X
বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

রাজাকার নাকি মুক্তিযোদ্ধা, কী তার পরিচয়?

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২১, ১৬:৫৭

মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাসটা বিশাল। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধারও আছে আলাদা আলাদা নিজস্ব গল্প। সবার প্রয়োজন, ইচ্ছা কিংবা লড়াইটা এক রকম ছিল না। কেউ যুদ্ধে গেছেন জেদে, কেউ সব হারিয়ে, কেউবা তারুণ্যের শক্তি ও সাহসকে পুঁজি করে। তবে যুদ্ধের শুরুতেই অস্ত্র সংগ্রহের কৌশলে জেনে বুঝে শুরুতে নিকৃষ্ট রাজাকার আর অস্ত্র পেয়েই মুক্তিযোদ্ধার কাতারে নাম লেখানো মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কম। এদের দুই জায়গাতেই নিজেকে বিশ্বাস করাতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। তেমনই একজন যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। তার নাম মোবারক হোসেন মবা।

তার গল্পের শুরুটা এভাবেই,‘আমি মোবারক হোসেন মবা। বর্তমানে আমার বয়স সাতাত্তর বছর। এক সময় শক্তিশালী যুবক ছিলাম। খেটে খাওয়া মানুষ আমি। দেশ মাতৃকার টানে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তত করে ফিরে আসি দেশে। সবাই আমাকে সাহসী বলতো। নিজেই নিজেকে নিয়ে বাজি ধরলাম। গ্রামের প্রবীণ কয়েজনের সঙ্গে আলোচনা করে কৌশলে রাজাকার হিসেবে যোগ দিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে। খুব সাবধানে দুই সপ্তাহ ধরে সুযোগ খুঁজতে থাকি। এর মধ্যেই নিজের সঙ্গে জুটিয়ে নিলাম আরও দুই জনকে। ১৫ দিনের মাথায় পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে ৩টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও ২০ বাক্স গুলি পেয়েছিলাম। সেগুলোসহ পালিয়ে গেলাম। যোগ দিলাম সিরাজগঞ্জের ‘পলাশডাঙ্গা যুব শিবির’-এ। সেখান থেকেই মোট তিনটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম।’

এবার তার যুদ্ধে অংশ নেওয়ার গল্প। ‘একদিন সিরাজগঞ্জের নওগাঁ এলাকায় মুখোমুখি যুদ্ধে গিয়ে দেখি সব হিসেব গোলমাল। পাকিস্তানি বাহিনী ৪৫টি নৌকায় প্রায় ৩শ’ সৈনিক নিয়ে নওগাঁ এলাকা আক্রমন করেছে। আমরাও সর্বশক্তি দিয়ে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের প্রচণ্ড আক্রমণ ও রাস্তা-ঘাট না চেনায় পিছু হটে ফিরে যায় পাক বাহিনী। পরের দিন আরও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নওগাঁয় আবারও আক্রমণ চালাতে আসে।

‘আমরা পাল্টা জবাব দিতে থাকি। তবে ওদের প্রস্তুতি ছিল বেশি, অস্ত্র গোলা-বারুদও ছিল বেশি। জবাব দিতে দিতে এক সময় আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসে। বাধ্য হয়ে আমরাই পিছু হটি। ঐ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বুলেট এসে লাগে আমার গায়ে। গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যাই আমিসহ বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা। সেখান থেকে পালিয়ে আমরা প্রায় ২০ কি.মি  দূরে খান মরিচ ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামে গিয়ে পৌঁছাই। টানা দুই দিনের যুদ্ধ আর না খাওয়া থাকায় ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ছিলাম আমরা। আমাদের আশ্রয় দেন হদু হাজী নামে এক ব্যক্তি। পরে জানতে পারি আমরা যুদ্ধস্থল থেকে চলে আসার পরে পুরো নওগাঁ গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী।’

সেখান থেকে পলাশ ডাঙ্গা যুব শিবিরে ফিরে গেলে আমার সাহসিকতার কারণে প্রখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পরে সংসদ সদস্য (প্রয়াত) আব্দুল লতিফ মির্জা আমাকে বুকে টেনে নেন। যুদ্ধ শেষে আমাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি সনদও দিয়েছিলেন তিনি।

স্বাধীন দেশে শুরু হয় আমার জীবন যুদ্ধ। দেশের যুদ্ধে জিতলেও হেরে গেছি জীবনের যুদ্ধে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ভাঙাচোরা একটা ঘর-বাড়িই ছিল আমার সম্বল। সেখানে বসবাসের মধ্যে অযত্ন অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছি যুদ্ধ শেষে পাওয়া আমার স্বীকৃতি সনদ। যদিও কখনো ভাবিনি জীবন চালাতে খুব বেশি প্রয়োজনও হবে এই সনদের। তা না হলে দেশকে টেকাতে পেরেছি, আমি আমার সনদটিও রাখতে পারতাম। শক্ত সমর্থ থাকায় আমি দিনমজুরির কাজ করে এগিয়ে নিচ্ছিলাম স্ত্রী কন্যার সংসার।

তিনি বলেন, ‘আশির দশকে হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় এলোমেলো হয়ে যায় আমার জীবন। পঙ্গুত্ব বরণ করে আমি হয়ে যাই অসহায়। নিজের কোনও সম্পদ না থাকায় একদিনে পথে বসতে হয় আমাকে। জীবন বাঁচাতে শুরু করি ভিক্ষা। এখনও ভিক্ষা করেই চলি। আমার রক্তে কেনা মাটিতে ভিক্ষা করতে খুব কষ্ট হয়। ভিক্ষা করেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন কানে শুনি না, চোখে দেখি না, হাঁটতেও পারি না ঠিক মতো। স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড আছে আমার।’

এই বৃদ্ধ বলেন, অনেককে শুনিয়েছি আমার এই জীবনের গল্প। কিন্তু কেন আপনারা মাঝে মাঝে আমার গল্প শুনতে আসেন জানি না। তবে যুদ্ধের ঘটনা বলতে আমার ভালোই লাগে। শরীরে শক্তি পাই। যদিও অনেককে এই গল্প বলার পরেও আমার মুক্তিযোদ্ধার সনদ আর তৈরির ব্যবস্থা করতে পারি নাই। আমি রাজাকার দলে যোগ দিয়েছিলাম অস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য। সেই অস্ত্র নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারে দলে যোগ দিয়ে করেছি তিনটা যুদ্ধ। আমার সঙ্গে যারা যুদ্ধ করেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যারা এই এলাকা থেকে ক্ষমতায় গেছেন তারা সবাই জানেন আমার যুদ্ধের বীরত্বের কথা। কিন্তু, তবুও স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে আমাকে শুনতে হয় আমি রাজাকার ছিলাম। দেশটা এত বিভক্ত হয়ে গেলো? তখনকার যারা ছিলেন, যারা মুক্তিযোদ্ধা, তাদের কাছে শুনছেন না কেন ওরা?

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামের এই বৃদ্ধকে সম্প্রতি দেখা যায় এত শারীরিক অসুস্থতা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মাত্র তিনটি ছোট আকারের লাউ বিক্রি করতে বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার পথ বাঁশের লাঠিতে ভর দিয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়েছে বাজারে। তার দাবি, এখনও বেঁচে আছি। প্রমাণ তো করুক কেউ আমি মুক্তিযোদ্ধা না রাজাকার? পাথরঘাটা গ্রামের মৃত সোহরাব সর্দারের ছেলে তিনি।

স্বাধীনতার ৫০ বছর চলছে এখন। স্থানীয় সরকারে যারা আছেন তাদের অনেকের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে বা তখন শিশু ছিলেন তারা। তাদের কাছে মোবারক হোসেন মবা এখনও জীবন্ত রহস্য, তিনি কি সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা? নাকি রাজাকার?

ভাঙ্গুড়া উপজেলা চেয়ারম্যান বাকী বিল্লাহ যুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম। তিনি জানান, মবা আমার নিকট প্রতিবেশী। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি তিনি রাজাকার হয়ে যোগ দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি খুবই অসহায়। আমি চেষ্টা করি সর্বদা তাকে সাহায্য সহযোগিতা করতে।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ইউনিটের সাবেক কমান্ডার মোকসেদ আলী বলেন, মবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা জানি না। তবে তিনি রাজাকার হিসেবে পাকিস্তানিদের সঙ্গে ছিলেন এটা জানি। রাজাকার হওয়ায় তার কাছেও অস্ত্র থাকতো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ’৭১ পাবনা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযুদ্ধা আ.স.ম আব্দুর রহিম পাকন বলেন,  আমি মূলত পাবনা নগড়বাড়ী এলাকায় যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আমি এলাকায় ছিলাম না। তবে মবা  নামে ওই ব্যক্তির বাড়ি আমার গ্রামে হওয়ায় আমি শুনেছি তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে আমি নিশ্চিত নই।

মোবারক হোসেন মবাকে তাহলে এই রহস্যের শেষ হবে কবে? তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন এমন একজনও কি এখন বেঁচে নেই যিনি বলতে পারবেন আসল সত্যটা। তার যুদ্ধের গল্পগুলো কি পুরোটাই বানানো নাকি সম্পূর্ণ সত্যি? নাকি তিনি আসলেই রাজাকারদের দল থেকে আর বের হননি? একবার রাজাকার দলে নাম লেখালে পরে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সক্রিয় যুদ্ধ করলেও কি তাকে রাজাকারই বলা হবে? কি হবে তার পরিচয়? এই সমস্যাটা খোলাসা করবে কে? যদি মুক্তিযোদ্ধা হয়েই থাকেন তাহলে তাকে কেন পুরো সম্মান দেখানো হবে না? প্রশ্নগুলোর জবাব জানতে চায় পরের প্রজন্ম।

/টিএন/

সম্পর্কিত

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:২১

ভূমিকা

সময়টা ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাস। স্বাধীন দেশে প্রথম বাংলা নববর্ষ পালনের রেশ তখনও যায়নি। অন্যদিকে দেশজুড়ে তখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কারণ, মার্কিনিদের বিরুদ্ধে ‘ভিয়েতনাম ছাড়ো’ আন্দোলন তুঙ্গে। সদ্য জন্ম নেওয়া দেশ বাংলাদেশেও তার হাওয়া বইছে। এরই মধ্যে ভিয়েতনামের একটি শান্তি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসে। তারা এসে বলে যান, ‘শুধু মানুষ নয় আমাদের দেশের সাপ ও মৌমাছিরাও গেরিলা যোদ্ধা।’ (দৈনিক বাংলা, ১৬ এপ্রিল, ১৯৭২) 

এর আগে মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। বঙ্গবন্ধু সেই বন্ধুত্বের হাত স্পর্শ করতে পাড়ি জমান মস্কো। বঙ্গবন্ধুর সেই সফরে সোভিয়েতের হেড অব গভর্নমেন্ট অ্যালেক্সা কোসিগিন তার ভাষণে বললেন, ‘পূর্ণ সমতা, পরস্পরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং একে-অপরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে সোভিয়েট (সোভিয়েত) ইউনিয়ন গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করি। আন্তর্জাতিক উত্তেজনা হ্রাসের উদ্দেশ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ যে জোট-নিরপেক্ষতা ও মিত্রতামূলক সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করছে, তার প্রতিও আমরা গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করি।...’ (৪ মার্চ, ১৯৭২, দৈনিক বাংলা)

ধরে নেওয়া যায়, বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের ধারাবাহিকতার সূত্র ধরেই দুই সাহিত্যিক, সমালোচক ও অনুবাদক বাংলাদেশে এসেছিলেন। তারা হলেন, রহিম ইসেনভ ও মরিয়ম সালগেনিক। তাদের সঙ্গে আলাপটি মনজুর আহমদ দৈনিক বাংলায় ১৯৭২ সালের ২১ এপ্রিল লিখেছেন। বর্তমান সময়ে এই দুই লেখক সম্পর্কে খুব একটা তথ্য অন্তর্জাল জগতে পাওয়া যায় না। তবে মরিয়ম সালগেনিক ২০০৭ সালে ভারতের পদ্মশ্রি খেতাবে ভূষিত হয়েছেন—শুধু এ তথ্যটি পাওয়া যায়। মরিয়ম সালগেনিক একজন অনুবাদক, সমালোচক। রহিম ইসেনভ সম্পর্কে কোনও তথ্যই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। 

যাই হোক, দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আলাপচারিতা এই জন্যই পাঠকের জানা জরুরি যে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা দুজন লেখক নতুন দেশ বাংলাদেশকে দেখতে এসেছেন। তাদের মধ্যে মরিয়ম সালগেনিক এই দেশ সম্পর্কে অধিক জানেন বলেই আলাপচারিতায় উঠে আসে। যেমন: মরিয়ম উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ যখন তার স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করছে তখন অনেক সোভিয়েত লেখকরা এ বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন। এমনকি তিনি উল্লেখ করেছেন, তাদের বেতারে অনেকে সেই লেখা পাঠও করেছেন। এটি একটি নতুন তথ্য বটে, যদিও সে সব লেখা বঙ্গানুবাদ হয়ে বাংলাদেশে এসেছিল কিনা সেটা অজানা।

স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে প্রবেশ করে মনে হয়—সেই লেখাগুলো সংগ্রহ করা জরুরি। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়, গোটা বিশ্বের সাহিত্যিক, কবি, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক সমাজ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে দেখেছেন, প্রকাশ করেছেন—এ সব সামনে আসা অত্যন্ত জরুরি। কীভাবে এত দূরে থাকা মানুষগুলো আমাদের পাশে ছিলেন, সেটাও তো তরুণ প্রজন্মের সামনে প্রকাশ হওয়া দরকার।

এই আলাপচারিতায় জানা যায়, শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’-এর অনুবাদও পড়েছেন মরিয়ম সালগেনিক। (যদিও প্রতিবেদক ‘শহীদ’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘মরহুম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন) অর্থাৎ সেই ৭২ সালেও আমাদের সাহিত্য অনুবাদ হয়ে ছড়িয়েছে সোভিয়েত সীমানায়। অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে কতটুকু পৌঁছালো আমাদের বাংলা সাহিত্য? অনুবাদ হয়ে তা কোন কোন সীমানা অতিক্রম করলো কিংবা কতটুকু এগুলো—এসব আমাদের অজানা।

জাতির মানস গঠনে সাহিত্যিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা আছে এ আলাপচারিতায়,যা এক ভিন্ন অনুভূতি দেবে। আর এ জন্যই দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এই আলাপচারিতা পাঠের গুরুত্ব রয়েছে বলেই মনে হয়।

আলাপচারিতাটি প্রকাশ হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৪৯ বছর আগে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পুরনো পত্রিকা পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম অ্যান্ড সেন্টার ফর বাংলাদেশ জেনোসাইড রিসার্চ। পত্রিকায় যেভাবে, যে বানানে লেখা হয়েছে সেটাকে অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস ‘সংশপ্তক’ বানান লেখা হয়েছে ‘সংসপ্তক’। এটিও পত্রিকায় যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে, সেভাবেই রাখা হয়েছে। কিছু অস্পষ্ট জায়গায় ‘(…)’ ব্যবহার করা হয়েছে।

অনুলিপি

২১ এপ্রিল, ১৯৭২, দৈনিক বাংলা

সমাজতন্ত্রে অনুপ্রাণিত করতে লেখকরাই পারেন

মনজুর আহমদ

যত না বলতে চান শুনতে চান তার থেকে বেশি জানতে চান এ দেশের মানুষের বিরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী লেখক শিল্পীদের অবদানের কথা। এ দেশের লেখকরাও কি হাতিয়ার তুলে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল?

স্বচ্ছন্দ একটি প্রশ্নে কৌতূহল ওদের সুস্পষ্ট। কৌতূহল ওদের আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন সম্পর্কে।

ওরা দু’জন লিখিয়ে। লেখেন, সমালোচনা করেন, অনুবাদ করেন। আর সেই সঙ্গে করেন লেখকদের সংগঠন। শুধু নিজের দেশের লেখকদের আন্তর্জাতিক সংগঠনেরও তারা কর্মকর্তা, সক্রিয় সংগঠক। আর তাই এ দেশের লেখকদের সম্পর্কে জানতে তাদের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হতে ওদের এত আগ্রহ, এত কৌতূহল।

ওরা মি. রহিম ইসেনভ ও মিসেস মরিয়ম সালগেনিক। এসেছেন সোভিয়েট ইউনিয়ন থেকে। এখানকার লেখক সাহিত্যিকদের সাথে পরিচিত হবেন তাদের সম্পর্কে জানতে।

মি. রহিম ইসেনভ তুর্কেমেনিস্তান লেখক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। একজন লিখিয়ে। আর মিসেস মরিয়ম সালগেনিক মস্কো লেখক ইউনিয়নের একজন সদস্যা। বিশিষ্ট সমালোচক হিসেবে পরিচিত। অনুবাদেই ঝোঁক বেশি। হিন্দি শিখেছেন। লিখতেও পারেন। দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, বাংলাটা এখনও শিখে উঠতে পারিনি তবে শেখার ইচ্ছে আছে। সামনের ছোট টেবিলটায় পড়ে থাকা দৈনিক বাংলার ওপর আঙ্গুল বুলিয়ে বুলিয়ে পড়লেন দ ন-ক...। তারপর পাশের একটি কাগজে হিন্দি হরফে লিখে ফেললেন দৈনিক বাংলা।

ঢাকায় তাদের আসার খবর পেয়ে গতকালই গিয়েছিলাম মিসেস মরিয়ম ও মি. রহিমের সাথে আলাপ করতে।

ঘড়িতে অনন্ত সময় মেপে নিয়ে আমরা বসেছিলাম পরস্পরকে জানতে ও জানাতে।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তোমরা বিশেষ করে সোভিয়েট দেশের লেখক সমাজ কীভাবে প্রত্যক্ষ করেছ? তোমাদের কাব্যে, সাহিত্যে আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধ কতটা স্থান অধিকার করেছে?

বেশির ভাগ কথারই জবাব দিচ্ছিলেন রহিম ইসেনভ তার নিজস্ব রুশ ভাষায়। ইংরেজিতে তার বক্তব্য ভাষান্তরিত করে দিচ্ছিলেন মরিয়ম সালগেনিক। দোভাষীর কাজ ছাড়াও মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্ন লুফে নিয়ে তিনি নিজেই জবাব দিচ্ছিলেন। করেছে, নিশ্চয় করেছে। সোভিয়েট লেখকরা তাদের সমস্ত সত্তা অনুভূতি দিয়ে তোমাদের মুক্তি সংগ্রামকে প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের অনেকেই লিখেছেন। অনেকেই লেখা কথিকা পড়েছেন বেতারে। তবে সব মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে এ সম্পর্কে কোনও নিবন্ধ এখনও প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

ওঁরা বললেন, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই সোভিয়েট লেখকদের দৃষ্টি এ দিকে গিয়ে পড়ে। শুধু দৃষ্টিই নয় তাদের সমবেদনাও তখন পুরোপুরি অর্জন করে নিয়েছে এ দেশের বীর সন্তানেরা। যারা লড়ছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছে, লড়ছে স্বাধীনতার জন্যে। প্রতিদিন আমরা খবর রেখেছি যুদ্ধে কী হচ্ছে?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমরা বাংলাদেশের আসার উদ্যোগ নিয়েছি। এতদিনে এসেছি। আর স্বাধীনতার এই চার মাস পরেও দেখছি যুদ্ধবিধ্বস্ত ঢাকা শহরে হানাদারদের হামলার জ্বলন্ত চিহ্ন। বিশেষ করে ৯ মাসের নৃশংসতার সেই সব পৈশাচিক স্বাক্ষর এখনও যেন আমাদের চমকে দেয়।

সেই পত্রিকার একাংশ বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অপরিসীম

ওরা আশা প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশ অবশ্যই একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে। দেশকে সমৃদ্ধশালী করে তোলার সুযোগ রয়েছে অনেক। তবে এর জন্য কাজ করতে হবে। কাজ করতে হবে সবাইকে একযোগে। আর এ ব্যাপারে লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অপরিসীম। বলা উচিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ওরা বাংলাদেশের কাব্য সাহিত্য সম্পর্কে জানতে খুবই আগ্রহী। ওরা পড়তে চান বাঙ্গালী কবিদের কবিতা, বাঙ্গালী লেখকদের লেখা। তাই ওরা আগ্রহী বাঙ্গালী লেখকদের লেখা অনুবাদে। বললেন,একের ভাষায় অপরের কাব্য সাহিত্য অনুদিত হলে পরস্পরকে জানতে যেমন সুবিধা হবে পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কটাও দৃঢ় হবে তত সহজে।

এই প্রসঙ্গে ওঁরা বললেন, ১৯৭৩-এ কাজাকিস্তানের রাজধানী শহর আলমা আতায় যে আফ্রো-এশীয় লেখক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে তাতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের পেলে আমরা অত্যন্ত খুশি হবো। এই সম্মেলনেই বিভিন্ন আফ্রো-এশীয় দেশের কবি লেখকদের সাথে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের আলাপ পরিচয় ও মতামত বিনিময় হতে পারে।

দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কবি সাহিত্যিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ওরা বললেন, কলমের ডগায় দেশের মানুষকে সমাজতন্ত্রের আদর্শে যেভাবে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করা সম্ভব তাতে লেখকরাই পারেন তাদের সমাজতন্ত্রের পথে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে। ওঁরা বললেন, সোভিয়েট ইউনিয়নে জনমত সংগঠনে কবি সাহিত্যিকরা বড় রকমের ভূমিকা পালন করে থাকেন।

সমকালীন সোভিয়েট সাহিত্য

সমকালীন সোভিয়েট কবি সাহিত্যিকদের করা সাহিত্যে আজ কীসের প্রতিফলন? কোন বিষয়বস্তুকে তারা আজ প্রতিফলিত করছেন?

জবাব দিলেন মরিয়ম সালগেনিক। বললেন, সমকালীন কবি সাহিত্যিক প্রায় সবারই কণ্ঠে আজ আন্তর্জাতিকতার সুর। পরিবর্তিত সমাজ চেতনায় তাদের চিন্তাধারাতেও নিয়ত পরিবর্তনের ঢেউ। শিল্প ক্ষেত্রে বিপুলভাবে উন্নত সোভিয়েটের কবি সাহিত্যিকদের রচনায় শিল্প চেতনা আজ সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত।

৭২টি ভাষায় বই প্রকাশ হয়

কথা উঠলো সোভিয়েটের সাহিত্য প্রকাশনা নিয়ে। মিসেস মরিয়ম সবিস্তারে বললেন, প্রকাশনা ক্ষেত্রে সোভিয়েটের বিরাট অগ্রগতির কথা। বললেন, শুধু সোভিয়েটের অভ্যন্তরেই ৭২টি ভাষায় বই লেখা ও প্রকাশিত হয়ে থাকে।

এক ঘণ্টা। না এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমরা ডুবে ছিলাম আলোচনায়। কথায় কথায় ওরাও জানতে চেয়েছিলেন আমাদের কথা। মুক্তিসংগ্রাম, কবি সাহিত্যিকদের ভূমিকা, বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা।

সংসপ্তকের ইংরেজি অনুবাদ পড়েছি

বলছিলাম মরহুম শহীদুল্লাহ কায়সারের কথা। তার অনুজ জহির রায়হানের কথা। মিসেস মরিয়ম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনছিলেন সারেং বউ, সংসপ্তকের কাহিনী। হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন সংসপ্তকের ইংরেজি অনুবাদ পড়েছি। তারপর তিনিই আমাকে শুনিয়েছেন অনুদিত সংসপ্তকের অংশ বিশেষ।

বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের আলোচনা অত্যন্ত বিষণ্ন হয়েছিলেন মিসেস মরিয়ম। জানতে চাইলেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারবর্গের কথা। জহির রায়হান খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ও লেখক। জহির রায়হানের ছবিগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলেন। জীবন থেকে নেওয়া সম্পর্কে আলোচনা হলো বিস্তারিত। আলোচনা হলো তার অসমাপ্ত ছবি (....) দেওয়া বি লাইট সম্পর্কে।

(....) তিনি বললেন, জহিরের কোন ছবি এখন চলছে ঢাকায়? মনে মনে খুঁজে চললাম। কিন্তু পেলাম না।

দুঃখ প্রকাশ করেই বললাম এখন নেই। কিন্তু কদিন আগেও জীবন থেকে চলছিল। জহির রায়হানের স্ত্রী (....) রায়হান একজন শিল্পী শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন মিসেস মরিয়ম, জানতে চাইলেন, কেমন আছে, কোথায় আছে ওরা?

বদর বাহিনীর হাতে নিহত অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের কথাও জানতে চাই বললেন তিনি।  অনেকের কথাই তাকে বললাম। বললাম শহীদ সাংবাদিকদের কথা। বললাম আ ন ম গোলাম মোস্তফার কথা। তার সাহিত্যকর্মের কথা। সেলিনা পারভীন আর বললাম কবি মেহেরুন্নেসার কথা।

সবার কথাই শুনলেন তিনি। ব্যথিত এক দৃষ্টি মেলে পর্দা খোলা জানালায় কাঁচের মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে রইলেন দূরে বহু দূরে।

/আইএ/

সম্পর্কিত

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

স্বীকৃতি চান গেরিলা যোদ্ধা মোক্তার হোসেন

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২১, ১৮:২০

দেশের টানে গ্রামের যুবকদের সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমার উলিপুর অঞ্চলের বিশাল জলরাশি বেষ্টিত ব্রহ্মপুত্র নদের দইখাওয়ার চরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর মুক্তাঞ্চল খ্যাত রৌমারীতে গিয়ে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। অস্ত্র হাতে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের মানচিত্র আর লাল সবুজের পতাকা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিয়ে নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে। দেশের প্রয়োজনে সময়মতো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও জীবনযুদ্ধের কর্মব্যস্ততায় সরকারি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াতে অংশ নিতে পারেননি। দেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি এই গেরিলা যোদ্ধার। জীবন সায়াহ্নে এসে স্বীকৃতি পেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের ‘অনুগ্রহ প্রার্থনা’ করেছেন জাতির এই সূর্য সন্তান।

সরকারি গেজেটভুক্ত হওয়া থেকে বঞ্চিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম মোক্তার হোসেন সরকার। কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়নের বাসিন্দা এই গেরিলা যোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও দলিল-দস্তাবেজ থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হতে না পারার ব্যর্থতা তাকে সব সময় কুরে কুরে খাচ্ছে– এমনটাই জানান এই গেরিলা যোদ্ধা।

মোক্তার হোসেন সরকার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বয়সে তরুণ। ’৭১ সালের জুলাই মাসে দেশের টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। দইখাওয়ার চরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করে রৌমারীতে প্রশিক্ষণ নিতে যাই। ১১ নম্বর সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান, কোম্পানি কমান্ডার আবুল কাশেম চাঁদ ও ৪নং প্লাটুন কমান্ডার আব্দুল জব্বারের নেতৃত্বে কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর তৎকালীন অধিনায়ক মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী সাহেবের দেওয়া সনদও রয়েছে আমার।’

যুদ্ধে অংশ নেওয়ার স্মৃতি ও সফলতা সম্পর্কে জানতে চাইলে এই গেরিলা যোদ্ধা বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কয়েকটি অপারেশনে অংশ নিই। একবার উলিপুরের শিববাড়িতে পাকবাহিনীকে বহনকারী একটি ট্রেনে অপারেশন চালিয়ে ট্রেন লাইনচ্যুত করি আমরা। ওই অপারেশনে বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়।’

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত মুক্তাঞ্চল রৌমারীতে হামলার ছক আঁকে পাক বাহিনী। কারণ রৌমারী দখলে নিতে পারলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও আস্তানা ধ্বংস করা সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যে কোদালকাটির (বর্তমানে রাজীবপুর উপজেলাধীন) চর হয়ে রৌমারীর দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় হানাদাররা। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা সে খবর পাওয়ামাত্র কোদালকাটিতে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ’৭১-এর আগস্টে কোদালকাটিতে ভয়াবহ এক সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কোদালকাটির সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার গৌরব এখনও আলোড়িত করে মোক্তার হোসেন সরকারকে।

‘আমি তখন বয়সে তরুণ। রক্তে দেশপ্রেমের প্রবল আলোড়ন। আমরা যারা দেশের জন্য যুদ্ধ করছি তাদের সবারই একই অনুভূতি। তাই দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার একটা বাসনা লালন করেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। কোদালকাটিতে যখন অস্ত্র হাতে পাকবাহিনীর ওপর গুলি করছি তখন একবারও জীবনের মায়া মনে আসেনি। শুধু চিন্তা ছিল, দেশকে স্বাধীন করতে হলে পাক বাহিনীকে হটাতেই হবে। কোদালকাটিতে সেদিন প্রবল প্রতিরোধের মুখে অবশেষে পাক বাহিনী পরাস্ত হয়ে পিছু হটে।’ যুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে যোগ করেন এই যোদ্ধা।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে বিজয়ের উল্লাসে সহযোদ্ধাদের হাতে নিজের অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়িতে ফেরেন মোক্তার হোসেন সরকার। পরে গাইবান্ধার টেকনিক্যাল কলেজ মাঠে তার অস্ত্রসহ সহযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দেন। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করলেও এখনও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি এই যোদ্ধা। কিন্তু কেন? জানতে চাইলে মোক্তার হোসেন সরকার বলেন, ‘যুদ্ধ শেষে জীবিকার তাগিতে জেলার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে বেরিয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের উপযুক্ত সম্মান ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা নিলেও জীবিকার প্রয়োজনে আমি চট্টগ্রামে থাকায় সময়মতো আবেদন করতে পারিনি। ফলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। আমার যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সব দলিল ও সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকলেও শুধু সময়মতো আবেদন করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’

‘বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আমার অনুরোধ, আমিসহ যেসব মুক্তিযোদ্ধা আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাদের যেন তালিকাভুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগে আমরা যেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাই। ’ প্রবল প্রত্যাশা নিয়ে যোগ করেন মোক্তার হোসেন।

মোক্তার হোসেনের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার সহযোদ্ধা ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম মিয়া, মো. মকবুল হোসেন ও মো. খবির উদ্দিন। তারা বলেন, ‘আমরা একই সেক্টরের (১১ নং সেক্টর) অধীন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। কিন্তু মোক্তার হোসেন দীর্ঘদিন এলাকায় না থাকার কারণে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি তালিকাভুক্তিতে আবেদন করতে পারেনি। তার মতো বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টি কামনা করি।’

/এমএএ/

সম্পর্কিত

রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠলো বিশ্বের দীর্ঘতম সড়ক আলপনা!

রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠলো বিশ্বের দীর্ঘতম সড়ক আলপনা!

ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯ মুক্তিযোদ্ধার কবর পাকা করে লাল-সবুজে সংরক্ষণ

ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯ মুক্তিযোদ্ধার কবর পাকা করে লাল-সবুজে সংরক্ষণ

বিশ্ব রেকর্ড গড়তে দীর্ঘতম আলপনা আঁকা শুরু

বিশ্ব রেকর্ড গড়তে দীর্ঘতম আলপনা আঁকা শুরু

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২১, ২১:০০

কখনও রাজনীতি করেননি। ছিলেন না বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কিংবা এর কোনও অঙ্গ সংগঠনের সদস্য। তবুও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ, দেশপ্রেম ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মুগ্ধ হয়েছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার কৃষক মো. ইসহাক শরীফ (৯২)। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কারণে হত্যার পর থেকে ৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। 

জীবনের শেষ সময়ে এসে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার শাস্তি চান ইসহাক। একইসঙ্গে জাতির পিতা কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে চান তিনি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনার তালতলী উপজেলার ছোট বগি ইউনিয়নের উত্তর চরপাড়া গ্রামে ১৯২৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম নেন মো. ইসহাক শরীফ। পারিবারিক নানা সমস্যার মধ্যেও ক্লাস ওয়ান পর্যন্ত পড়ালেখার সৌভাগ্য হয় তার। এরপর জীবন ও জীবিকার খোঁজে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কখনও দিনমজুর, কখনও কৃষকের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তার ৮ সন্তান। তাদের মধ্যে চার ছেলে ও চার মেয়ে। প্রত্যেককেই বিয়ে দিয়েছেন ও তাদের ঘরেও সন্তান রয়েছে।

ইসহাক শরীফ জানান, সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের যখন যেভাবে পেরেছেন সহযোগিতা করেছেন। যুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার ও এর পূর্ববর্তী সময় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, আদর্শ ও দেশপ্রেমে মুগ্ধ হন তিনি। মনের অজান্তেই এক অসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি। তাইতো তার কোনও কর্মসূচি থাকলেই সেখানে হাজির হতেন শুধু একপলক দেখার জন্য।

যুদ্ধ শেষে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। ইসহাক শরীফও বরগুনা থেকে ঢাকায় গিয়ে শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারের হত্যার খবর শুনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে সেই সময় জান্তাদের ভয়ে চলে এসেছিলেন বরগুনায় তার গ্রামের বাড়িতে। এরপর থেকে কালো পোশাক ও খালি পায়ে কাটিয়ে দিয়েছেন ৪৬ বছর। 

ইসহাক শরীফ বঙ্গবন্ধুকে যে মাটিতে দাফন করা হয়েছে সেই মাটিতে জুতা পায়ে হাঁটলে তাকে অসম্মান করা হবে তাই জুতা ছাড়াই খালি পায়ে হাঁটছেন বলে জানান ইসহাক শরীফ।

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে হাঁটার বিষয়ে কথা বলতে তার গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা যায় বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিনি। ঠিকমতো চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে এখনও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা উঠলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

ইসহাক শরীফ বলেন, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ, দেশপ্রেম ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অনুসারী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর শুনে আমি ধানমন্ডির বাসায় গেলেও মিলিটারিদের ভয়ে ভেতরে ঢুকতে পারিনি। তখন অনেককেই বলতে শুনেছি বঙ্গবন্ধুর অনুসারী আছে কারা তাদেরকেও হত্যা করা হবে। সেই সময় আমি বরগুনায় ফিরে আসি, কিন্তু তার মৃত্যু আমাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে মারছিল। তাই আমি পণ করি তার হত্যাকারীদের বিচার হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আমৃত্যু কালো পোশাক ও খালি পায়ে থাকবো।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সন্তোষ জানিয়েছেন ইসহাক, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, সবার বিচার শেষ হলে আমি শান্তি পাবো। একটা মানুষ তার জীবনের সবটুকু দিয়ে এদেশের জনগণকে ভালোবেসে গেছেন। আর ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে তাকেই হত্যা করেছে নরপশুরা। তাই তাদের শাস্তি ছাড়া আর কোনও কিছুই প্রত্যাশা করি না।

শেষ বয়সে কোনও ইচ্ছা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কোন ইচ্ছা নেই। তবে বঙ্গবন্ধুর কন্যা এখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যদি মরার আগে দেখা করতে পারতাম তাহলে শান্তিতে মরতে পারতাম।

তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছোট বগি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তৌফিকুজ্জামান তনু বলেন, সারা বিশ্বে কিছু মুজিব পাগল লোক আছে। তাদের একজন ইসহাক শরীফ। ইসহাক শরীফ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কলঙ্কিত ঘটনার পর থেকে কালো পোশাক পরে খালি পায়ে আছেন। তার একটাই চাওয়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন কিছু দুষ্কৃতিকারীর শাস্তি হলেও তিনি তাতে সন্তুষ্ট নন। তার দাবি বঙ্গবন্ধু হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত সবার যেন বিচার হয়।

/টিটি/

সম্পর্কিত

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২১, ১৭:২৭

গ্রামের নাম টোংরাইল। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রুপাপাত ইউনিয়নে গ্রামটির অবস্থান। উপজেলার প্রায় দক্ষিণ প্রান্তের সীমান্তবর্তী এলাকার এ গ্রামের পাশেই বিষ্ণুপুর গ্রাম। একটি বাড়ি নিয়ে বিষ্ণুপুর গ্রাম গঠিত। 

টোংরাইল গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সুদীর্ঘ একটি খাল। টোংরাইল সুতালিয়া নামের খালটি এখনও পাউবোর আওতাধীন। দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া এই খাল গ্রামটিকে করেছে অন্য গ্রাম থেকে আলাদা। খালের উপর দিয়ে যাতায়াতের জন্য রয়েছে অসংখ্য বাঁশের সাঁকো। আগে নৌকাই ছিল এই গ্রামের লোকজনের চলাচলের একমাত্র বাহন। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাসী একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছে। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও তাদের সেই দাবি পূরণ হয়নি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শেখর ইউনিয়নের তেলজুড়ি গ্রামে কুমার নদ থেকে সুতালিয়া খালের উৎপত্তি। এরপর মুড়া গ্রামের ভেতর দিয়ে এসে টোংরাইল গ্রাম হয়ে কালিনগর গ্রামে পৌঁছে ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মধুমতি নদীর সঙ্গে মিশেছে এ খাল। সারাবছরই কমবেশি পানি থাকে আর ভরা বর্ষায় পানিতে টইটুম্বুর হয়ে ওঠে খালটি। 

গ্রামটিতে প্রথমবার গেলে মনে হবে, এটি যেন সাঁকোর গ্রাম। খালের ওপারে থাকা পরিবারগুলো প্রয়োজনে নিজের খরচেই তৈরি করেছেন এসব সাঁকো। সবমিলিয়ে খালের উপরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টির মতো সাঁকো রয়েছে। 

 খাল পাড় ঘেঁষে একসময়ের পায়ে পায়ে গড়ে ওঠা মেঠো পথের এখন অর্ধেক অংশ পিচ ঢালা পাকা সড়ক। বোয়ালমারী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২/১৪ কিলোমিটার দূরত্বের প্রত্যন্ত এই টোংরাইল গ্রামের জনসংখ্যা সবমিলিয়ে চার হাজারের মতো। ভোটার সংখ্যা ছয় শতাধিক। মাত্র তিনশ’ পরিবারের বসতি এখানে। গ্রামটির বেশিরভাগ অধিবাসীই কৃষক। এক-দুটি পরিবার ছাড়া বাকি সব পরিবারের সদস্যরা সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বী। 

তবে এই খালের উপর কোনও সেতু না থাকায় গ্রামবাসীর ভোগান্তির শেষ নেই। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও গ্রামবাসীর ভোগান্তি লাঘব হয়নি।

গ্রামের মহানন্দ বিশ্বাস, নিখিল বিশ্বাস, উত্তম রায়, কপিল বিশ্বাসসহ অনেকেই জানান, খালের ওপারে চলাচলের রাস্তা রয়েছে। তবে সেতু না থাকায় যানবাহন পারাপারের কোনও সুযোগ নেই। ক্ষেতের ফসল নিয়ে এই সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। সাঁকো থেকে পড়ে আহত হওয়ারও অনেক ঘটনা রয়েছে।

গ্রামের বাসিন্দা কৃষক সুনীল বিশ্বাস (৫৬) বলেন, জন্মের পর থেকেই খালটি দেখে আসছি। তখনও বাঁশের সাঁকো ছিল। এখনও বাঁশের সাঁকো। টোংরাইল ব্রিজের পর কালিনগর পর্যন্ত সড়কের কিছুদূর পর রাস্তা খুবই খারাপ।

টোংরাইল গ্রামের আরেক বাসিন্দা রমেন বিশ্বাস (২৩) বলেন, টোংরাইল খালের উপরে প্রায় ৩০-৪০টির মতো বাঁশের সাঁকো রয়েছে। বলা যায় প্রতিটি বাড়িতে যেতে একটি করে সাঁকো ব্যবহার হয়। এ গ্রামে ছয় মাস পানি আর ছয় মাস শুকনো মৌসুম। বর্ষাকালে বাড়ি থেকে বের হতে বাঁশের সাঁকো বা নৌকাই ভরসা।

তিনি আরও জানান, গ্রামে কৃষিজীবী মানুষ বেশি হলেও প্রত্যেক ঘরেই স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী রয়েছে। তবে গ্রামে একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর কোনও বিদ্যালয় নেই। প্রাইমারি পাস করে অনেকে পাশের গ্রাম বনমালিপুর জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।

স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার রবিন বিশ্বাস বলেন, একটি সেতুর অভাবে কয়েকগ্রামের মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। গ্রামের অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে অনেক কষ্ট হয়। এলাকায় কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই। পাশের সুতালিয়া গ্রামে একটি স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। তবে সেখানে কোনও ডাক্তার থাকেন না বলে এখন আর কেউ সেখানে যান না। 

 তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালে গ্রামটিতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান। এছাড়া তিনি প্রাইমারি স্কুলের ভবন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সাহায্য, গভীর নলকূপ স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। গ্রামের মাঝখানে একটি ব্রিজের জন্য এলাকাবাসী দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে আসছে। দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আগের এমপি ব্রিজটির যাবতীয় প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। এখন শুধু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্রিজটি টেন্ডার ও কাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যিনি এমপি আছেন তিনি এলাকায় আসেন না। আমাদের সমস্যার কথা যে তার কাছে তুলে ধরবো সে সুযোগও নেই।

এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা প্রকৌশলী (স্থানীয় সরকার বিভাগ) একেএম রফিকুল ইসলাম বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শন ও ফাইলপত্র দেখে ওই গ্রামে ব্রিজ নির্মাণ বিষয়ে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিব সরকার। মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। 

 

/টিটি/

সম্পর্কিত

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২১, ১৪:৪৩

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও পাকা হয়নি বগুড়ার সোনাতলার জোড়গাছা ইউনিয়নের পোড়াপাইকর গ্রামের ৩০০ ফুট রাস্তা। নির্বাচন এলে প্রার্থীরা রাস্তা করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় স্থানীয়রা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে রাস্তাটি পাকা করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোনাতলা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে জোড়গাছা ইউনিয়নের পোড়াপাইকর গ্রাম। ওই গ্রামে প্রায় সাড়ে চার হাজার মানষের বাস। এরমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার ভোটার। শিক্ষাসহ সবকিছুতে এগিয়ে থাকলেও উন্নয়নে পিছিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, পোড়াপাইকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে গোলাম মোস্তফা মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৩০০ ফুট কাঁচা রাস্তা রয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলে এই রাস্তায় চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশ স্বাধীনের পর থেকে গত ৫০ বছরে রাস্তাটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিলেও কোনও ফল পাননি স্থানীয়রা। 

গ্রামের আবু সাঈদ মাস্টার, লুৎফর রহমান, সাজু মিয়া প্রমুখ বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকার পরও পাকাতো দূরে থাক, রাস্তায় এক ইঞ্চি মাটিও কাটা হয়নি। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় কাদা হয়। এতে চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম আজম টিপু জানান, রাস্তাটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এক ব্যক্তি জায়গা ছেড়ে না দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। 

জোড়গাছা ইউপি চেয়ারম্যান রোস্তম আলী মন্ডল বলেন, রাস্তাটি জনগুরুত্বপূর্ণ। তবে ওই গ্রামের দু’পাশ দিয়েই পাকা সড়ক রয়েছে। তবু গ্রামবাসীর যাতায়াতের জন্য রাস্তাটি দ্রুত পাকাকরণে পদক্ষেপ নেবেন বলে আশ্বাস দেন দিনি। 

সোনাতলা উপজেলা প্রকৌশলী রাশেদ ইমরান বলেন, ওই রাস্তার বিষয়ে কেউ আমাকে অবগত করেনি। প্রস্তাব পাওয়া গেলে প্রথমে ৩০০ ফুট রাস্তায় মাটি কাটা ও পরবর্তী অর্থ বছরে পাকা করণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

/টিটি/

সম্পর্কিত

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

বিদেশি দুই সাহিত্যিকের চোখে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

৪৬ বছর ধরে কালো পোশাক ও খালি পায়ে ইসহাক

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

যে গ্রামে বাঁশের সাঁকো আর নৌকাই ভরসা!

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও হয়নি সোনাতলার ৩০০ ফুট রাস্তা

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

৫০ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি বীর মুক্তিযোদ্ধার

হাসি-কান্নার ভেলায় ‍ফুটবলের ৫০ বছর

হাসি-কান্নার ভেলায় ‍ফুটবলের ৫০ বছর

তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে যেসব অর্জন

তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে যেসব অর্জন

মুক্তিযুদ্ধ হারিয়ে গেছে: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

মুক্তিযুদ্ধ হারিয়ে গেছে: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

সর্বশেষ

তালেবানকে বয়কট করবেন না: জাতিসংঘে কাতারের আমির

তালেবানকে বয়কট করবেন না: জাতিসংঘে কাতারের আমির

লিঙ্গ সমতার জন্য নারী নেতৃবৃন্দের নেটওয়ার্ক গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর

লিঙ্গ সমতার জন্য নারী নেতৃবৃন্দের নেটওয়ার্ক গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর

‘তালেবানের বিরুদ্ধে দুই দশকের লড়াই বৃথা যায়নি’

‘তালেবানের বিরুদ্ধে দুই দশকের লড়াই বৃথা যায়নি’

৭১ লাখ ফাইজার টিকা দেবে যুক্তরাষ্ট্র

৭১ লাখ ফাইজার টিকা দেবে যুক্তরাষ্ট্র

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু, নেপথ্যে ‘নজরদারির অভাব’

গবেষণাপানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু, নেপথ্যে ‘নজরদারির অভাব’

© 2021 Bangla Tribune