বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নেওয়ার আগে স্পেনের বিজয়ী তারকারা যখন পডিয়ামে একত্রিত হচ্ছিলেন, ঠিক তখন পরাজিত ও বিপর্যস্ত আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা তাদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ম্যাচজুড়ে খিটখিটে, খামখেয়ালি ও অপ্রীতিকর পারফরম্যান্সের এটিই ছিল চূড়ান্ত পরিণতি, যার খেসারত হিসেবে মাঠে দলটিকে একজন খেলোয়াড় কম নিয়ে খেলতে হয়েছে এবং ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর তারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছে।
খেলার উত্তেজনায় মাঠে সামান্য ধস্তাধস্তি বা তর্কাতর্কি হতেই পারে। কিন্তু বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টের বিজয়ীদের এভাবে বর্জন করা বা সম্মান না দেখানোটা ছিল খুবই কুরুচিপূর্ণ। পুরো ১২০ মিনিটের খেলায় আর্জেন্টিনা দল যেমন সৌন্দর্য বা কৌশলের দিক থেকে তেমন কিছুই দেখাতে পারেনি, তাদের এই আচরণও ছিল ঠিক তেমনই রুচিহীন।
ম্যাচের আগেই অনেকে ধারণা করেছিলেন যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী ও ধারালো হয়ে ওঠা স্প্যানিশ দলটিকে পরাস্ত করতে আর্জেন্টিনাকে কৌশলগতভাবে কৌশলী হতে হবে। যেখানে স্পেন খেলছিল ঠাণ্ডা মাথায় ও নিখুঁত পরিকল্পনায়, সেখানে আর্জেন্টিনা ছিল চরম আবেগী ও বিশৃঙ্খল। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম দলকেই এত সহজে হারানো যাবে বলে মনে হলেও এত কম ম্যাচ হেরেছে। এই ফাইনালের চিত্রটি ছিল স্পষ্ট, স্পেন খেলেছে মস্তিষ্ক দিয়ে আর আর্জেন্টিনা হৃদয় দিয়ে। কিন্তু সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে যেভাবে উস্কানি দিয়ে আর্জেন্টিনা কাবু করার চেষ্টা করেছিল, স্পেনের ক্ষেত্রে সেই চেষ্টা কাজে আসেনি।
স্প্যানিশ সেন্টার ব্যাক আইমেরিক লাপোর্তে ম্যাচের আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তারা জানতেন আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফাউল ও উস্কানিমূলক আচরণ করবে। রেফারি স্লাভকো ভিনসিক সম্ভবত কার্ড না দেখিয়ে খেলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন, যা মূলত আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের আরও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। ম্যাচের শুরুতেই অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে স্প্যানিশ তারকাদের ওপর বাজে ফাউল করতে দেখা গেলেও তারা পার পেয়ে যান। প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয় অর্ধে এসে লিয়েন্দো পারেদেসও বারবার রেফারির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ও উস্কানিমূলক আচরণ শুরু করেন।
দ্বিতীয় অর্ধে আর্জেন্টিনা দল পরিশ্রমে ঘাটতি না রাখলেও তাদের খেলায় কোনও নতুনত্ব বা প্রেরণা ছিল না। এমনকি লিওনেল মেসিও ছিলেন প্রায় নিষ্প্রভ। দল ক্লান্তি ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর এনজো ফার্নান্দেজ রেফারির সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন। এরপর স্পেনের তরুণ সেন্টার ব্যাক পাউ কুবার্সির ওপর মারাত্মক ফাউল করে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি।
ম্যাচ শেষে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্পেনের খেলোয়াড়েরা যখন জয় উদযাপনে মগ্ন, তখন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নাহুয়েল মলিনা স্পেনের রদ্রিকে ধাক্কা মারার চেষ্টা করেন। এর জেরে হাতাহাতি শুরু হলে লিয়েন্দো পারেদেস স্প্যানিশ খেলোয়াড় এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরে তাকে মাটিতে ফেলে দেন এবং গাভির দিকেও তেড়ে যান। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নিকোলাস ওটামেন্ডিকে টিভিতে রদ্রিকে উদ্দেশ্যে করে বলতে শোনা যায় যে, তারা নাকি সারা সপ্তাহ ধরে কাঁদছে।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য শান্ত মেজাজে কথা বলেছেন আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি। তিনি বলেন, আমরা যেমন জয়ে মহান ছিলাম, পরাজয়েও আমাদের মহান হতে হবে। আজ আমরা দেখিয়েছি যে আমরা হারতেও জানি। আমরা হেরেছি এবং তা মেনে নিচ্ছি।
তবে প্রতিপক্ষের এই আচরণে একেবারেই ক্ষুব্ধ বাকি ফুটবল বিশ্ব। সাবেক জার্মান তারকা টনি ক্রস লিখেছেন, স্পেনের এই জয়ে ‘ফুটবলের জয় হয়েছে’। অন্যদিকে তার সাবেক সতীর্থ থমাস হিটজলসপারগার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘পারেদেস, ফার্নান্দেজ, ওটামেন্ডিসহ পুরো দলটাই ক্রীড়াবিদ হিসেবে জঘন্য... মেসি হয়তো বল হাতে একজন জিনিয়াস, কিন্তু তার বেশিরভাগ সতীর্থই ফুটবলের সৌন্দর্য না বোঝা সন্ত্রাসী, ভিভা এস্পানিয়া (স্পেন দীর্ঘজীবী হোক)।’
অবশ্য এই আর্জেন্টাইন দলের ঐক্য ও জাতীয় পতাকার প্রতি তাদের আনুগত্যই ছিল বড় শক্তি, যার পেছনে বড় রসদ ছিলেন মেসি। এই দলগত ভালোবাসাই তাদের ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা জিতিয়েছে। মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের গভীর বন্ধুত্ব এবং সমর্থকদের ভালোবাসাই ছিল এই টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ। সাবেক আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা বলেন, ‘মানুষ আগে বলত দল নাকি দর্শকদের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারে না। কিন্তু এই দলটি ভক্তদের মনের মতো হৃদয় দিয়ে খেলেছে।’
তবে চূড়ান্ত মুহূর্তে জয় পাওয়ার জন্য আগ্রাসনের যে পথ তারা বেছে নিয়েছিল, সেটাই তাদের উল্টো ডুবিয়েছে। কোচ স্ক্যালোনিও স্বীকার করেছেন, ‘আজ ফুটবলের বিচারে আমরা ওদের সঙ্গে সমানে সমানে টেক্কা দিতে পারিনি।’
ট্রফি বিতরণের আগে স্প্যানিশ দল সৌহার্দ্য হিসেবে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের গার্ড অব অনার দিয়েছিল। কিন্তু বিজয়ীদের সম্মান জানানোর মুহূর্তটি এলে আর্জেন্টাইনরা নিজেদের সমর্থকদের দিকে মুখ করে ট্রফির মঞ্চ বর্জন করে গোলপোস্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এমনকি রদ্রি যখন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল পুরস্কার নিচ্ছিলেন, তখন আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা ‘মেসি, মেসি’ স্লোগানে চারপাশ মুখরিত করে তোলে। এভাবে পুরো বিশ্বের সামনে নিজেদের ভাবমূর্তি নিজেরাই ক্ষুণ্ণ করলো আর্জেন্টিনা।
সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক

বিশ্বকাপ জয়ের পরই আর্জেন্টিনাকে টপকে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে স্পেন
১৯ বছরেই ইয়ামালের ঝুলিতে যত ট্রফি
বিশ্বকাপ জিতে ৫ কোটি ডলার পেলো স্পেন, আর্জেন্টিনা কত পেলো?
ফাইনালের পর মারামারি, বড় শাস্তির মুখে পারেদেস!







