কীভাবে একটি অনুন্নত দেশ বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হলো? কীভাবে প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করে একটি দেশ গোটা পৃথিবীর অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠলো? চীনের এই অর্থনৈতিক বিপ্লব রাতারাতি কিংবা কোনও একগুঁয়ে ছক বা উচ্চভিলাষী পরিকল্পনা অনুসরণ করে গড়ে ওঠেনি। শুধু বিশ্বকে দেখানোর জন্য রাজধানী কিংবা বাছাই করা কোনও অঞ্চলকে সমৃদ্ধ না করে, শতভাগ বাস্তবমুখী পরিকল্পনা ও ধাপে ধাপে সংস্কারের মাধ্যমে গোটা দেশজুড়েই এই উন্নয়ন হয়েছে।
অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য অলীক সব পরিকল্পনা হাজির করলেও চীন বিশ্বাস করেছে বাস্তবতায়, যাকে বলা হয় ‘প্র্যাগম্যাটিজম’। ১৯৭৮ সালে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির মাধ্যমে এই উত্থানের সূচনা হয়। নেতারা বুঝেছিলেন অর্থনীতি একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। তাই একবারে পুরো দেশ না বদলে প্রথম ধাপে হাত দেওয়া হয় কৃষি খাতে, স্বাবলম্বী করা হয় গ্রাম ও কৃষকদের।
দ্বিতীয় ধাপে শুরু হয় শিল্প খাতের বিস্তার। হঠাৎ নতুন নীতি না চাপিয়ে ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ তৈরি করে ছোট ছোট অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। সফল মডেলগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় সারা দেশে, আর ব্যর্থ নীতিগুলো বাদ বা পুনর্গঠন করা হয়। নিখুঁত পরিকল্পনা খোঁজার চেয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী নীতি বদলানোর নমনীয়তাই চীনের প্রথম কৌশল।
অর্থশাস্ত্রের মুক্তবাজার বনাম রাষ্ট্র পরিচালিত অর্থনীতির বহুল চর্চিত বিতর্কও ভেঙে দিয়েছে চীন। তারা দেখিয়েছে বাজার ও সরকার একে অপরের পরিপূরক। মুক্তবাজার অর্থনীতি দেশে প্রতিযোগিতা, নতুন উদ্ভাবন ও দক্ষতা বাড়ায়, আর চীন সরকার সেখানে রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎ ও মেগা অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে দক্ষ সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সমন্বয়ই চীনের এই অলৌকিক সাফল্য এনে দিয়েছে।
চীনের তৃতীয় বড় চালিকাশক্তি ছিল বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করা। বহির্বিশ্বের জন্য দরজা খুলে দেওয়ায় বৈশ্বিক বিনিয়োগ, বিশ্বমানের প্রযুক্তি এবং রফতানি খাতে অভূতপূর্ব গতি আসে। ফলে চীন হয়ে ওঠে বিশ্বের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষামূলক নীতির আলোচনার মধ্যে চীন প্রমাণ করেছে, উন্মুক্ত অর্থনীতিই টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ।
চীনের মূলশক্তি শুধু আধুনিক অবকাঠামো বা দালানকোঠায় নয়, বরং তাদের মানুষের মধ্যে। চতুর্থ কৌশল হিসেবে চীন অবকাঠামোর পাশাপাশি ‘মানুষের যোগ্যতায়’ ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে শত শত কোটি ডলার খরচের ফলে চীন এখন প্রতিবছর ৫০ লাখ সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিত গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। এই দক্ষ জনবলই আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে চীনকে শীর্ষস্থানে বসিয়েছে।
তবে চার দশকের ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির পর চীন আজ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। সস্তা শ্রম বা অবকাঠামো বিনিয়োগের চাহিদা কমে আসা, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং বৈশ্বিক জটিল ভূ-রাজনীতি সত্ত্বেও চীনের অর্থনীতি থেমে যায়নি। তারা এখন সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি থেকে সরে এসে ৪-৫ শতাংশের টেকসই প্রবৃদ্ধিতে নজর দিচ্ছে, যা নির্ভর করছে উদ্ভাবন, পরিবেশবান্ধব শক্তি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর।
সম্প্রতি চীনা নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট করেছেন, উন্নয়ন হতে হবে মানুষকে কেন্দ্র করে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রামীণ পর্যটন বা অবকাঠামো গড়ার পাশাপাশি গ্রামবাসীকে ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং ও আধুনিক ব্যবসার প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। অবকাঠামো ও মানবিক সক্ষমতার এই জোড়া ভিত্তি স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করছে।
চীনের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি শিখতে পারে বাজার ও সরকারের যৌথ শক্তিকে কাজে লাগানো, অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের দক্ষতায় বিনিয়োগ করা এবং অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকতে বাস্তবতাকে মেনে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখা।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি









