দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রদত্ত ৩৪৩ ভোটের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। নির্বাচনি ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন মির্জা ফখরুল।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন।
সিইসি জানান, নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন। এর মধ্যে ৩৪৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ ৮৮ ভোট পেয়েছেন। প্রাপ্ত ভোটের ফল অনুযায়ী, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হয়েছেন। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান সিইসি।
সিইসির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ সময় সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা করতালি দিয়ে ও টেবিল চাপড়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাশের আসনে থাকা বিজয়ী প্রার্থী মির্জা ফখরুলের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং লাল গোলাপ দিয়ে অভিনন্দন জানান। এরপর বিরোধীদলীয় নেতাসহ অন্যরা নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাকে কোলাকুলি করতেও দেখা যায়। রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ফটো সেশনে অংশ নেন।
ভোট গণনা
এর আগে ভোট শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা নির্ধারিত নিয়মে ব্যালট বাক্সগুলো খোলেন। সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে ব্যালট গণনা শুরু হয়। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে ভোট গণনা করা হয়। গণনার সময় সংসদ সদস্যদের উপস্থিত থাকার সুযোগ ছিল। বিকাল ৫টা ১৮ মিনিটে ভোট গণনা শেষে নির্বাচনি কর্তা হিসেবে সিইসি আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোট দিলেও তার প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় নিজে ভোট দিতে পারেননি। নির্বাচনে ভোট দেননি ছয়জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় ভোট দিতে পারেননি। এছাড়া ভোট দেননি ওসমান ফারুক ও মোস্তফা কামাল পাশা। অন্যদিকে, জামায়াতের বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলাম, খেলাফত মজলিশের আবুল হাসান এবং স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারাহান ভোট দেননি।
যেভাবে ভোট
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদের নিয়মিত অধিবেশন না থাকায় সংসদ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়। জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষেই ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদের অধিবেশন কক্ষের মাঝে তিন পাশে তিনটি টেবিলে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স রাখা হয়।
ভোট শুরুর প্রায় ১৫ মিনিট আগে থেকেই সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করতে শুরু করেন। বেলা ১টা ৫৬ মিনিটে দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এরপর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে উপস্থিত সবাই তাকে স্বাগত জানান।
নির্ধারিত সময় বেলা ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অধিবেশন শুরু হয়। এর আগে অধিবেশন শুরুর সময় সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামকে নিয়ে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স পরীক্ষা করেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। তাঁরা ব্যালট বাক্স সংসদ সদস্যদের প্রদর্শন করেন।
অধিবেশনের শুরুতে নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটদানের নিয়ম ও প্রক্রিয়া সংসদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। পাশাপাশি ব্যালট গ্রহণ, ব্যালটে ভোট প্রদান এবং ব্যালট বাক্সে জমা দেওয়ার নিয়মও বুঝিয়ে দেন।
সিইসির বক্তব্য শেষে বেলা ২টা ১১ মিনিটে সংসদ কক্ষে প্রবেশ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম ভোট দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে করমর্দন করেন। ভোট শেষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে করমর্দন করেন এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ভোট দেওয়া শেষে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
এরপর ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের জন্য সংসদ কক্ষের মাঝে আলাদা চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানে বসেই তারা ভোট দেন। পরে ভোট দেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাদের ভোট দেওয়ার সময় সংসদ সদস্যরা করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানান। বেলা ২টা ১৯ মিনিটে ভোট দেন বিরোধীদলীয় নেতা। এরপর সংসদ সদস্যরা সারিবদ্ধভাবে ভোট দিতে থাকেন। বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়।
সংসদ গ্যালারি থেকে দেখা যায়, ভোট শুরুর পর ভিড় এড়াতে পর্যায়ক্রমে সংসদ সদস্যদের ব্যালট পেপার পৌঁছে দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রথমে সংসদ সদস্যের কাছে ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশ দেওয়া হয়। সেখানে তাকে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হয়। এরপর ব্যালটের মূল অংশে থাকা দুই প্রার্থীর নামের মধ্য থেকে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে ভোট দেন। মূল ব্যালটেও সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হয়। পরে ভাঁজ করা ব্যালট পেপার নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দেন তারা।
সরাসরি সম্প্রচার
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে ভোটগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ভোট শুরুর আগে থেকেই সংসদ ভবনের কার্যক্রম সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, ভারপ্রাপ্ত স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুলের ভোট দেওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়। ভোটগ্রহণের পুরো তিন ঘণ্টা সরাসরি সম্প্রচার না হলেও প্রক্রিয়ার রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়। ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট বাক্স খোলা, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার অংশও সম্প্রচার করা হয়।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল। এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে একাধিক প্রার্থী না থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
এবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আলাদা প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘদিনের সেই ধারা ভাঙে। ফলে ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
বিএনপির নিজস্ব ভোটের চেয়ে ১১ ভোট বেশি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেদের দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মোট ভোটের চেয়ে ১১টি ভোট বেশি পেয়েছেন। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি মোট ২৫৫ ভোট পেয়েছেন।
বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২০৮ জন মির্জা ফখরুলকে ভোট দিয়েছেন। দলটির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৬ জন। এ হিসাবে বিএনপির নিজস্ব ভোট পড়েছে ২৪৪টি।
এর বাইরে জোটসঙ্গীদের কাছ থেকে মির্জা ফখরুল পেয়েছেন তিনটি ভোট। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে পেয়েছেন সাতটি ভোট। এছাড়া ‘হাতপাখা’ প্রতীকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যও তাকে ভোট দিয়েছেন।
অর্থাৎ বিএনপির নিজস্ব ২৪৪ ভোটের সঙ্গে জোটসঙ্গীদের তিন, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সাত এবং হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচিত একজনের এক ভোট যোগ হয়ে মির্জা ফখরুলের মোট ভোট দাঁড়িয়েছে ২৫৫টিতে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
চিফ হুইপের বক্তব্য
জোটের বাইরে বিএনপির প্রার্থী বেশি ভোট পাওয়ার বিষয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমিও চিন্তা করছিলাম যে, এত ভোট আসল কোথা থেকে। পরে খুঁজে বের করলাম। দেখা যায়, স্বতন্ত্র সবাই ভোট দিয়েছেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের সাতটি ভোটের পাশাপাশি হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যের ভোটও পেয়েছেন মির্জা ফখরুল। এছাড়া জোটসঙ্গীদের কাছ থেকে পেয়েছেন তিনটি ভোট। সব মিলিয়ে বিএনপির নিজস্ব ২৪৪ ভোটের সঙ্গে আরও ১১ ভোট যোগ হয়েছে। অর্থাৎ ২৪৪, জোটসঙ্গীদের তিন, স্বতন্ত্রদের সাত এবং হাতপাখার একটি ভোট—সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের মোট ভোট ২৫৫টি।’
শুক্রবার শপথ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) বঙ্গভবনে শপথ নেবেন তিনি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়াবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
কারণ বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানের ৭৪(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ অবস্থায় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
এদিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংসদ সদস্যপদ শূন্য হবে। একইসঙ্গে তার মন্ত্রিত্বের দায়িত্বও শেষ হবে। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের দায়িত্বের অধ্যায়। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি বঙ্গভবনে শেষ অফিস করেন।









