বৈষম্য এবং নারীর প্রতি সহিংসতা

Send
ফারজানা মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৪:৫০, জুলাই ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫২, জুলাই ০৭, ২০১৯

ফারজানা মাহমুদকোনও সমাজব্যবস্থায় নাগরিকরা যখনই ধনী-দরিদ্র,নারী-পুরুষ হিসেবে বিভাজিত হয়ে যায়, তা সুদূরপ্রসারী বৈষম্য, নির্যাতন, সহিংসতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সূচনা করতে পারে। যেমন—নারী ও পুরুষ অর্থাৎ লিঙ্গ ভেদে যে বৈষম্য আমাদের সমাজের নানা স্তরে বিরাজমান, তা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এটি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীদের প্রতি নানামুখী অন্যায়-অত্যাচার এবং সহিংসতার একটি মূল কারণ।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এমনকি শহরের অসংখ্য পরিবারে ছেলে সন্তান জন্ম নিলে পরিবার খুব গর্ববোধ করে, কিন্তু মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে হয় উল্টো। ছেলে সন্তানকেই দ্বিধাহীনভাবে পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাকে সেভাবেই প্রস্তুত করা হয়। এর ফলে শিশুকাল থেকেই একজন ছেলে শিশুকে যেভাবে স্বাধীনতা দেওয়া হয়, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে যেভাবে ছেলে সন্তানের প্রতি যে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করা হয় অথবা মানসিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়, তা একটা মেয়ে শিশুকে দেওয়া হয় না। সুতরাং পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই একটি ছেলে শিশু তার মা, বোন কিংবা খেলার সঙ্গী মেয়েটির তুলনায় নিজেকে বড় বা বেশি প্রয়োজনীয় ভাবতে শিখে যায় এবং নারীদের ছোট করে দেখে বা পুরুষের সমপর্যায়ের ভাবার মনোবৃত্তি তার মধ্যে জন্মায় না। এই শিক্ষাটা চলতে থাকে বংশপরম্পরায় এবং তা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ে পরিবার থেকে সমাজের সর্বস্তরে।

পরিবার এবং সমাজব্যবস্থায় নারী-পুরুষ ভেদে ভিন্নরকমের ও বৈষম্যমূলক আচরণ নারীর প্রতি অসম্মান এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একটি অন্যতম কারণ। নারীকে দুর্বল এবং পুরুষের একচ্ছত্র মালিকানাধীন-দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ ভাবার কারণেই নারীর প্রতি অশ্লীল বাক্যবাণ থেকে শুরু করে শারীরিক নির্যাতন কোনোটাই কমছে না, যদিও আমরা প্রযুক্তিতে আধুনিক হচ্ছি এবং অর্থনীতিতে এগিয়েছি অনেক দূর। নির্যাতন বা ধর্ষণ বা অন্য কোনও কারণে নারী যদি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন আমরা দেখতে পাই সমবেদনার পাশাপাশি অনেক পুরুষ সেই আক্রান্ত নারীর চারিত্রিক দুর্বলতা খুঁজতে থাকেন, যা একজন সমালোচিত পুরুষের বেলায় কমই লক্ষ্যণীয়। এমন ক্ষেত্রে দোষ নির্যাতিতার দোষ খুঁজে দেখার মূল কারণ আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে নারীকে পুরুষের চেয়ে কম যোগ্য বা পুরুষের অধঃস্তন ও দুর্বল ভাবা এবং নারীর অর্থনৈতিক পরাধীনতা ইত্যাদি।
নারীর প্রতি শ্রদ্ধার অভাব বা নির্যাতনের মূল একটি কারণ পারিবারিক পরিমণ্ডলে বৈষম্যে, এখানে আমি উত্তরাধিকারে বা সম্পত্তিতে নারী পুরুষের বৈষম্যের ওপর জোর দিতে চাই। পারিবারিক সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার না থাকায় একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হন এবং এর পাশাপাশি সচেতন এবং অবচেতনভাবেই তিনি পুরুষের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন বা দুর্বলতাকে বোঝানো হয়। উত্তরাধিকারে পুরুষের বেশি অধিকার থাকায় এবং নারীর অপেক্ষাকৃত কম বা শূন্য অধিকার থাকায় একজন পুরুষ মনস্তাত্ত্বিকভাবেই নিজেকে নারীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী, ক্ষমতাবান এবং বেশি যোগ্য ভাবতে শুরু করেন।

আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং দৃশ্য-অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক যে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তা দূর করতে হলে আমাদের দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। প্রথমত পারিবারিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে নারীর সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্র কিংবা পারিবারিক পরিবেশে নারীর প্রতি যেন কোনও ধরনের হয়রানিমূলক আচরণ করা না হয় তার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক ও পারিবারিক অবকাঠামোতে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে এবং প্রাত্যহিক জীবনে কীভাবে তা পরিচর্যা করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ছেলে শিশু এবং মেয়ে শিশুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে মানবিকতার শিক্ষা পরিবার থেকেই দিতে হবে। পরিবারের মূল্যবোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যদি নারীদের সত্যিকার অর্থে সম্মান করতে শেখার অভ্যাসটা গড়ে তুলতে পারেন, তবে সেটি তার পরবর্তী প্রজন্মসহ সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবে। নারীকে পণ্য কিংবা দুর্বল ‘মেয়ে মানুষ’ নয় বরং মানুষ হিসেবে ভাবার সংস্কৃতিটা আমাদের পরিবার থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং মিডিয়াকে কাজে লাগানো যেতে পারে।

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে দ্বিতীয় যে বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করা। নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতে আমাদের সংবিধানের ২৮ (২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ অর্থাৎ সংবিধানে গণজীবন বা সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হলেও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়নি। সম্প্রতি সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন। আশা করা যায় এর ধারাবাহিকতায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পারিবারিক জীবনে এবং উত্তরাধিকারে নারীর সমঅধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।

নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা রোধে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক সুরক্ষা বলয় নিশ্চিতের মাধ্যমে নারীদের অগ্রগতিকে সমুন্নত ও টেকসই করার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে প্রয়োজনীয় বিধি এবং নীতিমালাও প্রণয়ন করা যেতে পারে। আমাদের মহান সংবিধানের ২৮(৪) নং অনুচ্ছেদে এই ধরনের বিধি প্রণয়নের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘নারী ও শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনও অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনও কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিতে পারবে না।’

শুধুমাত্র আইনের কঠোর প্রয়োগ কিংবা প্রতিবাদ দিয়েই নারীর অবমাননা বা নারীর প্রতি নির্যাতন সহিংসতা বন্ধ করা যাবে না। সহিংসতা বন্ধ নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করে সম অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মানুষ ভাবার শিক্ষা এবং নারীর অধিকার সর্বপ্রথম পারিবারিক পরিমণ্ডলেই নিশ্চিত করতে হবে, তা না হলে ক্রমবর্ধমান সামাজিক অবক্ষয় এবং সহিংসতা আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং অর্জনকে অর্থহীন করে দেবে।      

লেখক: আইনজীবী

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ