বাঙালির চরিত্র ও ধর্ষণ

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৬:২৫, জুন ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৭, জুন ২০, ২০১৯

মো. আবুসালেহ সেকেন্দারভারতে মোগল বংশের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা জহির-উদ-দীন মুহাম্মদ বাবর তার আত্মজীবনী  ‘বাবরনামা’য় লিখেছেন—‘বাংলাদেশে অদ্ভুত রীতি আছে, এখানে জনগণ সিংহাসনকে শ্রদ্ধা করে। রাজাকে হত্যা করে যেকোনও ব্যক্তি সিংহাসনে বসুক না কেন, তাকে সকলে রাজা বলে স্বীকার করে।’ সম্রাট বাবরের ওই উক্তি যে মিথ্যা নয়, তা ঐতিহাসিকভাবে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজ বনাম নবাব বাহিনীর যুদ্ধে জনতা নীরব দর্শক হিসেবে ইংরেজদের সিংহাসন দখলকে উপভোগ করেছে। বাংলার জনসাধারণের ওই মানসিকতার পরিচয় আমরা ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের বক্তব্য থেকেও পেয়েছি। রবার্ট ক্লাইভ লিখেছেন: ‘২৯ জুন, তিনি ২০০ ইউরোপীয় ও ৫০০ দেশীয় সৈন্য নিয়ে বিজয়গর্বে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করেন। এই উপলক্ষে লাখো দর্শক উপস্থিত হয়। তারা ইচ্ছা করলে শুধু লাঠি ও ঢিলা দিয়েই ইউরোপীয় সৈন্যদের মেরে ফেলতে পারতো। কিন্তু বাঙালিরা তা করেনি।’ বরং বাঙালি বিদেশিদের দেখে মজা পেয়েছে। বাসায় গিয়ে খোশগল্প করেছে, ইংরেজরা দেখতে কেমন ছিল, তা নিয়ে। বাঙালির এই স্বভাব আজও বদলায়নি। রাস্তা দিয়ে কোনও বিদেশি গেলে হা করে তাকিয়ে থাকে। বাসায় গিয়ে বা বন্ধুদের আড্ডায় বুক ফুলিয়ে গল্প করে!

দুই.

পলাশীর দুর্দশা কাটিয়ে স্বাধীনচেতা মীর কাসিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে আজাদির ঝান্ডা উড়িয়েছিলেন। নবাব সিরাজের মতো মীর কাসিমও বাঙালির সমর্থন পাননি। বক্সারের যুদ্ধ বাংলাকে গোলামির স্থায়ী শেকল পরিয়েছে। ইতিহাসবিদরা কি বলতে পারবেন, সেই যুদ্ধে বাঙালির ভূমিকা কী ছিল? সাধারণ বাঙালির পলাশী বক্সার নিয়ে মাথাব্যথা ছিল? আর ওই মাথাব্যথা না থাকাই ইংরেজদের বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠাকে সহজ করে দিয়েছিল। যদি সে দিন বাঙালি মীর কাসিমের পাশে দাঁড়িয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে লড়তো, তাহলে বাংলার ইতিহাস ভিন্ন হতো।          

তিন. 

বংশপরম্পরায় বাঙালির ভাবলেশহীন মানসিকতা তার জন্য সর্বনাশের কারণ হয়েছে। ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়ায়নি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে মীর কাসিমের যুদ্ধে তার হয়ে বক্সারে লড়েনি। বরং তারা ইংরেজদের নিয়মিত কর দিয়েছে। বাঙালির সেই করের টাকা দিয়ে ইংরেজরা তাদের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করে তাদের শাসন ভারতজুড়ে বিস্তৃত করেছে। 

যদিও পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধিকার আন্দোলনে বাঙালি সাহসী ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ওই আন্দোলনকে সত্যিকার অর্থে সাধারণ বাঙালির আন্দোলন বলা যাবে না। সমাজের অগ্রসর শিক্ষিত জনের অংশগ্রহণ সেখানে মুখ্য ছিল। সাধারণ বাঙালির আন্দোলন বলতে গেলে পাকিস্তানবিরোধী স্বাধীনতার অন্দোলনকে প্রথম প্রকৃত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বলা যেতে পারে। যদিও স্বাধীনতার পর বাঙালির সেই তেজ ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। তার বড় প্রমাণ স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পরও খুনিদের ক্ষমতা গ্রহণের বিরুদ্ধে বাঙালি দুর্বার কোনও গণআন্দোলন গড়ে তুলে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেনি। বছরের পর বছর সামরিক শাসকরা এদেশের গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ক্ষমতায় থাকলেও, জনতা খুব কমই ওইসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। তবে এও ঠিক, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার পতনও ঘটিয়েছিল।

চার.

অন্যায়কে মেনে নেওয়ার বাঙালির অসম্ভব ক্ষমতা, সবকিছুকে মেনে নেওয়ার প্রবণতাই আজ নষ্ট রাজনীতিবিদ ও আমলাদের অন্যায়ের পর অন্যায় করতে উৎসাহ জোগাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে যখন আফিয়া বিবির ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত সেই দেশের পুলিশ সদস্যদের বিচার হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে হাইকোর্টের নির্দেশের পরও অদৃশ্য কারণে অভিযুক্ত ওসিকে গ্রেফতার করা নিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছিল। আর বাঙালি বসে বসে সেসব দেখছে। ফেসবুকে কমেন্ট-স্ট্যাটাস লিখে হা হুতাশ করছে! ফলে একের পর এক ধর্ষক ও তার সহযোগীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। তনুর পর নুসরাত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। যদিও ওসি মোয়াজ্জেমকে অবশেষে গ্রেফতার করা হয়েছে।  

হলমার্ক, ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০০ মিলিয়ন ডলার রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে। অফশোর ব্যাংকিংয়ের আড়ালে অনায়াসে সাবেক এক মন্ত্রী ৩৪০ কোটি টাকা পাচার করার সাহস দেখাচ্ছেন সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। বিদেশে অর্থ পাচারের দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তাই দিন দিন ওপরের দিকে উঠছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই শীর্ষ স্থান বাংলাদেশের দখলে চলে আসবে। তবু বাঙালি নির্বিকার। বরং বাঙালি বসে বসে ডিআইজি মিজান আর দুদক পরিচালকের অডিও টেপ কেলেঙ্কারির চল্লিশ লাখ টাকা নিয়ে বাহাস করছে। 

বাঙালি ইদানীং যাও একটু উচ্চবাচ্য করছে, তাও ধর্মের ক্ষেত্রে। যদিও না বুঝে, না জেনে। অল্প শিক্ষিত ধর্মগুরুর অপব্যাখ্যায় মূলত ‘বানর নাচ নাচছে’। যদিও তাদের উচিত ছিল ধর্মগুরুদের ধর্মের অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করা। অবশ্য অলসতা বাঙালির চরিত্রগত, মজ্জাগত রোগ হওয়ায় ধর্মের গভীরে যাওয়ার আগ্রহ তাদের আছে বলে মনে হয় না। এজন্যই এই অঞ্চলের মানুষকে বলা হয় ‘শুনে মুসলমান’। নিজে খুঁজে দেখার চেয়ে অন্যের নিকট শুনে শুনে ধর্ম পালন করা যেন এদের স্বভাবজাত হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে শিক্ষিত-অশিক্ষিত কোনও পার্থক্য নেই। যদিও ধর্ম নিয়ে কেউ কিছু বললে লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে যাওয়ায় বাঙালি অদ্বিতীয়। ব্যক্তিজীবনে ধর্মীয় অনুশাসন পালনের নামগন্ধ নেই এমন বাঙালিও এক্ষেত্রে একেকজন নিজেকে ওমর, খালেদ, সালাউদ্দিন আইয়ুবী প্রমাণে কসরত করছে। অবশ্যই হাঁড়ির খবর নিলে দেখা যাবে, তাদের প্রায় শতভাগ কোরআন বুঝে জীবনে একবারও পড়েনি! 

পাঁচ.

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হলেও বাঙালি ওই গোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে কেন প্রতিরোধ করতে পারছে না? বাঙালির ঘুম কেন ভাঙছে না? ইতিহাসের কানাগলিতে হাঁটলে এর উত্তর পাওয়া যাবে। বাঙালির কুম্ভকর্ণের ঘুম ভীষণ প্রিয়!

তাই প্রধানমন্ত্রী একা চাইলেই ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতি বন্ধ হবে না। এর জন্য সাধারণ বাঙালিকে জাগতে হবে। সেই সাধারণ বাঙালির কুম্ভকর্ণের ঘুম অচিরে ভাঙবে?

আজ আর বাঙালি পরাধীন নয়। নিজেরা নিজেদের শাসন করছে। তাই অবশ্যই অলসতা ভেঙে বাঙালিকে জাগতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তার কি কোনও দায়বদ্ধতা নেই, বিষয়টি নিয়ে অচিরেই তাদের ভাবতে হবে। না হয়, ডিআইজি মিজান আর ওসি মোয়াজ্জেমের মতো দুষ্টু লোকের পুতুল নাচ বারবার দেখতে হবে। 

হে বাঙালি! বাংলাভাষী! বাংলাদেশি! একের পর এক ধর্ষণের উৎসবে মেতে ওঠা ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারীদের সামাজিকভাবে প্রতিহত করা কি নৈতিক দায়িত্ব নয়? আমরা কি সামাজিকভাবে পারি না, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ধর্ষক, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজদের  বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে? তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে? কুম্ভকর্ণের ঘুম ভেঙে একবারও ভাববে?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

salah.sakender@outlook.com

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ