ভারতীয় লোকসভা নির্বাচন, কী আছে মোদির ভাগ্যে?

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৫৮, মার্চ ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০০, মার্চ ১৪, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান আগে এক ও অভিন্ন ছিল। এখনও তিন দেশের মানুষ পরস্পর সম্পর্কে জানতে বুঝতে কম উৎসাহী নন। কোনও দেশে নির্বাচন হলে অন্য দু’দেশের মানুষ নিজ দেশের নির্বাচনের মতো খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেন। পাকিস্তানে নির্বাচন হয়ে গেছে, এখন তেহেরিক-ই ইনসাফ প্রধান ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী। গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে নির্বাচনও হয়েছে, পুনরায় আওয়ামী লীগ জিতেছে এবং শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন এখনও হয়নি।
গত ১২ মার্চ ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার লোকসভা নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছেন। ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ছয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর ২৩ মে ফলাফল একসঙ্গে ঘোষণা করা হবে। ষষ্টদশ লোকসভার মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে আগামী ২ জুন। তার মধ্যেই নতুন সরকার গঠিত হতে হবে। সপ্তদশ লোকসভায় ভোটার সংখ্যা ৯০ কোটি। এরমধ্যে নতুন ভোটার ৮ কোটি। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স দৃশ্যত বিদ্যমান। এনডিএ’র নরেন্দ্র মোদিই নেতা এবং তিনিই তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স-এর প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হচ্ছেন রাহুল গান্ধী। অবশ্য তারা ঘোষণা দিয়েছে, নির্বাচনের পরে প্রয়োজনে কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতে আপত্তি করবে না।

এরই মধ্যে জনমত জরিপের কিছু কাজ হয়েছে। তাতে এনডিএ এগিয়ে আছে। পাকিস্তানের বালাকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-এর পর নাকি নরেন্দ্র মোদির জনসমর্থন বেড়েছে। জরিপের ফলাফলে বলেছিলো বিজেপি আগের চেয়ে ১০০ আসন কম পাবে। সরকার গঠনের জন্য ২৭২ আসন প্রয়োজন। এখন নাকি নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তারা নাকি ৪১% ভোট পেতে পারে, তাতে এনডিএ’র আসন সংখ্যা হবে ২৬৪টি। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স নাকি ৩১% ভোট পেয়ে ১৪১টি আসন পাবে। তাতে দেখা যাচ্ছে সরকার গঠনের জন্য উভয় জোটকে আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে।

তৃতীয় বিশ্বে জনমত জরিপ সুষ্ঠু ও সঠিক হয় না। উন্নত বিশ্বেও জনমত জরিপ সঠিক তা বলি কীভাবে। গতবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনমত জরিপে হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে ছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। আমি বাংলাদেশে বসে আমেরিকার অবস্থা যা উপলব্ধি করেছি তাতে বাংলা ট্রিবিউনে আমার নিয়মিত লেখায় এবং টকশোতে বারবার বলেছিলাম ট্রাম্পের জেতার সম্ভাবনা বেশি। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর ৭১ টেলিভিশন আমার একটি সাক্ষাৎকারও প্রচার করেছিলো– কী করে, কী পরিপ্রক্ষিতে ট্রাম্প নির্বাচিত হবে কথাটা বারবার বলেছিলাম তা জানতে।

আমাদের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এক টকশোর বিরতিতে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যেখানে গোটা বিশ্ব হিলারির জেতার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল সেখানে আমি কেন ট্রাম্পের জেতার কথা একরোখাভাবে বলেছিলাম। যাক, আমি বয়স্ক মানুষ। অবসরে আছি, শুধু লেখালেখি করি। সুতরাং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার আমার যথেষ্ট অবকাশ আছে এবং আমি গভীর মনোনিবেশ করে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করি।

ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন নিয়েও আমার যে পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে, তাতে আমার ইনটিউশন বলছে নরেন্দ্র মোদি সম্পূর্ণ ব্যর্থ সরকার। ২০১৪ সালে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে জনসাধারণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটে জিতে এসেছিলেন তার কিছুই পূরণ করতে পারেননি তিনি। ব্যর্থতার তো পুরস্কার হয় না। বালাকোটের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক তো পাকিস্তানের পাল্টা স্ট্রাইকে ম্লান হয়ে গেছে।

নরেন্দ্র মোদি ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় ভোটারদের কাছে নতুন দিনের আশা জাগিয়েছিলেন। অসংখ্য বেকার যুবক তার সময়ে কাজ পাবে বলে আশ্বাস পেয়েছিলেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সাম্প্রদায়িক ভূমিকায় বিতর্কিত হলেও শিল্পবান্ধব বলে তার খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়েছিলো। সুতরাং তার পেছনে ভারতের তামাম ধনবাদীরা কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ নিয়ে সহযোগিতার হস্ত সম্প্রসারিত করেছিলো। আম্বানিরা ভারতের মিডিয়া মোগল, তাদের ২২টা টেলিভিশন চ্যানেল নরেন্দ্র মোদির প্রচারণায় শতাংশে সহযোগিতা করেছিলো।

মনমোহন সিং দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজের সততার ভাবমূর্তি রক্ষা করলেও কিন্তু সরকারের সততার ভাবমূর্তি রক্ষা করতে পারেননি। কারণ, তার সরকারের অংশীদার আঞ্চলিক দলগুলোর মন্ত্রীরা নিজ নিজ দফতর পরিচালনায় শতাংশে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিলেন। যে কারণে ভারতীয় ভোটারেরা এনডিএ’র অংশীদারদের ওপর যেন নির্ভর করতে না হয় সে বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির জনতা পার্টিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতিয়ে দিয়েছিলো। ভারতীয় ভোটারদের থেকে নেহরু আর ইন্দিরা গান্ধী ছাড়া আর কেউই এত সহযোগিতা পাননি।

ভারতীয় ভোটারদের বিশ্বাস স্থাপনের একটা নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে ধরে নিয়েছিলো। গত পাঁচ বছর নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় ভোটারদের হতাশ করেছেন চূড়ান্তভাবে। ষষ্টদশ লোকসভা নির্বাচনে তিনি তার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির কিছুই রক্ষা করতে পারেননি। তিনি গত লোকসভা নির্বাচনে কথা দিয়েছিলেন প্রতিবছর ২ কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। বাকবিভূতিতে নরেন্দ্র মোদি খুবই সুদক্ষ নেতা। সুতরাং বাঁধভাঙা স্রোতের মতো ভারতীয় বেকার যুবকেরা তার পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে বিশাল চৌধুরী নামে এমবিএ পাস এক যুবক দু’বছর রোলিংস্টোনের মতো একটা চাকরির জন্য ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু চাকরি মেলেনি। ক’দিন আগে সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলো ফটোকপি করা ও অফিসে চা তৈরির জন্য পাঁচজন পিয়ন নিয়োগের কথা বলে। শেষ পর্যন্ত এমবিএ পাস বিশাল চৌধুরী সে পাঁচ পিয়নের এক পদের জন্য আবেদন পেশ করেছেন। সেখানে আবেদন পড়েছিলো ২৩ হাজার।

গত এক বছর ধরে দেখছি কৃষকদের বিশাল বিশাল পদযাত্রা। মহারাষ্ট্রে ৩০ মাইল পায়ে হেঁটে কৃষক এসেছিলো মুম্বাইতে। শিবসেনা সরকার তাদের দাবি মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত দুই মাসে দুই-দুইবার উত্তর প্রদেশের ৩০ হাজার কৃষক এসেছিলো দিল্লিতে। প্রতিরোধের বহু প্রচেষ্টা করেও মোদি, অমিত শাহ তাদের দিল্লি প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখতে পারেননি। ভারতে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক বিলিয়নিয়ার রয়েছে। প্রতি বছরই ডজন ডজন বিলিয়নিয়ার বের হচ্ছে। রাষ্ট্রে সব নীতিই বিলিয়নিয়ার সৃষ্টিতে উৎসাহ প্রদান করছে।

মোদি ক্ষমতায় আসার পর তার সরকার বিলিয়নিয়ারদের প্রিয়ভাজন হয়ে কাজ করছে বেশি। অথচ কৃষক আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিচ্ছে। কৃষকেরা এখন আত্মসচেতন হয়ে উঠেছে। ভারতীয় নেতৃবৃন্দ সচেতন না হলে কৃষকের লং মার্চেই তাদের সমাপ্তি সূচনা করবে। সে আলামত আমরা দূর থেকে হলেও লক্ষ করছি।

ভারতীয় সমাজে সত্যান্বেষী মানুষের সংখ্যাস্বল্পতা প্রকট। মানবতন্ত্রের বিকাশ নেই বিস্তার নেই। বুদ্ধিজীবীরাও যুক্তি আর ভক্তির সমন্বয় করতে চায়। তারা যাজ্ঞবল্ক্যের আদর্শকে মেনে নিয়েছেন। যাজ্ঞবল্ক্য সঙ্গত প্রশ্নকে স্তব্ধ করতেন ভয় দেখিয়ে, তার ধনদৌলতের প্রতি লোভও ছিল। যাজ্ঞবল্ক্যের এই চরিত্রটিই ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের পছন্দ। বুদ্ধিজীবীদের এ মুখোশও খুলে যাবে অচিরেই। তার কারণ অন্য এক বুদ্ধিজীবী গ্রুপের উত্থান নয়, ভারতের সব সম্পদ তিন শতাংশ লোকের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে এ কারণেই। অচিরেই হতদরিদ্ররা আর কারও মুখ পানে চেয়ে থেকে বসে থাকবে না।

যাহোক, লোকসভা নির্বাচনের কথায় আসি। উত্তর প্রদেশের লোকসভার আসন সংখ্যা ৮০টি। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিলো ৭২টি। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে দুটি শক্তিশালী আঞ্চলিক দল বহুজন সমাজ পার্টি এবং সমাজবাদী পার্টি নিজেদের মাঝে সমান সংখ্যক আসন বণ্টন করে জোট গঠন করেছে। উত্তর প্রদেশে যাদব বেশি। যাদবেরা গোয়ালা। গোয়ালার দল হচ্ছে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি আর বহুজন সমাজ পার্টি হচ্ছে হরিজনদের দল। তাদের নেত্রী হচ্ছেন মায়াবতী। উত্তর প্রদেশে মুসলিম ভোটার উল্লেখযোগ্য। মুসলমানেরা সাধারণত ভোট প্রদান করে থাকেন হয় মায়াবতীর বিএসপিকে, না হয় অখিলেশ যাদবের এসপিকে। এবারের নির্বাচনে উভয় দলের ঐক্যের কারণে হরিজন, যাদব কুল আর মুসলিমদের ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা কম। সুতরাং বিজেপি এ লোকসভা নির্বাচনে ২০টার ওপরে আসন পাবে বলে মনে হয় না।

অখিলেশ আর মায়াবতী যদি রাহুলকে সঙ্গে নিতেন তবে বিজেপির আসন পাঁচ সংখ্যায় নেমে আসতো। রাহুল উচ্চ শ্রেণির হিন্দুদের ভোট পান। কর্নাটকে কংগ্রেস এবং জনতা দলের (দেবগৌড়া) ঐক্য হয়েছে। এ ঐক্য লোকসভা নির্বাচনেও অটুট থাকবে। সুতরাং কর্নাটকে বিজেপির একতরফা বিজয় সম্ভব নয়। বড় রাজ্যের মাঝে বিহারও একটা। এখন বিহারে জনতা দল (নীতিশ) ও জনতা পার্টির ফ্রন্ট সরকার। লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের জনপ্রিয়তা এখন নীতেশের চেয়ে বেশি। কয়েকটা উপনির্বাচনে লালু প্রসাদের বিজয় হয়েছে। মহারাষ্ট্রে শারদ পাওয়ারের (কংগ্রেস) এবং রাহুলের কংগ্রেসের ঐক্য আছে। মহারাষ্ট্রও বড় রাজ্য। তামিলনাড়ুতে আন্না ডিএমকে নেত্রী জয়ললিতার মৃত্যু হয়েছে। আবার ডিএমকে নেতা করুণানিধিরও মৃত্যু হয়েছে। আন্না ডিএমকে এখন রাজ্যের ক্ষমতায়। সম্ভবত এবারের নির্বাচনে স্ট্যালিন (করুণানিধির পুত্র) ও ডিএমকে ভালো ফল বয়ে আনবে। ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থান- তিন রাজ্যে বিজেপি কংগ্রেসের হাতে পরাজিত হয়েছিলো। এখন এ তিন রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার। অন্ধ্রে চন্দ্রবাবু নাইড়ু এবং তেলেঙ্গানায় চন্দ্র শেখর রাওয়ের অবস্থান ভালো। তারা উভয়ে উভয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিম বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার।

সুতরাং আপাতত  দেখা যাচ্ছে, বিজেপি জোট সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। দিন যত কাছে আসবে, তাতে আরও স্পষ্ট করে বলা যাবে মোদির ভাগ্যে আবারও কুরসি আছে কি নেই।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ