ইলিশ খেতে মানা!

Send
তানভীর আহমেদ
প্রকাশিত : ১২:৩৯, এপ্রিল ১১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৪, এপ্রিল ১১, ২০১৬

তানভীর আহমেদএবারের বৈশাখে বাঙালির পাতে ইলিশ আসবে নাকি অন্যকিছু সেই আলাপে মুখর সুধী সমাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনকী মূলধারার গণমাধ্যমে রীতিমতো বিজ্ঞাপন চালিয়ে ইলিশ খেতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বৈশাখে পান্তার সঙ্গে ইলিশ থাকবে নাকি অন্যকিছু সেই আলোচনায় আসার আগে একট প্রাসঙ্গিক গল্প বলতে চাই।
ব্রিটেনে বড়দিনের প্রধান আকর্ষণ হলো টার্কি পাখির রোস্ট। উত্তর আমেরিকার মেক্সিকোর জঙ্গলের এই টার্কি পাখি কেমন করে ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়লো তারও রয়েছে ৫০০ বছরের পুরনো ইতিহাস। ইংল্যান্ডের উত্তর ইয়োর্কশায়ারের ব্যবসায়ী উইলিয়াম স্ট্রিকল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করতে গিয়ে ব্রিটেনে ফিরে আসার সময় এক আমেরিকান ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৬টি টার্কি পাখি নিয়ে এসেছিলেন, সেই থেকে ব্রিটেনে টার্কি পাখির আগমন শুরু। ব্রিটেনে টার্কি আসার আগে ব্রিটিশরা বড়দিনের ফিস্ট হিসেবে শুকরের মাথা আর রাজহাঁস খেতো। উইলিয়াম স্ট্রিকল্যান্ডের আমেরিকা থেকে টার্কি নিয়ে আসার পর থেকে ব্রিটিশরা ভাবতে থাকে শুকর কিংবা রাজহাঁসকে তারা বড়দিনের বিশেষ খাবার হিসেবে ব্যবহার না করে অন্য নানা পদের খাবার হিসেবে ব্যবহার করবে। সেই থেকে তারা বড়দিনে টার্কি খেতে শুরু করে। তবে এই টার্কি খাওয়া জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে মাত্র ৬০ বছর আগে। মূলত রাজা অষ্টম হেনরি ও ৭ম অ্যাডওয়ার্ড ১৬ শতকে টার্কিকে রাজকীয় টেবিলে নিয়ে আসার পর থেকেই বড়দিনে টার্কি ভোজন ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে রেওয়াজে পরিণত হয়। এখন প্রতি বছর বড়দিনে ব্রিটেনে প্রায় ১০ মিলিয়নের মতো টার্কি পাখি বিক্রি হয়ে থাকে। যদিও শুরুতে উইলিয়াম স্ট্রিকল্যান্ড ব্রিটেনে টার্কিকে বাণিজ্যিক কারণে নিয়ে এসেছিলেন।
এবার আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশে ফিরে আসি। বৈশাখে ইলিশ-পান্তার প্রচলন আমাদের দেশে তিন দশকের। এটি এমনভাবে সমাদৃত হয় যে আমাদের বৈশাখ পালনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে খুব দ্রুত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক এর উত্থান হলেও বৈশাখে ইলিশ-পান্তা সংস্কৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে মধ্যবিত্ত শহুরে সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছে নব্বই-এর দশক থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকাকালে দেখেছি চারুকলার শিক্ষার্থীরা রমনায় পান্তা-ইলিশের স্টল দিতো। আমাদের সময় সানকি ভর্তি ইলিশ ছিল ৫০ টাকা আর এখন বাজারে একজোড়া ইলিশের দাম ৫ হাজার টাকা!
বৈশাখ ইলিশের প্রজননের কাল, এই সময়টাতেই ইলিশের চাহিদার ব্যাপকতায় মূলত এমন আগুন দাম! প্রজনন মৌসুমে জাতীয় মাছ ইলিশ নিধন না করলে পুরো বছর ইলিশ কেনা সামর্থ্যের ভেতরেই থাকবে আশা করা যায়। ইলিশের বংশ বিস্তারে এই সময়টা অপেক্ষা করাটাই কাম্য। কিন্তু শহুরে বৈশাখ উদযাপনে ইলিশ না খাওয়ার স্বাধীনতা যেমন থাকা উচিত, তেমনি চড়া দামে ইলিশ কিনে কেউ খেতে চাইলে তার ইচ্ছেকে তাচ্ছিল্য করাটাও সমীচিন নয়। এখানে এসে আবারও বড়দিনে ভিনদেশি টার্কির, ব্রিটিশ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অংশ হয়ে ওঠার প্রসঙ্গটি এসে যায়।
৫ শত বছর আগে ব্রিটিশরা রাজহাঁস কিংবা শুকরের মাথার বদলে কেন টার্কি পাখিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল সেটি না জানা গেলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে টার্কিকে বড়দিনের মেন্যু থেকে বিদায় করা রীতিমতো অসাধ্য ব্যাপার! কিন্তু মজার ব্যপার হচ্ছে, টার্কি পাখির আবাস হচ্ছে উত্তর আমেরিকার মেক্সিকোতে, তবুও এই পাখিটিই এখন ব্রিটিশদের সংস্কৃতির অংশ! তবে কেউ বড়দিনে টার্কির বদলে শুকর কিংবা রাজহাঁস খেতে পারবে না এমন রীতি কিংবা বাধ্যবাধকতা নেই। বড়দিনে ৭৮ শতাংশ ব্রিটিশ টার্কি রোস্ট খায়, তবে কি বাকিরা বড়দিন পালন করে না? টার্কি না খেলে কি বড়দিন পালন হবে না? হবে নিশ্চয়ই।
ইলিশ তো আমাদের জাতীয় মাছ, এই মাছ বৈশাখের সংস্কৃতিতে থাকলে তো দোষের কিছু নেই। তবে প্রজননের সময় ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকলে সারা বছর সস্তায় ইলিশ পাওয়া যাবে। এখন সময় এসেছে বৈশাখের মেন্যুতে ইলিশের বিকল্প কী হবে সেটা নিয়ে ভাবা। আরও একটি অতি গুরত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, প্রজনন মৌসুমে যারা ইলিশ ধরছে তাদের ক্ষেত্রে কঠোর আইনের বাস্তবায়ন। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইলিশ খেতে বারণ করার যে প্রচারণা চলছে তার সিঁকি ভাগও নেই ইলিশ ধরা বন্ধের প্রচারণায়!

যখন রেফ্রিজারেটরের প্রচলন ছিল না, ভাদ্র-আশ্বিনে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেতো তখন আমার বাবা প্রচুর ইলিশ  কিনে আনতেন। সেই ইলিশ মা বিশেষ পদ্ধতিতে লবণ দিয়ে সারা বছরের জন্য সংরক্ষণ করতেন, তাই আমরা সারা বছর খেতাম। ওই ইলিশকে বলা হতো নোনা ইলিশ । বাজারেও এই নোনা ইলিশ সারা বছর পাওয়া যেতো। এখন তো ফ্রিজ আছে ঘরে ঘরে, কেউ যদি শখ করে বৈশাখে ইলিশ মাছ খেতে চান, তাহলে কোরবানির গরুর মাংস যেভাবে সংরক্ষণ করেন, সেভাবেই ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ইলিশ কিনে বৈশাখের জন্য রেখে দিতে পারেন। তাহলে বৈশাখে আগুন দামের ইলিশের ছবি দিয়ে আর ফেসবুকে বিরক্তি প্রকাশ করতে হবে না। মৎস্য গবেষকরা প্রয়োজনে খুঁজে বের করুন, কৃত্রিম পদ্ধতিতে কীভাবে সারা বছর ইলিশের যোগান দেওয়া যায় অথবা যে সময়টাতে ইলিশের যোগান বেশি থাকে সেটিকে কিভাবে বৈশাখের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। বৈশাখে পাশ্ববর্তী দেশ বার্মা থেকে ইলিশ আমদানির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।

আরও পড়তে পারেন:
Probhash Aminঅন্ধ হলে কি আর প্রলয় বন্ধ থাকে

 সংস্কৃতি যুগে যুগে বদলায়, আমাদের যুগে বৈশাখী মেলার দিনে বাবা কিনে আনতেন সবচেয়ে বড় মাছ, মা করতেন নানা পদের ভর্তা আর নিরামিষ। দল বেঁধে মেলায় গিয়ে কিনতাম মাটির ঘোড়া, তালপাতার সেপাই, ডুগডুগি আর ট্যানটেনি (মাটির খোলাতে কাঠি যুক্ত করা দুই চাকার একধরণের ছোট্ট খেলনা, দেখতে ঠেলাগাড়ির মতো যা দড়ি ধরে টানলে অনবরত বাজে)। বাড়ি ফিরতে ফিরতে তালপাতার সেপাইয়ের হাত পা ছিঁড়ে যেতো আর মাটির ঘোড়ার শিং বা কান ভেঙে যেতো। বাকি থাকতো ট্যানটেনি। সেই ট্যানটেনির শব্দ সহ্য করতে না পেরে মা বিকেলের মধ্যেই সেটা ভেঙে ফেলতেন। এটাই তো ছিল আমাদের সংস্কৃতি! এখনকার ছেলে মেয়েরা তো মাটির ঘোড়া আর কাঠের পুতুল কেনে না , তাদের রয়েছে প্লাস্টিকের বার্বি-গার্ল আর ডিজনিল্যান্ডের মিকি মাউস! ডুগডুগির বদলে তারা অভ্যস্ত হয়েছে ভূভূজেলায়! আমাদের সংস্কৃতিতে ছাপ ফেলেছে বিশ্বায়ন। আমরা কতটা ভূমিকা রাখতে পারছি, নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষায়?

আরও পড়তে পারেন: পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ ‘বানোয়াট’ সংস্কৃতি

সাংবাদিক, শিশু সাহিত্যিক মোস্তফা হোসেইন বাংলা ট্রিবিউনে তাঁর সাম্প্রতিক কলামে ( নববর্ষে পান্তা-ইলিশ নয়, চাই বই ) লিখেছেন, 'সানকি আমাদের দারিদ্র্যের প্রতীক, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ টিনের থাল কিংবা চিনামাটির প্লেট কেনার সামর্থ্য রাখতো না, যে কারণে তাকে মাটির সানকি ব্যবহার করতে হতো, কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের সেই দারিদ্র্যকে উপহাস করার জন্য শহুরে কালচারে সানকি আমদানি করা হয়েছে।' লেখকের এধরণের চিন্তার সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে বলছি, সানকি আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ৮০ শতাংশ কৃষক যদি দরিদ্র্যতার কারণে সানকিতে পান্তা খায় তাহলে এখনও পর্যন্ত সানকি অবশ্যই সংখ্যাগুরু বাঙালির সংস্কৃতি। যদি এই ৮০ শতাংশই কোনওদিন চিনামাটির বাসনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে তবুও সানকি বাদ দিয়ে চিনামাটি কিংবা টিনের থালা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ধারক হয়ে যাবে না। গর্ব করে বলতে পারি লন্ডনে থেকেও আমরা এখনও মাটির সানকি ব্যবহার করি, প্রতিবার দইয়ের পাতিল কিনে আনলে সেই পাতিল জমিয়ে রাখি বলে কি লেখকের চোখে আমি উপহাসের পাত্র হবো? সানকি আর মাটির তৈরি পাত্র ব্যবহারের অনভ্যাসে আমরা আমাদের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পটি হারাতে বসেছি। মেলা থেকে এখন আর শীতল পাটি কিনে বাড়ি ফেরে না কেউ, সবার ঘরে আছে বৈদ্যুতিক পাখা। হাতপাখা শোভা পায় শোপিস হিসেবে। তবুও শীতল পাটি কিংবা হাত পাখাকে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। আর্থিক উন্নতি হলেই ঐতিহ্য বাদ দিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। চীনারা এখনও তাদের চ্যাপস্টিক দিয়ে খাবার খায়, জাপানিজরা টুল ছেড়ে টেবিলে বসে খাওয়া শুরু করে দেয়নি। সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে তুচ্ছ করা যায় না, আবার কারও ওপর চাপিয়েও দেওয়া যায় না। ব্যক্তির গ্রহণ ও বর্জনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। নতুন কোনও সংস্কৃতিতে যদি কেউ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সেটিকে স্বাগত জানাতে হবে, অবশ্যই নিজেদের ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে নয়।

আরও পড়তে পারেন:
নববর্ষে পান্তা-ইলিশ নয় চাই বই


গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইলিশ খাওয়া বন্ধের বিতর্কের পাশাপাশি জোর দিতে হবে, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে বিষয়ে। যারা ফেসবুক ব্যবহার করে না, টেলিভিশন কিংবা সংবাদপত্রের এই প্রচারণা তাদের কাছে পৌঁছায় না।  
সরকার শুধু মার্চ- এপ্রিল মাসের ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কিন্তু এই সময়টা জেলেদের বিকল্প জীবিকা কী হবে তা নিয়েও ভাবতে হবে। ব্রিটেনের মাছ আমদানিকারক লন্ডন ফিস বাজারের স্বত্ত্বাধিকারী মুহিব উদ্দীন জানালেন, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সরকার ইলিশ প্রজননের সময়টাতে জেলেদের ছুটি ঘোষণা করে, সরকারিভাবে 'ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল' উদযাপন করে। জেলেদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে জেলেদের নিয়ে সচেতনতামূলক এমন কোনও প্রকল্পে সরকার উদ্যোগী হলে বৈশাখে ইলিশ ধরার প্রবণতা কমবে আশা করা যায়।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মচারিদের উৎসব ভাতায় বৈশাখী বোনাস ঘোষণা করেছেন, নিঃসন্দেহে এই ঘোষণা ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। কিন্তু যে দু'মাস জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকবেন সেই সময়টা তারা কীভাবে সংসার চালাবে সেই বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভেবে দেখবেন কি?
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক। বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি ও একাত্তর টেলিভিশনের লন্ডন প্রতিনিধি।
ইমেইল: tvjournalistuk@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ