মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়শই নিজের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে দাবি করতেন, এটি শত্রু ও মিত্র উভয়কেই চাপে রাখে। একদা নিজের ক্ষমতাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাতুড়ি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ট্রাম্প এখন নিজেই এক যুদ্ধের জালে আটকে পড়েছেন, যা থেকে বের হওয়ার পথ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ এবং দেশটির সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে তিনি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করেন। তবে পাঁচ মাস পরও সেসব লক্ষ্য প্রায় পুরোই অধরা রয়ে গেছে। ভেনিজুয়েলা মডেলে সরকার পরিবর্তনের আত্মবিশ্বাস থাকলেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে তেহরানে এই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে ট্রাম্প এখন নতুন করে বড় সামরিক অভিযানে নামতে দ্বিধাগ্রস্ত।
যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তেলের বাজার ও শেয়ার বাজারের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার পর এখন লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী রুটটি নতুন করে হুমকির মুখে। পদাতিক সেনা পাঠানোর ইচ্ছা না থাকায় এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানোর সীমারেখা স্পষ্ট হওয়ায় ট্রাম্প চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন।
এই হতাশা ও খামখেয়ালিপনার প্রতিফলন দেখা গেছে তার নীতিগত সিদ্ধান্তেও। গত এক সপ্তাহেই সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিতে সই করার পরদিনই ট্রাম্প শর্ত জুড়ে দেন যে চুক্তি টিকিয়ে রাখতে হলে সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তিতে সই করে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এতে সৌদি আরব ক্ষুব্ধ হলেও ইসরায়েল সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আবার কানাডার সঙ্গে সীমান্ত সেতুর চুক্তির ক্ষেত্রেও ট্রাম্প চুক্তি বাতিল করে ৫০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করার ঘোষণা দেন। এতে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কানাডা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ বাতিল করেছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তিনি একই ধরনের অনমনীয়তা দেখিয়েছেন, যার কারণে তার দলের নিজস্ব আবাসন বিলের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়।
এই যুদ্ধ এখন মার্কিন জনগণের কাছেও মারাত্মক অজনপ্রিয়। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৯ শতাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধে ট্রাম্পের ভূমিকা সমর্থন করছেন। ট্রাম্পের প্রধান সমর্থকরাও এখন এই যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার তাগিদ দিচ্ছেন।
বর্তমানে ট্রাম্পের সামনে মূলত তিনটি বিকল্প রয়েছে। প্রথমত, সামরিক অভিযান তীব্র করা। কিন্তু এটি করলে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিতর্ক উঠবে। তাছাড়া, টানা ১৩ দিনের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা। তবে তেলের ওপর নতুন করে কঠোর অবরোধ কার্যকর করতে দীর্ঘসময় লাগবে, যা বেশ ব্যয়বহুল এবং এতে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
তৃতীয়ত, বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে আসা। কিন্তু এতে জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হবে এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা অপরিবর্তিত থেকে যাবে।
ট্রাম্প একসময় দাবি করেছিলেন তার ক্ষমতার কোনও সীমা নেই। কিন্তু ইরানের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষমতা ও সুনামের এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন তার মেয়াদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

যুক্তরাষ্ট্রে আস্থা হারিয়ে কেন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে কুয়েত
১৩ দিন পর ইরানে হামলা স্থগিত করতে কেন বাধ্য হলেন ট্রাম্প
অস্ত্র সংকটে ইরানে হামলা বাড়াচ্ছেন না ট্রাম্প







