বন্ধ আরএসআরএম কারখানা, তিন মাস বেতন পায় না শ্রমিকরা

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
৩০ মার্চ ২০২১, ০৮:৫২আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২১, ২২:১০

‘দুই কক্ষের একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। ঠিকমতো বাসাভাড়া দিতে না পারায় দুই মাস আগে বাসা থেকে একবার বের করে দিয়েছেন বাড়ির মালিক। পরে অনেক বুঝিয়ে ওই বাসায় থাকার ব্যবস্থা হলেও টাকার অভাবে বাজার করতে পারছি না। একটি ছোট সন্তান আছে তার জন্য কিছু ভালো মন্দ নিয়ে যাবো সেই সুযোগও নেই। কাজ করার পরও বেতন না পেয়ে খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে জীবন পার করছি।

আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন দেশের ইস্পাত শিল্পের অন্যতম প্রতিষ্ঠান রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস (আরএসআরএম)-এর এক কর্মচারী। কারাখানা বন্ধ থাকার পাশাপাশি গত কয়েক মাস বেতন বন্ধ থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন এই শ্রমিক।

বেতন বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই কর্মচারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনা শুরুর তিন/চার মাস পর থেকে বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। মাঝখানে ছয়মাস বেতন আটকা পড়ে। এরপর দুই দফায় ডিসেম্বর পর্যন্ত বেতন পেয়েছি। এখনও তিন মাসের বেতন বাকি পড়ে আছে।’

আরএসআরএম কারখানা

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো ছোটখাট চাকরি করি। আমাদের কাছে জমানো টাকা থাকে না। কাজ করার পর মাস শেষে যে বেতন পাই সেটি নিয়েই পুরো মাস কাটিয়ে দিই। কিন্তু এরমধ্যে যদি তিন মাস বেতন আটকে থাকে তাহলে চলার কোনও পথ থাকে না।’

শুধু এই শ্রমিক নয়, কারখানাটি বন্ধ থাকার পাশাপাশি গত তিন মাস ধরে বেতন বন্ধ থাকায় এভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন আরএসআরএম কারখানার আট শতাধিক শ্রমিক। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন ওই কারখানার সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্বে থাকা ১০০ জন দারোয়ান। কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা অন্যত্র ডে-লেবার হিসেবে কাজ করে পরিবার নিয়ে কোনোমতে জীবন যাপন করতে পারলেও সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্বে থাকা এই ১০০ দারোয়ান নিয়মিত কাজ করছেন। বিপরীতে বেতন আটকে থাকায় তারা পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।

মঙ্গলবার সরেজমিনে কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কারখানার দুই গেইটে কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড দায়িত্ব পালন করছেন। কারখানা বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে একাধিক সিকিউরিটি গার্ড বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ আছে। তবে তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন। উৎপাদন বন্ধ থাকায় শুধু শ্রমিকরা কারখানায় আসছেন না।

কারখানা বন্ধ থাকার পাশাপাশি বেতন না পাওয়ায় ইতোমধ্যে শ্রমিকরা অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নিয়েছেন। ঊর্ধ্বর্তন কর্মকর্তাদেরও অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। যে কারণে এক সময় শীর্ষে থাকা ইস্পাত শিল্পের এই কারখানাটি এখন বন্ধের পথে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিকিউরিটি গার্ড বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত তিন বছর ধরেই কোম্পানিতে সমস্যা চলতেছে। এই তিন বছরে ওয়ার্কার পার্টিসিপেন্ট হিসেবে শেয়ারের একটি টাকাও আমাদের দেওয়া হয়নি। ভুয়া স্বাক্ষর নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনকে দেখিয়েছে আমাদেরকে টাকা দিয়েছে। অথচ একটা টাকাও আমাদের দেয়নি। চারটা লভাংশের টাকা আমরা পাইনি। একটা ইনক্রিমেন্ট হয়নি। কারও বাসায় দারোয়ানের কাজ করলে তারাও দুই ঈদে দুইটা বোনাস পায় আমরা সেটিও পাইনি। এর মধ্যে গত তিন মাস ধরে বেতনও বন্ধ আছে। সব মিলিয়ে খুব কষ্টে জীবন যাপন করছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্যত্র চাকরি নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু করোনার কারণে এখন সব জায়গায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে যে কারণে চাকরি পরিবর্তন করার সুযোগও পাচ্ছি না।’

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আরএসআরএম’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি।

পরে কারখানার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ আছে এটি ঠিক। গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে কারখানা বন্ধ আছে। বিদ্যুতের সাব স্টেশন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে কারখানা বন্ধ আছে। তবে বেতন বন্ধ নেই। কারখানা বন্ধ থাকার পরও মালিক পক্ষ একজন শ্রমিককেও চাকরিচ্যুত করেনি। ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বেতন ভাতা প্রদান করা হয়েছে। জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারির বেতন এখন বাকি আছে। বেতন নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে, ফান্ড কালেকশন করতে হয়। যে কারণে কিছুটা দেরি হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, ‘আমাদের কারখানায় বিদ্যুতের যে সমস্যা ছিল সেটির ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে। ৪/৫ দিনের মধ্যে আমরা কারখানা পুনরায় চালু করতে পারবো। তখন অন্য সমস্যাগুলোও সমাধান হয়ে যাবে।’

 

 

/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কবে বাসযোগ্য হবে পৃথিবী, দূর হবে বৈষম্য?
কবে দূর হবে বৈষম্য?
‘মোদি আমার ভালো বন্ধু’, দ্রুতই বাণিজ্য চুক্তির আশা ট্রাম্পের
‘মোদি আমার ভালো বন্ধু’, দ্রুতই বাণিজ্য চুক্তির আশা ট্রাম্পের
প্লাস্টিকের ব্যবহার-দূষণ: জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে বাড়ছে ঝুঁকি
প্লাস্টিকের ব্যবহার-দূষণ: জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে বাড়ছে ঝুঁকি
ফরিদপুরে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুসহ মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২১
ফরিদপুরে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুসহ মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২১
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের