X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

দিনমজুরের সঞ্চয়ে গড়া গ্রাম পাঠাগার 'সাতভিটা গ্রন্থনীড়'

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২১, ১৯:৫৯

পেশায় দিনমজুর জয়নাল আলী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুতে পারেননি। আর্থিক অনটনে বিদ্যালয় ছেড়ে শ্রম বিক্রি করে সংসারের হাল ধরেন সেই শিশু বয়সেই। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহে ভাটা পড়েনি তাতে। নিজের প্রচেষ্টায় বই পড়ে পড়ে স্বশিক্ষিত হন তিনি। আর শিক্ষা ও বইয়ের প্রতি এই আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি তৈরি করেছেন গ্রাম পাঠাগার ‘সাতভিটা গ্রন্থনীড়'।

গ্রাম পাঠাগারের উদ্যোক্তা জয়নালের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সাতভিটা গ্রামে। ওই গ্রামের মৃত কাশেম আলীর ছেলে। জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত এই গ্রামে ২০১৫ সালে শ’খানেক বই নিয়ে নিজ বাড়িতে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন জয়নাল। শুরুটা বন্ধুর হলেও প্রত্যন্ত একটি অঞ্চলে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ায় প্রশংসা কুড়াচ্ছেন দিনমজুর উদ্যোক্তা জয়নাল আলী।

'বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আর গ্রামের শিশু কিশোরসহ সব শ্রেণির মানুষের জন্য বুদ্ধিভিত্তিক জ্ঞান চর্চার সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই পাঠাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি', বলেন জয়নাল।

জয়নাল আলী জয়নাল জানান, তিনি পেশায় মূলত দিনমজুর। এছাড়াও মৌসুমভিত্তিক ধান ব্যবসাও করেন তিনি। ধানের মৌসুম ছাড়া বাকি সময় দিনমজুরের কাজ করে চলে সংসার। পারিবারিক অভাব অনটনে প্রাথমিকের গন্ডিও পার হতে পারেননি। কিন্তু এরপরও শিক্ষা থেকে দূরে থাকেননি তিনি। নিজে বই পড়ে পড়ে স্বশিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি উদ্যোগ নেন নিজ এলাকায় পাঠাগার গড়ে তোলার। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ সফলতার আলো ফুটেছে তার 'সাতভিটা গ্রন্থনীড়' পাঠাগারে।

পাঠাগার প্রতিষ্ঠার শুরুর গল্প বলতে গিয়ে জয়নাল আলী জানান, দিনমজুরের কাজ করে রোজগারের টাকার কিছু কিছু জমিয়ে ২০১৫ সালের দিকে প্রায় ১০০ বই নিয়ে নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন তার শখের পাঠাগার। গ্রাম অঞ্চলে পাঠক জোগাড় করতে ছুটতে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি। বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে কখনও কখনও শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে বই সরবরাহ করতে হতো বলেও জানান তিনি। বর্তমানে জয়নালের গ্রন্থনীড় পাঠাগার পাঁচ শতাধিক বইয়ে সমৃদ্ধ।

বসতবাড়ি থেকে বর্তমানে নতুন কেনা জমিতে নতুন ঘরে পাঠাগার স্থানান্তরিত করেছেন জয়নাল। সম্পূর্ণ নিরিবিলি পরিবেশে পাঠকরা যাতে আলাদা পরিবেশে বই পড়তে পারেন সেজন্য এই উদ্যোগ।

জয়নাল আলীর পাঠাগার 'ধীরে ধীরে পাঠক সংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০১৯ সালে নিজের জমানো টাকা দিয়ে এক শতক জমি কিনে সেখানে টিনের ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা নেই। অর্থনৈতিক সমস্যা থাকলেও স্বপ্ন বাস্তবায়নে ধীরে ধীরে এগুতে থাকি। এক শতক জমি, পাঠাগারের ঘর ও আসবাবপত্র নির্মাণে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে যার সবটাই আমার দিনমজুরি করে আয়ের জমানো টাকায় করা। আজ আমার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। পাঠকরা এখন আরও স্বাচ্ছন্দ্যে বই পড়তে পারবেন।' বলেন জয়নাল।

জয়নালের পাঠাগারে বই পড়ে উপকৃত হচ্ছেন গ্রামের শিক্ষার্থী ও শিশু কিশোররা। তারা জয়নালের এমন উদ্যোগে অনুপ্রাণিত।

স্থানীয় যুবক পলাশ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘প্রায় চার মাস থেকে আমি এই পাঠাগারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা অত্যন্ত গর্বিত যে জয়নাল ভাইয়ের মতো বইপ্রেমী যুবক আমাদের গ্রামে আছে।'

সাতভিটা বিশেষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও পাঠাগারের পাঠক আম্বিয়া আক্তার মিম বলেন, ‘আমরা স্কুলের বই পড়ার পাশাপাশি অনেক ধরনের বই পড়তে পারছি। জয়নাল ভাই আমাদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে বই পড়ান।'

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকালে জয়নালের স্বপ্ননীড় পাঠাগারের নতুন ভবন উদ্বোধন ও সেরা পাঠককে পুরস্কৃত করা হয়। সে উপলক্ষে জয়নালের উদ্যোগকে সমর্থন এবং তাকে অনুপ্রাণিত করতে জেলা শহর থেকে ছুটে যান শিক্ষক, লাইব্রেরিয়ান, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীরা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বইয়ের প্রতি ভালোবাসার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক পাশে থাকারও প্রতিশ্রুতি দেন অতিথিরা।

জয়নাল আলীর পাঠাগার পাঠাগার পরিদর্শনে যাওয়া অতিথি আখতারুল ইসলাম রাজু বলেন, অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে প্রত্যন্ত একটি গ্রামে এরকম একটি পাঠাগার তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বই পড়ার আন্দোলন এক ধাপ এগিয়ে গেলো।'

সমাজকর্মী সুব্রতা রায় বলেন, লাইব্রেরিগুলো গ্রামেই হওয়া উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে পড়াশোনা খুবই জরুরি। শিশু-কিশোরসহ শিক্ষার্থীরা বইকে বন্ধু করতে পারলে সমাজটাই পাল্টে যাবে।’

শিক্ষক ও সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, ইন্টারনেটভিত্তিক পড়াশোনার থেকে পুস্তকভিত্তিক পড়াশোনার গুরুত্ব বেশি যা এই পাঠাগারে সম্ভব। জয়নালের এই উদ্যোগকে আমরা স্বানন্দ্যে স্বাগত জানাই।

জয়নাল আলীর পাঠাগার পরিদর্শনে যাওয়া কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সুশান্ত বর্মন বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের আগ্রহ ও সহযোগিতা থাকবে এই পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করার জন্য।'

'পাঠক পাঠাগারের প্রাণ। তাদের পাঠাগারে আনতে পারাটা একটা বড় অর্জন। জয়নাল বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠক সংগ্রহ করছেন যা এই উদ্যোগকে সফল করবে বলে আমি মনে করি।' যোগ করেন এই শিক্ষক।

জয়নালের পাঠাগার তার গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে জ্ঞানের আলো ছড়াবে এই প্রত্যাশা সবার।

 

 

/টিএন/

সম্পর্কিত

যে কারণে বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টিনের সময় কমছে

যে কারণে বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টিনের সময় কমছে

আরও ৩৫ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব হচ্ছে

আরও ৩৫ হাজার শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব হচ্ছে

পিআইবির ডিজি পদে ফের নিয়োগ পেলেন জাফর ওয়াজেদ

পিআইবির ডিজি পদে ফের নিয়োগ পেলেন জাফর ওয়াজেদ

ভিপি নুরের বিরুদ্ধে কুমিল্লায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

ভিপি নুরের বিরুদ্ধে কুমিল্লায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

সকালে কড়াকড়ি বিকালে ফাঁকা

সকালে কড়াকড়ি বিকালে ফাঁকা

১৭ লাখ টন বোরো ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত

১৭ লাখ টন বোরো ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত

জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে বিশ্বনেতাদের  ৪ পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে বিশ্বনেতাদের  ৪ পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটাতে হবে: মির্জা ফখরুল

ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটাতে হবে: মির্জা ফখরুল

‘আপন কেউ আক্রান্ত হলে দূরে থাকা যায় না’

‘আপন কেউ আক্রান্ত হলে দূরে থাকা যায় না’

অবশেষে জীবিতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন সহিদা

অবশেষে জীবিতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন সহিদা

হেফাজতের আরেক নেতা গ্রেফতার

হেফাজতের আরেক নেতা গ্রেফতার

স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেফতার

স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেফতার

সর্বশেষ

সাংবাদিক পরিচয়ে গাড়ি থামিয়ে চাঁদা দাবি, গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ

সাংবাদিক পরিচয়ে গাড়ি থামিয়ে চাঁদা দাবি, গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ

এসিআই হাইব্রিড ধানে হেক্টর প্রতি লক্ষ্য ১৫ টন

এসিআই হাইব্রিড ধানে হেক্টর প্রতি লক্ষ্য ১৫ টন

যেভাবে কমবে তামাকের ব্যবহার

যেভাবে কমবে তামাকের ব্যবহার

বরগুনায় এক যুগে সর্বোচ্চ ডায়রিয়ার রোগী, মৃত্যু ৮

বরগুনায় এক যুগে সর্বোচ্চ ডায়রিয়ার রোগী, মৃত্যু ৮

খালে ভাসছিল লাশ

খালে ভাসছিল লাশ

হাসপাতালে ঠাঁই নেই, তাঁবু খাটিয়ে চলে ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসা

হাসপাতালে ঠাঁই নেই, তাঁবু খাটিয়ে চলে ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসা

মোস্তাফিজদের নখদন্তহীন বোলিং, জয়ে শীর্ষে কোহলিরা

মোস্তাফিজদের নখদন্তহীন বোলিং, জয়ে শীর্ষে কোহলিরা

ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট, যুবদল নেতা আটক

ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট, যুবদল নেতা আটক

অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের

অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে  ডাকাতের গুলিতে নিহত ১, আহত ২

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডাকাতের গুলিতে নিহত ১, আহত ২

প্রেমের ফাঁদে ফেলে ছিনতাই, গ্রেফতার ৩

প্রেমের ফাঁদে ফেলে ছিনতাই, গ্রেফতার ৩

দরজায় ও কাঁথায় রক্তের দাগ, লাশ পুকুরের কাদায়

দরজায় ও কাঁথায় রক্তের দাগ, লাশ পুকুরের কাদায়

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ভিপি নুরের বিরুদ্ধে কুমিল্লায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

ভিপি নুরের বিরুদ্ধে কুমিল্লায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

অবশেষে জীবিতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন সহিদা

অবশেষে জীবিতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন সহিদা

স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেফতার

স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেফতার

নির্দেশনা অমান্য করায় হিলিতে ৩ জনকে জরিমানা

নির্দেশনা অমান্য করায় হিলিতে ৩ জনকে জরিমানা

ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহায়তা করায় গ্রাম পুলিশকে মারধর!

ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহায়তা করায় গ্রাম পুলিশকে মারধর!

লিচু গাছে আম ধরার ঘটনাটি ‘ভুয়া’

লিচু গাছে আম ধরার ঘটনাটি ‘ভুয়া’

বোরোর বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

বোরোর বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সাংবাদিক আবু তৈয়বের জামিন নামঞ্জুর

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সাংবাদিক আবু তৈয়বের জামিন নামঞ্জুর

‘ভ্যাকসিনের জন্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ভাটা পড়বে না’

‘ভ্যাকসিনের জন্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ভাটা পড়বে না’

লোকসানের শঙ্কায় পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা

লোকসানের শঙ্কায় পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune