X
মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

আর কতকাল?

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২০, ২৩:৫১

মুহম্মদ জাফর ইকবাল খবরের শিরোনামটি দেখে আমি শিউরে উঠেছিলাম—একজন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আমি ভাবলাম, না জানি কোন দেশে এরকম একটা ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেছে, আমাদের দেশে তো কখনও এরকম নিষ্ঠুরতা হয় না। খবরের ভেতরে চোখ বুলিয়ে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি আমার দেশের ঘটনা, লালমনিরহাটে অক্টোবরের ২৯ তারিখে ঘটেছে। যতই খবর আসতে থাকলো ততই এটি আরও অবিশ্বাস্য এবং আরও ভয়ঙ্কর মনে হতে থাকলো। শহীদুননবী জুয়েল নামের যে মানুষটিকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। কোরআন শরিফের অবমাননা করেছেন অপবাদ দিয়ে তাকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। খবরের যে অংশটি সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সেটি হচ্ছে যখন তাকে অসংখ্য মানুষ মিলে আক্রমণ করেছে তখন তাকে উদ্ধার করে কোনও একটি অফিসে নিয়ে আসা হয়েছিল, কিন্তু তারপরেও উন্মত্ত জনতার হাত থেকে তাকে রক্ষা করা যায়নি, তারা সেখান থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করেছে। তাহলে কী মেনে নিতে হবে আমাদের দেশে আসলে কোনও মানুষের নিরাপত্তা নেই? একজন নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে একটা অপবাদ দিয়ে কিছু মানুষকে উন্মত্ত করে ফেলে যখন খুশি তাকে মেরে ফেলা যাবে? পুলিশ র‍্যাব গিয়েও তাকে বাঁচাতে পারবে না? ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে আমরা কী এর আগে একজন নিরপরাধ মহিলাকেও হত্যা করার ঘটনা দেখিনি?
লালমনিরহাটের ঘটনার তিন দিন পরে আমরা আবার একই ধরনের আরেকটি ঘটনার খবর পেয়েছি। এটি কুমিল্লার মুরাদনগরের ঘটনা। আমাদের খুবই সৌভাগ্য সেখানে কেউ মারা যায়নি, যাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছিল, তারা আগেই বাড়ি থেকে সরে গিয়েছিলেন। তাদের বাড়িগুলো পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে খবর ছড়ানো হয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একাত্মতা প্রকাশ করেছে, তারপর রীতিমতো মাইকে ঘোষণা দিয়ে পরের দিন ঢালাওভাবে সবার ওপর আক্রমণ। উন্মত্ত মানুষ যখন বাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে তখন ফায়ার ব্রিগেডকে সেই আগুন নেভানোর জন্য যেতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় সেই ঘটনা ঘটেছে–আবার সেই একই ব্যাপার, তাদের বাড়িঘর রক্ষা করা যায়নি। লালমনিরহাটে যাকে হত্যা করা হয়েছে তিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মুরাদনগরে যাদের বাড়ি পোড়ানো হয়েছে তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। আমাদের দেশটি এরকম ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলো কেমন করে?
এই ঘটনাগুলোর কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে। আমরা রামুতে এটা ঘটতে দেখেছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও ঘটতে দেখেছি, দেশের অন্যান্য জায়গাতেও প্রায় নিয়মিত এরকম ঘটনা ঘটছে। সব জায়গাতেই মোটামুটি একই ধরনের ঘটনা, প্রথমে ফেসবুকের নামে কোনও একটা রটনা হয়, তারপর মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, তারপর শত শত উন্মত্ত মানুষ ধর্ম রক্ষার নামে উন্মত্ত হয়ে ছুটে আসে। পুলিশ কিছু করতে পারে না কিংবা করতে চায় না এবং ভয়ঙ্কর কিছু ঘটনা ঘটে যায়। বিষয়টা শুধু ধর্মীয় উন্মত্ততা থেকেও বেশি কিছু হতে পারে, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। কারণ, অনেক সময় দেখা যায় যারা আক্রমণ করছেন তারা স্থানীয় মানুষ নয়, তাদের অন্য এলাকা থেকে আনা হয়েছে!
এসব ঘটনা করা হয় ধর্মের নামে অথচ ইসলাম ধর্মের কোথাও এ ধরনের কথা বলা নেই। যারা এগুলো করে তারা আর যাই বিশ্বাস করুক ইসলাম ধর্মকে বিশ্বাস করে না। আমি পবিত্র কোরআন শরিফ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি, যে কথাগুলো আমার চোখে আলাদাভাবে পড়েছে সেটি হচ্ছে, কতবার সেখানে সীমা লঙ্ঘন না করার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর মানুষ তাদের কাজকর্মে যদি সীমা লঙ্ঘন না করতো তাহলে এই পৃথিবীটাই কী একটা অন্যরকম পৃথিবী হয়ে যেতো না? কোরআন শরিফের যে আয়াতটি আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং যেটি আমি অসংখ্যবার অন্যদের শুনিয়েছি সেটি হচ্ছে এরকম, তুমি যদি একটি মানুষকে হত্যা করো তাহলে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করো (৫:৩২)–এরকম একটি অসাধারণ কথা শোনার পরও কেমন করে একজন মানুষ ধর্মের নামে আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে পারে? হজরত মোহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের সময় একটি অসাধারণ ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই ভাষণের এক জায়গায় তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণে অতীতে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। কোরআন শরিফকে অবমাননা করা হয়েছে এরকম একটি অপবাদ দিয়ে যদি একজন ধর্মপ্রাণ মানুষকে পুড়িয়ে মারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না হয়ে থাকে তাহলে আর কী বাড়াবাড়ি হতে পারে?
খবরের কাগজে দেখেছি, লালমনিরহাটের সেই ঘটনার পর বেশ কিছু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শহীদুজ্জামান জুয়েলের আপনজনের এই মুহূর্তে সান্ত্বনা পাবার কিছু নেই, যারা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে এই দেশ, দেশের সরকার এবং আমাদের মতো দেশের মানুষেরা কি অপরাধবোধের বোঝা একটুখানিও কমাতে পারবো? শহীদুজ্জামান জুয়েলের একজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল, তাঁর কাছে শুনেছি জুয়েলের একজন সদ্য এইচএসসি পাস করা মেয়ে আছে। এই মেয়েটির জীবনটিতে এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর কি কিছু আছে? জুয়েল রংপুর পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করতেন, শুনেছি তার লাইব্রেরিতে কোনও একটি অনৈতিক ঘটনা কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করার কারণে উল্টো তার নিজের চাকরিটাই চলে গেছে। সে কারণে তিনি মানসিকভাবে একটু বিপর্যস্ত হয়েছিলেন। পুরো বিষয়টি কি আরও একটু ভালো করে তদন্ত করে দেখা উচিত নয়? জীবনটা তছনছ করে দেওয়ার জন্য আরও কোথাও কি তার ওপর অবিচার করা হয়েছিল? এই পরিবারের উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই, সরকার এবং প্রশাসনের অবশ্যই এই পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের সাহায্য করা দেশের সরকারের দায়িত্বের ভেতর পড়ে। তবে সেই ঘটনাটি ঘটতেই না দেওয়া আসলে সরকারের সত্যিকারের দায়িত্ব।
তাই আমরা আশা করবো সরকার তার মূল দায়িত্বটি আগে পালন করবে–এই দেশে এরকম ঘটনা ঘটতেই দেবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও অনেক বেশি সতর্ক থাকবে, তাদের ইন্টেলিজেন্স আরও অনেক বেশি কার্যকর হবে। মুরাদনগরের ঘটনার পর সেখানকার পুলিশের কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ এসেছে, তাদের কেউ কেউ নাকি বলেছেন, ইউনিফর্ম পরা না থাকলে তারাও এই ধর্ম রক্ষার আন্দোলনে যোগ দিতেন! এরকম পুলিশ কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করতে হবে, যারা আমাদের দেশের মূল আদর্শকেই বিশ্বাস করে না।
সামনের বছরটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর। যে স্বপ্নটিকে সামনে রেখে ৫০ বছর আগে আমাদের দেশ মুক্ত করা হয়েছিল সেটি কি আমাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নয়? এই স্বপ্ন পূরণের জন্য আর কতকাল আমরা অপেক্ষা করবো?
লেখক: শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক।

 

/এসএএস/এমএমজে/

সম্পর্কিত

‘টিকা’ টিপ্পনী

‘টিকা’ টিপ্পনী

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

আমাদের আয়শা আপা

আমাদের আয়শা আপা

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

কুল্লাপাথরে শায়িতদের জাতীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হোক

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৭:৫৬

মোস্তফা হোসেইন যুদ্ধশেষের যুদ্ধে জড়িয়ে আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। তাদের যুদ্ধটা মূলত মহান এই লড়াইয়ের বীরত্বকে প্রজন্মান্তরে তুলে ধরা এবং বীরদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। তেমনি এক যোদ্ধা ছিলেন আব্দুল করিম। সীমান্তবর্তী কসবা উপজেলার কুল্লাপাথরে পিতার দেওয়া একটি টিলার ওপর শায়িত ৫২ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে আগলে রেখেছিলেন অর্ধশতাব্দীকাল। বাঁশের খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত করা কবরগুলো ধীরে ধীরে পাকা হলো। কবরস্থান সীমানা দেয়ালে ঘেরা হলো। হলো আরও কিছু স্থাপনা। কিন্তু একটা অতৃপ্তিবোধ ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের মনে। শুধু বলতেন, কী করলে এই বীরদের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো হবে। মাঝে মাঝেই ফোন দিতেন। প্রস্তাব করতেন এবং প্রস্তাব চাইতেন। কী করা যায় সেখানে। মাস দুয়েক আগেও ফোন করে বললেন, আরও কিছু করা দরকার।  

জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী করতে চান করিম ভাই?

বললেন, বাংলাদেশের বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থান এখানে। এটাকে কেন্দ্র করে এখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হোক। বললেন, আমাদের এই অঞ্চলে অনেক মুক্তিযোদ্ধার কবর কাছে, অনেক যুদ্ধস্মারক অযত্নে পড়ে আছে। সেগুলো যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা যেতো তাহলে অনেক যুদ্ধস্মারক ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পেতো। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার জন্য অবকাঠামোগত ব্যয় খুব বেশি হবে না। বর্তমান গেস্ট হাউজকে বর্ধিত করে সেটা করা সম্ভব। আমারও মনে হয়েছিল, ঠিকই তো। এখানে গবেষণা কেন্দ্র হতে পারে একটা। প্রয়োজনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তত্ত্বাবধান করতে পারে।

বলেছিলেন করিম ভাই, করোনা পরিস্থিতি একটু ভালো হলে তিনি ঢাকা আসবেন। আমি যেন তাকে সহযোগিতা করি। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী এই বীরও পরাজিত হলেন করোনার কাছে। ২২/২৩ জুলাই করিম ভাই’র ছেলে মাহবুব করিম ফোন করে জানালো ওর বাবাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ২৭ তারিখ বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জামিল ডি আহসান বীর প্রতীক বললেন, করিম সাহেবের অবস্থা ভালো না। তাকে ডিএনসিসি হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। মধ্যরাতে খবর পেলাম তিনি পরপারে চলে গেছেন।

তার মৃত্যু সংবাদটা কাঁটার মতো বিঁধলো মনে। একই হাসপাতালে মাত্র ৪ দিন আগে আমার মেঝ ভাইও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

তাঁর মৃত্যুতে দেশব্যাপী কোনও নাড়া পড়েনি। প্রতিষ্ঠিত ও সমাজের উঁচুস্তরের মানুষের মৃত্যুর পর যেমন শোকবার্তা কিংবা সংবাদ হয়, তেমনও হয়নি। কিন্তু যখন তাঁর ও তাঁর বাবা আব্দুল মান্নানের অবদানের কথা মনে হয়, তখন ভাবি- এসব মানুষকে মূল্যায়ন আমরা করতে পারিনি, করার কোনও সংস্কৃতিও নেই। সেই অপারগতা যে জাতি হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধ করে বলতে দ্বিধা হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অরক্ষিত আছে অসংখ্য গণকবর। কত ভয়াবহ যুদ্ধস্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে সংরক্ষণের অভাবে। আর আব্দুল মান্নান আর তার ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের ঐকান্তিক চেষ্টায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থান সংরক্ষণ হয়ে আসছিল এতদিন। এর কি মূল্যায়ন হয়েছে?  

কিছুটা বোঝা যাবে কুল্লাপাথরে মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানের ইতিহাসের দিকে তাকালে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং যুদ্ধ সংগঠিত করার পাশাপাশি কিছু অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ের দিকে নজর দিতে হয় মুক্তিযুদ্ধের পরিচালকদের। কুল্লাপাথর ছিল সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের এলাকা।  ওই শহীদদের ভারতীয় এলাকায় দাফন করা হচ্ছে। এটা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু নিরাপদ জায়গাও পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই সুবাদে ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দার কথা বলেন আব্দুল করিমের বাবা আব্দুল মান্নানের সঙ্গে। তারপর মান্নান সাহেব খালেদ মোশাররফের সঙ্গেও কথা বলেন। আর সেই কাজটিকে দ্রুততর করে এক মহান শহীদের শেষ চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে। তিনি বীর শহীদ প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম। যুদ্ধে গুরুতর  আহত হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যু হলে যেন বাংলাদেশের মাটিতে দাফন করা হয়। সেই কাজটিই করা হলো একাত্তরে। কবরস্থানের জায়গা হিসেবে খালেদ মোশাররফ কুল্লাপাথরের তিনটি পাহাড়ের পশ্চিমের অংশকে পছন্দ করেন। জায়গাটা নোম্যান্স ল্যান্ড-সংলগ্ন হওয়ার পরও নিরঙ্কুশ নিরাপদ ছিল এমনটা নয়। তবে তুলনামূলক নিরাপদ তো অবশ্যই। কুল্লাপাথর থেকে মাত্র দেড় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে সালদানদী রেলস্টেশন। ওখানে পাকিস্তানিদের শক্তিশালী ঘাঁটি। ওখান থেকে পাকিস্তানিরা মুক্তিবাহিনীকে লক্ষ্য করে সারাক্ষণ মর্টার নিক্ষেপ করে, পূর্বদিকে ভারতীয় সীমান্ত লক্ষ্য করে। আবার মুক্তিবাহিনী পাল্টা গুলি করে ভারতীয় সীমান্ত থেকে। মাঝখানেই বলা যায় কুল্লাপাথরের করিম সাহেবদের বাড়িটিকে। তারপরও বাংলাদেশ এলাকায় এর চেয়ে ভালো জায়গা খুঁজে পাননি খালেদ মোশাররফ। সেখানেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের দাফন শুরু হয়।

এই গুরুদায়িত্বটি গ্রহণ করেন আব্দুল মান্নান। সঙ্গী হিসেবে পান গ্রামের দুয়েকজনকে। প্রত্যেক শহীদকে ইসলামি বিধান অনুযায়ী দাফন করা হয় সেখানে। দুয়েকজনের দাফনকালে আব্দুল করিমও সহযোগিতা করেন বাবাকে। কিন্তু নিজে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে যুদ্ধকালে সেখানে থাকতে পারেননি তিনি।

বিজয়ের পর একসময় আব্দুল করিম স্থানীয় একটি হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হলেন। ওই সময় ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার চিন্তা করতে পারেননি তিনি অনেকটা এই কবরস্থানের কারণেও। এক ধরনের আকর্ষণ তাকে পেয়ে বসে। এরমধ্যে তাঁর বাবা আব্দুল মান্নান ইন্তেকাল করেন। সেই থেকে পুরো কবরস্থানের দেখভালের দায়িত্ব পড়ে আব্দুল করিমের ওপর। তিনি ভাবতে থাকেন এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কবরগুলোর সৌধ নির্মাণ করা জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্বভুক্ত। দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন বিভিন্ন বিভাগ ও দফতরে। সবশেষে সরকারি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত হয়। পাহাড়ের ওপর কবরগুলোকে পাকা করা হয়। পাহাড়ে ওঠার জন্য সিঁড়ি তৈরি হয় পাকা। কবরস্থানের উত্তর-পশ্চিম কোণে বেদি তৈরি হয়, যেখানে এপিটাফ কিংবা ম্যুরাল তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করে সরকার একসময় সালদানদী থেকে কুল্লাপাথর পর্যন্ত রাস্তা পাকা করে। যদিও অনেকেই মনে করছেন, এই রাস্তার কাজটি গতিশীল করে দিয়েছে সেখানকার গ্যাসফিল্ড। উন্নয়নমূলক কাজ হিসেবে সেখানে তৈরি হয়েছে মসজিদ, গেস্টহাউজ ও পাকাঘাট।

তিনটি পাহাড়ের একটিতে বাস আব্দুল করিমের পরিবারের। মাঝখানে ছোট এক চিলতে সমতলভূমি। ওখানে গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।

দুর্ভাগ্যজনক সংবাদ পাওয়া গেছে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে। সীমান্তঘেঁষা এলাকা হওয়ায় সেখানে অহিতকর নানাকাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে শহীদদের কবরস্থানের পবিত্রতা নষ্ট হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের মৃত্যুর পর বারবার মনে হচ্ছে– এভাবে প্রতিটি শহীদকে সহোদর ভাববেন কি অন্য কেউ? কবরস্থানকে পরিত্যক্ত না ভেবে এখান থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করতে এগিয়ে আসবে কি কেউ?

জাতীয় বীরদের স্থায়ী ঠিকানা জাতীয়ভাবেই সংরক্ষণ হওয়ার কথা। যতটা জেনেছি, এই কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ। এ নিয়ে আব্দুল করিমেরও বক্তব্য ছিল। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় কিংবা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এর দায়িত্ব নেওয়া উচিত। আর অত্যন্ত মনোরম পরিবেশের কুল্লাপাথরে গবেষণা কেন্দ্র এবং সরকারিভাবে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠাও প্রয়োজন বলে মনে করি। সবশেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিমের যুদ্ধশেষের যুদ্ধ যেন সফল হয়, সেটাই কামনা করছি।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

গরিবের কথা একটু হলেও ভাবুন

গরিবের কথা একটু হলেও ভাবুন

গণপরিবহনে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিকার কি নেই?

গণপরিবহনে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিকার কি নেই?

লাল সবুজের আবেগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

লাল সবুজের আবেগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

হেফাজতের নতুন কৌশল

হেফাজতের নতুন কৌশল

গ্রেফতার মানেই মদ কেন?

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৬:৪৫

আমীন আল রশীদ গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে একসময়ের চিত্রনায়িকা একাকে আটক করেছে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে শনিবার (৩১ জুলাই) বিকালে তাকে রাজধানীর উলনের বাসা থেকে আটক করা হয়। হাতিরঝিল থানার ওসি জানান, একার বাসা থেকে পাঁচ পিস ইয়াবা, ৫০ গ্রাম গাঁজা ও মদ উদ্ধার করা হয়েছে।

এর ঠিক একদিন আগে রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেফতার করা হয় সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য পদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। অভিযান শেষে র‌্যাব জানায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ, বিয়ার, বিদেশি মুদ্রা, চাকু, মোবাইল সেট, ক্যাসিনো সরঞ্জাম, এটিএম কার্ড ও হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে।

একই সময়ে পিয়াসা ও মৌ নামে আরও দুই নারীকে আটক করা হয়, যাদের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য বলে দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—যারা রাতে বিভিন্ন পার্টিতে গিয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের টার্গেট করে বাসায় ডেকে আনতেন। এরপর বাসায় গোপনে তাদের আপত্তিকর ছবি তুলতেন। সেই ছবি বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের দেখানোর ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতেন। পয়লা আগস্ট রাতে রাজধানীর বারিধারা ও মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পুলিশ বলছে, তাদের বাসায় বিদেশি মদ ও ইয়াবা পাওয়া গেছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদসহ অনেক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এমনকি যুবলীগ নেতা সম্রাটসহ আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতারের সময় তাদের বাসা থেকে মদ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। অথচ তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই অন্য অনেক অভিযোগ ছিল। প্রশ্ন হলো, এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাসা থেকে মদ উদ্ধারের কথা কেন বলা হয়? বড় ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের বাসায় দুই চার বোতল মদ থাকা কি খুব অস্বাভাবিক?

গৃহকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে—শুধু এই অভিযোগই কি সাবেক চিত্রনায়িকা একার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত না? বাসা থেকে মদ ও গাঁজা উদ্ধারের কথা কেন বলতে হলো? আসলেই কি বাসায় মদ ছিল? পিয়াসা ও মৌ নামে যে দুই নারীকে আটক করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যদি ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ থাকে, তাহলে এই অভিযোগেই কি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না? নাকি আসলেই তাদের বাসা থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, যেহেতু বাংলাদেশ একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ এবং এ দেশের মানুষের বড় অংশই ধর্মভীরু—ফলে কাউকে গ্রেফতারের সময় যদি মদ উদ্ধারের কথা বলা হয়, সেটি সামাজিকভাবে ওই ব্যক্তির প্রতি মানুষের ক্ষোভ তৈরিতে সহায়তা করে। তাকে সামাজিকভাবে অসম্মানিত করে। যাতে মানুষ তার আসল অপরাধটি আমলে না নিয়ে বরং তার বাসায় যে মদ পাওয়া গেছে এবং তিনি যে মদপান করেন, এটিই মুখ্য হয়ে ওঠে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসায় গণহারে তল্লাশি চালানো হলে সম্ভবত অধিকাংশের বাসায়ই দুই চার বোতল মদ পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া মদপান করা বেআইনি হলেও অসংখ্য মদের দোকান বা বার রয়েছে। প্রতিটি অভিজাত ক্লাবেই বার রয়েছে। এসব ক্লাব ও বারে গিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মদপান করেন বা কিনে নিয়ে আসেন—যাদের অধিকাংশেরই মদপানের লাইসেন্স নেই। এসব বার ক্লাবে প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায় না। যদি চালাতো তাহলে লাইসেন্স ছাড়া মদপান ও মদ কেনার অপরাধে প্রতিদিন কয়েক হাজার লোককে গ্রেফতারের করতে হতো।

মদ উদ্ধারের বিষয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মেয়ে জেসিয়া আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, তার ভাই মদ পান করেন। সেগুলোই বাসায় ছিল। তবে ভাইয়ের মদপানের লাইসেন্স রয়েছে। আর হরিণের চামড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তার ভাইয়ের বিয়ের সময়ে তার মায়ের সঙ্গে রাজনীতি করা নেতানেত্রীরা মিলে ওই চামড়াটি উপহার দিয়েছিলেন। যেটি দেয়ালে ঝোলানো ছিল। ক্যাসিনোর সরঞ্জামের বিষয়ে তিনি বলেন, সময় কাটানোর জন্য তারাই ক্যাসিনো খেলতেন। জেসিয়া বলেন, এটা বাসায় বসে তাস খেলার মতো।

জেসিয়ার এই কথার কতটুকু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমলে আর সাধারণ মানুষ কতটুকু বিশ্বাস করবে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, দেশের আইন কী বলছে? ঘরে বসে খেলার জন্য কেউ কি ক্যাসিনো সরঞ্জাম রাখতে পারেন? ক্যাসিনো মূলত জুয়া। দেশের অসংখ্য ক্লাবে প্রতিনিয়তই জুয়া খেলা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে জুয়া খেলা নিষিদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কতগুলো ক্লাবে জুয়া বন্ধ করা সম্ভব? মূলত পয়সাওয়ালারাই জুয়া খেলেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই ক্যাসিনো বৈধ। সারা পৃথিবীর ধনী লোকেরা যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস শহর এবং ইউরোপের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র মোনাকোয় যান ক্যাসিনো খেলতে।

দেশে বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী হরিণ শিকার নিষিদ্ধ। সেই হিসেবে কারও বাসায় হরিণের চামড়া পাওয়া গেলে এটা অবৈধ। কিন্তু কেউ যদি বিদেশ থেকে হরিণের চামড়া কিনে আনেন বা কেউ যদি এরকম উপহার পান, সেটি কি অবৈধ? অসংখ্য বড়লোকের বাসার ড্রয়িংরুমের দেয়ালে হরিণের চামড়া আছে। সব বাসায় অভিযান চালিয়ে কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হরিণের চামড়া আটক করে বন্যপ্রাণী আইনে ওই বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করবে? হরিণ শিকার আর বাসার দেয়ালে শখের বশে হরিণের চামড়া ঝুলিয়ে রাখা কি এক? অনুসন্ধানের বিষয় হলো, ওই হরিণের চামড়ার উৎস কী? কেউ যদি হরিণ শিকার করে তার চামড়া ঝুলিয়ে রাখেন বা দেশের কোনও বাজার থেকে হরিণের কাঁচা চামড়া কিনে নেন, সেটি নিশ্চয়ই বেআইনি। হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসার দেয়ালে ঝুলানো হরিণের চামড়াটি কি অবৈধ?

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে ধরার জন্য বা তাকে আইনের মুখোমুখি করার জন্য তার বাসা থেকে মদ, ক্যাসিনো সরঞ্জাম বা হরিণের চামড়া উদ্ধার করতে হবে কেন? তার বিরুদ্ধে মূল যেসব অভিযোগ, তার একটি বড় অংশই ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার। সুতরাং এই অভিযোগেই তো তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নাকি দেশের প্রচলিত আইনে মদ উদ্ধারের বিষয়টি বেশি স্পর্শকাতর এবং এই ইস্যুতে আসামিকে ‘সাইজ’ করা সহজ হয়?

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ, তিনি ‘জয়যাত্রা’ নামে যে আইপি টেলিভিশন চালাতেন, সেটি অবৈধ। যদিও সম্প্রচার চ্যানেল হিসেবে যেসব সেটআপ থাকা দরকার তার সবকিছুই রয়েছে। সুতরাং একটি অবৈধ গণমাধ্যম চালানোর অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতো। যদিও দেশে আরও অসংখ্য আইপি টিভি রয়েছে, যেগুলোর আইনি বৈধতা নেই। এসব আইপি টিভির মূল কাজ চাঁদাবাজি—এমন অভিযোগও নতুন নয়। সুতরাং, যে যুক্তিতে ‘জয়যাত্রা’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেই একই যুক্তিতে অন্য সব আইপি টিভিও বন্ধ করে দেওয়া দরকার। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, অনেক আইপি টিভির পেছনেই কোনও না কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গ্রেফতারের সময় শুধু মদ নয়, কারও কারও ক্ষেত্রে নারী ইস্যুও সামনে আনা হয়। যেমন, সম্প্রতি অভিনেত্রী পরীমনির দায়ের করা মামলায় ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে তিন নারীকেও গ্রেফতার করা হয়— যাদের ‘রক্ষিতা’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়। প্রথম কথা হচ্ছে, পুলিশ কোনও নারীকে ‘রক্ষিতা’ বলে গণমাধ্যমের সামনে পরিচয় দিতে পারে কিনা? রক্ষিতা মানে কী? রাষ্ট্রের কোন আইনে রক্ষিতা শব্দটি রয়েছে এবং কোন কোন মানদণ্ডে একজন নারীকে রক্ষিতা বলা যায়? তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন, পরীমনির মামলা ব্যবসায়ী নাসিরের বিরুদ্ধে। তাহলে ওই তিন নারীকে কেন গ্রেফতার করা হলো? তাদের অপরাধ কী? ঘটনার সময় কি তারা নাসির উদ্দিনের সঙ্গে ছিলেন? কেন তাদের রিমান্ডে নেওয়া হলো?
সুতরাং, কোনও অপরাধীকে গ্রেফতার করা হলে আমরা খুশি হই এটা যেমন ঠিক, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোন শব্দ ব্যবহার করে, কী কী তথ্য দেয়, কোন প্রক্রিয়ায় কাকে গ্রেফতার বা আটক করে, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় কিনা, রিমান্ডের নামে আসলে কী হয়—এসব প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।  

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন। 

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

মহামারিকালে হাসপাতাল বন্ধ!

মহামারিকালে হাসপাতাল বন্ধ!

বুদ্ধিজীবী তর্কের লাভ-ক্ষতি

বুদ্ধিজীবী তর্কের লাভ-ক্ষতি

আমলাতন্ত্র নিয়ে সমালোচনার তির কার দিকে যাচ্ছে?

আমলাতন্ত্র নিয়ে সমালোচনার তির কার দিকে যাচ্ছে?

সমাজে ইসলামিক বক্তাদের প্রভাব ও জনসংস্কৃতির তর্ক

সমাজে ইসলামিক বক্তাদের প্রভাব ও জনসংস্কৃতির তর্ক

লকডাউনের শিথিলতা মহাবিপদের পূর্বাভাস

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ১৭:৪০
সালেক উদ্দিন ‘শিথিল হয়ে আসছে কঠোর লকডাউন’ খবরের কাগজের এমন শিরোনামকে ভয়ংকরই বলতে হবে। শুধু খবরের কাগজে, অনলাইন পোর্টালের নিউজে বলবো কেন? চোখ মেলে যা দেখছি তাতে এমনই মনে হচ্ছে। প্রতিদিনই  রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানবাহন বেড়ে চলছে, চেকপোস্টে গাড়ির জট বাড়ছে, পদ্মার দুই নৌ-রুটে, ফেরিঘাটে মানুষের লাইন প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে। ঢাকার রাস্তা তো এখন প্রাইভেট কার, রিকশা, অটোরিকশা, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেলের দখলে। রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার রিকশা আর  মানুষের অবাধ চলাচল ইত্যাদি কি আর এই খবরের সত্যতা যাচাইয়ের অপেক্ষা রাখে?

ঈদের একদিন পর অর্থাৎ ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।

শুরুতে দুই তিন দিন মনে হয়েছিল বোধহয় সত্যিই তাই। এখন আর সে রকম মনে হয় না। টেলিভিশনের খবর, সংবাদপত্রের খবর, রাস্তায় চোখ মেলে দেখা- যেভাবেই দেখুন না কেন এই লকডাউনও আগের লকডাউনের মতোই একই পথে হাঁটছে, যা জাতির জন্য মহাবিপর্যয়ের অশনি সংকেত।

বাংলাদেশের তো বটেই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এখন করোনার মহামারি। পৃথিবীকে স্বস্তি দিচ্ছে না এই ব্যাধি। বাংলাদেশে এখন প্রতিদিনই সংক্রমণের রেকর্ড ভাঙছে। রেকর্ড ভাঙছে মৃত্যুর। এর ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কেউ জানে না। তবে কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে। আর সেই আন্দাজের আলোকেই এই ঈদের আগেই বাংলা ট্রিবিউনেই ‘এবার ঈদযাত্রা বন্ধ হোক’ শিরোনামে লিখেছিলাম- ‘যদি গত রোজার ঈদের মতো কোরবানির ঈদেও লাখ লাখ মানুষ ঢাকাসহ শহর অঞ্চল থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঈদযাত্রায় অংশ নেয় তবে তা হবে করোনার কাছে আত্মাহুতি দেওয়ার শামিল। রোজার ঈদের সময় দেশে করোনা অবস্থা নিয়ন্ত্রণে ছিল। এবার রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায়। এমন কঠিন অবস্থায়ও যদি এবারের ঈদযাত্রার  মানুষদের ঠেকানো না যায় তবে বলতেই হবে করোনার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া দেশের মানুষের আর কোনও উপায় নেই।’

আমার সেই লেখাটি পাঠকদের কাছে সমালোচিত হয়েছিল। অনেক পাঠকই তাদের মতামতে নিন্দার তীরটি নিক্ষেপ করতে ভুল করেননি। কেউ কেউ আমি মুসলমান কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সম্ভবত তারা শুধু ঈদে বাড়ি যাওয়ার কথাই ভেবেছেন। একবারও ভাবেননি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানুষকে মহামারি আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করতে বারণ করেছেন এবং আক্রান্ত এলাকা থেকে বের না হওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। যার ফলে ধর্মযুদ্ধে গিয়ে হজরত ওমর (রা.) যখন জানলেন সেই এলাকায় মহামারি চলছে, তখন তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে আর মহামারি আক্রান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেননি। যুদ্ধ না করে ফিরে এসেছিলেন।

সময় এসেছে ভেবে দেখার- আমরা ধর্মের নির্দেশনা মানছি কিনা?

যাহোক, তারপরও  ঈদের কারণে সরকারকে লকডাউন শিথিলের নামে মূলত লকডাউন তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঈদের একদিন পর থেকে ১৪ দিনের কঠোর  লকডাউনের ঘোষিতও হয়েছে। এই ঘোষণায় কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হয়েছিলাম।

আশ্বস্ত হয়ে আরেকটি অনলাইন পোর্টালে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লির লকডাউনের উদাহরণ টেনে লিখেছিলাম, সর্বশেষ ঘোষিত এই লকডাউন যদি দিল্লির মতো সত্যিই কঠোর থেকে কঠোরতর হয় এবং টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যায় তবে দেশ করোনা মহামারির মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পারে। আর তা না হলে করোনায় দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ১২/১৩ হাজার থেকে ৫০ হাজার  ছড়ানো এবং মৃত্যু দুই শতকের ঘর থেকে হাজারের ঘর পার হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। করোনার ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর বিচারে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি সে পথেই যাচ্ছে।
 
সবাইকে মাঠ পর্যায়ে করোনার টিকা দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, টিকা কার্যক্রমে নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত হওয়ার নির্দেশ, ৭ আগস্ট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কেন্দ্রে এনআইডি কার্ড নিয়ে গেলেই টিকা দেওয়ার ঘোষণা, আগস্টের আগে শিল্প কারখানা না খোলার সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে পালিত হলে করোনা দৌড়ের গতি কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু লকডাউন বর্তমানে যেভাবে চলছে যদি সেভাবে চলে অথবা আরও শিথিল হয়, তবে এতে খুব একটা কাজ হবে বলে মনে হয় না।

লকডাউন কঠোর থেকে কঠোরতর হওয়ার  প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। লকডাউনে মানুষ যদি ঘর থেকে বের হতে না পারে তাহলে মানুষের কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যাভাবে মারা যাওয়ার কথা যারা বলছেন তাদের কথা ঠিক নয়। এরও বিকল্প আছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নেতৃত্বে আগ্রহী সাধারণ মানুষদের নিয়ে পাড়ায়-মহল্লায় গ্রামগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক  দল গঠন করা যেতে পারে। এদের দ্বারা খাদ্য চিকিৎসাসহ সরকারি বেসরকারি খাতের সহায়তা সামগ্রী সংকটে পড়া মানুষদের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তকেও এর আওতায় আনতে হবে। মধ্যবিত্ত এমন একটি শ্রেণি, তারা কষ্টের কথা না বলতে পারে, না সইতে পারে!

প্রকৃতপক্ষে এদের একটা বিরাট অংশ বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। বিষয়টি আমাদের মাথায় থাকতে হবে।

করোনার সঙ্গে যুদ্ধে সবার আগে প্রয়োজন শতভাগ জনসচেতনতা। এ ব্যাপারে অন্তহীন প্রচেষ্টা আমরা দেখেছি। কাজ হয়নি। এখন সেই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার যাতে কাজ হয়। বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে ত্যাগ করার কথা গুণীজনেরা বহুবার বলেছেন। করোনার রশি টেনে ধরা জাতির জন্য বৃহত্তর স্বার্থ। এতে যদি কিছু দিন মানুষকে ঘরে বসে কাটাতে হয়, খাদ্যাভাবের কষ্ট করতে হয়, তবে এই ত্যাগটুকু করতেই  হবে।

করোনা নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো টিকা প্রদান এবং জীবনযাত্রায় নিয়মতান্ত্রিকতা নিশ্চিত করা। এরইমধ্যে টিকার সহজলভ্যতার নিশ্চয়তা সরকার দিয়েছে। এবার নিশ্চিত করতে হবে জীবনযাত্রার নিয়মতান্ত্রিকতা। এর জন্য এই মুহূর্তে অন্তত লকডাউনের সময়টুকুতে মানুষকে ঘরে রাখার বিকল্প নেই। তারপরও মানুষ যদি ঘরে না থাকে তবে জোর প্রয়োগসহ সরকারের যা যা করা দরকার তাই করতে হবে। যতটা কঠোর হওয়া দরকার অবশ্যই ততটা হতে হবে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে এ নিয়ে কে কী বললো তা নিয়ে ভাবা সরকারের উচিত হবে না।

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় হোক আমাদের সবার।

লেখক: কথাসাহিত্যিক
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

ঈদ আনন্দে ভেসে যাক করোনার মহামারি

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

ঈদযাত্রা এবারের জন্য বন্ধ হোক

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

দৃষ্টি এখন কঠোর লকডাউনের ওপর

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

বাবাদের যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ২০:৩৮

ফারাজী আজমল হোসেন 'পাওয়ার পলিটিকসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। চীন কখনোই আধিপত্যকামী হবে না। প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাবে না'- কথাগুলো শুনলে যে কারও মনে হতে পারে, বিশ্বের সবচাইতে বড় গণতন্ত্র মনস্ক ব্যক্তি এই মন্তব্যগুলো করেছেন। কিন্তু আসলে এই মন্তব্য চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। চায়না কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ১০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এসব মন্তব্য করেন তিনি। তাইওয়ানের আকাশ সীমানায় বিমান পাঠিয়ে ও সমুদ্র সীমায় যুদ্ধ জাহাজ পাঠালেও বিষয়টিকে সম্ভবত 'আধিপত্যবাদী' আচরণ হিসেবে দেখছে না চীন। একই চিত্র হংকংয়ে। সম্প্রতি চীনের বন্ধুত্বের কল্যাণে বন্ধ হয়ে গেছে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী পত্রিকা অ্যাপল ডেইলি।

চীন সমুদ্র সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ চীন সাগর এবং সেখানকার কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করছে। সেখানে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলোর আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও চীন ওই অঞ্চলকে তার একক বলেই দাবি করছে। যার জন্য বর্তমানে ওই অঞ্চলের প্রায় ২০টি দেশের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। এ ছাড়াও ইন্দো প্যাসিফিক, এমনকি বঙ্গোপসাগরেও আধিপত্য বিস্তার করাকে লক্ষ্যের মধ্যে রেখেছে চীন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মিয়ানমার থেকে পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত তাদের নৌ-শক্তির আওতায় আনার উদ্দেশ্য নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। এই লক্ষ্যে ওখানকার পোর্টগুলোকে নেভাল বেইজে রূপান্তরিত করার যাবতীয় কাঠামোও তৈরি করে ফেলেছে চীন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাগর ও সাগরতলের সম্পদ সব দেশের সম্পদ হওয়ায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নৌ-শক্তিতে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়া চীনের আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। চীনের এই আগ্রাসন মোকাবিলা করার জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট কোয়াড সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জোট হিসেবে কোয়াডের উত্থানকে তাই চীন নিজের জন্য হুমকি মনে করছে। অন্যদিকে সমগ্র বিশ্বের ধারণা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যে আচরণ করছে, নৌশক্তি আরও বাড়িয়ে ইন্দো প্যাসিফিকে এসেও ঠিক একই আচরণ করবে। চীনের এই নৌপথ দখল ও সামরিক আধিপত্য ঠেকাতে একমাত্র কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে চার শক্তির সামরিক জোট কোয়াড।

ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত কোয়াড্রিলেটরাল সিকিউরিটি ডায়লগ (কোয়াড)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অধিকার-বহির্ভূত কথা বলেছেন এ দেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় চীনকে। এ বিষয়ে কথা বলার কোনও এখতিয়ার চীনের নেই বলেও জানানো হয়। কিন্তু চীনের পররাষ্ট্র বিভাগ জানায়, কোয়াড চীনকে বাদ দিয়ে গঠন করায় এই বিষয়ে যেকোনও মন্তব্য করার অধিকার চীনের রয়েছে (!)। বেশ অদ্ভুত এক যুক্তি!

চীনের এমন বন্ধুত্ব অবশ্য বিশ্বজুড়ে রয়েছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও মিয়ানমার চীনের বন্ধুত্বের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সম্প্রতি এই বন্ধুত্বের উষ্ণতা কিছুটা অনুভব করা শুরু করেছে আফগানিস্তান।

চীন পাওয়ার পলিটিকসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে। সে ক্ষেত্রে চীনের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা 'সুপার পাওয়ার পলিটিকস' কে ঘোচাবে? বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে কে?

পাকিস্তানের জঙ্গিবাদী চেতনা ও আচরণ নিয়ে কখনই কোনও মন্তব্য করেনি চীন। সেই সঙ্গে চীনে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যাতন নিয়েও কখনও পাকিস্তান বিরূপ মন্তব্য করেনি। ইমরান খানের শাসনামলে পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন। শি জিনপিং সরকারের কাছে ইমরান খানদের মোট ঋণের পরিমাণ দেশটির বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৩ গুণ। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা পাকিস্তানে নতুন কোনও বিনিয়োগ করছে না যুক্তরাষ্ট্র। যার শতভাগ সুযোগ নিয়েছে চীন। দেশটির ঋণের বোঝার নিচে চাপা পড়ে মুসলিম নির্যাতন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন বিষয়ে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নগ্ন হস্তক্ষেপ নিয়েও কথা বলতে পারছেন না ইমরান খান।

একই চিত্র শ্রীলঙ্কায়। ঋণের বোঝার নিচে চাপা পড়ে শ্রীলঙ্কা তার একটি সমুদ্রবন্দর দীর্ঘ মেয়াদে চীনকে অনেকটা 'বন্ধক' দিতে বাধ্য হয়েছে, যা নিয়ে ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে দেশটির। মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একসময় চীনের নগ্ন হস্তক্ষেপের ফলে ডলারের বদলে সরাসরি চীনের মুদ্রায় বাণিজ্য চলে কিছু দিন। নেপালের সীমান্তে অবস্থিত একটি গ্রাম দখল করে নিয়েছে চীন। গত বছরজুড়ে থেমে থেমে ভারতের সীমান্তেও সংঘর্ষ চালিয়ে গেছে চীন। এসব আচরণকেও হয়তো শি জিনপিং 'আধিপত্যবাদী' আচরণ হিসেবে দেখছেন না।

তবে অর্থনৈতিক এসব আধিপত্যবাদের থেকেও বড় একটি বিষয় এখন কপালে ভাঁজ ফেলছে বিশ্বনেতাদের। বিশ্বের ১৬০টি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাতে যাচ্ছে চীন। ওই সব দেশে ক্ষমতায় থাকা সরকারের 'পাওয়ার পলিটিকস' হয়তো সহ্য করবে না চীন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সরকারি দলকে পাশ কাটিয়ে ছোট, মাঝারি অন্য দলগুলোর সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখছে সিপিসি।

দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় শঙ্কার বিষয় আফগানিস্তান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। এই সুযোগে আবারও দেশটির ক্ষমতা দখলে নিতে চাইছে তালেবান। যেখানে দেশটিতে তালেবানের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্ব, তখন জঙ্গিবাদী তালেবানদের সহায়তায় পাশে দাঁড়াচ্ছে চীন! পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো দুটি দেশে জঙ্গিদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে ঘাঁটি তৈরি হলে বিষয়টি শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বরং বিশ্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। প্রশ্ন হলো, কোন সৎ (!) উদ্দেশ্যে চীন তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে সেই সুযোগ সবচাইতে বেশি ভোগ করবে কোন দেশ?

তালেবানের পুনরুত্থান আফগানিস্তানকে আবার বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। পরাশক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি শক্তিশালী দেশকে নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষতে হচ্ছে। দুই দশক পর আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে দেশটির নিজেদের প্রধান বিমান ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছে তারা। এরপরই আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের দখল নেওয়া শুরু করেছে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী তালেবান। দেশটিতে তালেবান ক্ষমতায় এলে সংকটে পড়তে পারে কিছু দেশের স্বার্থ। তালেবানের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা যত বাড়ছে, গোষ্ঠীটির সঙ্গে নানা দরকষাকষি ও বোঝাপড়া করে নিতে চাইছে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো।

আফগানিস্তানের প্রধান কয়েকটি শহর দখলের পর বুধবার প্রথমবারের মতো তালেবানের কোনও শীর্ষ নেতা হিসেবে চীন সফর করেছেন দলটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল ঘানি বারাদার।

দেশটির উত্তরাঞ্চলের শহর তিয়ানজিনে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ঘানি বারাদারের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেন। এ সময় ওয়াং ই বলেন, ‘তালেবান আফগানিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। দেশের শান্তি, সংহতি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াতেও গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রতিবেশী চীনের প্রায় ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ওয়াখান করিডর নামে ওই অঞ্চলটি পড়েছে চীনের উইঘুর মুসলমান অধ্যুষিত শিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে। অভিযোগ রয়েছে, উইঘুরদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে নিপীড়ন চালাচ্ছে চীন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিনজিয়াংয়ের স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম)।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক র‍্যান্ড করপোরেশনের বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যান ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী আফগানিস্তানে আরেকটি কারণে নিজের অবস্থান সংহত করতে চাইছে চীন। সেটি হলো দেশটির পার্বত্যাঞ্চলে মাটির নিচে থাকা ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ। চীন এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে চায়। এ ছাড়া আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে পাকিস্তানের পেশওয়ার শহর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে চীন। এটি চীন ও পাকিস্তানকে যুক্ত করবে। এর ফলে চীনের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হবে কাবুল।

আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ভারতকেও এক হাত দেখে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো যখন আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে 'তালেবানদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না' এমন বার্তা দিচ্ছে, তখন বিনা বাক্যব্যয়ে তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে চীন। কারণ একটাই। আফগানিস্তান থেকে যেন উইঘুর ও ইস্ট তুর্কেমিনিস্তানের নির্যাতিত মানুষগুলো কোনও সহায়তা না পায়। সেই সঙ্গে তালেবানদের সহায়তায় চীনের কথা না মানা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে যেন অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায়, সেই পরিকল্পনায় হয়তো করছেন শি জিনপিং।

ইতোমধ্যে চীনের পাওয়ার হাইড্রো প্রজেক্টগুলোর কারণে পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। সামনে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের নামে বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে চীন। সমুদ্রসীমা, আকাশসীমা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক সব নিয়ম অমান্য করে বারবার নিজ আগ্রাসনের বার্তা দিচ্ছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি এই আগ্রাসন বিস্তৃত আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলো পর্যন্ত। চীনের আগ্রাসী আচরণকে হুমকি হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করলেও কোনও পরোয়া নেই চীনের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর পর সবচাইতে সুসংহত এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। সেই যুদ্ধ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত বিশ্ব?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টায় চীন

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চেষ্টায় চীন

বাংলাদেশের আছে একজন শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের আছে একজন শেখ হাসিনা

করোনার করুণ কাহিনি: যুদ্ধে সরাসরি শরিক ও পরিবারের প্রথম শহীদ

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ১৬:২৮

মাকসুদুল হক ‘চিন্তা রোগের ওষুধ কোথাও খুঁজে পেলাম না।
চিন্তা যতই করি ততই বাড়ে গো সদাত দেয় যন্ত্রণা।।’
খোদা বকশ শাহ (১৯২৪-১৯৯০)

১. আজকের লেখার পটভূমি: আবারও যুদ্ধে যেতে হবে:

২০২০-এ মহামারি শুরু হলেও করোনা রোগের বিরুদ্ধে সম্মুখ লড়াই করার সুযোগ হয়নি। তবে এ বছর অনেক কাছের মানুষ– যেমন, আমার ব্যান্ড-এর এক তুখড় সদস্য ও তার স্ত্রী ২১ দিন কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল বন্দি, আরেক বন্ধু যিনি আমার বাংলা লেখার শব্দ বিভ্রাট রোগ ডিস্লেক্সিয়া’র কথা জেনে স্বেচ্ছায় ও নিঃস্বার্থে ভুল শুধরে দেন, তার এক মাসের ঊর্ধ্বে অসুস্থতা ও কোয়ারেন্টিন, আরেক ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি বন্ধুর স্ত্রীর কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে, আমি প্রতিদিন ফোনে খবর নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু সরাসরি কোভিড-১৯ বিরোধী যুদ্ধে কেবল উৎকণ্ঠিত হওয়া ছাড়া এ অবধি কোনও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারিনি।

সবকিছু পাল্টে গেলো ৫ জুলাই ২০২১ সালে। এ বছর যুদ্ধের ময়দানে আমি শরিক।

ভাগ্য আমাকে ‘ফ্রন্টলাইন ফাইটার’-এর ভূমিকায় ঠেলে দিয়েছে। আমি গর্বিত। কারণ, এটাকে কোনোভাবেই  ‘দুর্ভাগ্য’ মনে করি না।

গেলো ৫ জুলাই থেকে ২৭ জুলাই ২০২১– এই টানা ২২ দিনে ৮৩ বছর বয়স্ক আমার শ্বশুর শেখ আলী আহমেদ সাহেবের আকস্মিক অসুস্থতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম।

নড়াইল জেলা শহরের স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা ও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে রোগীকে ঢাকাতে মুমূর্ষু অবস্থায় স্থানান্তর ও দিনরাত হাসপাতাল যাওয়া আসা শুরু হলো।

ইয়েলো জোন আইসিইউ, কোভিড নেগেটিভ হয়ে গ্রিন জোন আইসিইউ, এইচডিইউ হতে কেবিন, নিউমোনিয়ার শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেন লেভেল ওঠানামা, রক্তের হিমোগ্লোবিন ড্রপ করা, বিবিধ ভুতুড়ে ইনফেকশন, রক্তের আবেদন, রক্ত দান করা বন্ধুদের প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়া সহানুভূতি, ডাক্তার বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও উপদেশ। ফের আইসিইউ, ফের কেবিন– এই মহড়া ১৮ দিনে পরপর তিনবার ঘটে গিয়ে ঈদের দিন বিকালে কোভিড-১৯ পজিটিভ।

কোভিড রেড জোনের ভেতরে ও বাইরে ছোটাছুটি, নন ইনট্রুসিভ ভেন্টিলেশন (এনআইভি), অতঃপর– ২৭ জুলাই ২০২১ রাত ১টায় আমার শ্বশুর দেহ ত্যাগ করলেন।

রোগীর স্বাস্থ্যের এই ঘণ্টায় ঘণ্টায় দ্রুত পরিবর্তন, এই ভালো তো এই খারাপ, এই অভিজ্ঞতার এই নির্মম সিকুয়েন্স জীবনে এর আগে আমার কখনও হয়নি।

‘এত কঠোর রেসট্রিকশনে থাকার পর ১৫ দিনে কোভিড নেগেটিভ থেকে কোভিড পজিটিভ হয় কী করে?’

এই প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বললেন– ‘আমরা জানি না’!

বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে কোভিড-১৯ রোগ সম্পূর্ণ ‘ভাগ্যের জুয়া খেলা’ এবং বিজ্ঞান আমাদের ১৬  মাসে জনগণের হাজারও প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি বা পারবে না। যতদিন বিজ্ঞান এই সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ ততদিন কে কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত বা কে নয়– তা রোগী নিজে ও তার আত্মীয় স্বজনের সুচিন্তিত নির্ধারণের ওপরে নির্ভর করবে। 

এমনকি ডেথ সার্টিফিকেটে ‘কোভিড ১৯-এর কারণে মৃত্যু’– তেমনটা লেখা নেই এবং জেনেছি তা লেখা হয় না। অত্যন্ত কঠিন ইংরেজি ডাক্তারি ভাষায় লেখা– ‘অপরিবর্তনীয় হৃৎপিণ্ড সংক্রান্ত শ্বাসবন্ধ হয়ে মৃত্যু’।

স্পষ্টত করোনাতে মানুষ মরে না, করোনার আতঙ্কে সারা বিশ্বে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। বিশ্বাসে ধ্বংস বা বিশ্বাসেই মুক্তি। আগে এই কলামে কয়েকবার বলেছি ‘অবিশ্বাসও এক ধরনের বিশ্বাস’।

হাসপাতলে মানুষের অসহায়ত্ব, কেউ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লে স্বজনদের চিৎকার ও কান্নাকাটির রোল- দীপ্রচিত্তে সহ্য করা ও নিজের আত্মাকে শক্ত করা ছাড়া কিছুই করার নেই।

সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি।

২. করোনা রোগীর উচ্চতর চৈতন্য ও চিন্তার বিস্তীর্ণ ব্যাপ্তি:

গেলো ১৮ জুলাই এই কলামে লিখেছিলাম, এই রোগ একটি ‘ইতিবাচক বনাম নেতিবাচক এনার্জির লড়াই’। কিন্তু যা জানতাম না– অসুস্থ রোগীর ধারে কাছে বা দূরে একটি মানুষও যদি নেগেটিভ চিন্তা বা অপায়া কথা বলে, তা সরাসরি রোগীর স্বাস্থ্যের উন্নতি বা অবনতি ঘটায়। এ যাত্রায় তার শক্ত প্রমাণ পেয়েছি।

অদ্ভুত বিষয় হলো, মুমূর্ষু কোভিড রোগীর অবচেতন চেতনাবোধের ওপরে আরেকটি উচ্চতর চৈতন্য বা ‘সুপার কনশাসনেস’ এসে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করলাম।

সেই বিস্ময়কর ‘কনশাসনেস’ রোগীকে মুহূর্তের মধ্যে পজিটিভিটি থেকে নেগেটিভিটির দিকে ধাবিত করতে খুব সহজেই পারে–  উল্টো নেগেটিভ থেকে পজিটিভ করতেও পারে।

এমনও দেখলাম রোগী যখন প্রলাপ করে তখন অতীতের কথা যেমন স্পষ্ট মনে করতে পারে, ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে তাও আকারে ইঙ্গিতে বলতে পারে।

আমার শ্বশুরের শেষ বাক্যগুলোর অনেক উদাহরণের মাত্র একটি আজ শেয়ার করছি।

যখন উনি কেবিনে তখন ওনাকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হয়েছে ও স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছেন, হঠাৎ বলে বসলেন, ‘এত মানুষ কান্না করছে কেন? তোমরা কাঁদছো কেন?’

ঠিক এক সপ্তাহ পর এই বিখ্যাত শিক্ষক তার হাজারো ছাত্রছাত্রী ও সমগ্র নড়াইলবাসীকে কান্নায় ভাসিয়ে বিদায় নিলেন।

এই প্রলাপ, এই বিলাপ ছিল তার বিদায় নেওয়ার পূর্বাভাস। যা আমরা উপস্থিত কেউ তখনও বুঝে উঠতে পারিনি।

আরও অনেক অপ্রিয় কথা বলে গেছেন, তা সত্য নাকি মিথ্যা হয়, তা বোঝা ও দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

আত্মীয়কুলে সবাইকে শান্ত এবং ইতিবাচক রাখা এই মুহূর্তে আমার সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।

কেউ অধৈর্য বা মৃত্যু অতঙ্কে পড়ে গেলেই আরও বিপদ ঘনিয়ে আসতে বাধ্য।

৩. করোনায় করণীয়: সম্ভাব্য প্রতিকারের ব্যবস্থা:

করোনা যেহেতু বায়ুবাহিত রোগ না, তাই একে প্রতিরোধ করতে মাস্ক ব্যবহার আদৌ কোনও কাজ করে কিনা, তা বলা এই মুহূর্ত অসম্ভব। দেখা গেছে মাস্ক পরিধান করার পরেও কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম না।

আমাদের প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছিল এ রোগ হাঁচি দ্বারা ছড়ায়। অর্থাৎ যে হাঁচি দিলে সনাতন বলে, ‘শিব শিব জীবো জীবো’, খ্রিষ্টান বলে ‘গড ব্লেস ইউ’ আর মুসলমান বলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

সারা জীবন জেনে এসেছি এক হাঁচিতে দেহ থেকে হাজারো রোগব্যাধি বিতাড়িত হয়। অথচ এখন হাঁচি হয়ে গেছে  ‘কোভিড কোভিড  করোনা করোনা’? এ কোনও রসিকতা ভাই?

হাঁচি দেওয়ার সময় মুখে হাত চেপে রাখতে হয়– এ কেবল অভদ্র মূর্খগণ বাদে সবাই জানে। কাউকে তা আলাদা করে শিক্ষা দিতে হয় না।

তাই ক’টা হাঁচি দেওয়ার কারণে যদি ঢাকা শহরে সবাই কোভিড-১৯ টেস্ট নেয়- একটা বিষয় অবধারিত যে ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ মানুষের ‘পজিটিভ’ রেজাল্ট আসবে।

তখন ‘আমরা কি করোনা আক্রান্ত’ এই আতঙ্কে হাসপাতালের দিকে ছুটবো?

১৮ জুলাই ২০২১-এর এই কলামে ‘কান্নার কোরবানি ও প্রাণশক্তির বেলোর্মি’-তে আমি বলেছিলাম যে আত্মরক্ষার জন্য যেসব ‘পশ্চিমা অনুশাসন’ আমরা মানতে বাধ্য হচ্ছি: যথা মাস্ক, হাত ধৌতকরণ, সামাজিক দূরত্ব ইত্যাদি– সবই ফেইল করছে।

পশ্চিমা বিজ্ঞান যেকোনও জীবন রক্ষার পদ্ধতি যার সঙ্গে সরাসরি ব্যবসার সম্পৃত্ততা নেই– তা একেবারেই পাত্তা দেয় না, তা আমরা ইতোমধ্যে বুঝতে পারছি।

তবে আমাদের মস্তিষ্কগুলো এমনি ঘোলা ও নিস্তেজ হয়ে গেছে যে বিকল্প কোনও সমাধান বা এই রোগ নিয়ে বিকল্প পাঠ– তা দেখা যাচ্ছে না—বরদাশত করাও হচ্ছে না।

ধরা যাক ‘স্টিম ইনহেলাশন’ বা বাষ্প শ্বাসগ্রহণ, যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বছর দীর্ঘক্ষণ টেলিভিশনে বুঝিয়েছিলেন। এই অতি প্রাচীন ও সহজ গলা, নাক, কান ও শ্বাসযন্ত্র প্রতিরক্ষা পদ্ধতি জনগণ তো বহু দূরের কথা– বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি একটুও পাত্তা দিয়েছে বা আমলে নিয়েছে? নেয়নি, কারণ ‘মামুলি’ গরম পানি দিয়ে নাক মুখে সেঁক দেওয়া-নেওয়াতে ‘ব্যবসা বা ধান্দা’র কোনও অপশন নেই।

অথচ চীন, জাপান ও তাইওয়ানে করোনাবিরোধী রাষ্ট্রীয় প্রচারে স্টিম ইনহালেশানকে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর ফলে ওই দেশগুলোতে করোনার ‘অসভ্য’ বিস্তারকে রোধ করতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।

যেমন, জাপানে এই তথাকথিত ‘ভয়াল মহামারি’র মাঝে অলিম্পিক চলছে।

৪. প্রয়োজন পশ্চিমা নাকি গরিমা বাংলার স্বাস্থ্য সেবা?

পশ্চিমা চিন্তা, পশ্চিমা কৌশল, পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থা এমনকি পশ্চিমা মূল্যবোধ, ভাববাদ ও আদর্শের সঙ্গে বাঙালির মিলের চেয়ে অমিলই বেশি।

আমাদের ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে যেকোনও সমস্যা, যেকোনও জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে বাঙালি যখন নিজের দিকে তাকিয়েছে সে তখনই বিজয়ের বেশ ধারণ করেছে। সে তার নিজের প্রতিভার ওপরে ভর করে কার্যত ও যুগোপযোগী সমাধান উপস্থাপন করেছে।

অথচ আমি আগে কয়েকবার বলতে বাধ্য হয়েছি, ‘আমরাই আমাদের সব চাইতে বড় শত্রু’।

বিদেশিদের তোষামোদি করতে করতে আমরা কী পরিমাণ আত্মমর্যাদা হারিয়ে নিজেদের সঙ্গে অবিচার করছি তা নিজেরা কি একটুও বুঝি?

দেশে ও বিদেশে এত ‘করোনা বিশেষজ্ঞ’র ছড়াছড়ি ও তাদের সেই অতি পরিচিত ভাঙা রেকর্ড শুধুই পশ্চিমা শাশ্বত বিজ্ঞানের সুরে গান করে ও শিখিয়ে দেওয়া তোতাপাখির মতো কথা বলে।

এত ‘বিশেষ জ্ঞান’সম্পন্ন মানুষ থাকা সত্ত্বেও যদি ১৬ মাসে কার্যত সমাধান, বা আত্মরক্ষার জন্য নিদেনপক্ষে কোনও কৌশল উপস্থাপন করা হতো, তা মেনে নিতাম।

তেমন কিছুই কি হয়েছে?

এই তথাকথিত ভাইরাসের চরিত্র ও গঠন কী, তা নিয়ে যখন এতটা অস্পষ্ট ও ভাসাভাসা ধারণা থাকে– এই রোগ থেকে মুক্তি কামনা আমরা করি কোন সাহসে?

৫. কিছু প্রশ্ন ও প্রস্তাবনা: দেখা হোক চক্ষু মেলিয়া

আমাদের বুনিয়াদি সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যগত গরিমার অফুরন্ত ভাণ্ডারে কি এই রোগ চিকিৎসা পদ্ধতি জানা নেই?

এ নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা কি করা হচ্ছে? আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে এটাই কি প্রথম মহামারি?

আগে কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো এবং মানুষ কীভাবে সুস্থ থাকতো– তা জানা, বোঝা ও প্রয়োগ করা কি এ সময়ে সব বাতিলের খাতায় চলে গেছে?

রাষ্ট্র এত এত লোকের সঙ্গে, এক্সপার্টদের সঙ্গে কথা বলছে, পরামর্শ করছে, সমাধান খুঁজছে, সেখানে আমাদের আবহমান বাংলার সংস্কৃতির লতাপাতার ভেষজ গুণ বোঝা ব্যক্তিবর্গ অনুপস্থিত কেন? কী কারণে হেকিমি, ইউনানি, আয়ুর্বেদি, বৈদ্য এমনকি হোমিওপ্যাথি বিশেষজ্ঞদের ধারে-কাছে ভিড়তে দেওয়া হচ্ছে না?

কী কারণে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধের বিজ্ঞাপন চতুর্দিকে সয়লাব অথচ ভেষজ প্রতিকারের ওষুধ উপেক্ষিত, নিরুৎসাহিত এবং এক প্রকার অলিখিত নিষেধাজ্ঞায় আবদ্ধ?

উন্নত বিশ্বে এই মহামারি রোধ করার জন্য যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ‘অল্টারনেটিভ অ্যান্ড ট্রাডিশনাল মেডিসিন’ বা বিকল্প ও ঐতিহ্যগত ওষুধের দিকে ঝুঁকছে তখন আমরা কেন নীরব দর্শক হয়ে দেখছি ও অলসতার হাই তুলছি?

আমাদের গরিমা সংস্কৃতির অত্যন্ত সম্মানজনক বয়োজ্যেষ্ঠ, অগ্রজ ব্যক্তিবর্গ ও মুরুব্বিগণ, যথা–দরবেশ, ফকির, সাধুগুরু, অলি এ কামেল, আউলিয়া, কুতুব ছাড়া বিভিন্ন ধর্মের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আধ্যাত্মিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে রাষ্ট্র তথা সরকার জরুরি ভিত্তিতে আলাপে বসলে আমি বিশ্বাস করি এই করোনার সমস্যা বিহিত করা সম্ভব।

আর যদি কাশি ও শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে তথাকথিত কোভিড-১৯ আক্রমণের প্রাথমিক নিদর্শন তা রুখে দেওয়ার মতো ভেষজ ওষুধ আমাদের বুনিয়াদি স্বাস্থ্য সেবায় অনেক আছে।

এসব কথা বিজ্ঞান বিশ্বাস করুক আর নাই করুক; আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি ও তার উপকার পাচ্ছি।

যেহেতু আমি কণ্ঠশিল্পী। গলা আর শ্বাসযন্ত্র পরিষ্কার ও সুস্থ রাখার জন্য বহু বছর ধরে ভেষজ ঔষধি ব্যবহার করছি।

৬. ভ্যাকসিন রাজনীতি ও বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য:

বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের প্রথম দেশ যে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন যখন আবিষ্কৃত হয়নি, পরীক্ষামূলক অবস্থায় ছিল, সেই সময়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করে আগাম বুকিং দিয়ে ফেলে।

সেই সুবাদে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট আমাদের ভ্যাকসিন সরবরাহ শুরু করলেও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারতে ছড়িয়ে পড়লে তা আসা বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর বাংলাদেশকে ধনী রাষ্ট্রগুলো যথা আমেরিকা, ইউরোপ, চীন ও রাশিয়া কী পরিমাণ নাকানি চুবানি খাইয়েছে তা সবাই বিস্মিত হয়েই দেখেছি।

নেপথ্যে বহু বিদেশে অবস্থানরত দেশপ্রেমী বাংলাদেশিদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কিছু ভ্যাকসিন ইতোমধ্যে এসেছে।

তাছাড়া আরও অনেক ভ্যাকসিন বাংলাদেশ অনেক চড়া মূল্যে ক্রয় করেছে নিঃসন্দেহে। তবে ভ্যাকসিন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি আমাদের সহজে স্বস্তি দিচ্ছে না।

একদিকে ভূরাজনৈতিক সুপার পাওয়ারের ভ্যাকসিন কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব, অপর দিকে ধনী রাষ্ট্রদের প্রয়োজন অতিরিক্ত ভ্যাকসিন মজুত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ক্রয় ক্ষমতা থাকলেও এই কাকুতি মিনতি, দেন দরবার ভিক্ষাবৃত্তির অবলম্বন না করে তা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব ঠেকছে।

আর বাড়তি মানসিক চাপ হলো দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়ার পর আরেক ডোজ ‘বুস্টার’ নিতে হবে মর্মে প্রচারণা এই প্রমাণ করে যে করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র গ্রহণযোগ্য অবলম্বন ‘ভ্যাকসিন’- তা ক্রয় বা জোগাড় করতে বাংলাদেশকে আগামীতে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে।

৭. অনুরোধ: সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়ায় এই যুদ্ধের হ্যাশট্যাগ #covid19resistancebangladesh  ব্যবহার করে ফ্রন্টলাইন ফাইটারদের অনুপ্রাণিত করুন।

লেখক: সংগীতশিল্পী

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: কান্নার কোরবানি ও প্রাণশক্তির বেলোর্মি

করোনার করুণ কাহিনি: কান্নার কোরবানি ও প্রাণশক্তির বেলোর্মি

করোনার করুণ কাহিনি: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পটভূমি ও  ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’

করোনার করুণ কাহিনি: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পটভূমি ও ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’

করোনার করুণ কাহিনি: শাটডাউন, লকডাউন ও  ‘ব্রেকডাউন’

করোনার করুণ কাহিনি: শাটডাউন, লকডাউন ও  ‘ব্রেকডাউন’

করোনার করুণ কাহিনি: সাধারণ ছুটি থেকে লকডাউন ও অতঃপর

করোনার করুণ কাহিনি: সাধারণ ছুটি থেকে লকডাউন ও অতঃপর

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

কথা রাখেননি গার্মেন্টস মালিকরা

কথা রাখেননি গার্মেন্টস মালিকরা

শেষদিনে অফিসারের গাড়িতে বাড়ি ফিরলেন কনস্টেবল ফারুক

শেষদিনে অফিসারের গাড়িতে বাড়ি ফিরলেন কনস্টেবল ফারুক

কক্সবাজারে এক বছরে ১৬টি বাচ্চা দিলো বন্য হাতি

কক্সবাজারে এক বছরে ১৬টি বাচ্চা দিলো বন্য হাতি

কমনওয়েলথ সম্মেলনের প্রথম ভাষণে যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু

কমনওয়েলথ সম্মেলনের প্রথম ভাষণে যা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু

চূড়ান্ত হলো  বিল ও মেলিন্ডা গেটসের বিচ্ছেদ

চূড়ান্ত হলো  বিল ও মেলিন্ডা গেটসের বিচ্ছেদ

শিশুর মুখের স্বাস্থ্যে বুকের দুধ

মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহশিশুর মুখের স্বাস্থ্যে বুকের দুধ

রাজনীতি ছাড়লেও এমপি পদ রাখবেন ভারতের সাবেক মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়

রাজনীতি ছাড়লেও এমপি পদ রাখবেন ভারতের সাবেক মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়

ভারতে ভুয়া ঘোষিত ২৪ বিশ্ববিদ্যালয়

ভারতে ভুয়া ঘোষিত ২৪ বিশ্ববিদ্যালয়

পতনের মুখে আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী

পতনের মুখে আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী

নকল পুলিশের গাড়িতে আসল পুলিশের হানা 

নকল পুলিশের গাড়িতে আসল পুলিশের হানা 

প্রবাসী কর্মীদের জন্য ঢাকায় ‘সাময়িক আবাসন’ করবে সরকার 

প্রবাসী কর্মীদের জন্য ঢাকায় ‘সাময়িক আবাসন’ করবে সরকার 

দাবানলে পুড়ছে তুরস্কের অবকাশ কেন্দ্র, নিহত বেড়ে ৮

দাবানলে পুড়ছে তুরস্কের অবকাশ কেন্দ্র, নিহত বেড়ে ৮

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune