X
বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ৮ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

চাকরি ও সংসার হারানো বায়ান্নর মমতাজ বেগম

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যেমন বাঙালি নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তেমনি বাংলাভাষা দাবির আন্দোলনেও নারীদের ছিল দুঃসাহসিক অবদান। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই—দাবির আন্দোলনে সহযোদ্ধা হয়ে পুরুষের পাশে নারীরাও অংশ নেন। পাকিস্তান পুলিশের লাঠিচার্জ, গুলি ও গ্রেফতারের ভয় উপেক্ষা করে ভাষার দাবির মিছিলগুলোতে নারীরা ছিলেন সামনের কাতারে, অকুতোভয় হয়ে। ভাষার দাবির কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখেন গৃহবধূরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবির বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত পোস্টার আঁকতেন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার কর্মসূচিতে ছাত্রীরাও অংশ নেন। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলে ছাত্রীরাও আহত হন। এরমধ্যে রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, বোরখা শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহীম, সুরাইয়া ডলি, সুরাইয়া হাকিম ছিলেন অন্যতম। সেদিনের আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসা সাহায্যের জন্য বাসাবাড়িতে থাকা গৃহবধূরা ছাত্রীদের হাতে চাঁদা তুলে দেন। আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য গৃহবধূ কর্তৃক শহিদ মিনারের পাদদেশে অলঙ্কার খুলে দেওয়ারও তথ্য পাওয়া যায়। শুধু ঢাকায়ই, জেলা শহর ও মহকুমায়ও ভাষা আন্দোলনে নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বাংলাভাষা দাবিতে আন্দোলন করায় নারায়ণগঞ্জের মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম গ্রেফতার হয়ে জেলনির্যাতন ভোগ করেন। একইসঙ্গে গ্রেফতার হন মমতাজ বেগমের দুই ছাত্রী আয়েশা আক্তার বেলু এবং ফিরোজা ।

ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগম, ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএড ডিগ্রি লাভের পর। ছবি : এম. আর. মাহবুব সম্পাদিত ‘ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগম’ গ্রন্থ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, জব্বাররা শহিদ হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে তৎকালীন ঢাকা জেলার মহকুমা নারায়ণগঞ্জ। অন্যান্যদের সঙ্গে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন মমতাজ বেগম। আন্দোলন করার দায়ে মমতাজ বেগমের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া তাঁরই ছাত্রী আয়েশা আক্তার বেলুর লেখককে প্রদত্ত সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, বায়ান্নর ২২ ফেব্রুয়ারি মমতজা বেগম স্কুলের ছাত্রছাত্রীদেরকে সংগঠিত করেন। সেদিন ঢাকায় ছাত্র হত্যার ঘটনার প্রদিবাদে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় তোলারাম কলেজের রিকুইজিশন করা জমিতে বিরাট জনসভা হয়। সভায় সাড়া জাগানো বক্তৃতা রাখেন মমতাজ বেগম। স্মৃতিচারণে আয়েশা আক্তার জানান, ২২ ফেব্রুয়ারি জনসভায় মমতাজ বেগম বলেন, ‘বাংলাভাষা আমাদের মায়ের ভাষা। এটা ওরা বন্ধ করে দিতে চাচ্ছে। আমাদের মুখের ভাষা যদি উর্দু হয়, বাঙালির সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যাবে।’ তাঁরই অনুপ্রেরণায় আমরা ছাত্রীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নামি। ট্রাকে চড়ে মিছিল শুরু করি। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই/নুরুল আমীনের কল্লা চাই’ স্লোগান দিতে দিতে শহর প্রদক্ষিণ করি। একই ট্রাকে করে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরাও স্লোগান দেয়। তখনকার রক্ষণশীল সমাজে মেয়ে-ছেলে ট্রাকে করে একসঙ্গে মিছিল ও বিক্ষোভ ঘটনা নারায়ণগঞ্জ শহরে একদম আলোড়ন পড়ে যায়।’

কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকার ২৪ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকায় পুলিশের গুলি ও হত্যার প্রতিবাদে গতকল্য অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। হরতালের কর্মসূচিতে মহকুমার ১৫ হাজার শ্রমিক সম্পৃক্ত হন। ঐদিন বিকেলে শ্রমিক নেতা ফয়েজ আহম্মদের সভাপতিত্বে জনসভা হয়। এতে ২০ হাজার জনতা অংশ নেন। (সুকুমার বিশ্বাস সম্পাদিত, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, কলকাতার সংবাদপত্র, বাংলা একাডেমি, পৃ. ৮২) আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত করার জন্য স্থানীয় রাজনীতিক এবং শ্রমিকদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন মমতাজ বেগম। আদমজী জুটমিলের শ্রমিকদের সঙ্গেও কয়েকদফা বৈঠক করেন। শ্রমিক নেতাদের সহযোগিতায় তিনি তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, এ আন্দোলন সফল না হলে শুধু ভাষাই নয়, বাঙালিদের অস্তিত্বও বিপন্ন হবে। (এম. আর. মাহবুব সম্পাদিত, ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগম, পৃ. ২৮)

নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে মমতাজ বেগম এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে, শুধু বাংলাভাষার দাবির আন্দোলন করার অজুহাতে পুলিশের পক্ষে তাঁকে গ্রেফতার করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ এই অজুহাতে গ্রেফতার করলে শ্রমিক অধ্যূষিত এবং অধিকার সচেতন নারায়ণগঞ্জ মহকুমার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এ জন্য হীন ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয় পাকিস্তান প্রশাসন। স্কুলের অর্থ আত্মসাৎ করার মিথ্যা অভিযোগ এনে স্কুলের গভর্নিং বোর্ড দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করানো হয়। আসল উদ্দেশ্য ছিল, নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলনকে দুর্বল করা। এরপর নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য খান সাহেব ওসমান আলীর বাসা থেকে মমতাজ বেগমকে ১৯৫২ সালের ২৯ শে ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে পুলিশ।

এখানে উল্লেখ্য যে, ২৯  ফেব্রুয়ারি খান সাহেব ওসমান আলীকেও গ্রেফতার করা হয়। জেলে পাঠানো হয় সেখানকার নেতৃত্বস্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী এবং ওসমান আলীর ছেলে শামসুজ্জাহাকেও। সেদিন ওসমান আলীর বাড়িতে তল্লাসি এবং বাসার আসবাবপত্র তছনছ করা হয়। (বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৮১) 

মমতাজ বেগমকে গ্রেফতারের খবর দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে। ক্ষোভে ফোঁসে ওঠে জনতা। মমতাজ বেগমকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে অন্যদের সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণ ঘেরাও করেন স্কুলছাত্রীরাও। মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার ও নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা অনুভব করা করা যায় তৎকালীন ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ১ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটির বক্তব্য ছিল এরকম, ‘স্থানীয় পুলিশ নারায়ণগঞ্জের মরগান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মিসেস মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করে মহকুমা হাকিমের আদালতে হাজির করে। সংবাদ পেয়ে একদল ছাত্র ও নাগরিক আদালতে হাজির হয় এবং বিনাশর্তে শিক্ষয়িত্রীর মুক্তি দাবি করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকে। মহকুমা হাকিম জনাব ইমতিয়াজী তখন বাইরে এসে ছাত্রদের বলেন, শিক্ষয়িত্রীকে স্কুলের তহবিল আত্মসাতের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথে তাঁর গ্রেফতারের কোনো রূপ সম্পর্ক নাই। কিন্তু জনতা তা বিশ্বাস না করে বলতে থাকে, মিসেস মমতাজ বেগম নারায়ণগঞ্জে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রধান কর্মী ছিলেন বলেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। সুতরাং তাঁকে বিনাশর্তে মুক্তি না দিলে তারা কোর্ট প্রাঙ্গণ ছেড়ে যাবে না। পুলিশ তখন মৃদু লাঠিচার্জ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। বিকেলে পুলিশ মোটরযোগে মিসেস মমতাজ বেগমকে নিয়ে ঢাকা রওয়ানা হলে জনতা চাষাড়া স্টেশনের নিকটে তাদের গমনপথে বাধা দেয়। ইহাতে পুলিশ ও জনতার মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং পুলিশ পুনরায় লাঠিচার্জ করে। ফলে উভয়পক্ষে প্রায় ৪৫ জন আহত হয়। (এম. আর. মাহবুব, পৃ. ৩২)

বাংলা ভাষার দাবির প্রশ্নে আপোষহীন মমতাজ বেগমের সঙ্গে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর দুই কিশোরী ছাত্রীকেও। মমতাজ বেগমের দুই ছাত্রী জেলে যান স্বেচ্ছায়; তারা ইচ্ছে করলে অবশ্য গ্রেফতার এড়াতে পারতেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগী ছিলেন মমতজা বেগম। পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জ ও সংঘর্ষের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মমতাজ বেগম একসময় অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাঁকে সেবা দেওয়ার জন্য পুলিশের ট্রাকে উঠেন দুই ছাত্রী। সাক্ষাৎকারে আয়েশা আক্তার বেলু জানান, ‘একপর্যায়ে মমতাজ আপাকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশের সঙ্গে আমরা ধস্তাধস্তি শুরু করি। উনার হাইপ্রেসার ছিল। টানাটানির মধ্যে উনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পুলিশ তখন বলল, মমতাজ বেগমকে দ্রুত ঢাকায় হাসপাতালে নিতে হবে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হয়—মমতাজ আপাকে সেবা করার জন্য দু-তিনজন মেয়েকে গাড়িতে তুলে দেয়ার জন্য। আমি আর ফিরোজা মমতাজ আপার সঙ্গে গাড়িতে উঠি। অন্যরা গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে এগোতে থাকেন।’

মমতাজ বেগমের সঙ্গে দুই ছাত্রী গ্রেফতার হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় ভারতের ‘দি স্ট্যাটম্যান’ পত্রিকার প্রতিবেদনে। ২৯ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে সংগঠিত ঘটনা নিয়ে, ‘দি স্ট্যাটমেন্টে’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ৩ মার্চ। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘One hundred and fifteen persons including two girls students have been arrested. So far in connection with the disturbances as Narayangonj that brook out after arrest of Mrs. Mamrtaz Begum, headmistress of the Morgan Girls High School on February 29 (এম. আর. মাহবুব, পৃ. ২৮)

মমতাজ বেগমসহ গ্রেফতার ছাত্রীদেরকে রাখা হয় ঢাকা জেলের পাগলাগারদে। সেখানে আগে থেকেই গ্রেফতার ছিলেন নাচোলের রানি ইলা মিত্র। মমতাজ বেগমসহ গ্রেফতার ছাত্রীদেরকে রাজবন্দির মর্যাদা দেওয়ার জন্য জেলেই আন্দোলন শুরু করেন ইলা মিত্র। পরে জেল কর্তৃপক্ষ তাঁর দাবি মেনে নেয়। কারাগারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন মমতাজ বেগমও। জেলে ছাত্রীদেরকে সাধারণ হাজতিদের খাবার দেওয়া হয়। এ ঘটনায় প্রতিবাদ করেন মমতাজ বেগম। তিনি জেলারকে বলেন, ‘এই খাবার আমার মেয়েরা খাবে না। ওদের ভালো খাবার দেওয়া হোক। আমার মেয়েদেরকে ভালো বিছানা দাও’। তারপর ছাত্রীদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। মমতাজ বেগম ততদিনে কারাগারের সবচেয়ে আলোচিত কয়েদি। কিশোরী ছাত্রীদের মানসম্পন্ন খাবার ও বিছানা দাবি বাধ্য হয়েই মেনে নেয় জেলকর্তৃপক্ষ। (সূত্র : আয়েশা আক্তার বেলুর সাক্ষাৎকার)

জেলবন্দি নারীদেরকে নিয়ে আরেক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পুলিশ। ‘তোমরা স্বেচ্ছায় ওই আন্দোলনে অংশ নেওনি। তোমাদেরকে জোর করে আনা হয়েছে’—এই বিবৃতি দিয়ে বন্ডসই দিলে জেল থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়। মমতাজ বেগমসহ গ্রেফতারকৃতদেরকে বন্ডসই দিতে চাপ দিতে শুরু করে প্রশাসন। বিবৃতি এবং বন্ডসই দিতে অস্বীকৃতি জানান মমতাজ বেগম এবং তাঁর দুই ছাত্রী। এক মাস পর মমতাজ বেগমের ছাত্রী আয়েশা আক্তার বেলু ও ফিরোজাকে আলাদা আলাদা দিনে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু মুক্তি মেলেনি মমতজা বেগমের।

মমতাজ বেগমের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া তাঁরই ছাত্রী ভাষাসংগ্রামী আয়েশা আক্তার বেলু। বন্ডসই ইস্যুতে ফাঁটল ধরে মমতাজ বেগমের দাম্পত্যজীবনে। তাঁর স্বামী অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নাফ ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। তিনি চেষ্টা করেছিলেন মমতাজ বেগম যেন সরকারের প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু দেশপ্রেমিক মমতাজ বেগম তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। যার কারণে আব্দুল মান্নাফকেও চাকরি হারাতে হয়। মমতজা বেগমের মেয়ে সাহানা বেগম খুকু স্মৃতিচারণে লিখেন, ‘…তাঁদের ছিল সুখের সংসার। ... মা জেলে গেলে বাবার উপর সরকারিভাবে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়, মা যেন মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন এবং আর কোনো সময় আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করেন। ... বাবা মাকে বন্ডসই করে জেল থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব করলে মা তা অস্বীকার করেন। সেই থেকেই আমার মায়ের সাথে বাবার দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বাবার সরকারি চাকরিরও শেষ রক্ষা হয়নি। মায়ের জেলজীবন এবং আন্দোলনের কারণে তাঁকেও চাকরি হারাতে হয়। পরে আইন পেশা শুরু করেন।’ (এম. আর. মাহবুব, পৃ. ১০-১১)

মমতাজ বেগম ১৯৫৩ সালের মে মাসে জেল থেকে মুক্তি পান। মুক্তির পর সামাজিক জীবন থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হয়। মর্গান স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার চাকরিটাও হারান। স্বামী তখন ফরিদপুরে চলে যান ওকালতি করতে। নারায়ণগঞ্জে একাই বেশ কিছুদিন থাকেন মমতাজ বেগম। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ যুক্তফ্রন্টের নেতারা নির্বাচনে মমতাজ বেগমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেন। সাহানা বেগম খুকু স্মৃতিকথায় লেখেন, ‘১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে পুরনো ঢাকা থেকে মাকে নমিনেশন দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া চলতে থাকে। (উল্লেখ্য ৫৪ সালে মমতাজ বেগম পুরান ঢাকায় চলে আসেন।) বাবা এ কথা জানতে পেরে মওলানা ভাসানী ও শেরে বাংলার সঙ্গে দেখা করেন। মাকে নমিনেশন না দেওয়ার জন্য তাঁদেরকে অনুরোধ করেন। বাবা তাঁদেরকে বলেন, এমনিতেই ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে আমার সংসার ভেঙে যাবার উপক্রম। আবার রাজনীতিতে জড়ালে আমার সংসার ভেঙে যাবে। আব্বার কান্নাকাটি ও অনুরোধের পর তাঁরা ব্যাপারটি বুঝতে সক্ষম হন এবং মাকে আর নমিনেশন দেওয়া হয়নি।’(এম. আর. মাহবুব, পৃ. ১১) পরে স্বামী আব্দুল মান্নাফের সঙ্গে মমতাজ বেগমের দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে। ১৯৫৯ সালের ১৫ নভেম্বর আব্দুল মান্নাফের সঙ্গে মমতাজ বেগমের দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘঠে।

ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগম ১৯৬৭ সালের ৩০ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। ভাষা আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা রাখায় মহিয়সী এই নারীকে  বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে তাঁর অবদানের প্রতি সম্মান জানান। 

প্রাপ্ত তথ্যমতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাভাষা দাবির আন্দোলনে অকুতোভয় ও অবিচল থাকার কারণে জেলনির্যাতনের শিকারের পাশাপাশি সবকিছুই হারান মমতাজ বেগম। ষড়যন্ত্র করে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আঘাত করা হয় তাঁর পেশাজীবনকে। এরপর বন্ডসই ইস্যুতে স্বামীকে ডাবার গুটি বানিয়ে আঘাত করা হয় তাঁর দাপ্তত্যজীবনে। এতকিছুর পরও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি মমতাজ বেগম। তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাঙালি সমাজে নারীর এমন সাহসী ভূমিকা রাখা সহজ ছিল না। তাই বাঙালি নারীর অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ভাষা আন্দোলনে নারীর সম্পৃক্ত হওয়ার ঘটনা এবং নারায়ণগঞ্জের মমতাজ বেগমের অবদান। মমতাজ বেগম এবং তাঁর ছাত্রীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনাপর্বের সাহসী অংশীদার, জাতীয় বীর। 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

সর্বশেষ

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune