ইরানের অর্থের প্রবাহ বন্ধ করতে চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ছায়া-ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত লেনদেনের অভিযোগে মিসরের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক বাংক মিসরের সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাখাগুলোকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।
গত ২৮ আগস্ট মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সচিব স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এর আওতায় ব্যাংক মিসরের আমিরাতি শাখাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেটি ‘অর্থ পাচারের প্রধান উদ্বেগের বিষয়’।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, ব্যাংক মিসরের আমিরাতি শাখাগুলো ইরানের ছায়া-ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন হিসাবের লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (ফিনসেন) স্পেশাল মেজার ফাইভ প্রয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ব্যাংক মিসর আমিরাতের-এর জন্য বা এর পক্ষে কোনও করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খুলতে বা পরিচালনা করতে না পারে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হবে।
ফিনসেনের মতে, ইরানি সরকারের জন্য মার্কিন ডলারের করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক মিসর আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করেছে। সংস্থাটির অভিযোগ, ব্যাংকটির কিছু গ্রাহকের মধ্যে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত ফ্রন্ট কোম্পানিও ছিল।
তবে এই প্রস্তাব শুধু ব্যাংক মিসর আমিরাতের-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এর আওতায় আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও রাস আল খাইমাহতে থাকা ব্যাংকটির পাঁচটি শাখা রয়েছে। মিসর ও অন্যান্য দেশে ব্যাংক মিসরের কার্যক্রম এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে।
যেভাবে ব্যাংকটির শাখা ব্যবহার করেছে ইরান
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের ব্যাংকগুলো সরাসরি মার্কিন ডলার ব্যবহারের সুযোগ হারিয়েছে। তাই তেহরান বহু দেশের মাধ্যমে পরিচালিত ‘ছায়া-ব্যাংকিং’ কাঠামো ব্যবহার করে আসছে। এর মাধ্যমে মূলত জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল রফতানি থেকে পাওয়া অর্থ নগদে রূপান্তর এবং বিদেশ থেকে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য কেনা হয়।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে বিভিন্ন স্তরের বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে।
ইরানের নেটওয়ার্কগুলো বিশ্বের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রে শেল কোম্পানি খুলেছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের খাদ্য, ভোগ্যপণ্য বা সাধারণ পণ্যের ব্যবসায় যুক্ত স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিত। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকদের সঙ্গে আইআরজিসি, ইরানের প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিকস মন্ত্রণালয় (মোদাফেল) এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক ছিল।
ফিনসেনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব ফ্রন্ট কোম্পানির ব্যাংক মিসর আমিরাতে হিসাব ছিল। এসব প্রতিষ্ঠান মার্কিন ডলারে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের নির্দেশ দিলে ব্যাংকটি যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সেই নির্দেশনা পাঠাত।
ফিনসেনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১০৩টি কোম্পানির জন্য ব্যাংকটি প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন করেছে। এর মধ্যে গত ১২ মাসেই ৫২০ মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে।
নজরদারি এড়াতে কেন এই ব্যাংক ব্যবহার করত ইরান
ইরানের ছায়া-ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যাংক মিসরের আমিরাতি শাখাগুলোকে বেছে নিয়েছিল মার্কিন ডলার ছাড় করার তুলনামূলক সহজ পথ হিসেবে। এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার নজর এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
তেহরান দুবাইয়ের বড় পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর কঠোর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার বদলে উত্তর আফ্রিকার আঞ্চলিক ব্যাংকের শাখাগুলোর কিছু কাঠামোগত সুবিধা কাজে লাগিয়েছে।
ব্যাংক মিসর আমিরাতের সাধারণ বাণিজ্যিক অর্থায়ন ও শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত। ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো নিজেদের সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়ে দুবাই ও হংকংয়ের মতো শহরকে বেছে নেয়। এসব শহরকে তুলনামূলক নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো যেখানে মালিকানার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, সেখানে ছোট ব্যাংকের শাখাগুলো এখনো প্রচলিত নাম মেলানোর সফটওয়্যার ব্যবহার করে। ফলে ইরান স্তরভিত্তিক শেল কোম্পানি ও প্রক্সি পরিচালক ব্যবহার করে এসব প্রাথমিক যাচাই এড়িয়ে যেতে পেরেছে।
ইরান এই ব্যবস্থাকে তৃতীয় একটি দেশের এমন একটি ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি আয়কে মার্কিন ডলারে রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে দেখেছে, যেটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল না। একই সঙ্গে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করতে ব্যাংক শাখাগুলো মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। এভাবে বিপুল বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালনাকারী একটি আঞ্চলিক ব্যাংকের মাধ্যমে ইরান বিকল্প ডলার প্রবাহের পথ তৈরি করেছিল।
পশ্চিম এশিয়ার আর্থিক খাতে প্রভাব
৩০ দিনের জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে চূড়ান্ত নিয়ম কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক মিসর আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ব্যাংকটি মার্কিন ডলার ক্লিয়ার করার সক্ষমতা হারাবে। করপোরেট হিসাবধারীরাও স্থানীয় মুদ্রা দিরহাম (এইডি) অথবা অন্য বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের দিকে যেতে পারেন।
জেপিমরগ্যান চেজ, সিটিগ্রুপ ও ডয়চে ব্যাংকের মতো বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও মিসরের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নজরদারি আরও কঠোর করতে পারে। এর ফলে লেনদেনের খরচ বাড়বে এবং অর্থ ছাড়ের সময়ও দীর্ঘ হতে পারে।
দুবাই, আবুধাবি ও দোহার মতো পশ্চিম এশিয়ার আর্থিক কেন্দ্রগুলো এখন আরও সতর্ক থাকবে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের এই পদক্ষেপ ওই অঞ্চলের অনেক ব্যাংকের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমিরাতে কার্যক্রম চালানো বিদেশি ব্যাংকের শাখাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নিয়ন্ত্রক নজরদারি আরও বাড়াতে পারে।
এই পদক্ষেপ মিত্র দেশগুলোর বিদেশি ব্যাংক শাখাগুলোর বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার একটি নতুন ধাপও হতে পারে। এর মাধ্যমে মূল ব্যাংক বা অভিভাবক প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি না দিয়েও নির্দিষ্টভাবে কোনও শাখাকে লক্ষ্য করা সম্ভব হবে। ধারা ৩১১ ব্যবহার করে মার্কিন ট্রেজারি ইরানের গোপন অর্থায়ন নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যদিও এতে বৃহত্তর কূটনৈতিক জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়বে
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের কোনও সমঝোতামূলক সমাপ্তি এখনও দূরে বলে মনে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য সব অর্থের উৎস বন্ধ করতে চাইছে।
গত কয়েক মাসে ইরান তার আর্থিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সম্ভাব্য প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে দেশটির অর্থনীতি প্রতিদিন আরও খারাপ হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইরানের রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এতে অতিমুদ্রাস্ফীতি আরও তীব্র হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে অর্থনীতি ন্যূনতম জীবনধারণের পর্যায়ের দিকে ঠেলে যাচ্ছে।
নতুন এই পদক্ষেপ ইরানের সামনে খুব বেশি বিকল্প রাখছে না। তেহরান এখন ক্রমবর্ধমান আর্থিক দেউলিয়াত্বের ঝুঁকি ও তীব্র অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ সামলে চলার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরানকে আরও গভীর সংকটে ফেলবে এবং আঞ্চলিক প্রক্সি তৎপরতা ও পারমাণবিক কার্যক্রম থেকে সরে আসতে বাধ্য করবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে দেশটিকে পুরোপুরি অর্থনৈতিক ও আর্থিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করা হবে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর কিয়েভে কুশনার-উইটকফ
যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিকল্প’ হিসেবে চীনকে তুলে ধরছেন শি?
যুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহে পর্নোগ্রাফিকে বৈধতার পথে ইউক্রেন
ইরানি সাইবার কমান্ডার আমির ইয়ারইয়াব সম্পর্কে যা জানা গেলো
‘এক ডলারের ক্ষতির বিপরীতে বহুগুণ মাশুল গুনবে যুক্তরাষ্ট্র’
লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ৪, আহত ২০







