গ্রামে গ্রামে রোগী

সাদ্দিফ অভি
০৭ জুলাই ২০২১, ১১:০০ আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২১, ২০:১৬

গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে এক সময় ‘ধারণা’ ছিল যে, করোনা হচ্ছে শহরের রোগ। কিন্তু সেই ‘ধারণা’ এখন ভুল প্রমাণিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মতে, জেলা সদরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর অর্ধেকের বেশি গ্রামের। গ্রামে এখন ঘরে ঘরে ঠাণ্ডা এবং জ্বরে ভোগা রোগী আছেন। তাদের মাঝে যারাই টেস্ট করাচ্ছেন, পজিটিভ হচ্ছেন। আবার করোনার ভয়ে অনেকেই টেস্ট করাতে যাচ্ছেন না মৌসুমি জ্বর ও ঠাণ্ডা ভেবে। এদিকে রেকর্ডের পর রেকর্ড ভেঙে মঙ্গলবার (৬ জুলাই) একদিনে শনাক্ত হয়েছে সাড়ে ১১ হাজারের বেশি রোগী। গ্রামে গ্রামে ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। অপরদিকে বেড়েছে মৃত্যুও।   

স্বাস্থ্য অধিদফতর  মঙ্গলবার (৬ জুলাই) জানায়, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫২৫ জন এবং মারা গেছে ১৬৩ জন। বর্তমানে শনাক্তের হার ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ঢাকা বিভাগে। ঢাকা শহরসহ এ বিভাগের ১৩টি জেলায় ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার) শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৯৭ জন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা জেলাতেই শনাক্ত হন ৩ হাজার ৭১৫ জন। গত ৭ দিনে ক্রমান্বয়ে রোগী বাড়ছে ঢাকায়। পাশপাশি সারাদেশেও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে রোগী। ঢাকায় বর্তমানে সংক্রমণের হার ৩১ শতাংশ।

সারাদেশের পরিস্থিতি

ঢাকার পাশপাশি সব বিভাগেই বেড়েছে করোনা সংক্রমণের হার। ময়মনসিংহ বিভাগে ২৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৩১ দশমিক ৭১ শতাংশ, রাজশাহীতে ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, রংপুরে ৩৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, খুলনায় ৩৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ, বরিশালে ৫২ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং সিলেটে সংক্রমণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৪০ শতাংশে।

এসব বিভাগের প্রায় সব জেলায় রোগী পাওয়া যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঢাকা বিভাগের ঢাকা, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জে রোগীর সংখ্যা বেশি। ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ জেলা, চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম জেলা, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লাতে রোগীর সংখ্যা বেশি। তাছাড়া রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধায় সংক্রমণের হার বেড়েছে। খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা ও ঝালকাঠি, এবং সিলেট বিভাগের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি বিভাগে গত এক সপ্তাহে রোগী বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বরিশাল ও সিলেট বিভাগে।

হাসপাতালে ধারণ ক্ষমতার বেশি রোগী 

ঢাকাসহ দেশের ১২টি হাসপাতালে ধারণ ক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি আছে এই মুহূর্তে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, গ্রিন লাইফ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, ফেনীর সবকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতাল, নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুষ্টিয়া ২৫০ বেড জেনারেল হাসপাতাল, বরগুনা জেলা সদর হাসপাতাল এবং সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতাল। এছাড়া দেশের ১৪ হাজার ৭৩৪টি বেডের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ বেডে রোগীরা চিকিৎসাধীন আছেন।

পাশাপাশি ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ৮৩৯টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ৬৯ ভাগই রোগীতে ভর্তি। রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালগুলোতে সবচেয়ে বেশি বেডে রোগী ভর্তি আছেন। রংপুর এবং সিলেটে কম সংখ্যক আইসিইউ’র বেড ফাঁকা আছে।

জুনে প্রাপ্ত নমুনায় বেশিরভাগই ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট

বাংলাদেশে গত এপ্রিলে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ার পর থেকে ‘ভারতের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের’ শনাক্তের হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেশে  এই ভ্যারিয়েন্ট মে মাসে ৪৫ শতাংশ ও জুন মাসে ৭৮ শতাংশ নমুনায় শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে দেশে  কোভিড-১৯ সংক্রমণে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সুস্পষ্ট প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

আইইডিসিআর বলছে, বাংলাদেশে ২০২০ সালের  ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিকোয়েন্স করা সব নমুনায় আলফা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। মার্চ মাসে সিকোয়েন্স করা মোট নমুনার ৮২ শতাংশ বিটা ভ্যারিয়েন্ট ও ১৭ শতাংশ আলফা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। এপ্রিল মাসেও বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিতদের মধ্যে বিটা ভ্যারিয়েন্টের প্রাধান্য ছিল। গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত  সংগৃহীত মোট ৬৪৬টি কোভিড-১৯ নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করা হয়েছে। এ সব নমুনায় কোভিড -১৯ এর আলফা ভ্যারিয়েন্ট (ইউকে-তে প্রথম শনাক্ত), বিটা ভ্যারিয়েন্ট (সাউথ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত), ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট (ভারতে প্রথম শনাক্ত), ইটা ভ্যারিয়েন্ট (নাইজেরিয়াতে প্রথম শনাক্ত), বি ১.১.৬১৮ ভ্যারিয়েন্ট (আনআইডেন্টিফায়েড) শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, ‘করোনা মহামারি গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে যেসব রোগী ভর্তি আছেন, তাদের অর্ধেকের বেশি গ্রামাঞ্চলের। এসব রোগীর বেশিরভাগই রোগের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে এসেছেন।’

স্বাস্থ্য অধিদফতর গত ৪ জুলাই  ৪৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে যে, ভর্তি রোগীদের বেশিরভাই বেশি গ্রামের। রোগীরা হাসপাতালে আসছেন রোগে আক্রান্ত হওয়ার বেশ পড়ে, যখন পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়ে পড়ছে।

মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘এখন বর্ষা মৌসুম। অনেকেই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হলেও সাধারণ সর্দি–জ্বর বা কাশিতে আক্রান্ত বলে ধরে নিচ্ছেন। পরীক্ষা করাচ্ছেন না বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন না।’ 

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার ১ নম্বর আলোকঝাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোকছেদুল গনি শাহ জানান, তার এলাকায় ঘরে ঘরে রোগী। প্রত্যেক বাড়িতে জ্বর- সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত রোগী আছেন। ভয়ে কেউই টেস্ট করাতে যাচ্ছেন না।

ঠাকুরগাঁও জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো মাহফুজুর রহমান সরকার বলেন, ‘আমাদের এখানে আগে রোগীই ছিল না। আগের তুলনায় আমাদের এখানে রোগী শনাক্ত অনেকটা বেড়ে গেছে। সব জায়গাতেই কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে বলে আমার ধারণা। গ্রাম-শহর সব জায়গায় এখন একই অবস্থা।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন অবস্থা তো ভয়াবহ। একদিকে সরকারের সর্বাত্মক লকডাউনের কোনও বিকল্প নেই। তাছাড়া সামনে কোরবানি আছে, সব মিলিয়ে এখন কঠিন একটা অবস্থা। আর এবারের সংক্রমণ একদম ভিন্ন। আগের সংক্রমণ ছিল মূলত জেলা শহরগুলোতে, এখন সেটা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। কাজেই লকডাউন দিয়ে এটা ঠেকানো খুব কঠিন কাজ।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এই রোগীদের আগেই আইসোলেশনে নিতে পারতাম, তাহলে কিন্তু লকডাউন ছাড়াও সংক্রমণ কমানো যেত। এই পন্থা একটু কষ্টকর বলেই করা যাচ্ছে না। তাই সহজ কাজ হিসেবে লকডাউন দিতে হচ্ছে।’

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ম্যানগ্রোভের সবুজে ঘেরা চর কুকরি-মুকরি
ম্যানগ্রোভের সবুজে ঘেরা চর কুকরি-মুকরি
প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশসেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশসেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
‘আদাই’র নগ্ন দৃশ্যে ভয় পেয়েছিলেন অমলা, নতুন সিদ্ধান্ত নায়িকার 
‘আদাই’র নগ্ন দৃশ্যে ভয় পেয়েছিলেন অমলা, নতুন সিদ্ধান্ত নায়িকার 
সর্বাধিক পঠিত
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রয়ে বাধা নিয়ে মধ্যরাতে আসিফ নজরুলের পোস্ট
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী
ঘরে টাকার স্তূপ-স্বর্ণ-গাড়ি, গ্রেফতার মাদক সম্রাজ্ঞী
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর ফোন, জিএম বরখাস্ত
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর ফোন, জিএম বরখাস্ত
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী