমতার দম্ভের কাছে মানবিকতার করুন পরাজয়ের স্বাক্ষর বহন করে। তাই যদি না হবে তবে এ দুজনকেই জনতার দাবির মুখে জেলখানায় যেতে হলেও সেখানে এরা রাজকীয় জীবন-যাপন করে কিভাবে? বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি সংবাদে দেখলাম নেশাখোর ধর্ষক তুফান সরকারকে জেলখানাতেই নিয়মিত ফেন্সিডিল সরবরাহ করা হচ্ছে। কেস তুলে নেওয়ার প্রচেষ্টায় ধর্ষিতাকে পুলিশ হেফাজতে জেলখানায় তুফানের কাছে আনা হয়েছিল। অবশ্য এসব খবর পত্রিকায় প্রচারিত হলে তুফানকে বগুড়া কারাগার থেকে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে নিয়ে আসা হয়।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে উত্ত্যক্ত করার বিচার দেওয়ায় কয়েকজন বখাটে এক কলেজছাত্রীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করার ঘটনা ঘটে। পরে গত ১৮ আগস্ট পুলিশ ধর্ষককে গ্রেফতার করে।

১৯ আগস্ট রাতে স্বামীকে আটকে রেখে নববধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ছাত্রলীগ সভাপতি সুমন হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে। নববধূর স্বামী অভিযোগ করেন, সুমন তার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় তাকে এবং তার ফুপুকে আটকে রেখে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে সুমন। এই ঘটনায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি সুমনকে বহিস্কার করেছে।

এই সময়ের মধ্যেই আরও যে সব ধর্ষণ সংবাদ পত্রিকায় আসে তার মধ্যে দু একটি এমন, ধর্ষণের কারণে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় শরীয়তপুরে দশম শ্রেণির ১৬ বছরের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। টাঙ্গাইলে ১৭ বছরের তরুণীকে সাত মাস নির্জন ঘরে আটকে রেখে ধর্ষণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীতে ধর্ষণের শিকার হয়ে ২০ বছরের বাক্প্রতিবন্ধী তরুণী অন্তঃসত্ত্বা। রাজশাহীতে দুই ‘ফেসবুক বন্ধুর’ হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্রী। এ ছাড়াও ঘটেছে গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে আসার পথে চলন্ত ট্রাকে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে গণধর্ষণ। রাজধানীর বাড্ডায় খাবারের লোভ দেখিয়ে ডেকে নিয়ে ৩ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা। ঢাকার শনির আখড়ায় টিভি উপস্থাপিকা ধর্ষণ। পল্লবীর স্কুলে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ। সাভারে বাউল শিল্পীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ। উত্তরখানে নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ। যশোরে অন্তঃসত্ত্বা তরুণীকে গণধর্ষণ-যুবলীগ নেতাসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা।

সর্বশেষ এই লেখাটির যখন এই পর্যন্ত লেখেছি তখন ২১ আগস্টের পত্রিকায় দেখলাম ধর্ষণের আর একটি খবর। সেটা হলো, রাজধানীতে পুরুষ পুলিশ কর্তৃক মহিলা পুলিশ ধর্ষণ এবং ধর্ষক গ্রেফতার। অর্থাৎ কোনও স্তরই আর বাকি রইল না।

এসব তো গেলো পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা। এর বাইরেও প্রতিনিয়ত ঘটছে এ ধরনের অনেক ঘটনা। বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী  প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

এই তথ্য থেকে বলতে আর দ্বিধা নেই, চরম সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে চলছে স্বদেশ। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলেই সমাজে এত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এখন ক্ষমতাধরদের কাছে অর্থশালীদের কাছে ধর্ষণের মতো অপরাধ অপরাধই মনে হয় না। কারণ তারা জানে ক্ষমতার কারণেই হোক অথবা অর্থের জোরেই হোক সমাজ তাদের শাস্তি দিতে পারে না। এই দুইয়ের যে কোনও একটির মহিমাবলে এ থেকে তারা বের হয়ে আসবেই। কারণ চোখের সামনে তারা এটাই দেখে আসছে। তাইতো ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা ধরাকে শরা জ্ঞ্যান না করে নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো অপকর্ম অবলীলায় করে বেড়াতে পারে। অর্থশালী আপন জুয়েলার্সের মালিক তার ছেলের ধর্ষণ কর্মের সাফাই গাইতে নির্লজ্জের মতো বলতে পারেন, এ আর এমন কী! বড়লোকের ছেলে এ তো করতেই পারে, আমিওতো করি।

ধর্ষকের পার পেয়ে যাওয়ার আর একটি কারণ হলো, বিচার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায় এবং ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে অশালীন জেরা। এই জেরায় তার চরিত্র নিয়ে এমন সব কথা বলা হয় যে একজন নারী আদালতে যাওয়ার ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলে। আদালত তার কাছে দ্বিতীয় দফা ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর ব্যাপার মনে হয়। সে তখন আর বিচার চায় না। এই পীড়াদায়ক বিষয় থেকে মুক্তি চায়। এরপরও যারা বিচারের আশায় টিকে থাকে তাদের জন্য রয়েছে আরো কঠিন পরীক্ষা। বিচার নিষ্পত্তির জন্য দেড় থেকে দুই যুগ বা তার বেশি অপেক্ষার পালা।এসব কারণেই এদেশে ধর্ষকদের সাজা হয় না। ক্ষমতার দাপটেই হোক বা অর্থের জোরেই হোক অথবা অন্য যে কোনও কারণেই হোক সমাজে নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো ঘৃণিত ঘটনা প্রতি নিয়ত ঘটছে।

এই অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। এখনই সময় সমাজের খুন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। আগামীকাল থেকে যেন আর একটি নারী বা শিশু ধর্ষিত না হয় সে জন্যে সরকার ও সমাজ সংস্কারকদের দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে।

এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ। দেশে আইনের শাসন নেই বলেই সরকারি দলের কর্মীরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। পুলিশ হয়ে পুলিশকে ধর্ষণ করতে পারে।

শুধু আইনের শাসন নিশ্চিতই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রয়েছে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ মামলার বিচার করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূ্লক শাস্তি দেওয়া। সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার ৪ উপধারা যার বলে ধর্ষিতার ধর্ষণ পূর্ব চরিত্র নিয়ে প্রতিপক্ষ উকিল অশালীন জেরা করতে পারে তার লাগাম টেনে ধরা।

সবশেষে যে কথা বলতে হয় তাহলো আমাদের দেশে ধর্ষণের শিকার অনেক নারী আত্মহত্যা করে। তার প্রধানতম কারণ হলো, দেশের পশ্চাৎপদ সমাজ ব্যবস্থার কারণে ধর্ষণ হওয়ার নারীকে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখে। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে এরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অথচ ধর্ষক বুক ফুলিয়ে হাঁটে। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। আমাদের এমন একটি সমাজের দিকে এগুতে হবে যেন অপমান সহ্য করতে না পেরে ধর্ষক আত্মহত্যা করে, ধর্ষিতা নয়। এর জন্য নিরাপরাধী ধর্ষিতা নারীর চারপাশে সংহতি ও সমর্থনের দেয়াল নির্মাণ করতে হবে। যে দেয়াল ভেঙে কোনোদিন তার গায়ে ঘৃণা বা অপবাদের শেল লাগতে না পারে। এই সংহতি ও সমর্থনের কাজ শুরু করতে হবে পরিবার থেকে যা এক সময় পুরো সমাজেই বিস্তৃতি লাভ করবে।

মানুষ খুন, গুম, নির্যাতন ও ধর্ষণমুক্ত সমাজ চায়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ