ঈদ আর ক্রিকেট: মহাউৎসবের শুরু

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৩১, জুন ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩২, জুন ০৩, ২০১৯

রেজানুর রহমান৩৩০ রান করার পরও কি জয়ের সম্ভাবনা থাকে না? ভিড়ের মাঝে কেউ একজন বললেন, নারে ভাই, এখনই বলা যাবে না। দলটা যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকা। ক্রিকেটের পরাশক্তি। তাদের কাছে ৩৩০ রান কোনও ব্যাপারই না। সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের মাঝে দুটি দল হয়ে গেলো। সংখ্যাগরিষ্ঠরা বাংলাদেশের জয়ের পক্ষে। গুটিকয়েক মানুষ দোদুল্যমনতায় ভুগছিলেন। শুরু হলো দ্বিতীয় পর্বের খেলা। অর্থাৎ ব্যাটিংয়ে নেমে গেলো দক্ষিণ আফ্রিকা। জিততে হলে তাদের করতে হবে ৩৩১ রান। বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয়ে গেলো রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা ফাঁকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে, শপিংমলে টিভির সামনে উৎসুক মানুষের ভিড়। যাকেই ফোন করি, সেই টিভির সামনে বসে আছে। বাংলাদেশের খেলা দেখছে। ফোন করা মাত্রই সবার অভিন্ন উত্তর, ‘ভাই খেলা দেখতেছি। দোয়া করেন যেন বাংলাদেশ জিতে।’ দক্ষিণ আফ্রিকা যখন ব্যাটিংয়ে নামে তখন একটি টিভি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়েছিলাম। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার ঈদসংখ্যা নিয়ে আলোচনা। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, পাক্ষিক অন্যদিন পত্রিকার সম্পাদক মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে অনুষ্ঠানে আমিও কথা বলবো। কিন্তু সবার মনোযোগ বাংলাদেশের খেলা  নিয়ে। প্রিয় কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম টিভিতে বাংলাদেশের খেলা দেখার জন্য ছটফট করছেন। ‘আজকের এই খেলাটায় বাংলাদেশের জেতা উচিত’, কয়েকবার এই কথাটা বললেন। এবং সত্যি সত্যি বাংলাদেশ জিতে গেলো। অবিশ্বাস্য ঘটনা। এতো আনন্দ কোথায় রাখি?

প্রশ্ন উঠতেই পারে, ক্রিকেট তো একটি খেলা মাত্র। কাজেই ক্রিকেট নিয়ে এত আবেগ ছড়ানোর কী আছে? এই প্রশ্নের সহজ-সরল একটা উত্তর আছে। তার আগে বলে নেওয়া ভালো, এটা বিশ্বকাপের খেলা। ১০টি দেশের সঙ্গে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে নেমেছে বাংলাদেশ। কাজেই ক্রিকেটে জয়-পরাজয়ের ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়েও বড় কথা বাংলাদেশে ক্রিকেট, একমাত্র ক্রিকেটই এমন বিষয়, যার জন্য দলমত নির্বিশেষে দেশের মানুষ এক হয়ে কথা বলে। আর তাই ক্রিকেট হাসলে বাংলাদেশ হাসে। ক্রিকেট ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ বেদনার্ত হয়। একথা সত্য, ক্রিকেটের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ বিশ্বে অনেক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি এবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে, তাহলে ঐতিহ্য ও অহংকারের জায়গাটা আরও বিকশিত হবে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যম কী বলে? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে অসংখ্য বিজ্ঞাপন ও প্রচারণামূলক বিভিন্ন ধরনের সংবাদচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে তেমন গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। ভাবটা এমন, বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়ার কী আছে? নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটার ম্যাককালাম তো এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতেই নারাজ। বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরুর আগেই তিনি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে নাকি একটা মাত্র ম্যাচে জিতবে। অবজ্ঞা করারও একটা সীমা-পরিসীমা আছে। দেশের একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় বিশ্বখ্যাত সাত জন সাবেক ক্রিকেটারের মন্তব্য পড়লাম। বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনালের জন্য সম্ভাব্য ৪টি দলের ব্যাপারে তারা মন্তব্য করেছেন। কেউ বাংলাদেশ দল নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। অথচ তাদেরই একজন আফগানিস্তান সম্পর্কে উচ্চাশা পোষণ করেছেন। অন্যরা পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কথাও বলেছেন। তাদের মুখে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়নি।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম খেলায় সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে শুরুতেই চমক সৃষ্টি করেছে। এবার আশা করি, আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে বাংলাদেশ দলের কদর বাড়বে। তবে এখনই আনন্দ করার সময় নয়। সবে তো বিশ্বকাপের জার্নিটা শুরু হলো। আরও অনেকটা পথ বাকি। তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। ২ মে লন্ডনের ওভাল ক্রিকেট মাঠে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পারফরমেন্স দেখে মনে হয়েছে দলটা এখন অনেক পরিপক্ব। দলপ্রধান মাশরাফির নেতৃত্বে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর সকলে। ব্যক্তিগত পারফরমেন্সের চেয়ে দলগত নৈপুণ্য প্রদর্শনে সবাই বেশ আন্তরিক। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম খেলায় শক্তিধর দক্ষিণ আফ্রিকাকে পরাজিত করেও বাংলাদেশ দলের কাউকেই অতিমাত্রায় হৈ-হুল্লোড় করতে দেখা যায়নি। তবে দলের প্রতিটি সদস্য জয়টাকে উপভোগ করেছে। ম্যাচ জেতার পর সাকিব আল হাসান যখন মাশরাফি বিন মুর্তজাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করছিলেন, তখন সারাদেশে টিভির সামনে বসে খেলা দেখতে থাকা অনেক দর্শকই আবেগ আপ্লুত হয়ে ওঠেন। আমার এক ক্রিকেট পাগল বন্ধু ফোন করে বললেন, সাকিব আর মাশরাফির পরস্পরকে জড়িয়ে ধরা ছবিটা দেখেছ? এটাই হলো আমাদের ক্রিকেট পরিবারের শ্রেষ্ঠ ছবি। এবার বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশকে কেউ দাবায়া রাখতে পারবে না।

একে তো ঈদ উৎসব, তার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট উৎসব। দুইয়ে মিলে এবার বাংলাদেশে মহাউৎসব শুরু হয়েছে। ৫ মে বাংলাদেশ তার দ্বিতীয় খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে শক্তিধর নিউজিল্যান্ড দলের সঙ্গে। আগামীকাল ৪ মে ঈদের চাঁদ দেখা গেলে পরের দিন অর্থাৎ ৫ মে সারাদেশে ঈদ উৎসব পালন করা হবে। কল্পনা করুন তো একবার, ৫ মে অনুষ্ঠিত হবে ঈদ উৎসব। একই দিনে বাংলাদেশের খেলা থাকবে বিশ্বকাপে। আর যদি সেদিন বাংলাদেশ জয়লাভ করতে পারে তাহলে ঈদ আনন্দের মাত্রাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বাংলাদেশ তার প্রথম খেলায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর পর, সারাদেশের মানুষের পাশাপাশি প্রচারমাধ্যমগুলোরও আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করেছে। দৈনিক প্রথম আলো প্রধান শিরোনামে লিখেছে, ‘স্বপ্নের মতো শুরু বাংলাদেশের’। কালের কণ্ঠ ব্যানার হেড লাইনে লিখেছে, ‘স্বপ্নরথের শুভযাত্রা’। বাংলাদেশ প্রতিদিন লিখেছে, ‘দাপুটে জয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ শুরু’। সমকাল লিখেছে ‘রেকর্ড গড়া জয়’। যুগান্তর লিখেছে ‘ঈদের আগে বাংলাদেশের ঈদ’। মানবজমিন লিখেছে ‘স্বপ্নের শুরু...’।

হ্যাঁ, স্বপ্নের শুরুটা ভালোই হয়েছে বাংলাদেশের। এবার আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবে প্রমাণ করার পালা। বাংলাদেশ সেটা করে দেখাতে পারবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে দেশের সকল মানুষের মধ্যে। আবারও বলি, ক্রিকেট মানুষের কাছে শুধু একটি খেলা নয়। ঐতিহ্য ও অহংকারের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ক্রিকেট হাসলে, বাংলাদেশের মানুষ হাসে। ক্রিকেট ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের মানুষ আশাহত হয়। কাজেই ক্রিকেটে সাফল্য চাই। জয় হোক বাংলাদেশের ক্রিকেটের। গুডলাক বাংলাদেশ!

লেখক: নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক, আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ