দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ

Send
মাহমুদুর রহমান
প্রকাশিত : ১১:১৪, মার্চ ১১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:১৬, মার্চ ১১, ২০১৬

মাহমুদুর রহমানকিছু কিছু কথা প্রশ্ন আর বক্তব্যের মাঝামাঝি এমন অবস্থান নেয় যে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে। প্রতি উত্তরে বক্তব্য না উত্তর দেওয়া উচিত, সেটা ভাবতে গিয়ে সার যেন অসার হয়ে যায়। আশির দশকে শীতের মিষ্টি বিকেলে চা-চক্রে অস্ট্রেলিয়ার এক সাংবাদিক বলে উঠলেন, ‘ভাবতে অবাক লাগে স্বাধীনতার ১৮ বছর পরেও তোমরা ঠিক করতে পারোনি তোমাদের জাতীয়তা বাঙালি না বাংলাদেশি। দেশ গড়বে কী করে?’
লজ্জায় মাথা ‘হেট’ হওয়ারই কথা। দুর্বল অবস্থায় আক্রমণ। তাই পাল্টা প্রশ্ন- ‘তোমার কী মনে হয়?’ অকপটে এলো স্বীকারোক্তি। ‘আমরা অস্ট্রেলিয়ান। কিন্তু তোমাদের মাঝে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। কারণ পাহাড়ি গোষ্ঠীরা বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় না’। কথাটি ফেলনা নয়। ভাষার কারণে আমরা বাঙালি জাতি- কিন্তু পশ্চিম বঙ্গবাসীরা একই কথা বলবেন। তাদের অনেকের ভীত, এই বাংলাদেশে, অথচ তারা হয়েছেন ভারতীয় জাতীয়তা।
দৈনিক সংবাদের সম্মানিত প্রয়াত সাংবাদিক বজলুর রহমান কিঞ্চিত উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন জাতীয়তাবাদের এহেন বিশ্লেষণে । কিন্তু, দেশ তো জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী সব কিছুর ওপরে তাহলে কেন এই দ্বিধা?
মাতৃভাষার জন্য চরম আত্মত্যাগ আমাদের গৌরব, তাই আমাদের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা। বাঙালি সংস্কৃতি, কৃষ্টি বিশেষায়িত, উদার আমাদের মন। তাই এই ভূখণ্ডে বসতি যাদের তারাও দেশের অংশ, তাদের ভাষা, কৃষ্টির প্রতি রয়েছে শ্রদ্ধা। আমাদের ভিন্নতা যে সুতোয় গাঁথা সেটাই জাতীয়তাবাদ। সেখান থেকে দেশ প্রেমের উৎপত্তি।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে যারা এদেশের মায়া ত্যাগ করে ভিন দেশের জাতীয়তাকে আলিঙ্গন করেছেন তাদের কাছ থেকে দেশপ্রেমের গান বড়ই বেসুরা লাগে। প্রেম তো হওয়ার কথা সে দেশের জন্য, যেথায় মিলেছে জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা। তা না হলে বুকে হাত দিয়ে যখন জাতীয় সংঙ্গীতকে সম্ভাষন জানানো হয়, কোন দেশের ছন্দ হৃদয়ে দোলে? নাকি জীবিকার টান এতই বেশি যে, সুবিধা মতো নানান দেশের পতাকা আর জাতীয় সংঙ্গীতের প্রতি আনুগত্য দেখাবো? এতই সহজ ভুলে যাওয়া রক্তে সিক্ত পতাকা? দীর্ঘ দিনের রক্তক্ষয়ী লড়াই করার পর কী করে আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেটার ইংল্যান্ডের জাতীয় সংগীতকে বরণ করে।

তারপর আবার আইরিশ পরিচয়ে ফিরে যায়? কী করে পাকিস্তান আর ভারতের বংশদ্ভুতরা ওমান, হংকং ও আরব আমিরাতের জাতীয় সংঙ্গীত আর পতাকা ধারণ করে। জাতীয়তা আর দেশপ্রেমকে এভাবে চপেটাঘাতের পরিত্রাণ কোথায়? খেলায় সমর্থনের নামে ভিন দেশের পতাকা উড়াবার মধ্যে আনন্দ উচ্ছাস থাকলেও নিজ দেশের পতাকাকে বড়ই অপমান করা হয়। আর যে দেশের পতাকা হাতে নেওয়া হচ্ছে তাকেও ছোট করা হচ্ছে। হয়তোবা একারণেই কোনও কোনও চিন্তাবিদ দেশপ্রেমকে সেকেলে ধারণার শ্রেণিভুক্ত করছেন। হয়তো একই কারণে আগামিতে দেশ-বিভাজনের স্তম্ভগুলো ভেঙে তৈরি হবে জাতিগত সীমানা।

লেখক: কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ