বাংলাদেশ এখন কাউকে ভয় পায় না

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৩:৪৭, মার্চ ০১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৮, মার্চ ০১, ২০১৬

Probhash Aminপ্রথমেই বলে নেওয়া ভালো টি-টোয়েন্টি-কে আমি ক্রিকেটই মনে করি না। আমার ধারণা, টি-টোয়েন্টি হলো খাল। আমাদের কাটা সেই খাল দিয়ে লোভের কুমির আসছে। সেই কুমির একদিন গিলে খাবেই ক্রিকেটকে, ক্রিকেটের শুদ্ধ চেতনাকে। আমার প্রস্তাব ছিলো, টি-টোয়েন্টি-কে স্পোর্টস থেকে এন্টারটেইনমেন্ট ক্যাটাগরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। এই প্রস্তাব এখনও বহাল আছে।
কারণ টি-টোয়েন্টি-তে খেলার চেয়ে অ-খেলার প্রাধান্য বেশি। তবে আমি জানি, আমি এখন সংখ্যালঘু। আমার কথা শোনার লোক নেই। এবং আমি এটাও জানি, আস্তে আস্তে টি-টোয়েন্টি-ই হয়ে উঠবে মূল ক্রিকেট। আসল ক্রিকেট হারিয়ে যাবে। টেস্ট ক্রিকেট থাকবে নামে মাত্র, ওয়ানডে খেলা হবে কালেভদ্রে, টি-টোয়েন্টি-কেই সবাই ক্রিকেট মনে করবে। তেমন দুঃখের দিন দেখতে হবে, সেই ভাবনাতেই গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন আমি। আমার এই ধারণা ইতিমধ্যে সত্য হতে শুরু করেছে। নইলে এশিয়া কাপের মতো একটি  ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্ট ওয়ানডে ফরম্যাট থেকে টি-টোয়েন্টি-তে বদলে যায় কিভাবে? টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনে আরেকটি টুর্নামেন্ট করা যায়। কিন্তু তাই বলে এমন একটি টুর্নামেন্টকে এভাবে গলা টিপে মারতে হবে?
তবে আমি ইউটোপিয়ান ধারণার মানুষ নই। ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও আমি বাস্তবতা মেনে নেই। টি-টোয়েন্টি এখন তেমন বাস্তবতা। একে অস্বীকার করা মানে উটপাখির মতো বালুতে মুখ গুজে রাখা। টি-টোয়েন্টি যুগের চাহিদা, যুগের দাবি। এখন ইন্সট্যান্ট কফির যুগ। পাঁচদিন বসে টেস্ট দেখার সময় নেই কারও। সবাই চায় চটজলদি। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি টি-টোয়েন্টি বন্ধ করে দিতাম নিদেনপক্ষে এন্টারটেইনমেন্ট ক্যাটাগরিতে পাঠিয়ে দিতাম। সেটা যেহেতু সম্ভব নয়। এখন তাই লড়াইটা হতে হবে টি-টোয়েন্টিতে যত বেশি ক্রিকেট রাখা যায়। বিজ্ঞাপন, বাণিজ্য, গ্ল্যামারের ফাঁক গলে যেন ক্রিকেটটাও একটু দেখা যায়।
বাংলাদেশ এখন বুঁদ হয়ে আছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে, এশিয়া কাপে। আমার যেহেতু টি-টোয়েন্টি ভালো লাগে না, তাই বল বাই বল দেখা হচ্ছে না। তবে সাংবাদিক হিসেবে এবং একজন ক্রিকেটানুরাগী হিসেবে যতটুকু খোঁজ রাখার তা রাখছি। আর বাংলাদেশ যখন খেলতে নামে, তখন আর ফরম্যাটটা মাথায় থাকে না। আমি আসলে ক্রিকেট নয়, বাংলাদেশকে দেখি। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট যখন এলো, তখন সবাই বলাবলি করছিল, এখানে বাংলাদেশের চান্স বেশি। যেহেতু ধুম-ধারাক্কা খেলা তাই যেদিন যে ভালো করবে সেদিন তার জয়ের সম্ভাবনা থাকবে। তাই বাংলাদেশের চান্সও বেশি। কিন্তু ঘটলো উল্টো।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশ এখন দারুণ ফর্মে, টেস্টেও লড়াই করার ক্ষমতা আছে। কিন্তু টি-টোয়েন্টি মানেই বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণের গল্প। কিন্তু দিন মনে হয় বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছেই বলাটা একটু বেশি ঝুঁকি হয়ে যায় বটে, তবে সেদিন বাংলাদেশ যে স্টাইলে শ্রীলঙ্কাকে হারালো, তাতে এটা বলাই যায়, টি-টোয়েন্টিতে বদলে যাওয়ার পথে এটা একটা টার্নিং পয়েন্ট। ক্রিকেটের দক্ষতা, টেকনিক তো থাকতেই হবে; তবে ক্রিকেট যতটা না শারীরিক সক্ষমতার খেলা, তারচেয়ে বেশি মানসিক সক্ষমতার। মাঠে মনোযোগ দিয়ে একটা দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখলেই ফলাফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। খেলার আগেই হেরে বসার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে ক্রিকেটে। গত একবছরে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে যে স্বপ্নের সময় পার করছে, তার একটা প্রভাব নিশ্চয়ই ওয়ানডেতেও পড়বে। সাফল্য সবচেয়ে বড় টনিক। সাফল্য নতুন সাফল্যকে ডেকে আনে। সাফল্য বদলে দেয় দলের মনোবল। বাংলাদেশ দারুণভাবে ওয়ানডের সাফল্যকে টেনে নিয়েছে টি-টোয়েন্টি-তে। নইলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অমন বিপর্যয়ের পর আগের বাংলাদেশ হলে ধসে যাওয়ার কথা। সেখানে সাব্বির রহমান যেভাবে রুখে দাঁড়ালেন, পাল্টা আক্রমণ করলেন; তা দেখতেও সাহস লাগে। এ সত্যি অন্য বাংলাদেশ।

প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের সাফল্য ছিলো স্পিন বোলিংয়ের সাফল্যের সমান্তরাল। রাখতে হয় বলেই ভদ্রতা করে দুয়েকজন পেসার দলে থাকতেন। কিন্তু দলের জয়ে তাদের ভূমিকা বরাবরই দুয়োরানীর গল্প। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট মাশরাফির হাত ধরে বদলে গেছে সেই পুতু-পুতু ভাবমূর্তি। গত বিশ্বকাপ থেকেই বাংলাদেশের সাফল্য আসছে পেসারদের গতিতে। মাশরাফি, তাসকিন, রুবেল তো ছিলেনই; এখন তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন বিশ্বের বিস্ময় মুস্তাফিজ। এভাবে পেস বোলিং দিয়ে প্রতিপক্ষকে গুড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে যে ‘অহং’ আছে, তা নেই স্পিনের হাত ধরে আসা জয়ে। এমন জয়ের মজাই আলাদা।

টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ওপেনিংটাই একটু নড়বড়ে লাগছে। তামিম ইকবালকে বড় বেশি মিস করছে সবাই। তামিমের সাহচর্য না পেয়ে যে নিজেকে মেলে ধরতে পারছে না সৌম্য সরকারও। দুঃখের কথা মুস্তাফিজ হয়তো চোটের কারণে এই টুর্নামেন্টে আর খেলতে পারবেন না। সুখের কথা হলো তার জায়গায় দলে ফিরছেন তামিম ইকবাল। ভালো হলো না খারাপ হলো, বোঝা মুশকিল। তবে মাশরাফি, তাসকিন, আল আমিনরা নিশ্চয়ই মুস্তাফিজের অভাবটা বুঝতে দেবেন না। আর তামিম যদি তার নবজাতক পুত্রের জন্য কোনও বড় গিফট দিতে চান, আমাদের কোনও আপত্তি নেই। আর পাকিস্তানকে যেমন নড়বড়ে লাগছে এবার, তাতে আমার মন বলছে পাকিস্তানকে হারিয়েই ফাইনালে যাবে বাংলাদেশ। আর ফাইনালে গেলে আমরা কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না। বাংলাদেশ এখন আর কাউকে ভয় পায় না।

লেখক:  অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

 ইমেল: probhash2000@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ