একুশের বইমেলা, কেন আঞ্চলিক?

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৪:২১, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৪, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

দাউদ হায়দারগত শতকের ষাট দশকের গোড়ায় রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক আত্মীয়ের বাড়িতে অতিথি, দিব্যি আছি। আদর-যত্নের কমতি নাই। বাড়ির কর্তা জোতদার, অন্তত তিনশ’ বিঘা জমির মালিক। তার আস্তানায় তথা কাচারি ঘরে, নানা কিসিমের মানুষের আনাগোনা। সকাল-দুপুর-বিকাল-সন্ধ্যায়। কেউ ভাগ চাষী, কেউ বর্গাদার, কেউ ধান-চাল-ডাল-মরিচ ক্রেতা বা বিক্রেতা। কেউ চাল-ডাল-গমের আড়তদার।
এক বিকেল, কোনও একটা বিষয় নিয়ে ‘কাজিয়া’ হচ্ছে। দুই দলে বিভক্ত। মুরুব্বি (বাড়ির মালিক/জমির মালিক) কান পেতে দুই পক্ষের কথা শুনছেন। কে একজন বর্গাচাষী, মধ্যবয়স্ক, ছোটখাটো পাতলা চেহারা, রুখু দাড়ি, মাথায় কালো টুপি, মুখ কুাঁচুমাচু করে, ভারী কণ্ঠে বললেন, ‘বুলল্যে পরে ব্যুলবেন যে ব্যুলছে’।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভাষা অজানা, জিজ্ঞেস করি আত্মীয়কে, ‘এই কথার মানে এবং শানে নযুল কী’।

বলেন, ‘বক্তা এই সভায় হয়ত কুলীন নন, নিজেকে সমগোত্রীয় ভাবছেন না, ছোটই ভাবছেন, তাই, প্রত্যেকের সামনে বলছেন, ‘ছোট মুখে বড় কথা বলছি, তাও আবার মুরুব্বির সামনে।’ ওই বলা কথার মানে এই।’ এই ভাষা কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জেরই নয়, নওগাঁ, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের সালার, সাহেবগঞ্জসহ আরো কিছু অঞ্চলে, মালদহের কিছু অঞ্চলেও।

দেশ ভাগের আগে রাজশাহী-মুর্শিদাবাদের-মালদহ গৌড়ীয়-অঞ্চল, একই ভাষাভাষী, প্রায় একই বুলি। স্থান-বিশেষ উচ্চারণ ভিন্ন কিছুটা। যেমন, বৃহত্তম ময়মনসিংহে। চট্টগ্রামে। সিলেটে। নোয়াখালি। কুমিল্লায়। এমন কী পাবনায়। ঢাকায়।

এক সময়, তাও গত শতকের ষাটের দশকে, মধ্যশুরুতে, পুরনো ঢাকায় বাস ছিল, খোদ কুট্টি মহল্লায়। ঢাকাইয়া কুট্টিরা কোনও গুরুগম্ভীর কথা-বলা বা আলোচনার আগে খিস্তি না করে জিভ-ঠোঁট ভেজান না (স্বাধীনতার পরে এই অভ্যাস এখনও আছে কিনা, অজানা)।

পুরনো ঢাকা চার ভাগে ভিভক্ত। কুট্টিরাও। চার ভাগে একই শব্দ-কথন-উচ্চারণে ভিন্নতা।

পাবনাতেও। পাবনা শহরেও। এমনকি আমাদের দোহারপাড়ায়। পাড়ার পুবের লোকের কথা, ‘মাথা চুলকায়ে’ পশ্চিমের ‘মাথা খামচায়ে’। ‘চুলকানো’ এবং ‘খামচানোর’ মধ্যে অর্থগত ফারাক যাই থাক, একই কথা বলতে চায়। একই মানে। হেরফের কেবল বচনে।

পাবনার দোহারপাড়ায় জোয়ান-বুড়োর মুখে বহুবার শুনেছি, ‘কতাডা এখন কোলেম (বললাম) নিরালায় ভাইবো। ভাবনার গিট্টি খুলে যাবিনি। যা কোলেম লিবের পারো আবার  না-ও লিবের পারো। সে তুমার ব্যাপার। নিজের বুদ্ধিরে হাটবাজারে চালান দিয়া ব্যবসা করতি হয়। বুদ্ধি খরচে লুকসান (লোকসান) নেই। আখেরে বরং লাভ’।

এই লেখায় দুটি প্রসঙ্গ টেনেছি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এবং পাবনার দোহারপাড়ার। প্রসঙ্গ দুটি প্রতীকী। সারাংশ অভিন্ন। তো মদ্দা কোথায় আসি।

বাংলাদেশের বইমেলার বয়স তো বেশি নয়, যথেষ্ট সাবালকও নয়, বিশ্বের নানাদেশের বইমেলার বয়সের পরিপক্কতায়। কিন্তু বাংলাদেশ অন্যদিক থেকে অনন্য।

পৃথিবীর কোনও দেশেই মাসব্যাপী বইমেলা হয় না। বড়োজোর পাঁচ বা সাতদিন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা ফ্রাঙ্কফ্রুর্ট। পাঁচদিন ব্যাপী (মূলত চারদিন)। কায়রো সাত দিন। ব্যতিক্রম ‘কলকাতা পুস্তক মেলা’ দশ দিন।

বাংলাদেশে বইমেলা গোটা ফেব্রুয়ারি জুড়ে, ভাষার মাসে। কোনও দেশই ভাষা সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনে যুদ্ধ করেনি। স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়নি।

একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি শিকড়। এই ভিত্তি শিকড়েই বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্য-সংস্কৃতিরও। ভুলছিনা আবহমান বাংলার আদি সংস্কৃতির রুপ, ঐতিহ্য।

ভিত্তি শিকড়ের অন্যতম বইমেলা। মাসজুড়ে ‘প্রাণের বইমেলা’।

যেহেতু ‘প্রাণের’, জাতীয় উৎসবও। অসাম্প্রদায়িক।

একুশে ফেব্রুয়ারি আর ‘শোক দিবস’ নয়।

মনে রাখি, একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভাষা সাহিত্যের নতুন পরিচয় দিয়েছে, নতুন ভাবনাচিন্তা তৈরি করেছে, নতুনত্বে পশিমবঙ্গের ভাষা সাহিত্য থেকে আলাদা।

একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভাষা সাহিত্যের নতুন ধারা সৃষ্টিকারী। এত স্মরণীয়, বাংলাদেশের নিজস্ব ভাষা-সাহিত্যে যুগসূচনা বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। পঞ্চাশের নামী কবি-সাহিত্যিক এমন কী বিপ্লবী, রাজনীতিকের প্রকাশ, আত্মপরিচয়।

ভাষার মাসে, প্রতি বছরই নতুন লেখকের অভ্যুদয়, গোটা বাংলাদেশে। শত শত বই প্রকাশিত। শহরে-গঞ্জে। জেলায়, উপজেলায়। কিন্তু প্রদর্শনীর জায়গা একটি। ঢাকার বইমেলা। সীমাবদ্ধ ঢাকায়, তাও আবার বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে, আয়োজনে। নির্ধারিত চৌহদ্দিতে।

ঢাকা ছাড়া কি বাংলাদেশের অন্য জেলার অঞ্চলের পাঠক বই কেনে না, পড়ে না? বই মেলার আমেজ আস্বাদ পেতে চায় না? নিশ্চয় চায়। কিন্তু গোঁফে তা দেবে কে? জেলায়-উপজেলায়?

দায় কেবল বাংলা একাডেমির নয়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের (যদিও সরকারি এবং অতিশয় ফালতু), পুস্তক প্রকাশ সমিতি, পুস্তক বিক্রেতা সমিতি। দুই সমিতির দায়িত্ব বিস্তর।

ফেব্রুয়ারি মাসে, বইমেলার মাসে, ঢাকাতেই নয় শুধু, শহর জেলা-উপজেলায় পুস্তক প্রকাশক সমিতি, পুস্তক বিক্রেতা সমিতি বইমেলা করতে পারে, মাসব্যাপী না হোক সপ্তাহব্যাপী, ছোট আকারে। বইয়ের বিক্রি বাড়বে। পাঠক উৎসাহিত হবে। মেলার স্বাদ-গন্ধ-আস্বাদ পাবে।

প্রশ্ন উঠবে আর্থিক খরচ। লোকবল। আর্থিক সুরাহা হলে লোকবল আদৌ সমস্যা নয়। আর্থিক সহায়তার জন্যে সরকারকে সাংস্কৃতিক দফতরকে চাপ দেওয়া আবশ্যক, সরকার বাধ্য হবেন। সরকার চান ঘরে-ঘরে বই পৌঁছে দিতে। সরকারের দায়ও আছে। কেবল, উদ্যোগী হওয়া। উদ্যোগ নিতে পারে বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, পুস্তক প্রকাশক সমিতি, পুস্তক বিক্রেতা সমিতি।

‘বুলল্যে পরে ব্যুলবেন যে ব্যুলছি’, ছোট মুখে বড় কথা বলছি। ‘কতাডা কোলেম, লিবেন না লিবেন আপনের ব্যাপার’।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ