X
শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

কবিতা

প্রতিদৃশ্য

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২১, ০২:২৭

প্রতিদৃশ্য

প্রতিদৃশ্য আমি। আমাকে আমির মতো কিছু তুমি দাও।
তুমি রেলগাড়ি। ঝমঝম। তোমার নামে দিনে দুবার সাতটা বাজে।

একটা ঝাউ। ঝাউয়ের মাথায় রোদ। রোদের মাথায় উর্ণি।
কোন গোলটেবিল কোনো দিন ঝাউগাছ হবে না। তর্ক হবে। যুদ্ধ হবে। পারমাণবিক হবে।
মানবিক হবে শুধু চা। কফি। চিকেন আর করমর্দন।

পাখিগুলো গোল। রঙ্গও গোল। তোমরা গোল গোল খেল। 

গতি ও গমন ছিল। আকার-প্রকার ছিল। আদি ছিল—অন্ধকার।
তার আগ থেকেও গুগল শুরু। পাখিরা জানে, পাখিরা আজও রক্ত দেয়। 

ভূগোল দেখো। চাপাচাপা পাশ। কমলালেবু চিরদিন তুল্য থেকে গেল। মানচিত্র হলো না।


ডাক

দেহ ডাকছে, শোনো... বর্ণনা খুলে দেখি, একটি ছাতিমগাছ আর কিছু ভূমিকা ও উপসংহার।
মাঝখানে হাঁ করা বেইলিরোড... ও পাখি চল-চল নাটক দেখে আসি।

কাল খরগোশের সাথে দেখা হয়েছিল, সে আর দৌড়াবে না।
পরাজয় তার কাছে রমনাপার্ক, বেঁচে থাকার গল্পগাছা।

আমার সমকোণ আছে কিন্তু কোনো ডাকটিকিট নাই। মৃগয়া নাই। লকবই নাই।
ব্যক্তিগত প্রজাপতি ছিল, তিনি এখন বিয়েপত্রের কার্টুন।

এই যে আঙুলগুলো কেবল চাষ করে। পাখি আঁকে। শিকার করে। খায়।
অথচ আঙটি পরে হস্তকন্যা অনামিকা। যতবার স্নেহ, ততবার নদী-নদী সুবর্ণরেখা।

দেহ ডাকছে শোনো... দেহ ডাকবে শোনো...


চিতা

ব্রিজ পার হলে কতগুলো চিতাবাঘ, সেতার শুনতে এসে শুয়ে আছে ঘাসে।
রক্তপিপাসা থেকে তারা একলাফে নির্জন।

ইতিহাস আজও ষড়যন্ত্র ফেরি করে। ফুলার রোডে তার ছটফট। স্বরলিপি।

পাহাড় ডাকো—ও পাহাড়...
ঝরনাকে ডাকো...
মৃগয়া ফিরিয়ে নিলে সমস্ত হরিণ দেখো উপসর্গের মতো।

হারাবার মতো কিছু ব্রহ্মাণ্ড ছিল, একুশ বছর পর তার শিরচ্ছেদ।
অথচ জল্লাদ আজ চারুকলা শেখে, আকাশ শিথান দিয়ে ঘুমায়। 
নাম ধরে ডাক দিলে সেও প্রেমিক চিতা।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

ঘুমোতে যাবার আগে  

ঘুমোতে যাবার আগে  

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ০০:১১

চলে যাব, সেদিন মরণ এসে অন্ধকারে আমার শরীর
ভিক্ষা করে লয়ে যাবে,—সেদিন দু’দণ্ড এই বাংলার তির—
এই নীল বাঙলার তীরে শুয়ে একা একা কী ভাবিব, হায়,—

শরীর খুব অসুস্থ, কদিন ধরেই তেতে ছিলো অভব্য প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ার কারণে। প্রতিদিনের মতই ১৪ অক্টোবর বিকালে তিনি হাঁটতে বের হলেন। একা জীবনানন্দ। যখন বেরুচ্ছিলেন স্ত্রী লাবণ্য তাঁকে বেরুতে নিষেধ করলেন, শরীর অসুস্থ ছিল কয়েকদিন ধরেই। লাবণ্যর নিষেধ না শুনেই জল দিয়ে মাথা ধুয়ে একাই বেড়িয়ে যান। ফেরার সময় বাড়ির কাছের লেক মার্কেট থেকে দুটো ডাব কিনে নেন। 

হাঁটতে হাঁটতে জীবনানন্দ রাসবিহারী এভিনিউ ও ল্যান্সডাউন রোডের সংযোগস্থলের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছেন, তিনি আসছিলেন রাসবিহারী এভিনুয়ের দক্ষিণ দিকের ফুটপাথ ধরে, সংযোগস্থলে এসে ফুটপাথ থেকে নেমে রাস্তা অতিক্রম করার জন্য পথে নামলেন। রাস্তার এই অংশটা বেশ চওড়া, ট্রাম যাতায়াতে জন্য রাস্তার মাঝখানে দুটো ট্রামলাইন পাতা। ট্রামলাইনের জমিটা ঘাসে সবুজ। তিনি ফুটপাথ থেকে নেমে মোটর, বাস, ট্যাক্সি প্রভৃতির জন্য পিচরাস্তার অংশ অতিক্রম করে ট্রামলাইনের কাছে এলেন, মনটা কিছুটা চঞ্চল ছিলোই, ভাবলেন ট্রাম আসার আগেই লাইন পার হয়ে যেতে পারবেন, এর আগে তো একটা স্টপেজ আছেই, এই সব ভাবতে ভাবতে কিছুটা অন্যমনষ্ক হয়েই ট্রামলাইন পার হতে লাগলেন।

তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, অন্ধকার অল্প অল্প করে জমছে। ট্রামটা আসছিল, আগের স্টপেজে লোক ওঠা-নামার না থাকায় না থেমে জোড়ের সাথেই চলে এলো, ছুটন্ত ট্রামটি জোড়ের সাথেই এসে ধাক্কা দিলো কবিকে, জীবনানন্দ আর ট্রামলাইন পার হতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে আহত ও অচৈতন্য হয়ে ট্রামলাইনের মাঝের সেই সবুজের ওপর ছিটকে পড়লেন, ট্রামের ক্যাচারের ভিতরে দেহটা ঢুকে গেল। রাসবিহারী এভিনিউ ও ল্যান্সডাউন রোডের সংযোগস্থলের দক্ষিণে একটা জলখাবারের দোকান ছিল, নাম ছিল ‘জলখাবার’। মালিক চুনীলাল দে পরে সেখানে ‘সেলি কাফে’ নামে রেস্টুরেন্ট খোলেন। জীবনানন্দের দুর্ঘটনার সময় এই চুনীবাবুই শুধু প্রত্যক্ষদর্শীই ছিলেন না, তিনি ছুটে গিয়ে অনেক সাহায্যও করেছিলেন। সেই চুনীবাবুর কথায়, ‘একটু পরেই হঠাৎ ট্রামের একটা শব্দ, বালিগঞ্জমুখো একটা ট্রাম কাকে যেন চাপা দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই পথচারীদের অনেকেই এসে গেলেন। গিয়ে দেখি একজন লোক অচৈতন্য হয়ে ট্রামের ক্যচারের মধ্যে পড়ে আছেন। ট্রাম দাঁড়িয়ে আছে। ট্রামের ড্রাইভার দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ভিড়ের মাঝে গাঢাকা দিয়ে সরে পড়েছে। যাইহোক, আমি তখনি ট্রামের তলায় ঢুকে আস্তে আস্তে তাকে বের করলাম। সমবেত জনতার দু-একজনের কথা কানে আসছিল, ট্রামলাইনের ঘাসের ওপর দিয়ে এই ভদ্রলোক আনমনে আসছিলেন। ট্রাম ড্রাইভার হর্ন দিয়েছিল, দু-একজন চিৎকার করলেও ভদ্রলোক কিসের চিন্তায় এমন বিভোর ছিলেন যে কিছুই তাঁর কানে যায়নি। যখন তাঁকে বের করা হলো, তখন তিনি অজ্ঞান। দু-তিনজনে মিলে জ্ঞানহীন জীবনানন্দকে ট্যক্সিতে তুলে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। চুনীবাবু তাঁকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রেখে এলেন, সাধারণ রোগীর মতোই পড়ে রইলেন জীবনানন্দ দাশ। পড়ে আত্মীয়স্বজনের অন্যবিভাগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁর শরীরের অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি আর। ট্রামের ধাক্কায় জীবনানন্দের বুকের কয়েকটা পাঁজর, কাঁধের হাড় এবং পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। ডা. বিধান রায় তাকে দেখতে গিয়ে জানিয়ে দেন যে তাঁর আর বাঁচার আশা নেই, যতদিন থাকেন একটু শান্তিতে রাখবেন। শম্ভুনাথ হাসপাতেলেই যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন কবি। ১৪ অক্টোবর রাত ৮টায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। গোটা জীবন অশান্তি ও আতৃপ্তির যন্ত্রণার এইভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটল। সবুজ ঘাস তার প্রিয় ছিল, অন্তিম আঘাতেও তিনি ছিটকে পড়েছিলেন সেই সবুজ ঘাসেই।

আশা স্বপ্নের ছাই ভষ্ম

১৯৫১ সালের ২৮শে মে ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে উত্তরবাংলার জলপাইগুড়ি শহরের তরুণ লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক সুরজিৎ দাশগুপ্তকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, ‘একবার ঘুরে আসতে ইচ্ছে করে, সভাসমিতি ইত্যাদি সবকিছুর হাত সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে তোমাদের মতো দু-একজনের সাহায্যে হিমালয়, চা-বাগান ইত্যাদি দেখে আসার লোভ জেগেছে মনে।’ পঞ্চাশোর্ধ কবির আরো অনেক ইচ্ছার মতই এই ইচ্ছাও পূর্ণ হয়নি। উল্লিখিত চিঠির সূত্রেই সুরজিত বাবু তাঁর শহরের কিছু নিসর্গ দৃশ্যের ফোটোগ্রাফ পাঠিয়ে দেন। ‘নগ্ন নির্জন’ শহরের ছবি। উত্তরে জীবনানন্দ লেখেন ‘এখুনি ঝিলের পারে ঘাসের ওপরে আকাশের মুখোমুখি নিজেকে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। নদী, ঝিল, পাহাড়। বন, আকাশ। কোনো নিরালা জায়গা থেকে এসবের নিকট সম্পর্কে আসতে ভালো লাগে আমার। বসে থাকতে পারা যায় যদি এদের মধ্যে, কিংবা হেঁটে বেড়াতে পারা যায় সারা দিন, তা হলেই আমাদের সময় একটা বিশেষ দিক দিয়ে (আমার মনে হয়) সবচেয়ে ভালো কাটে।’ 

নির্জনতা ও বিষণ্নতা আক্রান্ত জীবনানন্দের, প্রকৃতি ও মানবতার ছায়া-আচ্ছন্ন জীবনানন্দের ভালো লাগার ছোট ছোট টুকরোগুলো এমনই ছিল। ঝিলের পাসে ঘাসের ওপরে আকাশের মুখোমুখি নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাওয়া কবির ভালোবাসার ইচ্ছেগুলোও ছিল ভেসে বেড়ানো মেঘের মতো; শুভ্র ও খণ্ডখণ্ড, নিঃস্বার্থ ও উচ্চাশামুক্ত। এইসব ভালো লাগার ইচ্ছের অধিকাংশই ইচ্ছেপূরণের আনন্দে উত্তীর্ণ হয়নি, এই অতৃপ্তির যন্ত্রণার দহনেই দগ্ধ হয়েছেন তিনি নীরবে। নির্জন ও স্বতন্ত্র এই কবির গোটা জীবন ধরে রক্তপথ যাত্রা তাঁকে আরো স্বতন্ত্র করে দিয়েছিলো। 

জীবনানন্দের ৫৫ বছরের জীবনে ১৯১৯-এ ‘ব্রহ্মবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত (বৈশাখ ১৩২৬) ‘বর্ষা আবাহন’ কবিতা থেকে শুরু ধরলে কবিজীবন মাত্র ৩৪ বছরের, প্রকৃত বিচারে যদিও কবি জীবনানন্দের আয়ুষ্কাল আরো কম। এই ক্ষণকালের মধ্যেই তাঁর অন্তরের অনেকটা জুড়েই ছিল নতুনের, তারুণ্যের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। এই কারণেই যখন প্রান্তবাংলা জলপাইগুড়ির তরুণেরা লিখলেন, ‘আধুনিক সাহিত্য, বিশেষত, আধুনিক বাংলা কবিতার সঙ্গে উত্তরবংগের মানুষদের সম্পর্কে স্থাপনের জন্য একটা পত্রিকা প্রকাশ করতে চাই। আপনার একটা কবিতা চাই।’ জীবনানন্দের পর্যায়ের কবি এর উত্তরে কত অনায়াসে ‘শিরিষের ডালপালা লেগে আছে বিকালের মেঘে’ মফস্বলের নাম না জানা, না দেখা, সাক্ষাৎপরিচয়হীন সদ্য কৈশোর অতিক্রান্ত ছাত্রদের পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেন। জীবনানন্দকে জলপাইগুড়ি আসার আমন্ত্রণ করা হয়েছিলো ‘জলার্ক’-এর তরুণদের পক্ষ থেকে। ১৯৫২র ২০ জানুয়ারি জীবনানন্দ সুরজিত দাশগুপ্তকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘জলপাইগুড়ির ওদিককার অঞ্চল, পাহাড়, নদী, জংগল বেশ দেখবার মতো, ঘুরবার মতো, ঘুরে বেড়াবার মতো, আমার খুব ইচ্ছা করে, জল্পাইগুড়ির দিকে একবার যাব ভাবছি।’ কিন্তু তাঁর এই ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়। ১৯৫২তে লেখেন ‘আমার এখন জলপাইগুড়ি যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। যেতে পারলে অবশ্য আনন্দিত হতাম।’ 

অসুস্থতা, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তিতে বিপর্যস্ত কবি যেন সেসময় তাঁর ভালো লাগার জগৎ থেকে ক্রমশ ছিটকে যাচ্ছেন। এমনকি, কবিতাও লিখতে পারছেন না এই সময়। কবি কায়সুল হককে লেখা এইসময়ের একটি চিঠিতে তিনি একথা লিখেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জুন তিনি জানালেন, ‘নানা কারণে মন এত চিন্তিত আছে, শরীরও এত অসুস্থ যে অনেকদিন থেকেই কিছু লিখতে পারছি না।’ আলোচ্য এই চিঠিগুলো জীবনানন্দ লিখেছিলেন ১৯৫১-৫২, যখন তাঁর অন্তরাত্মা চাইছিলো জলপাইগুড়ির মতো কোনো সবুজ নির্জনতা। যখন চারপাশ তাঁর কাছে রূঢ় হয়ে উঠছিল। প্রতিটি ইচ্ছা ও কামনার মৃত্যু পরখ করছেন প্রতিদিন। ১৯৫০-এর ২ সেপ্টেম্বর তিনি খড়্গপুর কলেজ অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন, সদ্য প্রতিষ্ঠিত কলেজে নামমাত্র মাইনে পেতেন। স্ত্রী লাবণ্য ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজে বি. টি. পড়তে শুরু করেছেন এসময়। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ‘এলকাইনা’ রোগে অসুস্থ হয়ে পরেন। ১৯৫১-র জানুয়ারি, স্ত্রীর অসুস্থতার খবরে কলকাতা আসেন কবি। লাবণ্যদেবী সুস্থ হচ্ছেন না দেখে ছুটির সময় বৃদ্ধির আবেদন করেন কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বরখাস্থ করে দেয়। এসময় সহকর্মী পুলিনবিহারিকে কবি লেখেন, ‘বড়ই বিপদের ভেতর আছি। খড়্গপুর কলেজে থেকে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তিনশত টাকা পেয়েছিলাম। ফেব্রুয়ারি মাসে যে কাজ করেছিলাম, সে পাওনা আজ পর্যন্ত পাইনি। অন্তত পূর্বের মাইনে না পেলে এই দুর্দিনে কিছুতেই টিকে থাকতে পারবো না।’

এ সময় চরম বেকারত্বের। তাঁর কাধেই সংসারের ভার। বাড়ি নিয়ে, পরিবার নিয়ে তাঁর শত দুশ্চিন্তা। খড়গপুরের কলেজের সাড়ে পাঁচ মাসের মেয়াদি চাকরি চলে যাওয়ার পর সম্পূর্ণ বেকারত্ব তাঁকে অসহায় অবস্থা্র মধ্যে ঠেলে দেয়। শুরু হয় আবার চাকরির খোঁজ। ১৯৫৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির রিসার্চ এসিস্ট্যান্টের জন্য দরখাস্ত করেন কবি। প্রার্থী হন চারুচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনার জন্য। এসব ছেড়ে একসময় ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন তিতিবিরক্ত, হতাশ জীবনানন্দ। এ সময় তাঁর আত্মবিশ্বাসেও ফাটল ধরেছিলো। অধ্যাপনার বা পড়ানোর কাজ খুব একটা পছন্দের ছিলো না, তবুও হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। ভাইবৌ নলীনী চক্রবর্তীকে তিনি অধ্যাপনার সম্পর্কে লিখেছিলেন। ‘অধ্যাপনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেসবের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনি যা লিখেছেন ঠিকই। তবে অধ্যাপনা জিনিসটা কোনো দিনই আমার ভালো লাগেনি। যেসব জিনিস যাঁদের কাছে যেমন ভাবে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে—তাতে আমার বিশেষ আস্থা নেই। এই কাজে মন তেমন লাগে না, তবুও সময় বিশেষে অন্য কোনো কোনো প্রেরণার চেয়ে বেশী জাগে তা স্বীকার করি।’ শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেও, সন্তুষ্ট ছিলেন না, সম্ভবত নিশ্চিন্ত কোনো শিক্ষকতাও কোনো দিন পাননি। একটা কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে উঠেছিলেন, চিঠি লিখেছিলেন শিক্ষকতা/অধ্যাপনা চাকরির খোঁজের জন্য হরপ্রসাদ মিত্র, নরেশ গুহ কিংবা অনিল বিশ্বাসকে। হরপ্রসাদ মিত্রকে লিখেছিলেন : অমৃতবাজার পত্রিকায় দেখা গেছে, কলকাতার কয়েকটি প্রথম শ্রেণীর কলেজে ইংরাজি শিক্ষক নেওয়া হবে। কিন্তু কলেজের নামের পরিবর্তে পোস্ট বক্স নম্বর ব্যবহৃত বলে বুঝতে পারছি না স্কটিশচার্চ অথবা সিটি কলেজের প্রয়োজনে এই বিজ্ঞাপন।’

আর্থিক প্রয়োজনে জীবনানন্দ একসময় সিনেমার গান লেখবার কথাও ভেবেছিলেন। বন্ধু কবি অরবিন্দ গুহের কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেন—‘সিনেমার গান লিখলে নাকি টাকা পাওয়া যায়? তুমি কিছু জানো এবিষয়ে?’ অরবিন্দ বাবু তখন এবিষয়ে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে বিষয়টি তুলতে পারেননি কবি। এর পর অরবিন্দ বাবু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কথা বলেন। সিনেমার ডিরেক্টার শৈলজানন্দ বাবু জীবনানন্দের কাছের মানুষ ছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও পূর্বের মতই কবি আর বিষয়টি তুলতে পারেননি। কারণটি বেশ মজা করে অরবিন্দবাবুকে তিনি বলেছিলেন : এরপর সকৌতুক ভঙ্গিতে তিনি বলেন, যদি শৈলজা আমার জন্য কোথাও একটা ব্যবস্থা করে দেয় তাহলেও আমি কেমন করে লিখব, ‘রাঁধে -এ -এ -এ, ঝাঁপ দিলি তুঁই মরণ যমুনায়।’

এই কথোপকথনের কিছুদিনের মধ্যেই সেই মহাদুর্ঘটনা, ১৪ অক্টোবর। 

এমনই একদিন আড্ডার ছলে জীবনানন্দ অরবিন্দ গুহকে বলেছিলেন : ‘আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমি মানুষের নীতিবোধে বিশ্বাস করি।’ এই বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল জীবনানন্দের জীবন ও সাহিত্যে, কবিতায় ও কথায়। গোটা জীবন যে আর্থিক অনিশ্চয়তা তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে তাই তার প্রধান বিপন্নতা ছিল।

মুর্শিদাবাদের সরকারি আমলা অনিল বিশ্বাসকে লেখা তাঁর চিঠির মধ্যেও কবির বিপন্নতা ধরা পরে : বর্তমানে অত্যন্ত অসুবিধায় আছি, কাজ খুঁজছি। কলকাতায় একটা সাধারণ কাজও পাওয়া যাচ্ছে না। জংগীপুর কলেজে একজন ইংরেজি শিক্ষক নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছে, আমার বর্তমান অবস্থা এমন যেকোনো রকম কাজ করতে আমি কোনোরকম দ্বিধা করবো না।’ অথচ, আমরা জানি তিনি কলকাতাকে আঁকড়ে ধরেই থাকতে চেয়েছিলেন, বুদ্ধদেব বসুকে লিখেছিলেন : কলকাতার অলিগলি মানুষের শ্বাস রোধ করে বটে, কিন্তু কলকাতার ব্যাবহারিক জীবনে প্রান্তরের মতো মুক্তি পাওয়া যায়; এখন যখন জীবনে কর্মবহুলতার ঢের প্রয়োজন, কলকাতা এই স্বচ্ছন্দ পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা চলে না আর।’ এখানে উল্লেখ করতে হয় নলিনী চক্রবর্তীকে লেখা তাঁর উক্তি : ‘বরাবরই আমার আত্মোহতি ও জীবিকা নিয়ে কলকাতায় থাকার ইচ্ছে।’

১৯৫১-তে যে দুর্বিষহ আর্থিক চাপ তাঁর উপর নেমে আসে তাতে একসময় বিপন্ন জীবনানন্দ জনৈক পরিচিতের সঙ্গে ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, যদিও তা শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। খাঁ খাঁ বেকার সংসারের চাপে জীবনানন্দ প্রত্যহ খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের কলম থেকে বিভিন্ন কাজের খোঁজ নিয়ে আবেদন করতে থাকেন। তাঁর এরকম অসহায় জীবনের, অর্থাৎ কর্মহীনপর্বে একবার পরিচিতদের পরামর্শে দেখা করতে গিয়েছিলেন রাইটার্সে রেভিনিউ বোর্ডের সদ্য আই সি এস সত্যেন ব্যানার্জীর সঙ্গে। দেখা করতে গিয়ে রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েন, রাইটার্স বিল্ডিংয়েই অবনীমোহন কুশারীর ঘরে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন। 

পরের বছর চাকরি পেলেন তাঁর স্ত্রী লাবণ্য। এ সময়ই চার মাসের জন্য চাকরি পান জীবনানন্দ, ১৯৫২-র নভেম্বর থেকে ১৯৫৩-র ফেব্রুয়ারি, বড়িশা কলেজে শিক্ষকতার। কিন্তু এখানেও থাকা হয়নি। এই সময়কালে তিনি এতটাই বিপন্ন ছিলেন যে কবিতাও লিখে উঠতে পারছিলেন না। এ সময়ের একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সুরজিত দাশগুপ্ত একবার জলার্কের জন্য বুদ্ধদেব বসুর কাছে লেখা চাইতে গেলে তিনি প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখার জন্য পৃথক দর উল্লেখ করেছিলেন। সুরজিৎ দাশগুপ্ত এ কথা জীবনানন্দকে জানিয়ে তাঁর কোন দর আছে কিনা জানতে চাইলে জীবনানন্দ লেখেন, ‘একটি কবিতার জন্য সম্মানমূল্য আমি সাধারণতঃ ২৫/৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত পাই, তোমরা ২০ টাকা দাও। আমি সময় করে ভালোভাবে নতুন কবিতা লিখে পাঠাই।’ লেখার জন্য সময় ও সাধনা দরকার, গদ্যের চেয়ে কবিতার বেশি। ২রা নভেম্বর ১৯৫১তে তিনি এই চিঠিটি লেখেন।

ইতোপূর্বে কিছু চিঠির উল্লেখ করেছি, এমনি ১৯৫৭র জ্যৈষ্ঠ মাসে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়কে কবি লেখেন ‘বেশ ঠেকে পড়েছি, সেজন্য বিরক্ত করতে হলো আপনাকে। এখুনি পাঁচশ টাকার দরকার, দয়া করে ব্যবস্থা করুন। এই সঙ্গে পাঁচটি কবিতা পাঠাচ্ছি। পরে প্রবন্ধ ইত্যাদি (এখন কিছু লেখা নেই) পাঠাবো। আমার একটা উপন্যাস (আমার নিজের নামে নয়—ছদ্মনামে) পূর্বাশায়, কিন্তু টাকা এক্ষুনি চাই—আমাদের মতো দু-চারজন বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের এরকম দাবি গ্রাহ্য করবার মতো বিচার বিবেচনা অনেকদিন থেকে আপনারা দেখিয়ে আসছেন—সেজন্য গভীর ধন্যবাদ। লেখা দিয়ে আপনার সব টাকা শোধ করে দেব, না হয় ক্যাশে। ক্যাশে শোধ করতে গেলে ছ-সাত মাস তার বেশি নয়, দেরি হতে পারে।’ এক সময় তিনি, এই অবস্থায় পড়বার অনেক আগে অচিন্তকুমার সেনগুপ্তকে লিখেছিলেন ‘চারদিকে বে-দরদীর ভিড়। আমার যে একটি সমানধর্মা আছি, একটা নিরেট অচ্ছেদ্য মিলনসূত্র দিয়ে আমাদের গ্রথিত করে রাখতে চাই। আমাদের তেমন পয়সা-কড়ি নেই বলে জীবনে “creative comforts” জিনিসটা হয়তো চিরদিন আমাদের এড়িয়ে যাবে।’ বিভিন্ন জায়গায় কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছেন, বছরের পর বছর অনিশ্চিত জীবন যাপন করতে হয়েছে তাঁকে। খবরের কাগজের দপ্তরে কাজও করেছেন। স্বরাজ-এ প্রায় বেতনহীন অবস্থায় কয়েকমাস কাজ করেছেন, রবিবারের সাময়িকী দেখতেন। এই কাগজের চাকরি ছাড়ার পরেই তীব্র আর্থিক দুরাবস্থায় পড়ে বাধ্য হন উপন্যাস লিখতেন, রোজগারের জন্য, স্বাভাবিকভাবেই অনেকাংশে তা তাই হয়ে উঠে আত্মজৈবনিক। নিজস্ব যন্ত্রণা-জটিল জীবনের আলো-আঁধার অনুসৃত সৃজনের পেছনে থেকেছে তার আত্মগত উচ্চারণ। 

এক সময় যে কবি বুঝেছিলেন ‘এ যুগ অনেক লেখকের, একজনের নয়—কয়েকজন কবির যুগ; বিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বের স্বপ্ন দেখা জগৎ স্বপ্ন দেখানো জগত, ক্রমশ শতাব্দীর বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাচ্ছিলো। প্রকৃতির রূপ রস-এ নিমজ্জিত কবিও এই যন্ত্রণার বিবর্তন টের পেয়েছেন। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, কালোবাজারী, বেকারত্ব, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থির করে তুলেছিলো, পরাধীনতার বেদনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এই সময়ের সর্বোচ্চ আলোড়ন। শতাব্দীর এই রাক্ষসী বেলায় আর বাস্তবের রক্ততটে জীবনানন্দের আগমন। যার কাছে বাংলার লক্ষ গ্রাম ‘নিরাশায় আলোকহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেজ’। জীবনানন্দ যে যন্ত্রণায় তাড়িত হয়েছিলেন তা কি শুধু বাইরের জগতের, নাকি তাঁর অভ্যন্তরের, খবর কে রাখে? তাঁর যন্ত্রণার চিহ্ন নিয়ে রয়ে গেছে তাঁর কবিতা :

‘কোনোদিন মানুষ ছিলাম না আমি,
হে নর, হে নারী,
তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনদিন;

...

গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত;
আমাকে কেন জাগাতে চাও?’

তাঁর ‘আট বছর আগের একদিন’ পর্বের কবিতায় জীবনানন্দের যে আস্তিক্যবোধের স্পর্শ পাই, সংশয়ের চিহ্ন দেখি তা পরবর্তীতে ‘মহাজিজ্ঞাসা’য় দৃঢ় হয়ে ওঠে। জীবন যাঁর কাছে ছিল ‘অন্ধকারের সারাৎসারে অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে থাকা’, আবার তিনিই লেখেন, ‘তবু চারিদিকে রণক্লান্ত কাজের আহ্বান। / সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে—এ-পথেই পৃথীবীর ক্রমমুক্তি হবে’। জীবনের প্রতি প্রত্যাশামুক্ত কবিকে ক্রমশ মৃত্যু বোধ আচ্ছন্ন করছিল। যিনি একসময় লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর ভরাট বাজার লোকসান / লোভ পচা উদ্ভিদ কুষ্ঠ মৃত গলিত আমিষ গন্ধ ঠেলে / সময়ের সমুদ্রকে বারবার মৃত্যু থেকে জীবনের দিকে যেতে ব’লে।’ (পৃথিবীতে এই) তিনিই লেখেন ‘কোথাও মৃত্যু নেই—বিরহ নেই / প্রেম সেতুর থেকে সেতুলোক—/ চলছে—জ্বলছে দ্যাখ। (আমি) স্বেচ্ছা ধ্বংসের যে ধূসর ছায়ায় তিনি বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন, সেই শান্তি তাকে দিয়েছিলো মৃত্যু, স্বেছা আহূত কি সেই মৃত্যু? যেখানে কবি ‘কোনোদিন জাগিবে না আর / জানিবার গাঢ় বেদনার / অবিরাম—অবিরাম ভার/ সহিব না আর’।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২১, ১৩:১৪

ভালোবাসি চলো

চলো ভালোবেসে ফেলি পরস্পরে 
পাড়ার লোকে? 
তাকালো না হয় আড়চোখে— 
ক্ষতি কী! 
শানবাধা পুকুরঘাট তো নেই আর 
নেই জমিদারি নৌকায় বাদ্য সাজিয়ে আমোদের ভ্রমণ— 
সাথে শিল্পের খেলা 
এ বুঝি পড়ন্ত বেলা 
হলে হোক, ক্ষতি কী! 
আবার তো সকাল হবে 
আলোয় আলোয় আলোকিত হবে বাগান-ফুল 
হলে হোক ভুল; 
আমরা হয়তো বাগান পাব না 
ক্ষতি কী! 
ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক। 
আমরা তো একটি রাস্তাও পাব 
শুধু কি তাই! 
ফ্লাইওভারে চুল উড়িয়ে পাব বিন্দাছ হাঁটার সুখ 
পৃথিবী তবে নিরাপদ করুক আমাদের পথ চলা।। 
চলো, 
এর পরেও কি চিন্তিত হওয়া মানায় বলো? 
দেরি কেন; ভালোবাসি চলো, 
চলো ভালোবাসি পরস্পরে; 
জাত-পাতের কথাও তো দেখি ভাবো অবসরে! 
ঘরে? 
পরে? 
কৃষ্ণের ভালোবাসায় কি অধর্মের কল নড়ে? 
দ্বারে? 
আহা, সোজাসুজি বলো দুয়ারে 
না হয় বলো প্রবেশদ্বার 
এবং বলো দরজা যার 
পারাপার? 
তুমিও তো জানো—উনিও যে নিয়েছেন ফরহাদ-ইউসুফের ভার।। 
পৃথিবীতে দেখো স্ববিরোধী চরিত্রগুলোর খেলা— 
দেখো রক্তের হোলি, 
এসো ভালোবেসে পথ চলি; 
তবে রক্তের খেলা ফেলি 
কে নাড়ে কড়া দুয়ারে হায়! 
আমরা না হয় ভালোবেসে দাঁড়াব মৃত্যুর দরজায়।।



কি করেছি আমি

কি করেছি আমি? 
আমাকে দেখে মুখ ফেরালো 
আকাশে একফালি চাঁদ 
দিনের সূর্যও মুখ ফেরালো 
অশ্রু যে ভাঙ্গলো বাঁধ!

কি করেছি আমি? 
পরিণয় চাওয়াতে বিচ্ছেদ পাতে 
কাঁটা যে বিঁধল পায় 
মঙ্গল চাওয়াতে অমঙ্গল ঘটল 
কলঙ্ক লাগল গায়।

জীবনবীণার করুণ সুরে 
জেগে থাকা প্রতিটি নিশি 
আমার শোকে শোকাহত আজ 
আঁধার রাতের শশী।

কি কারণে যে বিচ্ছেদ চাও 
বাক্ বিনিময় বন্ধ করে দাও 
তুমিই বলো, তুমি ছাড়া আমার 
কী আছে প্রিয় দামি? 
নোনা জলে না হোক 
ঘৃণা ভরে বলো, 
কি করেছি আমি?


অহেতুক প্রস্থান

দৃষ্টি সীমানা পেরিয়ে 
অনন্ত অসীম কোন দূরত্বের সেপথ 
স্মৃতির পৃষ্ঠাজুড়ে কেবল অঞ্জলি ভরা দুঃখ 
তবুও হেঁটে চলা পথ— 
যেন মরুর পথে ধু-ধু বালুচর 
বিচ্ছেদ যেখানে বিধেছে বিমূর্ত চেতন; 
কেন তবে প্রস্থান মৃত্তিকার গন্ধে!

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

ঘুমোতে যাবার আগে  

ঘুমোতে যাবার আগে  

ব্যক্তিগত

ব্যক্তিগত

উজান বই আলোচনা

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪৭

উজান বই আলোচনা প্রতিযোগিতায় সেরা আলোচক হয়েছেন কবি ও প্রাবন্ধিক সরোজ মোস্তফা (গোলাম মোস্তফা)। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন ইলিয়াস বাবর এবং তৃতীয় স্থানে আছেন মাজেদা মুজিব। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীরা পাচ্ছেন যথাক্রমে ২০ হাজার, ১৫ হাজার এবং ১০ হাজার টাকা কিংবা সমমূল্যের বই। দেশের স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের নিয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের বিচারক কমিটির মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

উজান থেকে প্রকাশিত অনুবাদ গ্রন্থ ‘কোরিয়ার কবিতা’ (ছন্দা মাহবুবের অনুবাদ) এবং ‘কোরিয়ার গল্প’ (ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদের সম্পাদনা)-এর ওপর এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। বই দুটির বাংলা অনুবাদ এবং প্রতিযোগিতা আয়োজনে সহযোগিতা করেছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। বই দুটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা উজান।  

প্রতিযোগিতায় আলোচনা জমা দিয়ে নির্বাচিত আলোচক হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন আরো ১০ জন। তারা হচ্ছেন যথাক্রমে : মিলু হাসান, জাহিদ সোহাগ, সিরাজুম মুনিরা, সম্প্রীতি মল্লিক, অলাত এহসান, হারুন সুমন, রুম্মানা জান্নাত, ফাহাদ হোসেন, হাসান জামিল, আবিদা তাহসিন প্রমি। নির্বাচিত আলোচকরা প্রত্যেকে পাচ্ছেন ৫ হাজার টাকা মূল্যের বই।

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের জমা দেওয়া আলোচনার মান যাচাই ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই ১৩ জনের অবস্থান নির্ধারণ করেন পাঁচ সদস্যের বিচারক কমিটি। বিচারকরা হলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক সুব্রত বড়ুয়া, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক কুমার চক্রবর্তী, অনুবাদক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, কবি সোহেল হাসান গালিব এবং কোরিয়ান ভাষা বিশেষজ্ঞ ও অনুবাদক শিউলি ফাতেহা।

উজান বই আলোচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানের তারিখ দ্রুতই জানিয়ে দেওয়া হবে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

ফরিদা মজিদের কথা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৫:০০

অতি আধুনিক জীবন যাপন করে ‘আধুনিকা’ হয়েও ফরিদা মজিদ সারা জীবন মনে প্রাণে খাঁটি বাঙালি হয়েই ছিলেন। দীর্ঘকাল যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী থাকা স্বত্ত্বেও তিনি শাড়ি পরা ছাড়েননি। শুধু বাইরের পোশাকেই নয়; মনের দিক দিয়েও অস্তিমজ্জায় তিনি ভেতরে ভেতর লালন করতেন, ধারণ করতেন নিজস্ব সংস্কৃতির মার্জিত এবং রুচিশীলতার ‘বাঙালিত্ব’। তিনি ‘বাংলার নারী’ নামে একটি সংগঠনও করেছিলেন। তবে তা নারীবাদী সংগঠন নয়।

ফরিদা মজিদের সাথে প্রথম দেখা হয় ২০০৪ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কবি, অনুবাদক, মানবতাবাদী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক, বুদ্ধিজীবী ফরিদা মজিদের সাথে বিশ্বখ্যাত এবং নোবেলপ্রাপ্ত অনেক লেখকের বন্ধুত্ব ছিলো। তাঁদের মধ্যে কবি-বিশিষ্ট নাট্যকার ডেরেক এলটন ওয়ালকট, কবি জন অ্যাশবেরি, অ্যালেন গিন্সবার্গ থেকে শুরু করে টেড হিউজ, জ্যাক দেরিদা, জিনি লোলা ব্রিজিদার এঁরা অন্যতম। এঁদের কারো কারো সাথে ফরিদা আপার পত্র যোগাযোগ ছিলো।

‘প্রয়াতদের অপ্রকাশিত চিঠিপত্র’-এর জন্য তিনি তাঁর নানা কবি গোলাম মোস্তফা, ডেরেক ওয়ালকটসহ ক’জনের চিঠি দিয়ে আমার সংগ্রহ সমৃদ্ধ করেছেন।

সেই চিঠি সংগ্রহের জন্য তাঁর নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে ১২০ হাডসন রিভার ড্রাইভে বাসা যাই। নদীর কাছের ছিমছাম একটি ছোট্ট ফ্লাট। সেই ফ্লাটে গিয়ে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করো। দরজা খুলছি।’

দরজা খুলতে-খুলতে বললেন, ‘নোংটো ছিলাম। জামাটা পরে নিলাম।’

আমি বিব্রত এবং বিষ্মিত হলাম! পরে তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করলেন, আমরা পোশাক পরি, লজ্জা ঢাকি নিজের নগ্নতা আড়াল করার জন্য। কিন্তু তা নিজের জন্য নয়; অন্যের জন্য! তাই আমি ঘরে একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে এভাবেই থাকি!

ফরিদা আমার এই বিষয়টি প্রথমে ধাক্কা খেলাম এবং তা পাগলামি মনে হলেও পরে গভীর দর্শনতত্ব এবং এন্ট্রি-মর্ডান-লাইফ খুঁজে পেয়েছিলাম। পরে এই ধারণ এবং দর্শন নিয়ে আমি একটি কবিতাও রচনা করেছি।

নিজগৃহে খোলামেলা থাকার বিষয়টা আলাদা একটা সংস্কৃতি। একবার ‘সাপ্তাহিক বাঙালি’র সম্পাদক বন্ধু কৌশিক আহমদ এবং আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন দেখা করতে গিয়েছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গের বাসা। তিনিও তখন একেবারে পোশাকবিহীন অবস্থায় এসে দরজা খুলেছিলেন। গিন্সবার্গের ব্যাখ্যাও হয়তো তাই।

প্রসঙ্গক্রমে আরো একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছি। আমি টিটিসিতে কাজ করার সময় আমার ট্রেনিং-ইন্সট্রাক্টর প্যাট্রিক পরিচয় পর্বে বাংলাদেশের কথা শুনেই জর্জ হ্যারিসনের ‘বেংলাদেশ, বেংলাদেশ/ My friend came to me/ With sadness in his eyes… গেয়ে উঠেছিলেন। তিনি একজন গায়কও। তাঁর কণ্ঠের সেই গানটি ধারণ করার জন্য তাঁর টরন্টোস্থ ডাউন টাউনের বাসায় গিয়েও তাকে জন্মদিনের পোশাকে দেখতে পাই। প্যাট্রিকের আরেকটি বিষয় ছিলো তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তাঁর ভাষ্য, পৃথিবীতে যদি একজন লোক মোবাইল ছাড়াই থাকবে, সে হচ্ছে আমি!

সে প্রসঙ্গ থাক। সেদিন ফরিদা আপার বারান্দায় বসে দ্বিপাক্ষিক আড্ডা হলো। আড্ডা দিতে দিতে গ্লাসে ডগডগ করে ড্রিংক ঢাললেন। আমি খাব কি না, তা জিজ্ঞেসও করলেন না! সাথে কাজুবাদাম আর আলুর চিপস।

‘চিয়ার্স’ বলেই চুমুক দিতে দিতে একা একাই বলতে থাকলেন তাঁর রাজ্যের কথা। যেন ঠাকুরমার ঝুলি খুলে বসলেন। তাঁর কিছু কিছু কথা বোধগম্যও হচ্ছিল না। একটু ধৈর্যচ্যুত হচ্ছিলাম। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য—লেখকদের চিঠি। একফাঁকে বললেন, তোমার দুটি কবিতা দিয়ো। অনুবাদ করব।

সেদিন অনেকটা একতরফাই প্রচুর গল্প করলেন। জানলাম, তখন পর্যন্ত তাঁর কোনো বই বের হয়নি।

১৯৯৬ সালে আমার সরকারি চাকরি সমাপ্তির পর আমি আজিজ মার্কেটে প্রথমে ‘মিসিং লিংক’ পরে ‘স্বরব্যঞ্জন’ থেকে প্রবাসীদের জন্য নিউজ সার্ভিস, পত্রিকা প্রকাশ এবং গ্রন্থ প্রকাশনা শুরু করি। আমার প্রকাশনা থেকে ফরিদা আপার অনূদিত বিদেশি কবিদের একটি গ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তাব দিলাম। তিনিও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

পরে তিনি আমাকে নিয়ে বের হলেন। প্রথমে কলেজে একটি ক্লাস নেবেন। তারপর  বিকেলে আমাকে নিউ ইয়র্ক দেখাবেন। স্থানীয় একটি কলেজে সাহিত্য বিষয় ক্লাস নিলেন। আমাকে একবার বাইরের একটি ফাঁকা ব্যাঞ্চে বসিয়ে রাখলেন। পরে কি মনে করে ক্লাসে নিয়ে গেলেন। বললেন, আমার ক্লাস করো।

আমি বললাম, ভালোই হলো—আমি আপনার একদিনের ছাত্র।

—না, না। তোমাকেও মাস্টার বানাচ্ছি। দাঁড়াও।

তাঁর ক্লাস নেওয়ার স্টাইল ভিন্ন। পাঠ্য পড়ার চেয়ে অপাঠ্য বিষয় নিয়েই আলোচনা করলেন। অনেকটা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের মতো। যদিও সায়ীদের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনটাই আমার হয়নি। তবে তা সায়ীদ ভাইয়ের প্রিয় ছাত্রদের কাছে জানা।

যদ্দূর মনে পড়ে ফরিদা আপা সেদিন নারী লেখকদের সাহিত্য পড়িয়ে ছিলেন। এক পর্যায়ে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন—বাংলাদেশের কবি হিসেবে। এবং আমাকে তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার অনুরোধ করলেন। আমি এই পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত এবং বিব্রত। অনেকটা হাত-পা কাঁপাকাঁপি অবস্থা। একই রকম কাজ করেছিলেন ইকবাল করিম হাসনু। তিনিও ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টোতে চালুকৃত বাংলা ক্লাসে অতিথি বক্তা হিসেবে মঞ্চে উঠিয়ে দিয়েছিলেন।

যাহোক। ফরিদা আপা আমার সিটে বসলেন। আমি সেদিন কি বলেছিলাম, তা পুরোটা মনে নেই। যদ্দূর মনে পড়ে বাংলাদেশের কবিতা, নারী-কবিদের কবিতা নিয়ে কয়েক মিনিট কথা বলেছিলাম। প্রথমত, বাংলাদেশের নারী-কবিদের কবিতা নিয়ে কাজ করেছেন মার্কিন কবি ও গবেষক ক্যারোলিন রাইট। তাঁর কাজে আমার সহযোগিতার কথা বললাম। সেই সাথে প্রয়াত কবি নাসিমা সুলতানা এবং প্রবাসী কবি তসলিমা নাসরিন নিয়ে যৎসামান্য বললাম। কারণ, এরা তিন জনেই আমার বন্ধু। তখন দু-এক জন প্রশ্ন করেছিল—ক্যারোলিনের কাজ, নাসিমার মৃত্যু এবং তসলিমার দেশান্তরী নিয়ে।

আমি লেকচার টেবিল থেকে নামার পরও বাকি প্রশ্নের বাকি উত্তর দিয়েছিলেন ফরিদা আপা। ক্লাস থেকে বেরিয়ে আমাকে যথারীতি নিউ ইয়র্ক দেখালেন এবং আমার দেশে ফেরার আগের দিন অর্থাৎ পরের রোববার বাসায় দুপুরে খাবার দাওয়াত দিলেন আমাকে এবং ক্যারোলিন রাইটকে। ক্যারলিন রাইট তখন নিউ ইয়র্কে এসেছিলেন বিশ্বজিত সাহার ‘দশ সেরা বাঙালি’ অনুষ্ঠানে।

সেদিন ক্যারোলিনও এলেন, আমিও গেলাম। আড্ডা, ভাত-ভর্তা এবং আবারো নারী-কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনা চমৎকার কাটল নিউ ইয়র্কে একটি ঝলমলে দুপুর। বেশ জমেছিলো ক্যারোলিনের ঢাকা থাকাকালীন স্মৃতিচারণে। জানতে চাইলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, কাজী রোজীদের সম্পর্কে। ক্যারোলিন আমার মিরপুরের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। আমার আম্মার হাতের রান্না খেয়েছিলেন। সেই ঝাল তরকারির কথা এখনো মনে আছে তাঁর।

ফরিদা আপা এবং ক্যারোলিন তাঁদের দুজনেরই পছন্দের পোশাক ‘শাড়ি’। ফরিদা আপা শীত প্রধান দেশে শীতকালেও শাড়িই পরতেন। টিপ পরতেন। খোঁপা বাঁধাতেন। তাঁর ফেইসবুক ঘেঁটে দেখলাম, মাত্র দুটি ছবি মার্জিত ভাবে অন্য ড্রেসে। বাকি সবই শাড়ি পরা ছবি। শাড়ি সম্পর্কে ক্যারোলিনের মূল্যবান বক্তব্য—‘এ এক অদ্ভুত ড্রেস। দশ হাতি একটা কাপড় সেলাই ছাড়াই কি চমৎকারভাবে সারা অঙ্গে জড়িয়ে থাকে অপূ্র্ব সৌন্দর্যে’!

দুই
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় নিউ ইয়র্কে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ স্বেচ্ছা সেবকের বিরল ভূমিকা পালন করেন ফরিদা। এছাড়াও পাকিস্তানবিরোধী যেসব বিক্ষোভ-সমাবেশ-আন্দোলন হতো, তাতে ফরিদা আপার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালেও নিউ ইয়র্কে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমন্বয়কারী হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করেন। শুধু ভালো ইংরেজিই নয়; আরবি ভাষাতেও দক্ষ ছিলেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ইংরেজি বক্তৃতা দিয়ে, আরবি লিফলেট লিখে বিলি করে বিদেশির কাছে জনমত গড়ে তুলে ছিলেন। তাঁর সেই দেশপ্রেমের অবদান অনস্বীকার্য।

সেসব ঘটনা সাপ্তাহিক বাঙালির ৯ অক্টোবর ২০২১ সংখ্যায় স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সুন্দর করে উপস্থাপনা কবি ফকির ইলিয়াস এবং আদনান সৈয়দ।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তাঁর অসীম দেশপ্রেম দেশ বা দেশের মানুষ মূল্যায়ন করেনি! এবং তিনিও কখনো এই নিয়ে ভাবেননি তা পুঁজি করে ভাঙ্গাতে চেষ্টা করেননি। এখন থেকেই ফরিদা মজিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর মেলে। অথচ পিয়ারীরা বাংলা একাডেমির প্রবাসী পুরস্কার থেকে শুরু করে একুশে পদক ভ্যানিটি ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেছেন।

ফরিদা আপা আজীবন বাউন্ডেলে ছিলেন এবং একইসাথে লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন। প্রচুর লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, গদ্য লিখেছেন। এ সব লেখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে 'বোহেমিয়ান' ফরিদা আপা বলতেন, ‘আমি তো খাঁটি বাদাইম্যা। ও সব নেই কিছু—সব হারিয়ে গেছে’।

এখন তিনি নিজেই অনন্তে হারিয়ে গেলেন।

তিন
ধর্মতত্ব, সমাজতত্ব, সুফিবাদ, সঙ্গীত, শিল্পকলা, সাহিত্য, সিনেমাসহ অনেক বিষয়েই ছিলো তাঁর অগাধ জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্য। আমার জানা মতে, পিএইচডি করেছিলেন তুলনামূলক সাহিত্যে। পড়িয়েছেন আমেরিকার বনেদি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে। কমনওয়েলথ পোয়েট্রি প্রাইজের বিচারক ছিলেন। কিন্তু এসব নিয়ে তাঁর কোনো অহমিকা ছিল না। ছিলো আধ্যাতিকতা, পাগলামি, উড়নচণ্ডী।

ফরিদা আপা প্রকাশনার সাথে জড়িত থাকলেও তাঁর মাত্র একটি বই ‘গাঁদা ফুলের প্রয়াণ ও যারা বেঁচে থাকবে’ বই বের হয়েছে। ২০২০ সালে মাত্র ২৫টি কবিতা নিয়ে বইটি প্রকাশ করেছে ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স। ধন্যবাদ দেই এই অসীম ধৈর্যধারী প্রকাশনাকে। যদিও মুম রহমানের লেখা থেকে জানলাম, চরম বিড়ম্বনা আর বিরক্তির পরীক্ষায় তারা পাশ-ফেল দুটোই করেছেন। সবচেয়ে বড়কথা অন্তত তাঁর একটি বই প্রকাশ পেয়েছে।

কবি ফরিদা মজিদের কবিতা সম্পর্কে কবি সৈয়দ আদনানের মূল্যায়ন—

‘তাঁর কবিতাগুলো পড়লে যে বিষয় উপলব্ধি করতে পারি, তা হলো তিনি কবিতার শব্দ প্রয়োগে ছিলেন অনেক সচেতন। বিশেষ করে কবিতায় মেটাফোর তাঁর কবিতার অন্যতম অলংকার। তাঁর প্রতিটা কবিতার শব্দই পাঠকের চিন্তায় এবং অন্তরে এক চিত্রকল্পের ঢেউ জাগিয়ে তোলে। কবিতার শরীরে জাদুবাস্তবতার চিত্র আঁকতেও কবি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এসব কাজ দেখে তাঁর কবিতার পাঠকরা খানিক নিজের কল্পনাকে আশ্রয় করে আবার কবির কবিতার নির্যাসে ডুবে থেকে এক নতুন জগতের বাসিন্দা হয়ে যেতে বাধ্য’। [দ্রষ্টব্য : ফরিদা আপাকে মনে পড়ে/ সৈয়দ আদনান, সাপ্তাহিক বাঙালি, ৯ অক্টোবর ২০২১, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা।]

অনেক আগে আমি বের করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম ফরিদা আপার অনূদিত কবিতা বইয়ের। তিনি ঢাকায় আমার আজিজ মার্কেটের অফিসেও এসেছিলেন। পাণ্ডুলিপি কম্পোজও হলো। কিন্তু তিনি একের পর এক শর্তারোপ দিতে থাকলেন।

‘তুমি তো জানো, আমি লন্ডনে সালামান্দার পত্রিকা সম্পাদনা করেছি, আমাদের প্রকাশনা ছিলো। কাজেই আমাকে ফাঁকি দেওয়া চলবে না। বইটি এভাবে মেকাপ হবে, সেভাবে ছাপা হতে, টিস বাঁধাই হতে হবে’… ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আপা দেখুন—এটা বাংলাদেশ। আবহাওয়া, পরিবেশ, পরিস্থিতির কারণে ‘প্রকাশনার আন্তর্জাতিক মান’ আমাদের পক্ষে বজায় রাখা সম্ভব হয় না। ধরুন, কাগজের জন্য ৫%, কালির জন্য ৫%, ছাপাযন্ত্রের জন্য ৫%, বাঁধাই ৫%, কাটিং ৫% এভাবেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ৫০% কোয়ালিটি মাইনাস হয়ে যায়।

অবুঝ ফরিদা আপা কিছুতেই তা বুঝতে চান না। আরো আমার ওপর বিরক্ত হচ্ছিলেন এবং আমিও বিরক্ত হয়ে পড়ি। তাঁর শিশুশুলভ শর্তের পর শর্ত মানতে পারিনি বলে কম্পোজের পরও ‘বিদেশি বাতাস’ বের হয়নি।

চার
ফরিদা আপা ২০০৬ সালে দেশে ফিরে যাবার পর তাদের মৌচাকের পেছনে টিনসেট বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি তো বিদেশে উড়াল দিলা। আর আমি ঘুড়ির মতো আকাশ ঘুরে লাটাইয়ের কাছে ফিরলাম। শহীদ কাদরী ফিরতে পারলেন না। তুমি ফিরে আসো’।

এই ফিরে আসাটাই ফরিদা মজিদ। তিনি লন্ডন-নিউ ইয়র্ক কোথাও শেকড় গাঁথেননি এবং কোনো বন্ধনেও আবদ্ধ হয়নি। ছন্নছাড়া জীবনে একবার নাকি ‘বেলতলা’য় গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য—মাথার উপর যৌথ ছাদের চেয়ে খোলা আকাশই ভালো!

২০১৫ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি কবি শিমুল সালাউদ্দিন আমাকে নিয়ে একটি একক অনুষ্ঠান করলেন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেখানে ফরিদা আপা হুট করে হাজির হয়ে শুধু চমকিয়েই দেননি; ভালোবাসার প্রমাণও দিয়েছেন। মৃদু অভিযোগের সুরে বললেন, তোমাকে নিয়ে অনুষ্ঠান আর আমাকে একবারও বললে না! আমি বিব্রত হয়ে বললাম, আপা সরি। আসলে আয়োজকেরা হয়তো ব্যস্ততার জন্য ভুলে গিয়েছিল।

আমি শিমুলকে ডেকে বললাম, আপাকে কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডেকো। তিনি তাঁর বক্তব্যে আমাদের যৌথ স্মৃতিচারণ করলেন। বললেন, ‘আমি দেশে চলে এলাম আর দুলাল দেশ ছেড়ে চলে গেলে? তা বিদেশি বাতাস কেমন লাগছে’!

একটু ঝাঁকুনি খেলাম। এখনো মনে আছে তাঁর সেই ‘বিদেশি বাতাস’-এর কথা।

আবারও বইমেলায় দেখা হলো ২০১৯ সালে। আমি আর আমীরুল ইসলাম একটি বুকস্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি। ফরিদা আপা এসে বললেন, আরে আমীরুল, আরে রিটন তোমরা কেমন আছ? তোমাদের কি বই বেরুলো?

আপা এবার আমাকে চিনতে পারলেন না! আমি একটু অবাক হলাম। এত চেনাজানা পরেও আপা আমাকে গুলিয়ে ফেললেন! আমি তাঁর স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলাম! উজ্জ্বল-উচ্ছল চেহারাটা মরা নদীর মতো ক্লান্ত। সাজুগুজো স্বত্ত্বেও কেমন যেন ম্লান আর এলোমেলো মনে হচ্ছিল!

আমীরুল চিমটি কেটে দুষ্টুমি করে আমাকে ‘রিটন ভাই, রিটন ভাই’ শুরু করল। আমিও মজা নিচ্ছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত আমি লুৎফর রহমান রিটন হয়েই থাকলাম।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

বিশেষ সংখ্যা (সূচিপত্র)

বাংলা ট্রিবিউন শারদীয় সংখ্যা ২০২১

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ২১:০৯

 

সূ | চি | প | ত্র

 সাক্ষাৎকার

যতীন সরকারের সাক্ষাৎকার

হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

 

অনুবাদ

এইচ জি ওয়েলস যদি বেঁচে থাকতেন! | মূল : এলিফ শাফাক

অনুবাদ : অসীম নন্দন

 

‘তোমরা শান্তিতে ঘুমাও—এই ভুল আমাদের আর কখনো হবে না’ | হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ : আলভী আহমেদ

 

ছোটগল্প

ইমান একটি সাদা জবা ফুল | মামুন অর রশীদ

 

অনুগল্প

পাঁচটি অণুগল্প | চন্দন চৌধুরী

 

প্রবন্ধ

চাঁদ বণিকের একার যুদ্ধ | মনির-উল হক

 

কবিতা

[বর্ণানুক্রমে]

অর্ণব রায় | আসাদ মান্নান | খায়রুল বাকী শরীফ | গৌতম গুহ রায় | ত্রিশাখ জলদাস | ধীমান চক্রবর্তী | নিষাদ নয়ন | নিখিলেশ রায় | পরিতোষ হালদার | ফরিদ ছিফাতুল্লাহ | বনানী চক্রবর্তী | বিভাস রায়চৌধুরী | মাহফুজা অনন্যা | মেঘ বসু | রাখী সরদার | রুবেল সরকার | শিকদার ওয়ালিউজ্জামান | সাকিরা পারভীন | হাসনাইন হীরা |

 

দীর্ঘ কবিতা

পৃথিবীর প্রাচীনতম নেপথ্যসঙ্গীতের কথা | অরিত্র সান্যাল

 

ভ্রমণ

স্যুরিশের চারপাশে | অহ নওরোজ

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

জীবনানন্দ দাশ  একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

জীবনানন্দ দাশ একটি পথ দুর্ঘটনা বা পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

বিজয়ী হলেন সরোজ মোস্তফা, ইলিয়াস বাবর ও মাজেদা মুজিব

ফরিদা মজিদের কথা

ফরিদা মজিদের কথা

সর্বশেষসর্বাধিক
quiz

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

ছাদবাগানে ফুলের ঘ্রাণে তবে রসায়ন কমে যাক

নিখিলেশ রায়ের কবিতা

কবিতানিখিলেশ রায়ের কবিতা

নিষিদ্ধ ইস্তেহার 

কবিতানিষিদ্ধ ইস্তেহার 

ঘুমোতে যাবার আগে  

কবিতাঘুমোতে যাবার আগে  

ব্যক্তিগত

কবিতাব্যক্তিগত

হিমনগ্ন বালিকারা

কবিতাহিমনগ্ন বালিকারা

মৃত্তিকাম্যুরাল

কবিতামৃত্তিকাম্যুরাল

কাগজের পাখি

কবিতাকাগজের পাখি

ভোরের কবিতা

কবিতাভোরের কবিতা

গুজারিশ

কবিতাগুজারিশ

সর্বশেষ

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ২৪ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ২৪ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে সেলফি তোলায় পুলিশ সদস্যদের নোটিস

প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে সেলফি তোলায় পুলিশ সদস্যদের নোটিস

‘স্বাধীনতাবিরোধীরাই সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা চালাচ্ছে’

‘স্বাধীনতাবিরোধীরাই সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা চালাচ্ছে’

'হামলার দায় এড়াতে পারেন না রাজনৈতিক নেতারা'

'হামলার দায় এড়াতে পারেন না রাজনৈতিক নেতারা'

বেগমগঞ্জে হামলা চালিয়ে মালামাল লুটের ঘটনায় সুজনের স্বীকারোক্তি 

বেগমগঞ্জে হামলা চালিয়ে মালামাল লুটের ঘটনায় সুজনের স্বীকারোক্তি 

© 2021 Bangla Tribune