শরীরের ভেতরে প্রবেশ করা ক্ষতিকর প্লাস্টিকের সূক্ষ্ম কণা (মাইক্রোপ্লাস্টিক) নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। তবে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকার জন্য দুনিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এক বিশেষ ‘রক্ত পরিশোধন’ চিকিৎসা বা আইভি থেরাপি রক্তে ভাসমান এই প্লাস্টিক কণা কমাতে সক্ষম বলে নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।
ছোট পরিসরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক অকাল প্রসব, শরীরের ভেতরের প্রদাহ এবং কিছু রোগের কারণ হতে পারে; যদিও এই ক্ষেত্রের গবেষণাগুলো এখনও খুব শক্তিশালী নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) অনুমোদিত এই প্রক্রিয়ার নাম থেরাপিউটিক প্লাজমা এক্সচেঞ্জ (টিপিই)। এতে রোগীর দুই হাতে আইভি চ্যানেল বা স্যালাইনের নল ব্যবহার করে রক্তের কোষবিহীন তরল অংশের প্রায় ৭০ শতাংশ বের করে নেওয়া হয়। এরপর সেই জায়গায় অ্যালবুমিন, স্যালাইন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কিছু অ্যান্টিবডি পুশ করা হয়। সাধারণত একটি সেশনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় নির্দিষ্ট কিছু অটোইমিউন এবং স্নায়বিক রোগের চিকিৎসার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
সার্কুলেট হেলথ-এর প্রধান নির্বাহী ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ব্র্যাড ইয়ংগ্রেন বলেন, এটিই মানুষের ওপর পরীক্ষামূলক ট্রায়াল চালানো প্রথম গবেষণা, যা শরীর থেকে প্লাস্টিক দূর করার কোনও থেরাপিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
প্লাজমা এক্সচেঞ্জ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সার্কুলেট হেলথ-এর করা এবং পর্যালোচিত এই নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রায় প্লাস্টিক থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এই থেরাপি কার্যকর। ১১৪ জন রোগীর ওপর করা এই গবেষণায় দেখা যায়, যাদের রক্তে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক কণা ছিল, মাত্র একটি সেশনের পর তাদের প্রতি ১০০ মাইক্রোলিটার রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গড় মাত্রা ৫২.২ থেকে কমে ২১.১ কণায় নেমে এসেছে। মাঝারি মাত্রার রোগীদের ক্ষেত্রেও প্লাস্টিকের পরিমাণ কমেছে।
এই চিকিৎসাটি মোটেও সস্তা নয়। সার্কুলেট হেলথ-এর এই থেরাপির একেকটি সেশনের খরচ ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা)। বর্তমানে এটি সুস্থভাবে দীর্ঘায়ু পাওয়ার আশায় ধনকুবের ও তারকাদের মাঝে ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে। এই থেরাপি নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত বায়নো-হ্যাকার ব্রায়ান জনসন, গুপ-এর প্রতিষ্ঠাতা গ্লিনেথ প্যালট্রো, পুরস্কারজয়ী গায়িকা লিয়েন রাইমস, এনএফএল হল অব ফেমার ট্রয় আইকম্যান এবং প্রযুক্তিবিদ পিটার ডায়াম্যান্ডিস।
তবে গবেষণায় একটি অদ্ভুত নেতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। যেসব রোগীর রক্তে শুরুতে প্লাস্টিকের মাত্রা অনেক কম ছিল, থেরাপির পর তাদের রক্তে প্লাস্টিক কণার পরিমাণ সামান্য বেড়ে গেছে! গবেষকদের ধারণা, থেরাপির সময় ব্যবহৃত প্লাস্টিকের টিউব এবং আইভি সরঞ্জামের কারণেই মূলত এমনটি ঘটেছে।
তা ছাড়া, রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক কমালেই মানুষের স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু বা রোগের ঝুঁকি কমে কি না, এই গবেষণা সেই উত্তর দেয় না। এমনকি বারবার এই থেরাপি নিলে তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভেতরের সামগ্রিক প্লাস্টিকের বোঝা কমাবে কি না, তা-ও এখনও অস্পষ্ট। মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে করা এই গবেষণাগুলোকে ক্ষেত্রের অনেক বিজ্ঞানীই এখনও পুরোপুরি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন না। চলতি বছরের শুরুতে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে মস্তিষ্ক এবং ধমনীতে প্লাস্টিক কণা খুঁজে পাওয়ার প্রচলিত গবেষণাগুলোর তীব্র সমালোচনা ও ত্রুটি প্রকাশ করেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আবিষ্কারের তথ্যকে এখনই অন্ধভাবে বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। বিজ্ঞানীরা এখনও বোঝার চেষ্টা করছেন যে, শরীরের ভেতরের এই মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আসলে এই মুহূর্তে আদৌ কিছু করার প্রয়োজন আছে কি না।
সূত্র: অ্যাক্সিওস

অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন আশা
উদ্ভাবনের স্বর্ণালী সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান







