বাংলাদেশের শ্রমবাজারে গত এক দশকে এক ভিন্নধর্মী ও উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সাধারণত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়লেও বাংলাদেশে তার বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বরং কৃষি খাতে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—যা অর্থনীতিবিদদের মতে স্বাভাবিক উন্নয়ন প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের এক অধিবেশনে এ বিষয়টি উঠে আসে। আলোচনার মূল বিষয় ছিল দেশের শ্রমবাজারের কাঠামোগত পরিবর্তন।
কৃষিনির্ভর কর্মসংস্থানে অস্বাভাবিক প্রবণতা
আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন। গবেষণা উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।
তিনি জানান, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কৃষি খাতে জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এ খাতে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অন্যদিকে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এবং সেবা খাতেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
নাজমুস সাদাত খান বলেন, এই পরিবর্তন স্বাভাবিক উন্নয়ন প্রবাহের বিপরীত। কৃষি খাতে সত্যিকারের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, নাকি অন্য খাতে কাজ না পেয়ে মানুষ নিম্ন আয়ের অনানুষ্ঠানিক কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছে—তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক এক দশকে মোট নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৩ শতাংশ এসেছে কৃষি, বন ও মৎস্য খাতে। এসব কাজের বড় অংশই কম আয়ের ও অনানুষ্ঠানিক।
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের মানও জরুরি
গবেষক নাজমুস সাদাত খান বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি এমন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন, যেখানে তুলনামূলক বেশি কাজের সুযোগ তৈরি হয় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
অন্যদিকে গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন বলেন, কৃষি খাতে সাম্প্রতিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পেছনে কোভিড-পরবর্তী সময়ের প্রভাব থাকতে পারে। শহরাঞ্চলে কাজ হারানো অনেক মানুষ গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। ফলে এটি স্থায়ী পরিবর্তন নাকি সাময়িক পরিস্থিতির ফল—তা আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
দক্ষতা সংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, বিশ্বজুড়ে এখন “কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি” একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তিনি বলেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিল্প খাতকে কেন্দ্র করে কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষা আরও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি করা যায়।
উৎপাদন খাতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে
সম্মেলনে উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণায় সানেমের গবেষণা সহযোগী দীপা দাস জানান, উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমার পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে আগে যেখানে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় অর্ধেক ছিল, তা বর্তমানে কমে প্রায় ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, সামাজিক বাধা, পারিবারিক চাপ, শিশুযত্নের অভাব এবং সাংস্কৃতিক কারণ নারীর অংশগ্রহণ হ্রাসে ভূমিকা রাখছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মানুষ, পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা, ভূমিহীন পরিবার এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা উৎপাদন খাতে বেশি যুক্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে নারীরা, বৃহৎ পরিবারভুক্ত মানুষ, তুলনামূলক বেশি সম্পদশালী কৃষিনির্ভর পরিবার এবং কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কৃষি খাতে বেশি অবস্থান করছেন।
এছাড়া কোনও পরিবারের একজন সদস্য উৎপাদন খাতে কাজ করলে অন্য সদস্যদেরও একই খাতে যাওয়ার প্রবণতা কয়েক গুণ বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
নীতিনির্ধারণে সতর্কতার আহ্বান
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শ্রমবাজারের এই পরিবর্তন শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে। তাই নীতিনির্ধারণে শিল্প, সেবা ও কৃষি—সব খাতের কর্মসংস্থান প্রবণতা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।









